আবার এসেছে এক ভাইরাস। অ্যাডিনো ভাইরাস। ভয় দেখানোর কাজ চলছে। কিন্তু সে গুড়ে বালি। ন্যাড়া একবারই যায় বেলতলা্য়। মানুষ একবার ভয় পেয়েছিল। সেই ২০২০ তে। করোনা ভাইরাসের আতঙ্কে। অনেকদিন চলেছিল সে ভয়ের আবর্ত। কত লেখা, কত সতর্কবাণী, কত কসরৎ, কত বিতর্ক। কেউ বলে চিনের ল্যাব থেকে বেরিয়েছে ভাইরাস। কেউ বলে আমেরিকার থলি থেকে। কেউ বলে দায়ী বিল গেটস। ওষুধের কোম্পানিগুলো ফেঁপে-ফুলে কলাগাছ।
‘দ্য ইকনোমিকস টাইমস’ পত্রিকায় অপিনিয়ন কলামিস্ট টমাস এল ফ্রিডম্যান BC আর AD-র নতুন ব্যাখ্যা দিলেন। বললেন করোনার অভিযানের পর BC হবে করোনা-পূর্ববর্তী কাল আর AD হবে করোনা পরবর্তী কাল। বিশেষজ্ঞরা বললেন করোনা পরবর্তীকালে মানুষ হবে পরিবারকেন্দ্রিক, ফিরে আসবে পারিবারিক মূল্যবোধ, সমাবেশ বা পার্টিতে যাওয়ার প্রবণতা কমে যাবে, বদলে যাবে খাদ্যাভ্যাস, ফাস্টফুডের পরিবর্তে গুডি গুডি বয়ের মতো ঘরের খাবার খাবে, জুনোটিক সংক্রমণের কথা মাথায় রাখবে, পরিবেশের ভারসাম্যের কথা রাখবে মাথায়। ইত্যাদি ইত্যাদি।
আমিও অনেকের মতো বিশ্বাস করেছিলাম সেসব কথা। করোনা সংক্রমণের ডায়েরি লিখে যাচ্ছিলাম প্রতি সপ্তাহে। কিন্তু ২০২০ সালের শেষদিকে সন্দেহ দেখা দিল আমার মনে। দেখছিলাম করোনার ভয়ের আবহেও চলেছে রিপুর খেলা। ব্যক্তিগত স্তরে, জাতীয় স্তরে, আন্তর্জাতিক স্তরে। খুন, জখম, রাহাজানি, তঞ্চকতা। মনে হল মানুষকে বদলানোর সাধ্য নেই করোনার। এমনই চিজ মানুষ। কবি সত্যেন্দ্রনাথ বাঙালি সম্বন্ধে যে কথা বলেছিলেন, সে কথা সাধারণভাবে মানুষ সম্বন্ধে সত্য, ‘মন্বন্তরে মরি নি আমরা / মারী নিয়ে ঘর করি’।
তাই আমি আমার ‘করোনা সংক্রমণের ইতিহাস’ বই-এর শেষ পরিচ্ছেদে (লেখা হয়েছে ১২ ডিসেম্বর, ২০২১) লিখলাম করোনা বিষয়ে ভগবান ও শয়তানের কথোপকথন। শয়তান ভেবেছিল করোনার ধ্বংসলীলা তারই সৃষ্টি। ভগবান তার ভুল ভাঙিয়ে দিলেন। বললেন, ‘দেখো শয়তান, মানুষ তৈরি করে আমি তাকে দুটো ক্যাপসুল গিলিয়ে দিয়েছিলাম — সুমতি ক্যাপসুল আর কুমতি ক্যাপসুল। কুমতি ক্যাপসুল আসলে রিপু (কাম, ক্রোধ, মোহ, মদ, মাৎসর্য) ক্যাপসুল। তার মানে ডুয়েল পার্সোন্যালিটি। তার মানে মানুষ ধ্বংস যেমন করে, তেমনি করে সৃষ্টি। এই কুমতি ক্যাপসুল তাকে দমতে দেয় নি। এর আগে কত ঝড়, কত সাইক্লোন, কত মহামারি, কত অতিমারি এসেছে, দমেছে মানুষ? রিপু তার অসীম পরিপাক শক্তি দিয়ে সব হজম করে ফেলেছে।
তারপরে ভগবান বললেন, ‘করোনার ঢেউ একটু স্তিমিত হলে দেখবে আবার গাছ কাটবে মানুষ, বন উচ্ছেদ করবে, যানবাহনের উৎকট শব্দে মুখরিত হবে আকাশ-বাতাস, রাসায়নিক বর্জ্য অকাতরে ঢালবে নদী-সমুদ্রে, সংগোপনে চলবে রাসায়নিক ও জৈব অস্ত্রের নির্মাণ, খাদ্যে মেশাবে ভেজাল, সংকীর্ণ স্বার্থবোধের প্রেরণায় গণহত্যার গেণ্ডুয়া খেলায় মত্ত হবে।’
আমার মতো অতি তুচ্ছ মানুষ কিভাবে ভবিষ্যৎকে দেখতে পেল, কে জানে! এই ২০২৩ সালে মানুষের কার্যকলাপ দেখে কি মনে হয়, করোনা বিশ্ব-ব্যবস্থাকে কিছুমাত্র পাল্টে দিতে পেরেছে? কবীর সুমন লিখেছিলেন :
আমরা মানুষ পৃথিবীর রাজা
কে যেন বলেছে কবে
এইটুকু ছোট ভাইরাস বলে
ফুসফুসে দেখা হবে
তিনি বলতে চেয়েছিলেন করোনার কাছে মানুষের জ্ঞান-গম্যি, প্রতিভা-টতিভা সব মিথ্যে। বুঝতেই পারছেন, তাঁর বা তাঁর মতো আরও অনেকের কথা মেলে নি। মানুষ হজম করে ফেলেছে করোনাকে, হজম করে ফেলেছে করোনার ভয়কে। মানুষ এমন চিজ।
লেখক সিনিয়র ফেলোশিপপ্রাপ্ত গবেষক