| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

কর্পোরেট লাইফ ইন এন্সিয়েন্ট ইন্ডিয়া : রমেশ চন্দ্র মজুমদার (১৬নং কিস্তি) অনুবাদ : বিশ্বেন্দু নন্দ

Reporter
বিশ্বেন্দু নন্দ / ৪০০ জন পড়েছেন
আপডেট শনিবার, ২৪ ডিসেম্বর, ২০২২

দ্বিতীয় অধ্যায়

রাজনীতিতে ব্যবসায়িক সংগঠন

বার

কখনো কখনো উত্তম পরিকল্পিত সেচ ব্যবস্থাও ব্যর্থ হয় এবং গ্রাম মন্বন্তর এবং অভাবের মুখোমুখি দাঁড়ায়। গ্রাম সভা এবাবদে এই দুর্যোগে চরমতমভাবে নিজেদের প্রস্তুত রেখে এই প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি হত।

আলানগুড়ি শিলালিপিতে রাজারাজার রাজত্বে ষষ্ঠ বছরে তীব্র মন্বন্তরের কথা উল্লিখিত হয়েছে। এই শিলালিপিতে বলা হয়েছে এই সময় গ্রামের মানুষের চাল কেনার মতন অর্থ ছিল না, ধানের বীজ ছিল না এবং অন্যান্য নানান নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কেনার জন্যে অর্থ ছিল না। কেন জানা যায় না মন্বন্তর বিপদের মুখোমুখি হওয়া মানুষেরা রাজকোষ থেকে অর্থ সাহায্য চায় নি। গ্রাম সভা স্থানীয় মন্দিরের গয়নার কোষ থেকে থেকে নির্দিষ্ট পরিমান সোনা রূপো ধার নেয়। এর বিনিময়ে গ্রাম সভা দেবতার জন্যে ৮.৭৫ বেলি জমি বরাদ্দ করে। সেই জমির উৎপাদনের উদ্বৃত্ত থেকে ধার শোধ করা হয়।

একটি চোল শিলালিপি থেকে আমরা জানতে পারি ‘খারাপ সময়’ এবং ‘খাদ্যশস্যের অভাবের’ জন্যে গ্রাম সভা মন্দিরের কোষ থেকে অর্থ ধার করছে।

গ্রাম সভা তার সমস্ত সামর্থ প্রয়োগ করে এই ধরণের প্রাকৃতিক দুর্যোগের মোকাবিলায় দায়িত্ব পালনে উদ্যমী হওয়ার বিষয়টি সরকার সার্বিকভাবে স্বীকৃতি দেয়। তাই তারা কখনো কখনো অবস্থা নিয়ন্ত্রণে আনতে সরকারি বকেয়া বিষয়ে নতুন করে চিন্তাভাবনা করে। বীর রবি কেরালাভরনমের ৪১০ কোল্লম বছরে অর্থাৎ ১২৩৪-৩৫ খ্রিঃতে মানালিক্কারাই শিলালিপি সূত্রে একটি অভূতপূর্ব ঘটনার উল্লেখ পাচ্ছি —

In the year 410 is issued the following proclamation after a consultation having been duly held among the loyal chieftains ruling at Venad and the members of the assembly (Sabha) of Kodainallur and the people of that village, as well as Kondan Tiruvikramau, entrusted with the right of realising the Government dues. Agreeably to the understanding arrived at in this consultation we command and direct that the tax due from Government lands be taken as amounting in paddy to (such and such measure). In seasons of drought and consequent failure of crops the members of the Sabha and the people of the village shall inspect the lands and ascertain which have failed and which have not. The lands that have failed shall be assessed at one-fifth of the normal dues. Similarly the members of the Sabha and the people should report to the officer-in-charge if all the taxable lands equally failed, and after the said officer was satisfied by personal inspection, one-fifth only of the entire dues shall be levied. If the member of the Sabha and the people agree among themselves and pray in common for the postponement of the payment as the only course open to the majority among them, this demand (i.e., one-fifth the usual rate) shall be apportioned over all the lands paying tax to Government (to be levied in the subsequent harvest) but without interest.

