আমরা বেঁচে থাকি বিশ্বাসে। সেই বিশ্বাসেই থাবা বসিয়েছে অদৃশ্য দানব করোনা ভাইরাস। অনিশ্চিত জীবনের হাতছানি জনমানসে বেপরোয়া ভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। যে আত্মপ্রত্যয়ে মানুষ বেঁচে থাকার স্বপ্নে বিভোর হয়, জীবনকে চলিষ্ণুতায় আন্তরিক করে তোলে, তাই আজ প্রাণসংশয়ে স্থিরতায় প্রহর গুণে চলেছে। প্রতিটি মুহূর্তেই অবিশ্বাসী অস্থিরতার পরশ আমাদের সচকিত করে তুলেছে। কিছুতেই বিশ্বাসে থিতু হতে না পারা মানুষের মধ্যে থেকে প্রশান্তির ছায়া সুদূরপরাহত। সর্বত্র অশনি সংকেতের চেতাবনি। অন্যদিকে আত্মবিশ্বাসের অভাবেই ঐশ্বরিক বিশ্বাস জেগে ওঠে। সেই বিশ্বাস নানারকম সংস্কারের মধ্যে দিয়ে প্রকাশ পায়। তাতে যুক্তির অভাব থাকলেও ভক্তির প্রাচুর্য স্বাভাবিক। সেই ভক্তিতেই যে ভক্তের স্বস্তি মেলে, লাভ করে অপার প্রশান্তি। পূজার্চনায় অন্যে কুসংস্কার খুঁজে পেলেও ভক্তের সংস্কারে তা বিশল্যকরণী মনে হয়। সেক্ষেত্রে অপরের বিশ্বাসে যুক্তিবাদীদের জ্ঞানের অভাব জেগে উঠলেও বিশ্বাসীদের মনে তৃপ্তিবোধের পরশ ছড়িয়ে পড়ে যা তার বেঁচে থাকায় প্রাণিত করে। এজন্য শালুক কাপড়ে মোড়া সিদূর চর্চিত না-পড়া ধর্মগ্রন্থের মধ্যেও প্রমথনাথ বিশী অসারতা খুঁজে পাননি। ধর্মবিশ্বাসী মানুষের অচলা ভক্তিতেই তার প্রকাশ। সেখানে যে ভক্তিই মূলকথা।
জীবনে বেঁচে থাকার জন্য সেই বিশ্বাসী ভক্তিরও প্রয়োজন আছে। কেননা আমাদের বিশ্বাসে শুধু বাস্তবতা নেই, আছে কল্পনাও। ‘পোস্টমাস্টার’ গল্পের সেই রতনের দাদাবাবু আর ফিরে আসার কোনো সম্ভাবনা না থাকা সত্ত্বেও তার কল্পনার বিশ্বাসে ভর করে পোস্ট অফিস ঘরের চারদিকে ঘুরপাক খাওয়ার মতো আমাদের জীবনও আবর্তিত হয়। একজনই প্রথম হয়। অথচ স্বপ্ন দেখে অনেকেই। সেখানে যুক্তিবাদীরও অভাব নেই। বাস্তব ও কল্পনা মিলিয়েই আমাদের জীবন। এজন্য কারও কাছে যা কুসংস্কার, অন্যের কাছে তা সংস্কৃতি। করোনার বিধ্বংসী আক্রমণে সেই ঐশ্বরিক বিশ্বাস অস্তাচলগামী। আবার বিজ্ঞানও সেভাবে দিশা দেখাতে পারেনি। সেক্ষেত্রে তার সর্বগ্রাসী বিচরণে স্পর্শমাত্র বিস্তারেই শুধু নয়, তার অমর প্রকৃতিও মানুষকে অসহায় করে তুলেছে। এজন্য সেখানে সামাজিক সম্পর্কই তার আক্রমণে ভেঙে গেছে। করোনার অদৃশ্য আক্রমণে আমাদের সামাজিক জীবনই আজ বিপর্যস্ত। শুধু তাই নয়, গৃহবন্দি নিঃসঙ্গ জীবনে বেঁচে থাকার লক্ষ্যে আমাদের জীবনপ্রত্যয়ে অনিশ্চয়তা স্বাভাবিক হয়ে এসেছে। যেখানে বাঁচাই মানুষের মূলধন হয়ে ওঠে, সেখানে তার সামাজিক মনধন দরিদ্র হয়ে পড়ে। আর সেই সূত্রে সামাজিক শিথিলতা অনিবার্য। এজন্য মৃত্যুভয়ের তাড়নায় যাওবা ‘বাঁচো এবং বাঁচাও’-এর অস্তিত্বে দেশপ্রেম জেগে ওঠে, তার প্রকট হাতছানিতে তাও আবার সময়ান্তরে তার ‘বাঁচো’র মুখে ‘বাঁচাও’ নীরবতা লাভ করে।
