অভ্যস্ত চোখে ফাঁক ও ফাঁকির অন্ত নেই। যে চোখ দিয়ে দেখি, তা-ই অদৃশ্য থেকে যায়। সেই চোখে অসংখ্য চোখ সরব হলেও নিজের চোখের নীরবতাও স্বাভাবিক মনে হয়। সেক্ষেত্রে যাঁদের চোখ দিয়ে আমাদের প্রাত্যহিক জীবন সচল-সরব, সেই সংবাদজগতের নিবেদিত কর্মীদের কথা আমাদের চোখ এড়িয়ে চলে। যখন প্রয়োজন পড়ে তখন গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভটি রক্ষার জন্য কত কথাই না বলি! অথচ তা নিয়ে যত সোচ্চার হই, ততই তার সমাদরের প্রতি উদাসীন থাকি। জনমত গড়ে তোলায় যাঁরা অবিকল্প-অতুলনীয়, তাঁরাই জনগণের অভ্যাসের শিকার। একের কর্তব্য যখন অন্যের অধিকারে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে, তখন সেই কর্তব্যের মধ্যে ত্যাগ ও সেবার আদর্শ লোকচক্ষুর আড়ালে চলে যায়। তখন সে তো পেয়েই থাকি’র অধিকার আস্ফালন করে, সেই তো তাঁর কাজ-এর দায়িত্ব সজোরে স্মরণ করিয়ে দেয়।
অর্থাৎ সে-সবই তখন প্রত্যাশিত। অথচ তাঁদের নিবিড় জনসংযোগে জনসেবার মূর্তি আন্তরিকতার পরশে আমাদের প্রতিবেশী মনে হয়। জনকণ্ঠে তাঁরা আত্মীয়, জনসেবায় পরিবেশনকারী। এজন্য সংবাদকে পাতপেড়ে খাই, খাওয়ার শেষে সাংবাদিককেই ভুলে যাই। হোক না আত্মীয়! অন্যদিকে তাঁদের ব্যবসায়িক দৃষ্টিতে দেখায় অভ্যস্ত চোখে শুধু হলুদ সাংবাদিকতা বা ফেক নিউজ-এর কারিগর জেগে ওঠায় আমরা সব কানে কালা হয়ে উঠি। কালার কানে সাংবাদিক হয়ে ওঠে সাংঘাতিক। সত্যিই তাঁরা সাংঘাতিক। একক শক্তিতে সঙ্ঘের কাজ করে চলে, প্রায় নিঃসঙ্গতায় জনগণের হয়ে সরকারের বিরুদ্ধে গিয়ে লড়াই করে, আমজনতার শরিক হয়ে প্রতিবাদে মুখর হয়। শুধু তাই নয়, নিজের বাড়িকে উপেক্ষা করেই তাঁরা অন্যের হাঁড়ির খবর রাখার ব্রতে সক্রিয় থাকেন নিরন্তর। পেশাই তাঁদের সেবা, সেবাই তাঁদের ধর্ম।
সেই পেশাতেও তাঁরা রুদালী, সেবাতে নারদ। রুদালীরা অপরের মৃত্যুতে টাকার বিনিময়ে কান্না করে। অথচ নিজের মৃত্যুতে কান্নার লোকের অভাব। অন্যদিকে নারদের সংবাদ-দূতের ভূমিকা তাঁর কূটবুদ্ধির পরিচয়ে আত্মগোপন করে। সাংবাদিকের মুখে সেই ব্যবসায়িক দৃষ্টিভঙ্গি ভেসে ওঠায় তাঁর সমাজসেবকের ভূমিকাটি আন্তরিক হতে পারে না। অথচ আমাদের মূল্যবোধে অবক্ষয়িত সমাজে দেবতারূপী অমানুষ থেকে মানুষরূপী দেবতাকে চেনানোর দায়িত্বে তাঁদের অবিসংবাদিত ভূমিকা সংবাদজগতেই প্রকাশমুখর। সেখানে তাঁরাই সবচেয়ে বেশি উপেক্ষিত। করোনার দৌলতে সেকথাই আবার প্রত্যক্ষ হয়ে উঠেছে।
ডাক্তার-নার্স-সহ চিকিত্সাকর্মী থেকে পুলিশকর্মীদের প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা ও ভালবাসায় অভাব নেই। সরকারি বদান্যতাতেও বারবার কৃতজ্ঞতার প্রাচুর্য। সেখানে জীবনবিমার প্রত্যাশিত আয়োজন। অন্যদিকে করোনার ভয়ে সংবাদপত্রের মতো তার সংবাদকর্মীরাও উপেক্ষিত। তাঁদের নাম পর্যন্ত উচ্চারিত হয় না। কোনো কিছু প্রত্যাশা না রেখেই তাঁরাও সেই শ্রদ্ধা ও ভালবাসার বার্তা ছড়িয়ে চলেছেন। আবার তাঁদের জন্যই সেই বার্তা আবেদনক্ষম হয়ে উঠেছে। তাঁরা শুধু আমাদের প্রয়োজন নন, তাঁরা যে আমাদের প্রিয়জনও। অথচ আমাদের আয়োজনে যে তাঁরা আপনজন হতে পারে না, তা নিয়ে তাঁদের নীরবতার আভিজাত্যও গৌরব ও অহঙ্কার বয়ে আনে। আর আমরা সেখানে অকৃতজ্ঞতায় ম্লান পড়ি, ভাবা যায়!
লেখক : প্রফেসর, বাংলা বিভাগ, সিধো-কানহো-বিরসা বিশ্ববিদ্যালয়, পুরুলিয়া-৭২৩১০৪।