দ্বিতীয় অধ্যায়
রাজনীতিতে ব্যবসায়িক সংগঠন
পাঁচ
গ্রাম প্রধানের নেতৃত্বে রাজনৈতিক একক হিসেবে গ্রামের স্বীকৃতি আমরা জাতকে খুঁজে পাই। খারাসারা জাতকে পাচ্ছি গ্রাম প্রধানের (গামভোজক) দায়িত্ব ছিল রাজস্ব আদায় এবং স্থানীয়দের সহায়তার চোর ডাকাতের প্রতাপ থেকে গ্রাম রক্ষা করা। একটি বিশেষ ঘটনায় এই কাজে জনৈক সরকারি মন্ত্রী নিযুক্ত হয়েছিলেন। গ্রাম লুঠ হয়ে যাওয়ার পর ডাকাতদের সঙ্গে গোপনে যোগাযোগ থাকার অভিযোগে তাকে পদচ্যুত করা হয়। একই জাতকে আরেক গ্রামের কর্তব্যচ্যুত গ্রাম প্রধানকে তাড়িয়ে দিয়ে অন্য জনকে দায়িত্ব দেওয়ার উদাহরণ উল্লেখ করা হয়েছে। কুলবাক জাতকে এই কাঠামোর কার্যকলাপ বিষয়ে আরও কিছু তথ্য পাচ্ছি। কোনও এক গ্রামে এক ব্যক্তি গ্রাম প্রধান ছিল। তার অধিকার ছিল আধ্যাত্মিক পানীয়ের (spiritual liquor?) ওপরে রাজস্ব বসানোর। বোধিসত্ত্বর উদ্যম বিষয়ে তাকে জানানো হলে সে গর্ব করে বলল মানুষেরা মদ্যপায়ী হলে এবং নরহত্যা ইত্যাদি করলে আমরা বহু অর্থ রোজগার করি শুধু মদ্য বিক্রি করে নয়, তাদের ওপর জরিমানা এবং অনাদায়ী রাজস্ব চাপিয়ে। বোধিসত্ত্ব এবং তার অনুগামীদের ঝেড়ে ফেলতে রাজার সামনে খল মানুষটা তাদের বিরুদ্ধে ডাকাতির অভিযোগ আনলেন। রাজা খল মানুষোটির চরিত্র প্রকাশ করলেন। মানুষের ওপর মিথ্যা অভিযোগ চাপাবার দায়ে তার সমস্ত সম্পদ অধিকার করে তাকে দাস করে রাখলেন। এখানে নতুন কোনও গ্রাম প্রধান নিযুক্ত হওয়ার সংবাদ পাচ্ছিনা, বরং দেখছি গ্রামের মানুষেরা যৌথ উদ্যমে গ্রাম ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব নিচ্ছেন, হয়ত গ্রাম প্রধান তারাই নির্বাচন করছেন। উভাতোভট্ট জাতকে গ্রাম প্রধান অথবা গামভোজকের বিচার করার ক্ষমতার উদাহরণ পাওয়া যাচ্ছে, যিনি জনৈক জেলের স্ত্রীকে ঝগড়া শুরু করার জন্যে জরিমানা করছেন এবং তাকে বেঁধে রেখে পিটিয়ে তার থেকে অর্থ আদায় করা হচ্ছে।
পানিয় জাতকে কাশি রাজ্যের দুজন গামভোজক প্রাণী হত্যা এবং কড়া মদ্য বিক্রয়ের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। জনগণের প্রতিনিধিরা গামভোজকদের বললেন এই কর্মগুলি সুদূর অতীত থেকে চলে আসছে এবং দু’ক্ষেত্রেই তারা জারি করা নির্দেশ তুলে নেওয়াতে সক্ষম হলেন। গহপতি জাতকে আমরা দেখি মন্বন্তরের সময় গ্রাম প্রধান অধিবাসীদের মাংস দিলেন এই শর্তে ‘দুমাস পরে যখন চাষ হবে, তারা যেন এটাকে ধার হিসেবে গণ্য করে শোধ করে দেয়’। জাতকের এইসব উদাহরণ থেকে আমাদের দৃঢ় ধারণা হয় প্রাচীন ভারতে গ্রাম একটি রাজনৈতিক একক হিসেবে কাজ করত এবং এই চরিত্রটা সে সময় সবাই জানতেন এবং মান্যও করতেন। কখনো কখনো গ্রাম প্রধানকে রাজা নিয়োগ করতেন, তবে এটা ব্যতিক্রমই, সাধারণ নিয়ম ছিল না। ফলে আমরা স্পষ্ট বুঝলাম গ্রাম প্রশাসনিক দপ্তর গ্রামের মানুষেরাই চালাতেন। গ্রাম প্রধানের ব্যাপক প্রশাসনিক এবং বিচারবিভাগীয় ক্ষমতা ছিল, যে উদাহরণগুলো আমরা আগেই দিয়েছি। এছাড়াও জনগণের স্বর গ্রামীনের ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণে খুব বড় ভূমিকা পালন করেছে।