করোনার কবলে পড়ে রাজ্যে প্রথম মৃত্যুর শবদাহতেই তার পরিচয় নিবিড় করে তুলেছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ‘মানুষের ধর্ম’ প্রবন্ধে দেহ ভিন্ন হলেও মনে আমরা ঐক্য প্রত্যয়ী বলেছেন। এজন্য প্রধানমন্ত্রীর ‘মনের কথা’তেও সেই ঘরে বিচ্ছিন্ন হলেও মনে এক হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। কিন্তু যেখানে প্রাণের দায় বড় হয়ে ওঠে, সেখানে মনের সাড়া না মেলাই দস্তুর। এজন্য তখন ‘নিজে বাঁচলে বাপের নাম’ সর্বস্ব চেতনা সক্রিয় হয়ে ওঠার প্রবল সম্ভাবনা। করোনা সেখানে শুধু আমাদের মৃত্যুপুরীর ভয় জাগিয়ে মানবিক চেতনায় আন্তরিক করেনি, পাশবিক চেতনার পথেও এগিয়ে নিয়ে চলেছে। আত্মকেন্দ্রিক মানসিকতায় পারস্পরিক বিদ্বেষ, স্বার্থপরতা, দোষারোপের মাধ্যমে সেই অবিশ্বাসের কালো ছায়া ক্রমশ সুদীর্ঘ হতে থাকে। যখন বিশ্বাস চলে যায়, তখন সন্দেহ আন্তরিক হয়ে ওঠে। স্বাভাবিক ভাবেই তাতে ভালোবাসা উবে যায়। তখন মানুষের অস্তিত্বে পাশবিকতা জেগে ওঠে। করোনার মৃত্যুর ঘনঘটায় সেই অবিশ্বাসের ভয়ঙ্কর পদধ্বনিতেই অদৃশ্য দানবের বিকট পাশবিক উল্লাস আরও ভয়াবহ মনে হয়। মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব তার মানবিকতার মধ্য দিয়ে প্রস্ফুটিত হয়। করোনা সেখানেই আঘাত হানায় সক্রিয় হয়ে উঠেছে, ভাবা যায়! কোনো বিশ্বাসেই যে তাকে রোখা যাচ্ছে না।
এখন দেখার প্রতিকূলতার মুখে অপরাজেয় মানুষ, নাকি একালের ভয়ঙ্করতম অদৃশ্য দানবের মুখে শেষ হাসি উঠে আসে। অবশ্য বিশ্বাসের অভাব হলেও মানুষ তার স্বকীয় অস্তিত্বেই অপ্রতিরোধ্য ভাবে অগ্রসর হয়েছে চিরকাল। সেখানেই আমাদের প্রত্যয়, আমাদের মুক্তির আকাশ, আমাদের মুক্ত জীবনানন্দ। রবীন্দ্রনাথও জীবনের উপান্তে এসে মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানোকে পাপের সঙ্গে তুলনা করেছেন। সভ্যতার সংকটে এর চেয়ে মহার্ঘ আত্মপ্রত্যয় আর কী হতে পারে? সেই মানবতীর্থেই যে আমাদের প্রাণের ঠাকুর চরৈবেতির হাতছানি দিয়ে চলে। সেখানেই আমাদের আশ্রয়, আমাদের প্রশ্রয়, আমাদের অপরাজেয় জীবনবিভূতি। মানুষকেই সেই আত্মবিশ্বাসকে জীবন দিয়েও রক্ষা করে যেতে হবে। রবীন্দ্রনাথও যে সেই পুণ্যশ্লোকে আজীবন আস্থাশীল ছিলেন : ‘আছে দুঃখ, আছে মৃত্যু, বিরহ দহন লাগে।/ তবুও শান্তি, তবু আনন্দ, তবু অনন্ত জাগে।।’ আমরা যে সেই আনন্দনিকেতনবাসী। আমাদের হারায় কার সাধ্যি!
লেখক : প্রফেসর, বাংলা বিভাগ, সিধো-কানহো-বীরসা বিশ্ববিদ্যালয়, পুরুলিয়া
বেশ মনোজ্ঞ লেখা। সমৃদ্ধ হলাম।