বাজারে এখন কাঁচালঙ্কার দামের ঝালে চোখে জল। জানলে অবাক হবেন আজ থেকে একশো সাতাশ বছর আগে সেই ১৮৯৬ সালে সাহেবদের দেশে তিনটে কাঁচা লঙ্কার দাম ছিলো তিন সিলিং, যার ভারতীয় মূল্য প্রায় ৩ টাকার মতো। তখন স্বামীজি ছিলেন লন্ডনে। স্বামী বিবেকানন্দের প্রচন্ড ঝাল লঙ্কা খেতেন, আর সেই সময় বেজায় অভাব ছিল লন্ডনে লঙ্কার। সুযোগ পেলেই স্বামীজি বলতেন, ‘চ রান্নাঘরে গিয়ে রাঁধি গে, বেশ ঝাল ঝাল আলু চচ্চড়ি বা আলুর দম।’ এক সহযোগীকে বহু কষ্টে উইলিয়াম হোয়াইটের দোকান থেকে তিনটি কাঁচালঙ্কা কিনে আনিয়ে ছিলেন। লঙ্কার মোহমায়া সামলাতে না পেরে সব কটা লঙ্কাই খেয়ে ফেললেন।
বড্ড ঝালের মুখ ছিল বিবেকানন্দর। স্বামীজি যে লঙ্কা ভালবাসতেন তাই নিয়ে নানা গল্প শোনা যায়। একবার এক ধনাঢ্য ব্যক্তি প্রশ্ন করলেন, ‘স্বামীজি আপনি এত লঙ্কা খান কেন?’
বিবেকানন্দের উত্তর লঙ্কাপ্রেমীদের জেনে রাখা ভালো। ‘মশাই চিরজীবন পথে পথে ঘুরে বেড়িয়েছে আর বুড়ো আঙ্গুলের টাকনা দিয়ে ভাত খেয়েছি। লঙ্কাই তো তখন একমাত্র সম্বল ছিল — ওই লঙ্কাই তো আমার পুরনো বন্ধু ও মিত্র।’
এই লঙ্কা প্রীতি প্রচন্ড অভাবের সময় বিবেকানন্দকে শক্তি দিত। রামকৃষ্ণের মৃত্যুর পর বরানগরের সাধনভজনের সময় প্রবল অনটন ছিলো। দারিদ্র্য এমনই এসেছিলো, মুষ্টিভিক্ষা করে এনে তাই ফুটিয়ে একটা কাপড়ের উপর ঢেলে দেওয়া হতো। একটা বাটিতে থাকতো লবণ ও লঙ্কার জল। একটু ঝাল জল মুখে দিয়ে এক গ্রাস করে ভাত খাওয়া হতো।
প্রয়াগধামে গুরুজি অমূল্য নামে এক বাঙালি সাধুর সঙ্গে স্বামী বিবেকানন্দের পরিচয় হয়েছিল। একদিন সকালে আহারে বসেছেন দুজন। বিবেকানন্দ একটি লঙ্কা নিলে, অমূল্য দুটি লঙ্কা নিলেন। স্বামীজি দমবার পাত্র নন। তিনি তিনটে লঙ্কা খেলেন। লঙ্কা ভক্ষণ প্রতিযোগিতায় স্বামীজি যে অপরাজেয় তা প্রমাণ করে তবে তিনি ক্ষান্ত হলেন।
লন্ডনে একদিন কচুরি ও আলু চচ্চড়ি রেঁধেছিলেন বিবেকানন্দ। কাজের মেয়ে মিস কেমরিন খাবারের ভাগ না পেয়ে রেগে গিয়ে বলল, ‘ইউ কুকিং স্বামী, কেবল খেয়ে খেয়ে মোটা হবে আর আমার জন্য কিছু রাখবে না!’ এবার স্বামীজি ওর জন্য দু-খানা কচুরি ও আলু চচ্চড়ি রাখলেন। খুশি হয়ে মেমসাহেব জানতে চাইলো কি দিয়ে খেতে হয় — চিনি না নুন? শরৎ মহারাজ স্বামী সারদানন্দ নুনের পরামর্শ দিলেন। এবার চামচে করে আলুচচ্চড়ি মুখে নিয়ে মিস কেমরিন লাফিয়ে উঠলেন। প্রবল ঝাল সামলাতে না পেরে দু-হাতে দুই গাল চাপড়াতে লাগলেন এবং সন্ন্যাসীকে গাল পাড়তে লাগলেন।
১০০ বছর আগেকার সেই ইংরেজ এখন অন্য মানুষ, সে এখন ঝাল কম হলে চটে যায়। ‘কারীতে ঝাল আরও ঝাল’ এই হল এই যুগের স্লোগান এবং এই পরিবর্তনে বিবেকানন্দের ভূমিকা অবহেলার যোগ্য নয়।

“বিবেকানন্দের আগে লঙ্কা এবং ভারতীয় রান্নাকে বিদেশে প্রচারের দুঃসাহস কেউ আগে দেখাননি। ইচ্ছা করলেই পথ দেখাতে পারতেন প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর, কিন্তু তিনি যে ঝালানুরাগী ছিলেন এমন কোন উল্লেখ কোথাও নেই।” (কথাগুলি শংকরীপ্রসাদ বসু মহাশয় ওলাবিবিতলা লেনের বসু নিবাসে বলেছিলেন।)
