চার রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফলে বিজেপি তিন আর কংগ্রেস এক। এই ফলাফলকে আর এক ভাবে দেখলে বলা যায়, হিন্দি বলয়ে কংগ্রেস শূন্য আর বিজেপি শূন্য দক্ষিণে। এ দেশের রাজনীতিতে বহু কাল ধরে একটি প্রবাদ চালু আছে— উত্তরপ্রদেশ যার, দিল্লির মসনদ তার। একটা সময় কংগ্রেস কেবল উত্তরপ্রদেশ নয়, গোটা উত্তর ভারতের সমর্থন নিয়েই দিল্লির মসনদে আসীন ছিল। কিন্তু কংগ্রেস সেই রাজত্বের দিন হারিয়েছে, বরং এখন বলা যায় ১৩৭ বছরের প্রাচীন দল প্রায় সব রাজ্যে থেকেই ক্ষমতা হারাচ্ছে। অন্যদিকে, ৪৩ বছর আগে জন্ম নেওয়া একটি দল দিল্লি থেকে রাজ করছে সেই পথেই। ২৪-এর লোকসভা নির্বাচনের আগে তাই বলাই যায় যে এই চার রাজ্যের ফল বিজেপিকে বাড়তি অক্সিজেন জোগাবে। কারণ, দিল্লির মসনদে কে বসবে, তার অনেকটাই ঠিক করে দেয় এই হিন্দি বলয়।

কংগ্রেস যে একেবারেই হিন্দি বলয়ে নেই তা বলা যাবে না কারণ, গোবলয়ে হিন্দির মধ্যে না পড়লেও হিমাচল প্রদেশ তো হিন্দিভাষী রাজ্য। সেখানে এক বছর আগেই কংগ্রেস ক্ষমতায় ফিরেছে। তাছাড়া তৃতীয় শরিক হলেও বিহারে কংগ্রেস ক্ষমতায় রয়েছে। যদিও ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর ১৬০ আসনের মধ্যে কংগ্রেসের মাত্র ১৯। বিজেপির ৭৮। হিন্দি বলয়ের সর্ববৃহৎ রাজ্য উত্তরপ্রদেশের ৪০৩ আসনের মধ্যে কংগ্রেসের দুই! ৯০ আসনের হরিয়ানায় কংগ্রেসের হাতে ৩০। এবারের বিধানসভায় রাজস্থান, ছত্তীসগঢ়, মধ্যপ্রদেশও হাতছাড়া হল। গত বিধানসভা নির্বাচনে কংগ্রেস মধ্যপ্রদেশে জিতেছিল ঠিকই কিন্তু দলবদলের খেলায় ক্ষমতা চলে যায় বিজেপির হাতে। এবার কিন্তু বিজেপি মধ্যপ্রদেশ সরাসরি জিতেছে। হিন্দি বলয়ে কংগ্রেসকে ৩-০ হারিয়েছে বিজেপি। আগেরবার যেখানে তিনটি রাজ্যেই সরকার গড়েছিল কংগ্রেস, সেই তিনটি রাজ্যেই গেরুয়া শিবির বাজিমাত করেছে। কংগ্রেস একমাত্র সান্ত্বনা পুরস্কার হিসেবে পেয়েছে তেলাঙ্গানা। তার মানে আগামী বছর লোকসভা নির্বাচনের আগে মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থান এবং ছত্তিশগড়ে কংগ্রেসের পক্ষে ‘ডবল’ ধাক্কা। কারণ, দল হিসেবে ভোটারদের কাছে কংগ্রেসেরে প্রাসঙ্গিকতা কমল, সেই সঙ্গে বিরোধীদের ইন্ডিয়া জোটেও কংগ্রেসের গুরুত্ব আরও কমবে।
হিন্দি বলয়ে কংগ্রেসের লোকসভার আসন কমে ৫০-এ এসে দাঁড়ানোয় সংসদে বিরোধী দলের মর্যাদাও তার নেই। তেলেঙ্গানায় কংগ্রেস জিতলেও বিজেপিকে হারিয়ে নয়, ফলে ২৪-এর লোকসভা নির্বাচনের আগে হিন্দি বলয়ে বিজেপির জন্য যেমন সুখের, কংগ্রেসের পক্ষে তেমনই উদ্বেগের। তেলেঙ্গানা জয় করেও কংগ্রেস দক্ষিণ ভারতে ক্ষমতায় রইল কর্ণাটক ও তেলেঙ্গানায়। কিন্তু হিমাচল প্রদেশ জুড়লেও গোটা দেশে কংগ্রেসের দখলে মাত্র তিন রাজ্য। অন্যদিকে একক ভাবে বিজেপিশাসিত রাজ্যের সংখ্যা ১২। উত্তরপ্রদেশ, হরিয়ানা, উত্তরাখণ্ড, গুজরাত, গোয়া, অসম, ত্রিপুরা, মণিপুর, অরুণাচল প্রদেশ এবং মধ্যপ্রদেশ, তার সঙ্গে যুক্ত হল রাজস্থান ও ছত্তীসগঢ়। এ ছাড়াও মহারাষ্ট্র, মেঘালয়, নাগাল্যান্ড ও সিকিমে সরকার পক্ষে রয়েছে বিজেপি। স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন আসে, দীর্ঘ কাল দেশ জুড়ে রাজত্ব করার পর হিন্দি বলয়ে কংগ্রেসের এই পরিণতি কেন?

