হঠাৎ করে খেলোয়াড়সুলভ তৎপরতা প্রায় সবার চোখেমুখে। সেখানে সকলের চোখ স্কোর বোর্ডে। যে মা খেলাপাগল ছেলের ভবিষ্যতের জন্য জ্যোতিষী সেজে বসে, সেও তার খবরে ওত পেতে থাকে। আবার যে ঘরণী ক্রিকেটঅন্ত স্বামীর জন্য দিনরাত টিভিটাকেই সতীন ভেবে এসেছে, তারই চোখ এখন সেই টিভি প্রেমিক হয়ে উঠেছে। ভয়ঙ্কর প্রতাপে সব একঘাটে জল খাওয়ার মতো করোনার দৌলতে প্রায় সকলের দৃষ্টি সেই স্কোর বোর্ডের দিকে। সেখানে কেউ ব্যাটিংয়ে, কেউ ফিল্ডিংয়ে, কেউ রানারে, কেউ ওয়েটিংয়ে, কেউবা আউটে হতভাগ্য, কেউবা আবার নট আউটে ভাগ্যবান। সেখানেও খেলার মতো টান টান উত্তেজনা। তবে এই স্কোর বোর্ডে জয় পরাজয় নেই, আছে শুধু হারিয়ে যাওয়ার বার্তা, হেরে যাওয়ার অশনি সংকেত। এজন্য এতেও উত্তেজনা বর্তমান। জয়ের আনন্দের চেয়ে পরাজয়ের গ্লানিবোধ আরও বেশি উত্তেজনামুখর। সেখানে মৃত্যুচেতনার উত্তেজনা তুলনারহিত।
মধ্যযুগে মানুষে পশুতে যুদ্ধ লাগিয়ে বিনোদনের আয়োজন চলত। একালেও তার পরিসর বিস্তৃত। জীবনকে বাজি রেখে খেলা বা কসরত দেখানোর উত্তেজনায় সার্কাসের বিনোদন থেকে ম্যাজিক শো, জিমন্যাস্টিক্স থেকে কুস্তির লড়াই, ফুটপাথের সাপ খেলা থেকে তারে হেঁটে চলার খেলার উত্তেজনা সবেতেই সমান সজীব। এজন্য টিভিতেই সেই জীবনবাজি রাখা বীভৎস বিনোদনের আসরের প্রাচুর্য শ্রীবৃদ্ধিমান। সেদিক থেকে মানুষের মৃত্যুচেতনার মধ্যে যেমন শূন্যে মিলিয়ে যাওয়ার ভয় মনকে অবসাদগ্রস্ত করে তোলে, তেমনই তা থেকে উত্তরণ প্রয়াসী কল্পনায় উত্তেজনাও কম নেই, বরং তা অনেক বেশি প্রগলভ। সেখানে বেঁচে থাকাটাই লড়াই, জীবনের অস্তিত্বেই বিজয়ীর আত্মপ্রকাশ। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও রসিকতা করে সেই অস্তিত্বের কথা পরোক্ষভাবে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন : ‘আপাতত এই আনন্দে গর্বে বেড়াই নেচে/ কালিদাস তো নামেই আছেন, আমি আছি বেঁচে।’ এই বেঁচে থাকার মধ্যে যে অতীতের বিস্মৃতি থেকে বর্তমানের মুক্তির পথকে প্রশস্ত করে ভবিষ্যতের হাতছানি দিয়ে চলে।
আসলে অনেক সময় মৃত্যুর বিষাদব্যাকুল নিঃসঙ্গতাও স্বাধীনতাপ্রিয় মানুষের মনে বন্ধনমুক্তির আস্বাদ বয়ে আনে। সেখানে আপাতভাবে মানুষের স্বার্থপরতা উঠে এলেও তার মধ্যে মানুষের অপরাজেয় প্রাণশক্তিও বর্তমান। একাকী জীবনেও তার বেঁচে থাকার স্বপ্ন শেষ হয়ে যায় না, নিঃসঙ্গতার অভাব তাকে পেয়ে বসে না। বরং মুক্তির আনন্দে সে নতুন করে নবজীবনের প্রত্যাশায় জেগে ওঠে। বিভূতিভূষণের ‘অপরাজিত’তে সর্বজয়ার মৃত্যুতে শোকার্ত অপুর মনেও মায়ের বন্ধনমুক্তির আনন্দ জেগে উঠেছিল। সে তখন নিজের মতো করে পৃথিবীকে আস্বাদন করায় তৃপ্তিবোধে মুক্তি লাভ করে।
সেদিক থেকে করোনার অতিমারীর স্কোর বোর্ড আমাদের যতই সচকিত করুক না কেন, তাতেও উত্তেজনার পারদ উঠানামা করে, বেঁচে থাকার চলন্তিকা কথা বলে ওঠে, উত্তরণের নবদিশায় জীবনের গানই মনের অজান্তে গুনগুনিয়ে উঠে, অস্তিত্বের নিশানদেহি খাম্বায় বিজয় পতাকা হাতছানি দিয়ে চলে। জীবনের সচলতায় উত্তেজনা অপরিহার্য। সেখানে নিজেকে সক্রিয় রাখার জন্য উত্তরণপ্রয়াসী জীবনের উত্তেজনার পরশ আস্বাদনে বাছবিচার নেই। এজন্য বেঁচে থাকার অপর নাম জীবনযুদ্ধ। আর যুদ্ধে যেখানে জয়ী হওয়াই লক্ষ্য, সেখানে পাপ-পুণ্য, নীতি-দুর্নীতির চেতনা নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে। সেদিক থেকে মানুষের মৃত্যু চেতনার মধ্যেও জীবনের পরম্পরা বর্তমান। স্বপ্ন হাতছানি দিয়ে ডাকে, কল্পনা স্বাগত জানায়। সেখানে করোনার জীবন বাজি রাখা খেলাও আমাদের উত্তেজনার পরশ জুগিয়ে চলে। আমরা যে ‘অমৃতস্য পুত্রাঃ’।
লেখক : প্রফেসর, বাংলা বিভাগ, সিধো-কানহো-বীরসা বিশ্ববিদ্যালয়, পুরুলিয়া-৭২৩১০৪।