যে কোন দুর্ভিক্ষ, অতিমারি, বিপর্যয়ের অভিঘাতে বদলে যায় একটা জনপদ। তা শহর হোক বা গ্রাম। এই ঘটনা আমরা এর আগে প্রতিটি বিপর্যয়েই দেখেছি। গ্রাম হয়ে গেছে শ্মশান, শ্মশান হয়ে গেছে জনপদ, নিরিবিলি জায়গা চোখের নিমেষে হয়ে গেছে ঘিঞ্জি বস্তি। বেশি দূর যেতে হবে না, বেলগাছিয়া থেকে বেলেঘাটা, যাদবপুর থেকে যোধপুর পার্ক, শহরের নানা এলাকার অতীতের ছবির সঙ্গে বর্তমানের ছবিটাকে মেলালেই ব্যাপারটা পরিস্কার হবে। কিছু প্রবীণ মানুষ তো কোন জায়গার কথা উঠলে এখনও বলে ফেলেন, দূর দূর ওখানে তো শিয়াল ডাকতো।
ঠিক কথা বিপর্যয় এসব বদল এনেছে, কিন্তু একটা ভাইরাসের ধাক্কায় চোখের নিমেষে মানুষের এত বিপন্ন চেহারা গত কয়েক দশকে দেখা যায়নি। কোভিড মানুষকে দুর্ভোগ ও মৃত্যু দিয়েছে, কিন্তু বিপন্নতা দিয়েছে আরও বেশি। প্রায় একশো বছর আমরা মহামারি দেখিনি। দেখিনি মানুষের এভাবে বদলে যাওয়াও। আমাদের আত্মবিশ্বাসকেই যেন ধাক্কা দিয়েছে এই মহামারি। বড় প্রবল তার অভিঘাত। তা মানুষের মর্মে লেগেছে, যাকে বলে হতভম্ভ করে দিয়েছে তাকে।
কোভিডকালে কলকাতা ও সংলগ্ন অঞ্চলে মানুষের জীবন ও জীবিকায় একটা বড় বদল ঘটে গেছে। যারা নিজেদের জীবনের চেনা ছকটা বদলেছেন বা বদলাতে বাধ্য হয়েছেন তাদের এসব নিয়ে তেমন কোন হাঁকডাক বা হেলদোল নেই। কেউ তাদের হয়ে কোন দরবারও করছেন না। এইসব থেকেও নেই হয়ে যাওয়া মানুষদের কোন সঙ্ঘ নেই, নেই কোন সত্যে পৌঁছনোর ইচ্ছে। তাদের কথা বলার কোন লোকও নেই। সবচেয়ে বড় কথা তাদের নিজেদেরও এনিয়ে কোন কথা বলার ইচ্ছে নেই।
কারখানায় কাজ করা যে লোকটি এখন বাড়ির রকে ভোর থেকে চায়ের দোকান সাজিয়ে বসছেন তাকে দেখে আপনি কিছুতেই বুঝতে পারবেন না যে তিনি একটা অফিসে কাজ করতেন। আবার বহুতল আবাসনে প্রহরীর কাজ করা যে মানুষটি এখন বিক্রি করছেন ডিয়ার লটারির টিকিট, তাকে দেখে মনে হবে তিনি যেন চিরকালই লটারির টিকিট বিক্রি করতেন। কোন না কোন একটা কাজের সঙ্গে নিজেদের এরা জুড়ে নিয়েছেন, কারণ বাঁচতে হবে। কিন্তু তা নিয়ে তাদের কোন আগ্রহ বা উৎসাহ নেই। অতিমারিও এদের থেকে মুখ ফিরিয়েছে। এদের কোন মাস্ক নেই, কারও ঠিক করে দেওয়া কোন টাস্কও নেই। গুরুত্বপূর্ণ কোন জীবিকার সঙ্গে যুক্ত ছিলেননা, তাই তারা কোন সমীক্ষার আওতায় আসবেন না, ঢুকবেন না সরকারি কোন পরিসংখ্যানে।
কোভিডের কোপে মানুষের জীবন-জীবিকা যাকে বলে একেবারে ওলটপালট হয়ে গেছে। গোটা শহর জুড়ে এ ঘটনা ঘটেছে। যারা আগে রিকশ চালাতেন তারা এখন অনেকেই বিক্রি করছেন সব্জি, শহরের বহু পাড়াতেই এর উদাহরণ মিলবে। শহর ও শহরতলির অলিগলিতে ঘুরতে ঘুরতে দেখি অসংখ্য চায়ের দোকান। নতুন কেটলি, ছাঁকনি, গেলাস, ছোট গ্যাসের দিকে তাকালেই বুঝবেন ইনি সদ্য নেমেছেন ব্যবসায়। অপটু হাতে খদ্দের সামলাতে পারছেন না, চা দিতে দেরি করার জন্য লোকের ধমক খেয়ে বোকার মত হাসছেন। মফঃস্বলের কর্মহীন লোক শহরের রাস্তায় ভিক্ষা করছেন।
বারান্দা থেকে রোজ দেখি নিত্যনতুন মাছওয়ালা, ফলওয়ালা, সব্জিওয়ালা, ডাবওয়ালা, কিংবা দুধের প্যাকেট বিক্রেতাদের। এদের চালচলন, কথাবার্তা শুনলেই বোঝা যায় জীবন বেলাইন হয়ে যাওয়ায় লাইনে নতুন। গেরস্থরা এদের পাত্তা দেন না, কারণ আমরা শক্তের ভক্ত, নরমের যম। ধার-বাকি, ওজনে মারা,বাজে মাল, কোন কিছুতেই এরা পুরনোদের সঙ্গে পেরে উঠবেন না। পুরনোরাও এদের জায়গা ছাড়বেন না কিছুতেই। তাদেরও তো বাঁচার লড়াই। কোভিড সমপর্যায়ের মানুষদের যাকে বলে শ্রেণিশত্রু বানিয়ে দিল। এ লড়াইকে বাঁচার লড়াই বলা যাবে না, কারণ এরা কেউ বেঁচে নেই, পরিবার, পরিজনের মুখ চেয়ে কোনমতে টিঁকে থাকার চেষ্টা করছেন। তাতে যে জিতবেন সে কথাও এখনই বলা মুশকিল।
এ যেন বেঁচে থাকার এক অভিনয়! সেদিন দেখলাম, একটি নিম্নবিত্ত বাড়ির জানলায় সাঁটানো একটা কাগজে অপটু হাতে লেখা আছে ‘যত্ন সহকারে রুটি, পরোটা, লুচি তৈরি করিয়া থাকি। রুটি প্রতি পিস, তিন টাকা।’ কোভিড সময়ে পাড়ায় পাড়ায় এই রুটির দোকানের সংখ্যাও বেড়েছে। কোন কোন পাড়ায় ক্রেতার থেকে বিক্রেতার সংখ্যা বেশি। তবুও যত্ন সহকারে রুটি তৈরির ঘোষণা বাড়ছে। যে যেমনভাবে পারে বেঁচে থাকার চেষ্টা করছেন।
হয়তো আর কয়েক সপ্তাহ পরেই এসে যাবে ভ্যাকসিন, বিদায় নেবে অতিমারি। কিন্তু নেই হয়ে যাওয়া মানুষগুলো কোন ভ্যাকসিনে জীবনের রাজপথে ফিরবে!