বৈদিক যুগের পরিবর্তী সময়ে পুগ এবং গণ নামে দুটি পরিভাষা শহর এবং গ্রামের প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনাকে চিহ্নিত করছে। বীরমিত্রোদয়ে ‘গণশব্দ পুগপারর্য’ (ganasahdah pugaparyayah) এবং আবার পুগা সমূহ ভিন্নজাতিনাম ভিন্নবৃত্তিনাম একাস্থনবাসিনম গ্রামনগ্রাদিস্থানম’ (pugah samuhah bhinnajatinam bhinnavrittitiam ekasthanavasinam gramanagaradisthanam)। যাজ্ঞবল্ক্যের টিকা করতে গিয়ে বিজ্ঞানেশ্বর গণকে ব্যাখ্যা করেছেন গ্রামাদিজনসমূহ (gramadijanasamuha) হিসেবে। দুটো পরিষাই সাধারণভাবে স্থানীয় প্রশাসনিক কাঠামো নির্দেশ করে; কিন্তু মাঝেমাঝে এই লব্জদুটো বিশেষ স্থানীয় প্রশাসন যাকে টিকাকার গ্রাম বা শহরের প্রশাসন হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। পাণিনিতে টিকা করতে গিয়ে কাষিক (Kasika) বলছেন, —

গণ শব্দটি অন্যান্য পরিভাষা এবং আরও অন্য প্রসঙ্গে ব্যবহৃত হয়েছে — এসব আমরা পরে আলোচনা করব।
বিনয়পিটকে (চুল্লবগ্গ V ৫, ২; VIII, ৪, ১) পুগ শব্দটা ব্যবহার হয়েছে শহর বা গ্রামের স্থানীয় প্রশাসন বোঝাতে। আমরা জানছি, কিছু কিছু পুগ (annatarassa pugassa অন্নতরস্য পুগাস্য) সংঘকে খাদ্য সরবরাহ করার কাজ করত। এই বাক্যটা শাস্ত্রে বহুবার ব্যবহৃত হয়েছে। অধ্যাপক রিজ ডেভিস বা ওল্ডেনবার্গ indeterminate and indefinite multitude অর্থে ব্যবহার করেছেন, আমি এখানে সে অর্থে ব্যবহার করিনি। পরের দিকে প্রবন্ধকার এবং টিকাকারেরা পুগকে ব্যবহার করেছেন গ্রাম শহরের প্রশাসন বোঝাতে। আরও গুরুত্বপূর্ণ যে বিনয়পিটক অন্য এক জায়গায় ভিক্ষুণীপতিমোক্ষ সঙ্ঘদিশেস বাক্যে বুঝিয়েছে পুগের প্রশাসনিক ক্ষমতা বিস্তৃত ছিল ভিক্ষুণীদের সন্ন্যাস গ্রহণের অনুমতি দানে বা মহিলা চোরের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া ইত্যাদির। ফলে বিনয়পিটক অনুসারে আমরা পুগ শব্দকে শহর বা গ্রামের প্রশাসনিক একক হিসেবে চিহ্নিত করলাম এবং বুদ্ধের সমসাময়িক সময়ে এই ধরণের প্রশাসনিক সংগঠনের অস্তিত্ব প্রমানও করলাম।
গ্রামের যৌথ সমবায়িক এবং রাজনৈতিক চরিত্র কৌটিল্য স্বীকার করে নিয়ে দশম অধ্যায়ের ৩ খণ্ডে এই নির্দেশিকাটি দিয়েছেন When the headman of a village has to travel on account of any business of the whole village, the villagers shall by turns accompany him —
“Those who cannot do this shall pay 1.5 panas for every yojana. If the headman of a village sends out of the village any person except a thief, or an adulterer, he shall be punished with a fine of 24 panas, and the villagers with the first amercement (for doing the same.) (R. Shamasastry’s Translation, pp. 218-19).
আবার বলছেন —
“The fine levied on a cultivator who arriving at a village for work does not work shall be taken by the village itself…..