তের

পূর্বে ৯ অংশে উল্লিখিত শিলালিপি সূত্রে দেখেছি কীভাবে গ্রাম সভা গ্রামের অধিবাসীদের ওপর সার্বিক নিয়ন্ত্রণ কায়েম করত। আমরা দেখেছি গ্রাম সভাই গ্রামের জমির নিয়ন্ত্রক, জমি বিক্রি অথবা জমি রাজস্বমুক্ত করতে তাদের সার্বিক অধিকার ছিল। আমরা এমনও একটা উদাহরণ পাচ্ছি যেখানে রাণীকেও গ্রাম সভার থেকে জমি কিনেনিতে হচ্ছে। গ্রাম সভা জমিতে রাজস্ব চাপাতে পারত, অন্যান্য করাধান করত এবং সমাজের প্রয়োজনে অর্থ ঋণ নিতে পারত। এতদ সত্ত্বেও তারা একচ্ছত্র ক্ষমতা প্রয়োগ করত না এবং সাধারণভাবে সংবিধান মান্য করেই তাদের এই সব কাজকর্ম সম্পাদন করত। গ্রাম সভার কার্যাবলী এবং বাধাগুলি বিক্রম চোলের শিলালিপিতে পাচ্ছি। তিরুনারায়ুর সভা ব্যয় বরাদ্দের তুলনায় অতিরিক্ত ব্যয় করে ফেলেছিল; যেহেতু সে সময় চলতি রাজস্বর বাইরে অতিরিক্ত রাজস্ব ধার্য করতে পারত না, তাই উক্ত সভার সদস্যরা সেই অতরিক্ত ব্যয়ের অর্থ শোধ করতে মন্দিরকে অর্থের বদলে একটি জমি বিক্রি করে।

একটিমাত্র শিলালেখতে একটিমাত্র উদাহরণ পাচ্ছি যেখানে গ্রাম সভা সাধারণ মানুষের ইচ্ছের ওপরে নিজেদের নিয়ম চাপিয়ে দেয়; বলা হল ‘যে সব মানুষ হিসেব পরীক্ষা, কাঠের কাজ ইত্যাদি করতে দক্ষ তাদের অবশ্যম্ভাবীভাবে এই গ্রামেই কাজ নিতে হবে। যারা এই গ্রামের বাইরে এই কাজে নিজেদের নিযুক্ত করেছেন তারা আইনভঙ্গকারী, তারা সভার মতের বিরুদ্ধে গিয়ে গ্রামকে ধ্বংস করার কাজ করছেন’।

চোদ্দ

বেশ কিছু শিলালেখতে আমরা দেখছি গ্রাম সভাকে জন-অছি এবং স্থানীয় মহাজন হিসেবে কাজ করতে। উক্কল শিলালেখতে আমরা পেয়েছি তারা দাতার বেঁধে দেওয়া শর্তে গচ্ছিত অর্থ ব্যয় করত। এ বিষয়ে অন্যান্য শিলালেখতে আমরা আরও কিছু বিশদ বিবরণ পাচ্ছি। নবম শতের অম্বসমুদ্রম শিলালিপিতে পাচ্ছি পাণ্ড্য রাজা বরগুনা ইলানগোকুড়ি গ্রাম সভায় ২৯০ কাসু জমা করেন। শর্ত এই পুঁজিতে হাত দেওয়া হবে না, পুঁজির উদ্বৃত্ত থেকে মন্দিরের নানান কাজ সম্পাদন করতে হবে। এই কাজে সদস্যরা প্রতি বছর প্রতি কাসুতে দুই কলম ধান হিসেবে ৫০৮ কলম ধান দিলেন। এই রোজগার থেকে দেবতা এবং সভার সেবকেরা বিশদে লিখত নির্দেশ অনুসরণ করে দৈনিক চারবার পুজো দিতেন।

তাঞ্জোর মন্দিরের শিলালেখতে এই ধরণের কাজের উদাহরণ ১৭ বার লিখিত হয়েছে। যে অর্থ তাদের কাছে জমা থাকে, সেই অর্থ থেকে মন্দিরকে সুদ দিতে হয় অর্থমূল্যে না হয় ধান/চালে।

