ভারতে সমবায় আইনের সূচনা হয় ১৯০৪ সালের ২৫ মার্চ। অবিভক্ত বাংলায় সমবায় আন্দোলনের দুই প্রাণপুরুষ হলেন, স্যার ড্যানিয়েল হ্যামিলটন এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। সমবায় সমিতির গতি সঞ্চারে আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ও সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছিলেন। ১৯০৪ সালে তদানীন্তন ব্রিটিশ ভারতের জেনারেল লর্ড কার্জন সমবায় ঋণদান সমিতি আইন জারি করেন। মূলত এই আইনের মাধ্যমেই উপমহাদেশের সমবায় আন্দোলনের সূচনা হয়। ১৯৪০ সালে বঙ্গীয় আইন পরিষদ দি বেঙ্গল কোঅপারেটিভ সোসাইটি অ্যাক্ট নামে সমবায় আইন পাস করে।
এই প্রসঙ্গে বলে রাখি, বন্ধুদের থেকে চড়া সুদে টাকা ধার নিয়ে সরল সুদে ঋণ দেবার মহৎ উদ্দেশ্যে পতিসরে গরিব চাষিদের জন্য ব্যাঙ্ক খুলেছিলেন রবীন্দ্রনাথ (১৯০৫)। মূলধনের অভাব দূর করতে নোবেল প্রাইজের টাকার একটা বড়ো অংশ (৮২ হাজার টাকা) রেখেছিলেন সেখানে। রথীন্দ্রনাথ ‘পিতৃস্মৃতি’ বইয়ে লিখছেন, “কৃষিব্যাঙ্ক হয়ে প্রজাদের খুব উপকার হল। কয়েক বছরের মধ্যেই তারা মহাজনদের দেনা সম্পূর্ণ শোধ করে দিতে পেরেছিল। কালীগ্রাম এলাকা থেকে মহাজনরা তাদের ব্যবসা গুটিয়ে নিয়ে অন্যত্র যেতে বাধ্য হয়েছিল।” তাঁর সমাজে কখনও রাজনীতি ঠাঁই নিতে পারেনি, মহাত্মা গান্ধীর স্বরাজ আন্দোলনের দিনটি সম্পর্কেও কবি সচেতন ছিলেন। কবি মনে-প্রাণে কামনা করতেন গ্রামের আত্মনির্ভরশীলতা।
রবীন্দ্রনাথ লক্ষ্য করেছিলেন, এক সময় ভারতের পল্লীগুলো ছিল অর্থনীতিতে, সমাজনীতিতে স্বয়ংসম্পূর্ণ। তারা ছিল স্বাধীন। তারা তাদের সহজাত মেধা দিয়ে পল্লীকে সমৃদ্ধ করেছিলেন। তাদের অন্ন তারাই ফলাত, তাদের বস্ত্র তারাই তৈরি করত, তাদের গৃহ তারাই নির্মাণ করত। তাদের রাজত্বে তারাই ছিল রাজা। সুলতানরা, মোঘল সম্রাটরা ভারতের পল্লীর যুদ্ধে শোষণের হাতুড়ি চালায়নি। ভারতের স্বয়ংসম্পূর্ণ পল্লীকে তছনছ করে দিয়েছে ইংরেজ সরকার। চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত বাংলার কৃষকদের সর্বনাশ করেছে, রবীন্দ্রনাথ তা লক্ষ্য করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ এও জানতেন, ইংরেজরা বাংলার তাঁতশিল্পের ধ্বংস করেছিল। তাঁতীদের আঙুল পর্যন্ত কেটে দিয়েছিল। তাই রবীন্দ্রনাথের বুকে গভীর আবেগ জেগে ছিল কৃষকদের আত্মনির্ভরশীল করার। বিভিন্নভাবে তিনি সমবায় গড়ে তোলার মাধ্যমে, কৃষকদের মধ্যে শিক্ষার বিস্তার ঘটিয়ে, গ্রামের বুক থেকে সাম্প্রদায়িকতা ও অন্ধবিশ্বাস দূর করে গ্রামীণ কৃষকদের জাগিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘একা অন্ন ভক্ষণ করা যায়, তাতে হয়তো পেট ভরে। কিন্তু পাঁচজন মিলে খেলে পেটও ভরে, আনন্দও মিলে এবং সম্প্রীতির ক্ষেত্রও প্রস্তুত হয়।’