“Any person who does not co-operate in the work of preparation for a public show shall, together with his family, forfeit his right to enjoy the show (preksha). If a man, who has not co-operated in preparing for a public play or spectacle is found hearing or witnessing it under hiding, or if any one refuses to give his aid in work beneficial to all, he shall be compelled to pay double the value of the aid due from him” (Ibid, p. 220)
এই নিষেধাজ্ঞাগুলি থেকে পরিষ্কার বদ্ধ কাঠামো হিসেবে গ্রামের প্রশাসন তার ভূমিকা পালন করত। গ্রামের প্রধান গ্রাম প্রশাসন চালাতেন এবং তার দুর্বিসহ কাজ সুচারুরূপে সমাধা করতে গ্রামের জনসমুদায় তাঁকে সাহায্য করত। তিনি গ্রামবাসীদের সাহায্য নিয়ে দুষ্কৃতিদের শাস্তিদান করতে, এমন কি গ্রাম থেকে কোনও বাসিন্দাকে বহিষ্কারও করতে পারতেন। অর্জিত অধিকার উল্লঙ্ঘন করার জন্যে গ্রামীন জনগণ এমন কি গ্রাম প্রধানকে শাস্তি দেওয়া হত এবং গ্রাম প্রধানের নেতৃত্বে গ্রাম সমিতির বৈঠক ডেকে শাস্তি কার্যকর করা হত। এই আলোচনা থেকে আমরা আরও সিদ্ধান্ত করতে পারি, ব্যক্তি সমবায়িক সংগঠনের অধীনস্থ ছিল না এবং একই কথা বলা যায় শ্রেণী সংঘের ক্ষেত্রেও — রাজা একচ্ছত্র আধিপত্য দিয়ে দুই ক্ষেত্রে দ্বন্দ্ব নিরসনের কাজ করতেন। গ্রামীন, চাষী ইত্যাদিদের কাজ অবহেলা সংক্রান্ত জরিমানা একটা সাধারণ তহবিলে জমা থাকত। এই ধরণের প্রত্যেক ব্যক্তিতে জনকৃত্যে অংশ নিতে বাধ্য করা হত Those who, with their united efforts, construct on roads buildings of any kind (setubandha) beneficial to the whole country and who not only adorn their villages, but also keep watch on them shall be shown favourable concessions by the king.” (Ibid, p. 221.)
বৈদিক যুগের পরেও গ্রাম সংগঠনকে সমবায়িক রাজনৈতিক একক হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। বিষ্ণু(III., 7 and 11) এবং মনু স্মৃতিতে (VII., 115-116) রাষ্ট্র কাঠামো এবং পরিচালনার ক্ষেত্রে গ্রামকে ক্ষুদ্রতম রাজনৈতিক একক হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। গ্রামীক বা গ্রাম প্রধানের নামোল্লেখ বার বার উঠে এসেছে।
মনু স্পষ্টভাবে বলেছেন গ্রাম সমাজের সঙ্গে বিবাদ তৈরি হলে, চুক্তি ভঙ্গ হলে রাজাকে তার রাজ্য থেকে বহিষ্কার করা হতে পারে। ধর্মসূত্র এবং ধর্মশাস্ত্র উভয়েই গণ এবং পুগ পরিভাষা দুটি শহর এবং গ্রাম সংগঠনের একক হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। পূর্বে উল্লিখিত বীরমিত্রোদয় এবং বিজ্ঞানেশ্বর, উভয় টিকাকার এ বিষয়ে আরও কিছু ব্যাখ্যা দিয়েছেন। যাজ্ঞবল্ক্য, II, ৩১ এবং নারদ, মুখবন্ধ, ৯, ৭ স্পষ্টভাবে বলেছেন পুগ এবং গণ দুটি সমার্থক শব্দ, এদের ব্যবহার করা যায় একমাত্র গ্রাম আর শহরের প্রশাসনিক সংগঠন বোঝাতে। মনুতে বলা হয়েছে যে ব্যক্তি পুগ আর গণে বলি দিয়েছেন তিনি শ্রাদ্ধের কাজে অযোগ্য এবং একই নিদান দেখি গৌতম এবং বিষ্ণুতে।