তামিল শিলালেখতে একটি জমির দান উল্লেখ করা হয়েছে এই শর্তে যে সেই জমির উদ্বৃত্তে মন্দিরে প্রদীপ জ্বলবে। দানকর্মের দেখাশোনার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল বাৎসরিক পুকুর দেখাশোনা করা সমিতিকে। আরেকটি শিলালেখতে পাচ্ছি ৫ জন ব্রাহ্মণকে দৈনিক খাওয়ানোর জন্যে গ্রাম সভাকে ৭৫ কালানজুস পরিমান সোনা দান করা হয়েছিল। হালজ্‌শ (Hultzsch) তিরুকোভালুরের যে ১৪টি শিলালেখ প্রকাশ করেছেন তার মধ্যে ৬টাতে বলা হয়েছে গ্রাম সভা নিরদিষ্ট পরিমান অর্থ এবং ধান জমা রেখে নির্দিষ্ট কিছু কাজ দাতব্য কাজ করবে।

কোনও কোনও সময় গ্রাম সভায় দীর্ঘকালীন সময়ে অর্থ জমা রাখা হয় (ফিক্সড ডিপোজিট), যার সুদের অর্থে মন্দিরের রাজস্ব বিদায় দেওয়া হয়। এইরকম একটি তথ্যে দেখছি স্থানীয় মন্দিরের জনৈক ভক্ত ১৬০ কাসু জোগাড় করে গ্রাম সভায় দান করেন যাতে মন্দিরের জমিটি রাজস্বমুক্ত হতে পারে। প্রায় একই ধরণের আরেকটি শিলালেখয় আমরা পাচ্ছি বাজারে দোকান থেকে রাজস্ব আদায়ের দায় স্থানীয় মন্দিরকে দিয়েছিল গ্রাম সভা।

তিরুনামানাল্লুরের একটি শিলালেখতে ১০০টি জীবিত এবং অবয়স্ক ভেড়া উপহার দেওয়া হচ্ছে গ্রাম সভাকে যাতে স্থানীয় মন্দিরে প্রদীপ জ্বালানোর জন্য ঘি সরবরাহ করা যায়। অবয়স্ক এবং জীবিত ভেড়া শব্দদুটি উল্লেখ করার অর্থ হল যে ভেড়া বয়স্ক হয়ে যাবে অথবা দুধ দিতে পারবে না, সেগুলিতে প্রতিস্থপিত করতে হবে।

কোনও কোনও সময় গ্রাম সভায় দানের বিষয়টি জনগনের সম্মতিতে ঘটত। রাজারাজা চোলের সময়ের এক শিলালেখ থেকে জানা যায় জনৈক বণিক কিছু অর্থ জমা রাখে, যে অর্থের সুদে তিরুবিদাবান্ডাইএর গ্রাম সভা এবং গ্রামবাসী অনন্ত সময়ের জন্যে মন্দিরে প্রদীপ জ্বালানোর কাজ করবেন। কখনো আবার দুস্তরীয় ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থা আয়োজিত হত। চোল শিলালেখ থেকে জানতে পারি থাইয়ুরের বাসিন্দাদের উদ্দেশ্য করে জনৈক ব্যবসায়ী কিছু অর্থ দান করলেন এই শর্তে যে তারা এই অর্থ থেকে তিরুবিদাবান্ডাইএর গ্রাম সভাকে সুদ হিসেবে দেবে তেল এবং ধান, যা দিয়ে মন্দিরে প্রদীপ জ্বলবে এবং ৩৫ ব্রাহ্মণের খাদ্য জোগানো যাবে।

দক্ষিণ ভারতের প্রচুর শিলালিপি থেকে বিশদে এই ধরণের প্রচুর উদাহরণ দিয়ে দেখানো যায় এই অঞ্চলের গ্রাম সভা জনগণের অছি এবং স্থানীয় মহাজন/ব্যাঙ্ক হিসেবে কাজ করত।