রাজ্য সরকারের সমবায় বিভাগের নীতি বাস্তবায়িত হয় কো-অপারেশন ডাইরেক্টরেটের ৩টি জোনাল ও ২২টি রেঞ্জ অফিসের মাধ্যমে। পশ্চিমবঙ্গে ১৭ ধরনের সমবায় রয়েছে। সমবায়ের উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণে সাহায্যকারী ভূমিকা পালন করে। রাজ্য সরকারের সমবায় বিভাগের দুটি শাখা : ক) কো-অপারেশন ডাইরেক্টরেট, খ) কো-অপারেশন অডিট ডাইরেক্টরেট। সমবায়ের ধরনগুলি হলো : ভোগকারী সমবায়, উৎপাদনকারীদের সমবায়, সমবায় বিপণন সমিতি, আবাসন সমবায় সমিতি, সমবায় ঋণদান সমিতি।
বাম আমল থেকে রাজ্যের সমবায় ব্যবস্থায় আমলাতন্ত্রের মৌরসিপাট্টা চলে আসছে। তাই সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও রাজ্যের সমবায় আন্দোলন কোনও গুরুত্ব পায়নি। বহুদিন ধরেই গ্রামাঞ্চলে ব্যাঙ্কিং পরিষেবা পৌঁছে দেওয়া নিয়ে সরব হয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কেন্দ্রীয় সরকারকে একাধিক বার অনুরোধ ও জানিয়েছিলেন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী। মুখ্যমন্ত্রী মনে করেন, গ্রামীণ উন্নয়ন হলে রাজ্যের উন্নয়ন হবে। রাজ্যের উন্নয়ন হলে দেশের উন্নয়ন হবে। কেন্দ্রের তরফে কোনও সদর্থক পদক্ষেপ না করলেও রাজ্য তার সীমিত ক্ষমতার মধ্যেও গ্রামীণ অঞ্চলে ব্যাঙ্কিং পরিষেবা পৌঁছে দেবার নির্দেশ দেন সমবায় দফতরকে। এই ব্যঙ্কিং পরিষেবা কেন্দ্রগুলি গ্রামীণ মানুষের চাহিদার সাথে সাথে বেকার ছেলে-মেয়েদের স্বাবলম্বী হতে ও ব্যাঙ্কের লোন পেতে সাহায্য করবে। সৃষ্টি হবে কর্মসংস্থান।
সমবায়ের মাধ্যমে গ্রামীণ যুব সম্প্রদায়কে স্বাবলম্বী করে তুলতে হবে। এটাই ছিল মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উদ্দেশ্য। এর জন্য রাজ্যের ৪৩ হাজার সমবায়কে বিশেষ উদ্যোগ নিতে হবে। গ্রামীণ অর্থনীতিকে আরও উন্নত করতে রাজ্যের এক লক্ষ পরিবারকে হাঁস-মুরগি পালনের জন্য ১৮ হাজার টাকা করে দেওয়া হয়েছে। এটা করা হয়েছে যাতে তাঁরা স্বাবলম্বী হতে পারেন। একইরকমভাবে যুব সম্প্রদায়কে স্বাবলম্বী করে তুলতে সমবায়গুলিতে যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। ঋণের সুযোগ করে দেওয়া হচ্ছে। এ রাজ্যে ২৮ হাজার সাধারণ সমবায়ের পাশাপাশি ১০ হাজার মৎস্য এবং ৫ হাজার দুগ্ধ সমবায় রয়েছে। রাজ্যের যুব সম্প্রদায়কে সেখানে কাজে লাগানো হচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের উদ্যোগে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের চিন্তাধারায় রাজ্যের সমবায় ব্যবস্থার উন্নয়নের পাশাপাশি সমবায় ব্যাঙ্ককে নতুনভাবে গড়ে তোলার পাশাপাশি তার কর্মকাণ্ড বাড়ানো ও শাখা বৃদ্ধি ঘটিয়ে প্রান্তিক মানুষজনের আয় বৃদ্ধি ও মান উন্নয়ন ঘটানো। ব্যাঙ্কহীন গ্রামগুলিতে ২,৬০০টি ব্যাঙ্ক পরিষেবা কেন্দ্র