বিদেশি শুধু বেদান্ত নয়, স্বামীজির মধ্যে ইন্ডিয়ান রান্না প্রচারের ব্রত যে ছিল তার প্রমাণ পাওয়া যায়। বোম্বাই থেকে আমেরিকার জাহাজে চড়বার আগে বিবেকানন্দ চোদ্দ টাকা খরচা করে স্বহস্তে পোলাও রান্না করে সবাইকে খাওয়ালেন। কিন্তু নিজে কিছু খেলেন না। যারা পোলাওয়ের ব্যাপারটা বোঝেন তারা জানেন মাস্টার রাঁধুনি না হলে পোলাও ম্যানেজ করা সম্ভব হয় না। আসলে বিবেকানন্দের বাবা বিশ্বনাথ দত্ত নিজেও ছিলেন খাদ্যরসিক। তার বাবা জীবিত থাকাকালীন দত্ত পরিবারে প্রায় রোজই পোলাও হতো। তাই সেখান থেকেই হয়তো এই গুণ প্রাপ্তি নরেনের।
আমেরিকাতে খ্যাতির মধ্যগগনে পৌঁছেও ভারতীয় রান্না থেকে স্বামীজি দূরে থাকতে পারেননি। সুযোগ পেলেই নিমন্ত্রিত অতিথি হয়েও স্বামীজি গৃহ স্বামীর অনুমতি নিয়ে তিনি রান্নায় মেতে উঠেছিলেন। পরিব্রাজক সন্ন্যাসীর পকেট থেকে বেরিয়ে আসতো নানা ধরনের মসলা। সেইসব মসলা বাটবার জন্য শিলনোড়া পর্যন্ত তিনি জোগাড় করেছিলেন। এইসব দেখে ভক্তরা রীতিমতো অবাক হয়ে যেতেন।
বেদান্ত ও বিরিয়ানি একই সঙ্গে প্রচার করেছিলেন বিবেকানন্দ, সেই সঙ্গে বলেছিলেন ভারতের বিচিত্র খাদ্য ভান্ডারের কথা।
সেই সময় ইংল্যান্ডে ভারতীয়রা কারি রান্না করতো হাড় বাদ দিয়ে মাংসের টুকরো ফুটন্ত জলে ফেলে দিয়ে। খুব ফোটানোর পর ওরই মধ্যে কারী পাউডার ও লবণ দেওয়া হতো। ঝোল ঘন করবার জন্য ময়দা গুলে জলে ঢেলে দেওয়া হতো। এই আনাড়ি দৃশ্য স্বামীজীর পক্ষে সহ্য করা খুবই কঠিন ছিল। তাই বক্তৃতার মাঝে মাঝে তিনি স-উৎসাহে রান্নার রহস্যময় জগতে প্রবেশ করেছিলেন।
প্রবাসে বিবেকানন্দের সঙ্গে আমতেলও থাকতো। তা মুখে দিয়ে পরম ভক্ত গুডউইন একবারে বিকৃত মুখ করে যা তা মন্তব্য করেন। প্রিয়ভক্ত সান্যাল মশাই আমেরিকাতেই বিবেকানন্দকে বেদের সঙ্গে আচার, আমতেল, ডাল বড়ি ইত্যাদি পাঠিয়েছিলেন এইসব বিবেকানন্দ অতি সংরক্ষণের সঙ্গে নিয়ে বেড়াতেন। গুডউইন ঝাল ও হিং দেওয়া বড়ি খেয়ে মহারেগে বলেছিলেন, ‘এরকম বদ গন্ধওয়ালা জিনিস ভারতের লোকেরা খায়!’ সায়বি নাকের এই গন্ধ যে এত অল্প সময়ে এইভাবে ঘুচে যাবে তাকে জানতো? এই যে অদম্য উৎসাহে রান্নার প্রচার ব্রত বিবেকানন্দকেই মানায়।
স্বামীজির শেষ জীবনের শেষ পর্বের কথা। বেলুড়ের মঠে বসে বিশ্বজয়ী বিবেকানন্দ একদিন প্রকাশ্যে পাড়ার ফুলুরিওয়ালা হতে চাইলেন। উনুন জ্বললো, কড়া বসল, তেল ঢালা হলো। ফাটানো বেসন গরম তেলে ছেড়ে, পিঁড়িতে বসে বিশ্বজয়ী স্বামী বিবেকানন্দ হয়ে উঠলেন ফুলুরিওয়ালা নরেন। ছোটবেলায় সিমলা পাড়ায় যেমন দেখেছেন ফুলুড়িওয়ালা কে বেলুরের মাঠে হাত ছেড়ে খদ্দের ডেকে স্বামী বিবেকানন্দ মহা আনন্দ পেতে লাগলেন।
গতকাল চৌঠা জুলাই ছিলো রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের প্রতিষ্ঠাতা স্বামী বিবেকানন্দ-র প্রয়াণ দিবস। ১৯০২ সালে বেলুড় মঠে প্রয়াত হন তিনি। ইউএসএ এবং ইউরোপে হিন্দু ধর্ম প্রচারে তার অবদান অনস্বীকার্য। তাঁকে শ্রদ্ধা জানাতেই স্বামীজির রান্না ও খাওয়া দাওয়া নিয়ে কিছু কথা বললাম। যদি বলেন, স্বামীজি সম্বন্ধে এত সাবজেক্ট থাকতে রাঁধুনি বিবেকানন্দ কেন? তবে বলি,পাইওনিয়ার হিসেবে এই বিষয়েও তাঁর স্বীকৃতি প্রয়োজন।
তথ্য ঋণ: শংকরের লেখা ‘আহারে অনাহারে বিবেকানন্দ’ এবং অন্যান্য।
স্বামীজীর আহারে অনাহারে আপনার কলমে পড়লাম। খুব ভালো লাগলো।
অনেক ধন্যবাদ।
100 gram lonka=30 taka=500 chicinga= 500 fojli am
খুব সুন্দর লিখেছেন,,,,পড়ে খুব ভালো লাগলো????????????????????????
থ্যাঙ্ক ইউ