পনেরো

অধিকাংশ সময় দেখা গেছে স্থানীয় গ্রাম সভার প্রশাসকদের সঙ্গে স্থানীয় মন্দিরের কর্মকর্তাদের সুচারু সখ্য ছিল। এই সম্পর্কটার ঘনিষ্ঠতা স্পষ্টভাবে বোঝা যায় সেই সব গ্রামে যেখানে গ্রামটি ব্রহ্মদেয় এবং মন্দিরের জন্যে উতসর্গীকৃত। রাজারাজা চোলের একটি শিলালেখ থেকে জানতে পারি, এই ধরণের গ্রামের বাসিন্দারা তাঞ্জোর মন্দিরকে দান করতে হবে ১। মন্দিরের খাজাঞ্চি কারন ব্রাহ্মণেরা জমি, সম্পদ এবং পুঁজিতে ধনী ছিলেন; ২। মন্দিরের সেবক হিসেবে ব্রহ্মচারী; ৩। মন্দিরের হিসেব রাখার কাজের দক্ষ পেশাদার। রাজারাজার তাঞ্জোর শিলালেখ আমাদের নাম ধরে ধরে ১৪৪টি এই ধরণের গ্রাম সভার কথা জানাচ্ছে যারা মন্দিরকে ব্রহ্মচারী সরবরাহ করতে পারে এবং অন্য ১০৫ গ্রাম যারা প্রহরী সরবরাহ করতে পারে।

এর আগে আমরা দেখেছি কীভাবে গ্রাম সভা এবং মন্দির কর্তৃপক্ষ তাদের নিজেদের অধিকার রক্ষা করত এবংন কোনও এক পক্ষ তার অধিকার পালনে চ্যুত হলে একে অপরের বিরুদ্ধে রাজদরবারে অভিযোগ শানাত। একটি শিলালেখতে দেখছি গ্রাম সভার কিছু সদস্যকে মন্দিরের ভাণ্ডারের দায়িত্বে থাকতে।

সামগ্রিকভাবে গ্রাম সভা মন্দির এবং অন্যান্য সংগঠনের ব্যবস্থাপনা বিষয়ে নিজেদের দায়িত্ব সুচারুরূপে পালন করত। এডায়ারপক্কম শিলালিপি সূত্রে এর একটা চমৎকার উদাহরণ পাচ্ছি। জনৈক ব্রাহ্মণ কন্যা গ্রামীনদের থেকে একখণ্ড জমি কেনেন মন্দিরের চিরকালীন সময়ের জন্যে প্রদীপ জ্বালাবার উদ্দেশ্যে। কিন্তু জমিটার সেচ ব্যবস্থা খুব একটা উন্নত না থাকায় গ্রামের কেউই এগিয়ে এল না জমিটি চাষ করার জন্যে। মন্দিরের প্রদীপ না জ্বলার কারনে মন্দিরের অছিরা গ্রামবাসীদের অনুরোধ করল মহিলার থেকে জমিটা নিজেদের ব্যবস্থাপনায় ফিরিয়ে নিতে এবং জমির বদলে নির্দিষ্ট পরিমান গরু দান করতে যাতে মন্দিরের প্রদীপ জ্বলতে পারে। এরপরে প্রদীপ জ্বলতে শুরু করল।

যদিও নিয়মিত নয়, মাঝেমধ্যেই গ্রাম সভা মন্দিরের অধিকারে থাকা জমির রাজস্বের হার কমিয়ে দিত এবং কখনো তাদের থেকে বকেয়া বরাদ্দও মকুব করে দিত। চোল সাম্রাজ্যের একটি শিলালেখ থেকে আমরা পাচ্ছি মন্দিরের অধিকারে থাকা কোনও সম্পত্তির ওপরেই রাজস্ব ধার্য করা যাবে না।

গ্রাম সভা মন্দিরে মালা এবং অন্যান্য কিছু সরবরাহ করার জন্যে জমি অনুদান দিত। তাছাড়া স্থানীয় মন্দিরে প্রদীপ জ্বালাবার জন্যে, স্তব পাঠ করার সুযোগ সুবিধেও করে দিত। আমরা বেশ কিছু উদাহরণ পেয়েছি যেখানে গ্রাম সভা মন্দিরে নানান ধরণের পুজোসহ অন্যান্য সেবা দেওয়ার জন্যে নিজে জমি দান করত অথবা অন্যান্যদের এই কাজ করতে সাহায্য করত।