খোলার কাজে হাত দেওয়া হয়েছে। রাজ্যের যেসব গ্রামে ব্যাঙ্ক নেই সেখানে ২,৬০০টি ব্যঙ্কিং পরিষেবা কেন্দ্র তৈরি করবে সমবায় দফতর। নতুন এই পরিষেবা কেন্দ্রগুলিতে ব্যাঙ্কের প্রায় সমস্ত অত্যাধুনিক পরিষেবাই পাওয়া যাবে। অনলাইন ব্যাঙ্কিং পরিষেবাও মিলবে এই শাখাগুলিতে। রাজ্যের প্রায় ৭০০টি গ্রাম পঞ্চায়েতে আপাতত কোনও ব্যাঙ্ক নেই। রাজ্যের এই সিদ্ধান্তের ফলে সমবায় আন্দোলনের এক নতুন অধ্যায় শুরু হবে, উপকৃত হবেন গ্রামীণ মানুষ।
অনেকে ভাবে সমবায় ইউনিয়ন একটা রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান। না, তা নয়। আমাদের কাজ হলো জেলার প্রত্যন্ত গ্রামগুলোতে সমবায়ের ভূমিকা এবং রাজ্য সরকারের নেওয়া উদ্যোগগুলি সম্পর্কে প্রত্যন্ত গ্রামের মানুষকে সচেতন করে তোলা। গরিব অসহায় মানুষ চটজলদি নগদ টাকার বিনিময়ে অত্যন্ত কম দামে তাঁদের ফসল মহাজনদের হাতে তুলে দিতে বাধ্য হয়। আমরা সেই মহাজনদের কৃষকদের কাছ থেকে দূরে সরাতে চাই। এজন্য রাজ্যসরকার কী কী করেছে তাঁদের জানানো এবং সচেতন করতে বদ্ধপরিকর। তার জন্য গ্রামীণ এলাকায় যত বেশি সম্ভব ‘সিসিএম’ বা সেন্টার ফর কো-অপারেটিভ ম্যানেজমেন্ট গড়ে তোলা যাবে তত বেশি মানুষের কাছে সমবায়ের গুরুত্ব পৌঁছে দেওয়া যাবে। মালদহে একটা সিসিএম তৈরি হয়েছে। আশা রাখছি, জানুয়ারিতেই এর কাজ শুরু হয়ে যাবে। ঝাড়গ্রামে এবং উত্তরপাড়ার রাজবাড়িতে প্রায় সাড়ে তিন কোটি টাকা খরচ করে নতুন সিসিএম তৈরি করা হয়েছে। সমবায় একটা আন্দোলন। এই আন্দোলন শব্দটা মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মস্তিষ্কপ্রসূত। তিনিই শিখিয়েছেন, কীভাবে কিছু কাজ এবং কর্মপদ্ধতিকে আন্দোলনে রূপ দেওয়া যায়। মোদ্দা কথা মহাজনি প্রথা ভাঙতে পারা। সমবায়ের কর্মসূচি এমনভাবে তৈরি করা হয় যাতে গ্রামীণ মানুষের আর্থিক শ্রীবৃদ্ধি ঘটে। সমস্ত কৃষককুলই সমবায় ব্যাঙ্কের মাধ্যমে ৭ শতাংশ সুদে চাষের কাজের জন্য ঋণ নিয়ে ফসল ফলাতে পারবেন। সেই ফসল রাজ্য সরকারের হাত ধরে কৃষকদের কাছ থেকে ন্যায্যমূল্যে ফসল কিনে তা সংগ্রহ করে সংরক্ষণ এবং মজুত করতে পারছি। ঠিক সময়ে সেই ফসল বাজারেও আসছে। প্রত্যন্ত গ্রামের কৃষকরা যেমন তাঁদের ফসলের দাম পাচ্ছেন, তেমনি ক্রেতারাও ন্যায্য দামে আনাজপাতি কিনতে পারছেন। এর ওপর যেটা এখন আমরা নজর দিয়েছি তা হলো আধুনিকীকরণ। প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার করে গ্রামীণ অর্থনীতির উন্নয়ন ঘটানো। এবারে আরও বেশি করে কৃষকদের ঋণ দেওয়া যাবে। যাতে তাঁরা মহাজনের খপ্পর থেকে বেরিয়ে এসে সমবায় ব্যাঙ্কে ভিড় করতে পারেন। সমবায় সমিতি যদি প্রত্যন্ত গরিব চাষির উঠোনে গিয়ে হাজির হয়ে তাঁদের সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয় তাহলে ক্ষতি কী?