যাজ্ঞবল্ক্য সূত্রকে গভীরভাবে পাঠ করলে আমরা একই সিদ্ধান্ত দেখতে পাই। এখানে লেখক শহর বা পুর-এর রাজকীয় দায়িত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলছেন শহরে পবিত্র ব্রাহ্মণদের বসানো কর্তব্য। গণের উদ্দেশ্যে রাজকীয় দায়িত্ব অর্থাৎ, গণের সম্পত্তি যে চুরি করবে রাজা তাকে শাস্তি দেবেন। একই সঙ্গে বলা হল রাজা এই নিদানটি শ্রেণী সংঘ, ব্যবসায়ীদের সংঘ (নিগম), এবং নানান ধরণের ধর্মীয় গোষ্ঠীর ক্ষেত্রেও বিস্তৃত করবেন। এখানে বলা দরকার গণ শব্দটা শহর বা গ্রামের (পুর) সমার্থক শব্দ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে, না হলে পুর শব্দ ব্যবহারের কোনও মানে থাকে না। আমরা আগেই দেখেছি, টিকাকার বিজ্ঞানেশ্বর এই মত স্বীকার করে নিয়েছেন।
এবারে আমরা দুটি নিষেধাজ্ঞা বিষয়ে আলোচনা করব ধর্মসূত্র এবং ধর্মশাস্ত্রের সময়ে গ্রাম সঙ্গঠনকে সমবায়িক সংগঠন হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছিল।
১। যেখানে ব্রাহ্মণ তার পূণ্য কাজ পালন করে না, বেদ বিষয়ে অজ্ঞ থাকে এবং ভিক্ষা করে জীবনধারণ করে এবং চোরদের পালন করে সেই গ্রামকে শাস্তি দেওয়া হবে।
২। যখন গরু এবং অন্যান্য পশু হারিয়ে যায় অথবা যখন অন্যদের সম্পত্তি বলপ্রয়োগে ছিনিয়ে নেওয়া হয়, অভিজ্ঞ পুরুষ এগুলী খুঁজে বার করার দায়িত্ব নেবে।
যেখানেই পদচিহ্ন গিয়েছে, সেটি গ্রামই হোক বা পশুচারণভূমিই হোক অথবা পতিত জমিই হোক, সেই এলাকার মালিক এবং বাসিন্দা এই হারানো সম্পত্তি ফিরিয়ে দেবে।
যখন পদচিহ্ন গ্রামের পৌঁছাবার আগেই মিলিয়ে যায়, তাহলে সেই গ্রামের বাইরের ঘাস জমিকে [মালিককে] দায়ি করতে হবে। [নাদদ, XIV, ২২-২৪]
দুটি ঘটনাতেই সামগ্রিক গ্রাম এবং গ্রামের অধিবাসীদের দায়ি করা হচ্ছে। গ্রামীনদের কোনও অধিকার না থাকলে এ ধরণের নিষেধাজ্ঞার কোনও মানে দাঁড়ায় না। এখানে মাথায় রাখুন কোনও আধিকারিক ইত্যাদির সূত্র উল্লেখ না করে সামগ্রিক দায়িত্ব গ্রাম সমাজের ওপরে অরোপিত করা হয়েছে। ফলে আমরা দেখলাম গ্রাম সমাজকে রাষ্ট্রের একটি সমবায়িক একক হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে যার ওপরে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র প্রশাসনিক দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছিল এবং সেই দায়িত্বগুলি পালনের ব্যর্থতায় ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে গ্রাম সমাজকে জবাবদিহি করতে হত।
বিভিন্ন সমকালীন সাহিত্যে স্থানীয় প্রশাসন বিষয়ে যে সব উদাহরণ আমরা পেলাম, প্রত্নতাত্ত্বিক উৎখননেও সেই তথ্যগুলি সমর্থিত হচ্ছে। সব থেকে পুরোনো যে পোড়ামাটির সিল পাওয়া যাচ্ছে এলাহাবাদের কাছে ভিট্টায়, তাতে চতুর্থ পঞ্চম খ্রিতে ব্যবহার হওয়া লিপিতে লেখা রয়েছে Sahijitiye nigamasa। এই মৌর্য আমলের তথ্যটি আবিষ্কার করেছেন স্যর জন মার্শাল – হয়ত এই অঞ্চলটা সাহিজিতি শহর প্রশাসন বা নিগমের দপ্তর ছিল।
