এতদিন নরেন্দ্র মোদী ও তাঁর দল কংগ্রেসের বিরুদ্ধে কথায় কথায় পরিবারতন্ত্র চালানোর অভিযোগ তুলে এসেছে। আজ থেকে কংগ্রেস সেই অভিযোগের হাত থেকে রেহাই পেল। ১৯৯৮ সালের পর এই প্রথম গান্ধী পরিবারের বাইরের কেউ কংগ্রেসের সভাপতি পদ পেলেন। এর আগে গান্ধী পরিবারের বাইরে ওই পদে ছিলেন সীতারাম কেশরী। কংগ্রেস সভাপতি পদের জন্য শেষবার নির্বাচনে জগজীবন রামকে নতুন সভাপতি হলেও রিমোট গান্ধী পরিবারের হাতে
হারিয়ে সভাপতি হয়েছিলেন সোনিয়া গান্ধী। এরপর থেকে পরবর্তী দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে কংগ্রেস সভাপতি থেকেছেন কোনও এক গান্ধী। ২০২২ সালে শেষমেষ সেই ধারাবাহিকতা ভাঙলেও প্রশ্ন উঠেছে, নতুন কংগ্রেস সভাপতি কি স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবেন, না কি, রিমোট কন্ট্রোল সেই গান্ধী পরিবারের হাতেই থাকবে?
প্রসঙ্গত, বুধবার অন্ধ্রপ্রদেশের কুলনুরে ‘ভারত জোড়ো যাত্রা’য় বেরিয়েছিলেন রাহুল। দুপুর দেড়টা নাগাদ তিনি সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন। তখন কংগ্রেস সভাপতি নির্বাচনের ভোটগণনা চলছিল। সাংবাদিকরা রাহুলকে সভাপতি নির্বাচন পরবর্তী পর্যায়ে তাঁর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন করেন। উত্তরে রাহুল বলেন, পরবর্তী কংগ্রেস সভাপতির ভূমিকা নিয়ে কোনও মন্তব্য তিনি করতে পারেন না। কিন্তু তিনি বলেন খড়্গেজি এ বিষয়ে বলতে পারবেন। তার মানে সভাপতিই ঠিক করবেন দলে তাঁর ভূমিকা কী হবে। লক্ষ্যণীয় রাহুল ফল বেরোনোর আগেই কার্যত খড়্গেকে সভাপতি ‘ঘোষণা’ করে দেন। তবে কি পরিবারতন্ত্রের অভিযোগের হাত থেকে বাঁচার জন্যই মল্লিকার্জুন খাড়গেকে কংগ্রেসের নতুন সভাপতি করা হয়েছে। অন্যদিকে রাজনৈতিক বিশেষঙ্গরাও মনে করে কংগ্রেসের রিমোট কন্ট্রোল গান্ধী পরিবারের হাতেই থাকবে, নতুন সভাপতি খাড়গেকে দল পরিচালনার কাজ করতে হবে গান্ধী পরিবারের কথা অনুযায়ী। যদিও খাড়গে নিজেকে গান্ধীদের ‘রিমোট কন্ট্রোল’ বলতে নারাজ কিন্তু তিনি কংগ্রেস দলে গান্ধীদের ভূমিকা নিয়ে সব সময়েই সরব।
সভাপতি নির্বাচনে থাড়গের জয় নিয়েও দলে কোনও প্রশ্ন ছিল না। তিনি যে জিতবেন তা বোঝাই যাচ্ছিল। যদিও গান্ধী পরিবার প্রথমে রাজস্থানের মুখ্যমন্ত্রী অশোক গেহলটকে সভাপতি পদে সমর্থন করবে বলেই ঠিক করেছিল। কিন্তু গেহলট মরু রাজ্যে মুখ্যমন্ত্রীর পদ ছাড়তে চাননি, উল্টে বিদ্রোহ করেছিলেন। তাই পরে খাড়গেকে সমর্থন করে গান্ধী পরিবার। অন্যদিকে কংগ্রেস সভাপতির পদে একজন শশী থারুরের নাম তোলা মাত্রই রাহুল তা নাকচ করে দিয়েছিলেন! রাহুল জানান, ওই পদের জন্য প্রবীণ, অভিজ্ঞ এবং পোড়খাওয়া রাজনীতিকের প্রয়োজন। হতে পারে থারুর সুদর্শন, সুবক্তা, সুলেখক এবং তরুণ প্রজন্মের কাছে ‘খোলা হাওয়া’র মতো। কিন্তু থারুরের এই যোগ্যতা বা পরিচিতিই