গ্রাম সভা শিক্ষা এবং অন্যান্য দাতব্য বা অধিকাংশ সময় স্থানীয় মন্দিরের নানান সেবা করার জন্যে সুযোগ সুবিধে করে দিত। ১০২৫ খ্রিঃতে রাজেন্দ্র চোলের রাজত্বে একটা চমকপ্রদ উদাহরণ পাচ্ছি একটি শিলালেখতে। রাজার সাফল্যে জন্যে রাজারাজা-চতুর্বেদী-মঙ্গলম সভা রাজারাজা-ভিন্নাগর মন্দিরে থেকে বেদ শিক্ষার জন্যে একটি বিদ্যালয় স্থাপন করে — তার বিশদ নিচে উল্লিখত হল —

১। ৪ জনকে নিযুক্ত করা হবে মন্দিরে তিরুভায়মলি স্তব পাঠের জন্যে এবং তাদের জন্যে বরাদ্দ থাকবে ৩ কারুণি চাল প্রত্যেক দিনের জন্যে

২। মন্দিরের সঙ্গে জুড়ে থাকা মঠে ২৫ জন বৈষ্ণবের ক্ষুন্নিবৃত্তির জন্যে ১ ভেল্লি ৪ মা পরিয়ান জমি বরাদ্দ করা হল।

৩। ৬০ কলম ধান জমি এবং ৩ কালাঞ্জু সোনা বরাদ্দ করা হল ৭ দিনের আনি-আনুলম উৎসবে যোগ দিতে আসা ১,০০০ বৈষ্ণব এবং দাসের (ভক্ত) জন্যে —

৪। আধ ভেলি এবং ২ মা জমি আর কিছু সোনা দেওয়া হল রথে করে দেবতার গ্রাম প্রদক্ষিণের সময় দরিদ্রদের পরিধেয় দেওয়ার জন্যে, দেবতাকে বেশ পরাবার জন্যে, পুজো, মালা এবং স্নানের জন্যে আর কিছু অন্যান্য পুজোপাঠের জন্যে এই সব পড়ুয়াদের খাওয়ানো হবে —

ক। ঋগ্বেদ পাঠের জন্যে ৭৫ জন

খ। যজুর্বেদ পাঠের জন্যর ৭৫ জন

গ। ছন্দোগ-সাম পড়ার জন্যে ২০ জন

ঘ। তালবকরম-সাম পরার জন্যে ২০ জন

ঙ। বাজসেনেয় পাঠের জন্যে ২০ জন

চ। অথর্ব পাঠের জন্যে ১০ জন

ছ। বৌধায়নের গৃহ্যকল্প এবং গণ পাঠের জন্যে ১০ জন

ওপরে উল্লিখিত বেদ পাঠের জন্যে ২৩০ ব্রহ্মচারী, রূপাবতার পাঠের জন্যে ৪০ জন, সব মিলিয়ে ২৭০ জন। প্রত্যদিন প্রত্যেকের জন্যে ৬ নালি ধানি জমি বরাদ্দ করা হয় (Six nali of paddy was allotted for each of these per day)।

এছাড়াও —

জ। ব্যকরণ পাঠ নেবে ২৫ জন

ঝ। প্রভাকর পাঠ নেবে ৩৫ জন

ঞ। বেদান্ত পাঠ নেবে ১০ জন।

শেষ ৭০ জনের প্রত্যেকের জন্যে প্রতিদিন ১ কুরুনি ২ নাকি ধানী জমি বরাদ্দ করা হল।

১ কলম ধানী জমি বরাদ করা হল ব্যকরণবিদ নাম্বির উদেশ্যে, ১ কলম জমি বরাদ্দ করা হল প্রভাকর বিশেষজ্ঞর জন্যে এবং ১ কলম ১ তুণি বরাদ্দ হল বেদান্ত শক্ষক তৃতীয় জনের জন্যে।