তৃতীয় খ্রিপূর ভাট্টিপ্রলু মঞ্জুষে (Bhattiprolu Casket) (এই শিলালেখতে নিগম শব্দের উল্লেখ রয়েছে। বুহলার অর্থ করছেন শ্রেণী সংঘের সদস্য হিসেবে। বইএর প্রথম দিকে আমরা দেখেছি নিগম শব্দটা অনেক বেশি প্রযোজ্য শহরের ক্ষেত্রে। অধ্যাপক ভাণ্ডারকর শব্দকে লিখছেন নিগমাহ রূপে অর্থাৎ যাজ্ঞবল্ক্য বা নারদস্মৃতিতে উল্লিখিত নাগরিকদের সঙ্ঘরূপে) শুধু যে গ্রাম প্রধানের কথাই বলা হয় নি, সেখানে শহর প্রশাসনে থাকা আধিকারিকদের নামোল্লেখ করা আছে। ৪ এবং ৮৪ খ্রিঃর মথুরা জৈন শিলালেখতে গ্রামীন প্রধান পদের উল্লেখ রয়েছে। প্রথম শিলালেখতে এক মহিলার কথা বলা হয়েছে যিনি জনৈক গ্রামীন প্রধানের কন্যা এবং আরেক গ্রাম প্রধানের বধুমাতা। এর থেকে আন্দাজ করা যায় গ্রাম প্রধানের পদটি বংশানুক্রমিক ছিল।
উষাভদত্তের নাসিক শিলালেখতে নিগম-সভা বা শহর প্রশাসন শব্দবন্ধের উল্লেখ রয়েছে যেখানে প্রথা অনুযায়ী দানের নানান বিষয় নথিভূক্ত এবং পঞ্জীকৃত করা হত। এই অঞ্চলেই একটি শিলালিপিতে নাসিকের অধিবাসীদের পক্ষে একটি গ্রাম দান করার কথা উল্লিখিত হয়েছে। অন্যদিকে সাঁচির দ্বিতীয় স্তুপের বেড়ায় উল্লিখিত হয়েছে একটি গ্রাম পাদুকুলিক গ্রাম দান এবং অমরাবতী স্তুপে ধনকাতক নিগম দানের কথা বলা হয়েছে। এইগুলি সামগ্রিক শহরের সমবায়িক সংঘ বোঝাচ্ছে।
ভিটায় আবিষ্কৃত চারটি পোড়ামাটির সিলের একটিতে কুশান অক্ষরে লিখিত হয়েছে নিগমাস আরেকটিতে নিগমাস লিখিত হয়েছে গুপ্ত লিপিতে। এই উল্লেখ থেকে স্পষ্ট খ্রিষ্টাব্দের প্রথম চার থেকে পাঁচ শতকে শহর পরিচালনা সংগঠনের ধারাবাহিক উল্লেখ পাওয়া যাচ্ছে, যা বইএর প্রথম দিকে উল্লিখিত বৈশালী শিলালেখর পাঠকে সমর্থন করে।
৯৩৩ বিক্রমাব্দে গোয়ালিয়রের ভিল্লাভট্টস্বামীন মন্দিরের যে শিলালিপি পাওয়া গিয়েছে সেখানে ব্যবসায়ী সাভভিয়ক, শ্রেষ্ঠী ইচ্ছুভাক এবং সাভভিয়কের সভার অন্যান্য সদস্যর ওপরে শহরের প্রশাসন দেওয়া রয়েছে এবং সমগ্র শহরটাকে নবদুর্গা মন্দিরকে দেওয়া আছে এবং মন্দিরটি যে ভূমির ওপরে অবস্থিত সেটি শহরের নিজস্ব অধিকারের। একইভাবে এটি শহরের প্রশাসনের অধিকারে থাকা আরেকটি ভূমি বিষ্ণু মন্দিরের জন্যে দান করেছে এবং মন্দিরটি দেখাশোনা করার ভার দেওয়া হয়েছে তেলি এবং মালাকারদের শ্রেণী সংঘকে — শর্ত, তারা মন্দিরের প্রয়োজনীয় দৈনিক তেল আর মালা সরবরাহ করবে। ছোট এই শিলালেখটি শহর পরিচালনার উদাহরণ পেশ করে। শহর নগমের নিজস্ব ভূমি ছিল এবং তারা শহরের নামে দান এবং বৃত্তি দিতে পারত। দশম শতাব্দের মাঝামাঝি সময়ের সিয়াদোনি শিলালেখতে আমরা একই ধরণের উল্লেখ পাচ্ছি, শহরের প্রসাসন মোটামুটি পাঁচ জনের একটি দল ব্যবস্থাপনা করত, যার নাম পঞ্চকুল এবং এই দলে মাঝে মধ্যে শহর অধিবাসীরা দুজন করে নিযুক্ত করতেন। এর থেকে প্রমান হয় শহর ব্যবস্থাপনার সংগঠন প্রাচীন ভারতের শেষ সময় অবদি কার্যকর ছিল। (চলবে)