বৃষ্টি ঝিরঝিরে পথে যখন গনগনে আগুনে পোড়া ভুট্টার গন্ধ পাওয়া যায়, তখন আপনা হতেই মন ছুটে চলে লোভনীয় খাবারের দিকে। ভুট্টাকে বলা হয় ক্ষেতের রানী। ধান ও গমের তুলনায় ভুট্টার পুষ্টিগুন অনেক বেশি। পর্যায় সারণীর ২৬টি মূল্যবান উপাদান থাকে এর মধ্যে।
ভুট্টার জন্মের ইতিহাস নিয়ে নানা মুনির নানা মত আছে। মনে করা হয় এটি পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাচীন জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং। এমনকি মায়াকাহিনী ‘পোপোল ভুহ্’ তে কথিত আছে ভুট্টা থেকে নাকি মানব জন্ম হয়েছিল। তবে, ভুট্টার ইতিহাস শুরু হয় প্রায় ১০,০০০ বছর আগে মেক্সিকোয়। কলম্বাসের আমেরিকা আবিস্কারের পরে ইউরোপীয়রা ভুট্টার চাষ শুরু করে। সপ্তদশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে পর্তুগিজ ঔপনিবেশিকগণ ভারতের মাটিতে ভুট্টার চাষ শুরু করে।

অনেক বিজ্ঞানীর মতে, ভুট্টার বন্য পুর্বপুরুষেরা ছিলো টিওসিন্টে জাতীয় একধরনের বন্য ঘাস।
প্রাচীন কৃষকরা কাঙ্খিত বৈশিষ্ট্যযুক্ত গাছ থেকে দানা সংরক্ষণ করে এবং পরবর্তী মৌসুমের ফসলের জন্য সেগুলি রোপণ করে, নির্বাচনী প্রজননের মধ্যে দিয়ে আধুনিক ভুট্টার আবিস্কার করেন।
ভুট্টার দানার বৈশিষ্ট্যের উপর ভিত্তি করে নানান ধরনের ভুট্টা পাওয়া যায়। যেমন— পপকর্ন, সুইটকর্ন, বেবীকর্ন, ডেনট কর্ন, ফ্লিন্ট কর্ন, ফ্লাওয়ার কর্ন।

ভুট্টার দানাগুলো বেশ শক্ত। তাপ দিলে খই এর মতো ফোটে। এটাই হলো ছোটো-বড়ো সকলের প্রিয় স্ন্যাকস পপকর্ন । টিভিতে মুভি বা ম্যাচ চলাকালীন নতুবা বারান্দায় আরাম কেদারায় বসে আড্ডা দেওয়ার সময় পপকর্ন এর জুড়ি মেলা ভার। আর লং জার্নি, পপকর্ণের গুরুত্ব বাড়িয়ে দেয়। বিনোদনের একটি অভিন্ন মেনুতে পরিচিত পপকর্ন। পপকর্ণের জনপ্রিয়তা বাড়ার অন্যতম কারণ হলো, এটি সহজেই বানিয়ে ফেলা যায়। যুক্তরাজ্যে পপকর্ন ঐতিহ্যগতভাবে প্রচলিত থাকলেও, ১৮৮৫ সালে ইলিনয়ের একজন কেক প্রস্তুতকারক চার্লস ক্রেটর বাষ্পচালিত পপকর্ন তৈরির যন্ত্র আবিষ্কার করার পর থেকেই এর জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে। যন্ত্রের সাহায্যে রাস্তাঘাটে সহজেই পপকর্ন তৈরি করে বিক্রি করা সম্ভব হচ্ছে। পপকর্ন এ আকৃষ্ট হওয়ার অন্যতম কারণ হলো এর সুবাস। পপকর্ন বানানোয় তেলের কোন ভূমিকা নেই। ফলে ফ্যাট নিয়ে সমস্যা নেই। পাহাড়ি রাস্তায় বা গাড়িতে করে ঘুরতে গেলে অনেকেরই বমি বমি ভাব অর্থ্যৎ শুরু হয়ে যায় মোশন সিকনেস, তাদের জন্য পপকর্ন একটা টোটকা। এর নোনতা স্বাদ বমিভাব কমায়। জীবনের বহুছন্দে জড়িয়ে আছে মুচমুচে পপকর্ন।
স্টাটারে সুইট কর্ন এর চার্চ বা স্যান্ডউইচ সবার প্রিয়। স্যুপের স্বাদ বাড়াতে সুইট কর্ণের ভূমিকা অন্যন্য। সুইট কর্ন হল জিনের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই ঘটে যাওয়া রিসেসিভ মিউটেশনের ফলাফল যা ভুট্টা কার্নেলের এন্ডোস্পার্মের ভিতরে চিনিকে স্টার্চে রূপান্তর নিয়ন্ত্রণ করে। পুড়িয়ে খাওয়া ছাড়াও সুইটকর্ন একটু টক দই, তার সঙ্গে মিশিয়ে দিন পেঁয়াজ-টমেটো আর চাট মশলা। তৈরি করে ফেলুন সহজেই একটা চটপটি ডিশ। এছাড়া দানাগুলোতে সামান্য মাখন আর গোলমরিচ মিশিয়ে মাইক্রোওয়েভ করে বানিয়ে নিন স্বাস্থ্যকর একটি খাবার।

ভুট্টার সম্পূর্ণ শাঁস পিষে তৈরি করা হয় কর্নফ্লাওয়ার। এতে থাকে প্রোটিন, ফাইবার, স্টার্চ-সহ ভুট্টার সম্পূর্ণ গুন। রান্নাঘরের অতিপরিচিত একটি উপকরণ।
ভুট্টার তেলের প্রধান ব্যবহার হয় রান্নায়। এটি কিছু মার্জারিনের মূল উপাদান। ভুট্টার তেল সাধারণত অন্যান্য ভেজিটেবল তেলের তুলনায় কম ব্যয়বহুল।
বাঙালী আড্ডাপ্রেমী শুধু নহে, ভোজনপ্রেমীও বটে। এই দুই কম্বিনেশনের মেলবন্ধন করে ভুট্টার যে কোন পুষ্টিকর প্রিপারেশন একঘেয়ে ডায়েটের হাত থেকে বাঁচাতে ট্রাই করা যেতেই পারে।
তথ্যসূত্র : “The Evolution of Corn” এবং উইকিপিডিয়া।