১০ জন অধ্যাপককে বেদ পাঠের জন্যে নিয়োগ করা হল —

ঋগ্বেদের জন্যে ৩ জন

যজুর্বেদের জন্যে ৩ জন

ছান্দোগ্যের জন্যে ১ জন করে

তালবকর সামের জন্যে ১ জন

বাহজসনেয়র জন্যে ১ জন

বৈধায়নের গৃহ্য এবং কল্প এবং কথকের জন্যে ১ জন করে

উল্লিখিত শিক্ষকদের জন্যে বিশদে বিদায় বরাদ্দ করা হল। মোটামুটি সামগ্রক শিক্ষা কাঠামোর জন্যে ৬১.৫ কালাঞ্জু সোনা এবং ধানী জমি বরাদ্দ হল। মন্দিরকে ৪৫ ভেলি জমি বরাদ্দ করা হল।

কিছু সময়ে অন্যান্যদের তৈরি দাতব্য সংগঠন ব্যবস্থাপনা করত গ্রাম সভা। রাজা রাজেন্দ্র চোলের স্বাস্থ্য কামনায় জনৈক সেনাপতির স্থাপিত মন্দিরের নানান দান সেবারমূলক কাজের জন্যে ত্রিভূবন-মহাদেবী-চতুর্বেদীমঙ্গলম সভা জমি কিনছে। বাৎসরিক ভাড়া হল ১২০০০ কলম ধানওয়ালা ৭২ ভেলি ফসলি জমি কেনা হচ্ছে নিম্নলিখিত উদ্দেশ্যে

১। রাজকীয়ভাবে পুজো এবং নৈবেদ্য দেওয়ার জন্যে

২। বৈষ্ণবদের সেবার জন্যে উৎসব আয়োজন করতে

৩। ১২ জন বৈদিক শিক্ষকের খাওয়ার ব্যবস্থা করতে

৪। অন্যান্য বিষয়ের ৭ শিক্ষকের খাওয়ার ব্যবস্থা করতে

৫। ১৯০ বৈদিক ছাত্রকে খাওয়ার ব্যবস্থা করতে

৬। ৭০ অন্যান্য ছাত্রকে খাওয়ার ব্যবস্থা করতে

তিনটে নির্দিষ্ট রাজস্ব ছাড়া জমিতে অন্য কোনও রাজস্ব ধরা হিয় নি। ছাত্র এবং শিক্ষকদের রাজস্ব দেওয়া এবং অন্যান্য দায় থেকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে।

একটি খাদ্য সরবরাহ করা সংগঠনের দান জোগাড়ের জন্যে গ্রাম সভা জমি বিক্রি করার উদাহরণ রয়েছে। এই ধরণের অনেক উদাহরণ দেওয়াই যায়, কিন্তু ওপরে যে সব উদাহরণ আমরা ব্যবহার করেছি তাতে গ্রাম সভার দান কর্মের বেশ কিছু সদর্থক উদাহরণ ফুটে উঠেছে।

ষোল

গ্রাম সভা যে গ্রামের সুরক্ষার জন্যে দায়ি, এই উদাহরণটা তিরুপ্পুতুরের দুটো শিলালেখয় স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। যতদূর সম্ভব দক্ষিণ ভারতে তাদের প্রথম অভিযানে মুসলমানেরা একদা একটি গ্রামের মন্দির দখল নিয়েছিল। গ্রামের অধিবাসীরা এ বিষয়টি নিয়ে বেশ কিছুটা অস্থির হয়েছিল। এই সময় জনৈক বিশালয়দেব মন্দিরটি নতুন করে তৈরি করে দেয় এবং গ্রামের অধবাসীদের নৈতিক এবং ধার্মিক পতন থেকে বাঁচায়। গ্রামীনেরা স্বতঃস্ফূর্ত ইচ্ছেয় বিশালয়দেবকে সমান জানানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রত্যেক ব্যক্তির চাষ করা নির্দিষ্ট পরিমান দানাশস্য দান করার সিদ্ধান্ত নেয় এবং তাকে মন্দিরে বিশেষ সুবিধেও দেওয়া হয়। দুবছর আগের আরেকটি শিলালেখতে জানা যায় তিরুপ্পুতুরের গ্রাম সভা জনৈক মহাদেবচক্রবর্তীনকে পাডিক্কাভাল পদে নিয়োগ করে। যতদূরসম্ভব শব্দটার অর্থ হল গ্রাম সুরক্ষক। হয়ত মুসলমানেদের আক্রমনের ভয়ে গ্রাম সভাগুলি এই সিদ্ধান্ত নেওয়া শুরু করে।