কংগ্রেস সভাপতি নির্বাচনের ময়দানে তাঁর প্রধান অন্তরায়। তাছাড়া কংগ্রেস দলে সুনেতৃত্বের অভাব, সাংগঠনিক সমস্যাকে তুলে ধরে এমনকি হাইকমান্ডের কর্মপদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তুলে ২০২০-র আগস্টে যে ২৩ জন নেতা সভানেত্রী সোনিয়া গান্ধীকে চিঠি পাঠিয়েছিলেন সেই গ্রুপ-২৩ বা জি-২৩ নামে পরিচিতদের অন্যতম ছিলেন শশী থারুর। ইতিমধ্যে গুলাম নবি আজাদ, কপিল সিব্বল, জিতিন প্রসাদের মতো নেতারা দল ছেড়েছেন। যদিও থারুর সোনিয়ার সবুজ সঙ্কেত পেয়ে দেশের সব থেকে প্রাচীন দলের শীর্ষপদের জন্য ভোটের লড়াইয়ে নেমেছিলেন কিন্তু বোঝাই গেল তাতে চিড়ে ভিজলো না।
অন্যদিকে তিন বার কর্নাটকের মুখ্যমন্ত্রিত্বের দাবিদার হয়েও ছিটকে যেতে হয়েছে যাকে, কর্নাটক এবং কেন্দ্রীয় সরকারে একাধিক দফায় মন্ত্রিত্ব করলেও কখনওই নিজস্ব পরিচিতি গড়ে কর্মদক্ষতার ছাপ রাখতে পারেননি যিনি, দ্বিতীয় ইউপিএ সরকারের শেষ ১১ মাস রেলমন্ত্রী থাকা ছাড়া উল্লেখযোগ্য কোনও পদও পাননি। ২০১৪ সালে লোকসভা ভোটে কর্নাটকের গুলবর্গাতে জিতে লোকসভায় কংগ্রেসের নেতা হয়েছিলেন। কিন্তু নিজের এলাকাতেই দলিত নেতা মল্লিকার্জুন খাড়গের জমি তেমন শক্ত নয়। গত সাড়ে তিন বছরে রাজ্যসভার বিরোধী দলনেতা হিসাবেও স্বকীয়তার ছাপ রাখতে পারেননি তিনি। তাই ২০১৯-এ হেরে গান্ধী পরিবারের আনুকূল্যে রাজ্যসভায় ঠাঁই হয়। কিন্তু বরাবরই খাড়গে কংগ্রেস হাইকমান্ডের প্রতি অনুগত থেকেছেন। ৫৩ বছরের রাজনৈতিক জীবনে আনুগত্যই তাঁর একমাত্র ধর্ম। সেই ধর্ম থেকে একবারই মাত্র বিচ্যুত হয়েছিলেন। ১৯৭৭ সালে লোকসভা ভোটে কংগ্রেসের ভরাডুবির পরে ইন্দিরা গান্ধীকে ছেড়ে যোগ দিয়েছিলেন দেবরাজ আরসের শিবিরে। কিন্তু হাওয়া বুঝে কিছু দিন পরেই ফিরে এসেছিলেন কংগ্রেসের মূলস্রোতে। ৮০ বছর বয়সি এই অনুগত নেতার জয় নিয়ে কোনো যেমন সংশয় ছিল না, তেমনি তাঁর সভাপতিত্বেও যে রিমোট গান্ধী পরিবারের হাতে থাকবে তা নিয়েও কোনও সন্দেহ নেই।
প্রসঙ্গত, শশী থারুর প্রচারের জন্য দেশের অনেক রাজ্যেই ঘুরেছেন। কিন্তু শশী থারুরের বৈঠকে যোগ দেওয়ার জন্য কংগ্রেস নেতারা খুব একটা উৎসাহ দেখাননি। এমনকি কংগ্রেসের বিক্ষুব্ধ গোষ্ঠীর অধিকাংশই কংগ্রেস সভাপতি নির্বাচনে থারুরের বদলে মল্লিকার্জুন খড়্গেকে সমর্থন জানান। মণীশ তিওয়ারি বলেন, কংগ্রেসের এখন মল্লিকার্জুন খড়্গের মতোই নিরাপদ হাত দরকার, যিনি কংগ্রেসের সেবায় জীবনের ৫০ বছর কাটিয়েছেন। উনি দলের তৃণমূল স্তর থেকে উঠে এসেছেন। কংগ্রেসের যে রকম স্থিতিশীলতা দরকার, তা খড়্গেই দিতে পারেন। বোঝাই যাচ্ছে কংগ্রেস দলটাই চলে অনুগত কর্মী ও নেতা নিয়ে। সেখানে নতুন সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে যে দল পরিচালনায় গান্ধী পরিবারের সিদ্ধান্ত মেনেই অগ্রসর হবেন সে আর এমন নতুন কথা কি।