২০২২ সালের নভেম্বরে হিমাচল প্রদেশ বিধানসভার ভোটে বিজেপিকে কংগ্রেসের কাছেই হারতে হয়েছিল, ছ-মাস পর ফের কর্ণাটকে ধাক্কা খেতে হয়। এরপর রাহুল গান্ধীর ভারত জোড়ো যাত্রার পর উজ্জীবিত কংগ্রেস বিজেপিবিরোধী দলগুলোকে জোটবদ্ধ করার প্রচেষ্টায় গঠিত হয় ‘ইন্ডিয়া জোট’। লক্ষ্য, কেন্দ্র থেকে মোদী সরকারকে দূর হটাও। কিন্তু পাঁচ রাজ্যের ভোটের ফল কী আভাস দিচ্ছে? প্রসঙ্গত, ২০১৮ সালের বিধানসভা নির্বাচনে কংগ্রেস রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ ও ছত্তিশগড়ে বিজেপিকে হারিয়ে ক্ষমতায় এলেও ২০১৯ সালের লোকসভা ভোটে এই তিন রাজ্যের ৬৫টি আসনের মধ্যে কংগ্রেস জিতেছিল মাত্র তিনটিতে!

ভোটের ফলাফলে হিন্দি বলয়ের তিনটি রাজ্যেই কংগ্রেস পুরোপুরি পর্যুদস্ত। অথচ পরিসংখ্যান খুবই আশ্চর্যজনক। কংগ্রেস তিন রাজ্যে পরাজিত হয়েছে ঠিকই কিন্তু চার রাজ্যে প্রাপ্ত মোট ভোটের নিরিখে কংগ্রেসই এগিয়ে রয়েছে। কংগ্রেস চার রাজ্যে মোট ভোট পেয়েছে ৪,৯০,৬৯,৪৬২ আর বিজেপি পেয়েছে ৪,৮১,২৯,৩২৫। তার মানে বিজেপি তিন রাজ্যে জিতলেও মোট ভোটের নিরিখে কম ভোট পেয়েছে। রাজ্য ভিত্তিক ভোটের হিসাব বলছে কংগ্রেস মধ্যপ্রদেশে পেয়েছে ১,৭৫,৬৪,৩৫৩ ভোট আর বিজেপি পেয়েছে ২,১১,১৩,২৭৮। এই রাজ্যে ২৩০টি আসনের মধ্যে বিজেপি দখল করেছে ১৬৩টি আসন আর কংগ্রেস ৬৬টি। শতাংশের হিসাবে বিজেপি ৭১.৩০ আসন জিতে ৪৮.৫৮ শতাংশ ভোট পেয়েছে। অন্যদিকে কংগ্রেস ৪০.৪৪ আসন জিতে পেয়েছে ২৮.২৬ শতাংশ ভোট।
রাজস্থানে কংগ্রেস ১,৫৬,৬৬,৭৩১ ভোট পেয়েছে আর বিজেপি পেয়েছে ১,৬৫,২৩,৫৬৮ ভোট। এই রাজ্যে মোট আসন ১৯৯টি, তার মধ্যে বিজেপি জিতেছে ১১৫টি আর কংগ্রেস ৬৯টি। রাজস্থানে কংগ্রেসের থেকে বিজেপি ৪৭টি আসন বেশি পেলেও ভোটের হারের ফারাক দুই শতাংশ। বিজেপি ৫৭.৭৮ আসন জিতে ভোট পেয়েছে ৪১.৬৯ শতাংশ আর কংগ্রেস ৩৪.৬৭ আসনে জিতে ভোট পেয়েছে ৩৯.৫৩ শতাংশ।

তেলাঙ্গানায় কংগ্রেস পেয়েছে ৯২,৩৫,৭৯২ ভোট আর বিজেপি পেয়েছে ৩২,৫৭,৫১১ ভোট। মোট ৯০টি আসনের মধ্যে ৮ জিতেছে বিজেপি আর ৬৪টি আসনে জয়ী হয়েছে কংগ্রেস। এই রাজ্যেও ভোটের হারের নিরিখে বিজেপির ঘাড়ে শ্বাস ফেলছে কংগ্রেস। কংগ্রেস পেয়েছে ৩৯.৪০ শতাংশ আর বিজেপি পেয়েছে ১৩.৯০ শতাংশ ভোট। পরিসংখ্যান অনুযায়ী কংগ্রেস তিন রাজ্যেই পরাজিত কিন্তু মোট ভোটের নিরিখে বিজেপির থেকে ১০ লাখ ভোট বেশি পেয়েছে। তাহলে আসল ঘটনাটি কী? রাজস্থান আর ছত্তিশগড়ের ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে বিজেপি অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ২.৪ শতাংশ ভোটের নিরিখে জিতে গিয়েছে।