৯ শত থেকে ১৭ শতাব্দ পর্যন্ত সময় ধরে মাদাকাসিরা তালুক থেকে বেশ কিছু সংখ্যক শিলালেখ পাওয়া গিয়েছে যেখানে গ্রামের বীর আর দেশভক্তদের বিশেষভাবে সম্মান জানানো হয়েছে। কয়েকটি শিলালেখ খুবই উল্লেখযোগ্য। দুটি বা তিনটি বিধ্বংসী যুদ্ধে সফলভাবে গ্রাম রক্ষার জন্যে হারাতির গ্রাম প্রধান কয়েকজনকে জমি দান করছেন। ৯৬৬ এরিগায় আয়াপ্পাদেবের জনৈক ভক্ত চোল বাহিনীর বিরুদ্ধে বীরত্বমূলক লড়াই করেছিলেন, পেনজেরুর বাসিন্দারা তাকে সম্মান জানায়। আরও কিছু রক্ত ঝরিয়ে সমাজ/গ্রাম বাঁচানোর ঘটনায় বেশ কিছু জায়গায় জমি দান করার তথ্য পাওয়া গিয়েছে। মারুদাদুতে পাওয়া এক শিলালেখতে জানা যাচ্ছে, প্রথম রাজারাজার রাজত্বের অষ্টম বছরে কালিপ্পেরুমান গ্রাম সুরক্ষার জন্যে তার জোবন দান করেন। শহীদের সম্মানে গ্রামীণেরা মন্দিরে একটি প্রদীপ দান করেন।

তিরুমেয়নানাম শিলালেখতে সমাজের সমবায়িক চরিত্রের উদাহরণ পাওয়া যাচ্ছে। নালুর গ্রামের বাসিন্দারা তেঁতুল গাছের নিচে সম্মিলিত হয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে তারা কেউই গ্রামের এবং তিরুমেয়নানাম মন্দির সহ অন্যান্য একই ধরণের সংগঠনের স্বার্থবিরোধী কাজ করবে না। যদি কেউ করে তাদের তাদের গ্রামদোষীণ এবং যারা গ্রামের এই যৌথ সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করবেন তারা শিব দেবতার পা ছুঁতে পারবেন না।

গ্রামের সমবায়িক চরিত্র শত্রুপক্ষের রাজাও স্বীকার করেছিল। কুম্ভকোনাম শিলালেখ আমাদের জানাচ্ছে প্রথম পরান্তক মাদুরা দখল করে কুম্ভকোনাম গ্রাম সভার সদস্যদের ওপরে ৩,০০০ কালাঞ্জক সোনা জরিমানা চাপিয়ে দিলেন এবং তারা এই সম্পদ দিতে রাজিও হয়ে গেল। রাজা প্রথম কুলশেখরের রাক্ত্বের ৩৬ তম বছরে তিরুপাট্টুরের একটি শিলালেখতে জনৈক বাল্লুবনদালবনের একটি গ্রাম দখলের বর্ণনা আছে। আক্রমনকারী গ্রাম সভা এবং দুজন ব্যক্তিকে আত্মসমর্পণের প্রস্তাব দিতে বলে। তারা অস্বীকার করে এবং অনেকে গ্রাম ছেড়ে চলে যায়। আক্রমনকারী তার শর্ত মানিয়ে নিতে উল্লিখিত দুই ব্যক্তিকে মন্দিরে বন্দী করে রাখে। পরে রাজার হস্তক্ষেপে বিষয়টি মিটমাট হয়। তবে এই ঘটনা থেকে প্রমান করা যায় গ্রামের সমবায়িক চরিত্র। এই জন্যে আক্রমনকারী গ্রাম সভার সঙ্গে প্রথমেই তার শর্ত মানিয়ে নিতে চাপ দিতে থাকে। শত্রুই হোক বা বন্ধু সে সময়ের গ্রামের চরিত্রটাই এমন ছিল যে গ্রাম সভাকে এড়িয়ে কোনও কাজই করা যেত না। (চলবে)

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev