দ্বিতীয় অধ্যায়
রাজনীতিতে ব্যবসায়িক সংগঠন
সতেরো
দক্ষিণ ভারতে ঘণবদ্ধভাবে সংগঠিত সমবায়িক গ্রাম সভার সমবায়িক চরিত্র উল্লেখের পাশাপাশি আরেকটা বিষয় উল্লেখ করা দরকার, সেটি হল কীভাবে বৃহত্তর ক্ষেত্রে জনগনের নিজেদের মধ্যে নানান সময়ে নানান ঘটনায় সমবায়িক চরিত্রের প্রকাশ ঘটেছে। পল্লব রাজত্বের একটি শিলালেখতে পাচ্ছি, অভিনানি নদীর উত্তরের এবং পেন্নাই নদীর দক্ষিণে একটি গ্রামের অধিবাসীদের মধ্যে ঐক্যমত্য তৈরির চুক্তিপত্র তৈরির বৈঠক হয়। মহান জেলা সভার বৈঠকটি হয় রাজকীয় প্রাসাদে ৮টা জেলার ১৬ প্রতিনিধিকে নিয়ে। অধিকাংশ সময়ে কোনও কৌমের সমবায়িক চরিত্র গঠিত হয় সাধারণত এক ধর্মের ছাতার তলায় থাকার ফলে। একটা উদাহরণ দেওয়া যাক। প্রথম কুলতুঙ্গর (১০০৫-০৬) রাজত্বের কুডুমিয়ামালাই শিলালেখতে রাত্তাপাদিকোণ্ডা-চোল-ভালানাদু (আজকের পুডুকোট্টাই জেলার অধিকাংশ অঞ্চল) অঞ্চলের অধিবাসীরা দুই ব্যক্তির সঙ্গে (যতদূরসম্ভব ব্রাহ্মণ) চুক্তি করে যে জেলায় যত পান পাতা আসবে তাতে দালালি শুল্ক চাপবে এবং এই কাজের ফল হিসেবে বাতসরিকভাবে ৩০,০০০ সুপুরি আর ৭৫০ গাঁট পান একটি মন্দিরকে দান করতে হবে। জেলার অধিবাসী এবং ৫০০ জন চরিত্রে দাগহীন ব্যক্তি (padai) এই চুক্তি ব্যবস্থাপনা করার জন্যে নিযুক্ত হল।
এই ধরণের একজোট হয়ে নির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত নেওয়ার আরও কিছু উদাহরণ পাচ্ছি। কামারাসাভাল্লি শিলালেখয় জটাবর্মন বীরপাণ্ড্যর রাজত্বের ১০ম বছরে পঞ্জিকৃত হওয়া ১৮টি সাবডিভিসনের ৭৯ জেলার বাসিন্দা জড়ো হয়ে নিজেদের ব্যবসার উদ্বৃত্ত জড়ো করে, মন্দির সারাই করার খরচ হিসেবে ব্যয় করার সিদ্ধান্ত নেয়।
এরকম আরও কিছু তথ্য পাওয়া যায়। মানাগলি শিলালেখ সূত্রে আমরা জানতে পারি, আয়াভোলের ৫০০ স্বামী, মানিমাগাবল্লির ৫০০ মহাজন, মালবোঝাইএর কাজ করা স্থানীয় শেট্টিরা, নাকারারা, পান ব্যবসায়ি গাত্রিগারা, কলুদের শ্রেণী সংঘ, থারদাবাদির ময়দা এবং চার্নিং স্টিক বিক্রেতারা এবং বহু জেলার গাভারিরা, মুম্মুরিদান্দা এবং ৮ জেলার ১৬ জন একযোগে মিলিত হয়ে স্থানীয় মন্দিরে নানান সেবা আর প্রথাগত ধর্মীয় আচার খরচ তোলার ব্যবস্থা করেন। হয়সালা বীর ভাল্লালার সময়ের একটি শিলালেখতে পাচ্ছি এলুগারানি-নাদুর বাসিন্দারা মন্দিরের চাহিদা পূরণে জমি দান করছে। রাজেন্দ্র চোলের শিলালেখ থেকে আমরা জানতে পারছি তিনটি জেলার অধিবাসীরা মন্দিরের এক সেবককে এক খণ্ড জমি লিজে দিয়েছিলেন। প্রথম পরন্তকএর সময়ের শিলালিপি আমাদের জানাচ্ছে জেলার মানুষেরা নির্দিষ্ট একটি মন্দিরে ভোগ আর পুজার্চনার জন্যে মূল্য দান করেছিলেন। দানটি ছিল এরকম প্রতি ভাড়াটে থেকে ০.৫ পনম, প্রতি বিবাহ অনুষ্ঠানের থেকে ০.৩৩ পানম এবং প্রতিটি নববিবাহিত বরের থেকে একই মূল্য ০.৩৩ পানম। আরেকটি শিলালেখতে একটি জেলার বাসিন্দাদের মধ্যে সম্পাদিত চুক্তি উল্লেখ করে বলা হচ্ছে তারা মণ্ডপে মিলিত হয়ে প্রতি গ্রাম থেকে ১ মাডাই দান গ্রহণ করে বন্যার সময় মন্দিরের ক্ষতি রুখতে একটি বাঁধ তৈরি করবেন।
কিন্তু ধর্মীয় যোগ ছাড়া অন্যান্য উদ্দেশ্যেও একই ধরণের সমবায়িক উদ্যম নেওয়ার উদাহরণ পাচ্ছি। রাজা জটা বর্মণ সুন্দর পাণ্ড্য ১২ তম রাজত্ব বছরে এক শিলালিপিতে জানাচ্ছেন ইরান্ডুমালাই-নাডুর গ্রাম প্রধানেরা কুন্নান্দারকোইলির গ্রাম-প্রধানকে আশ্বাস দিয়ে বলছেন, তারা একে অপরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করলেও, তাদের নিরাপত্তা বলয়ে থাকা সাধারণ চাষী, সাধারণ নাগরিক এবং ভ্রমণকারীদের ক্ষতি সাধন করা থেকে বিরত থাকবেন। এতদসত্ত্বেও যুদ্ধেরে সময় কোনও ব্যক্তি যদি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাহলে তাঁরা তাকে ১০০ পানম আর গ্রামের ক্ষতি হলে ৫০০ পানম ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে।
আরও একটা উদাহরণ তুলে দেওয়া গেল সমবায়িক সমাজগুলোর সংযোগমূলক চরিত্রের বৈচিত্রময় ঘটনাবলী বর্ণনা করার উদেশ্যে। থিরুকালাক্কুদির শিলালেখতে বলা হচ্ছে চার জেলার (নাড়ূ) বাসভূমির জনগণ পূণ্য ছাই গ্রহণ করার, ভগবানের রথের রশি টানার এবং তাঁকে পুজো করার এবং বিনায়কের সামনে নারকেল ভাঙার অধিকার অবাধে পালন করার জন্য চুক্তিবদ্ধ হল।
বীর পাণ্ড্য দেবের তামিল শিলালিপি সূত্রে জানা যাচ্ছে দুই জেলার অধিবাসী ঠিক করল যে ৪টি পরিবাকে নির্দিষ্ট কিছু দায় পালন করা থেকে মুক্তি দেওয়া হবে। আরেকটি শিলালিপি থেকে জানা যাচ্ছে একাম্বরথর প্রেসিডেন্সির ১৮টি ডিভিসনের বাসিন্দাদের বৈঠক ডাকা হয় নির্দিষ্ট একটি জমি বিষয়ে সমস্যা সমাধান করার জন্যে। অন্য একটি শিলালিপি সূত্রে জানা যাচ্ছে কৃষ্ণার উভয় তীরের ১৮টি জেলার নানান বাসিন্দা একযোগে বৈঠক করে ঠিক করে রাজস্ব হিসেবে প্রত্যেক নৌকো পিছু বড় ফানাম (fanam) শোধ করবে। আরেকটা শিলালিপি সূত্রে পাচ্ছি ১২টি গ্রামের বাসিন্দা অত্যধিক করাঘাতের দরুন গ্রাম ছেড়ে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলে, তাদের জন্যে রাজস্ব কম করা হয়।
এর আগে আমরা যখন গ্রাম সভার বিচার ক্ষমতার উদাহরণ দিচ্ছিলাম তখন বেশ কিছু সমবায়িক যৌথ উদ্যমের উদাহরণ পেশ করা গিয়েছে।
আঠার
আরও কিছু তথ্যসূত্রে জানতে পারা যায় যে কখনো কখনো এই সব সাময়িক সমবায়িক কাজকর্মের বড় ক্ষেত্রে আরও বড় উন্নত সমবায়িক কাজে রূপান্তরিত হত। নন্দিভরণমএর সময়ের উদয়েন্দিরম শিলালেখ সূত্রে দুটি গ্রাম সভা একত্রিত হওয়ার উদাহরণ পাচ্ছি। প্রথম পরন্তকের (১০ম শতে) ২৬তম রাজত্ব বছরে বলা হচ্ছে আমরা কাঞ্চিভায়েলির সভার [সদস্যরা] এবং আমরা উদয়-চন্দ্র-মঙ্গলমএর সভার [সদস্যরা নিম্নলিখিত বিষয়ে একমত হয়ে ঘোষণা করছি] আমরা এই দুই গ্রাম [বাসিন্দা] মিললাম [এবং] এক হলাম, এখনকার সময় [তারিখ] থেকে এই দুটি গ্রাম একটিমাত্র গ্রাম হিসেবে শ্রীবৃদ্ধিলাভ করবে।
সমগ্র জেলাটি একটি সংগঠন হিসেবে গণ্য হওয়ার উদাহরণ পাচ্ছি তিরুভরনগুলাম মন্দিরের শিলালেখ থেকে তৃতীয় কুলতুঙ্গর রাজত্বে। উপদ্রুত দেশের অস্থির অবস্থায় রাজ্য হিসেবে একটি সাব-ডিভিসন ভাল্লানাদু গ্রাম সভার সদস্য এবং অধিবাসীরা ঘোষণা করল পবিত্র তিরুভরনগুলাম গ্রাম এবং [এর মধ্যের] দেবদান গ্রামের চার সীমান্তের মধ্যে বাস করা চাষীদের নিরাপত্তা বিধান করা হবে। এই নিরাপত্তাবিধানের মধ্যেও যদি দেখা যায় এর কোনও সভায় [অঞ্চলে] ডাকাতি বা চুরি হয়, গরু দখল নেওয়ার ঘটনা ঘটে অথবা চাষীদের ক্ষতি হয় অথবা অন্যান্য দুষ্কর্ম ঘটে, তাহলে এই কাজের জরিমানা হিসেবে, উক্ত সভা, দুই ‘মা’ অঙ্কের চাষের জমি মন্দিরকে দান করতে বাধ্য থাকবে। একটি শিলালেখতে, জেলা সমিতির সামন্ত (samantas) এবং হাগগাডিদের [haggades প্রধান?] নামোল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়াও নানান শিলালেখয় ‘জেলাগুলোর নির্দোষ ৫০০টি’ এবং ‘জেলাগুলির প্রধান’ এই সব শব্দবন্ধ ব্যবহার করা হয়েছে। এই সব তথ্য থেকে মনে হয় কিছু কিছু সাবডিভিশন বা জেলায় বা বিশাল সংখ্যক জনগণের মধ্যে নির্দিষ্ট স্থায়ী সংগঠন তৈরি হয়েছিল। এই ইঙ্গিতটি দ্বিতীয় পৃথিবীপতির সময়ের উদয়েন্দিরাম শিলালিপি থেকে পাওয়া তথ্যের সঙ্গে মিলে যায় ‘তদনুসারে জেলার [নাডু] [বাসিন্দারা] একসঙ্গে জড়ো হয়ে দান করা জমির সীমান্ত ঘুরে দেখলাম’। এই ঘটনায় যেহেতু সমগ্র জেলার সব বাসিন্দার পক্ষে একজোট হয়ে যোগ দেওয়া অবাস্তব, তাই ধরে নিতে পারি, জেলার নানান প্রান্ত থেকে আসা জনগণের প্রতিনিধিরা মিলিত হয়। রাজারাজা চোলের একটি শিলালেখতে ১২টি নাডুর ১২ মহাপ্রধানের বৈঠকের সংবাদ পাছি। পশ্চিম চালুক্য রাজা ত্রিভূবনমল্লর সময়ে একটি শিলালিপিতে বিভিন্ন অঞ্চলের ৩২,০০০ প্রতিনিধির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এই সব উল্লেখ থেকে আমরা দ্বিধাহীনভাবে বড় সমবায়িক সংগঠনের অস্তিত্বের কথা আন্দাজ করতে পারি, যদিও তাদের সত্যকারের চরিত্র সম্বন্ধে আন্দাজ করা খুবই কঠিন কাজ।
উনিশ
উপসংহারে এই সব দক্ষিণ ভারতীয় সংগঠনের প্রাচীনতা এবং বিস্তৃতি সম্বন্ধে কিছু প্রাসঙ্গিক কথা বলা দরকার। পল্লব রাজা নন্দীবর্মনের সময়ের কাসাকুদি শিলালেখ সূত্রে গ্রামে কোনও এক প্রকার স্থায়ি সংগঠনের অস্তিত্বের কথা আন্দাজ করতে পারি, না হলে স্থানীয় বাসিন্দাদের কথা উল্লেখ না থাকা জমি দান বিষয়ক রাজকীয় নির্দেশ জারি করা অসম্ভব হত। নন্দীবর্মনের আবির্ভাব ঘটেছিল অষ্টম শতের প্রথম পাদে, এটাই গ্রাম সভার অস্তিত্বের প্রাচীনতম লিখিত উল্লেখ। নবম শতের দুটি উক্কল শিলালেখ একটি কম্পবর্মণ এবং অন্যটি বরগুণার [বিক্রমাদিত্য] সময়ের অম্বাসমুদ্র্মে আমরা গ্রাম সভার উল্লেখ পাচ্ছি। দশম শতে বিপুলভাবে চোল এবং পাণ্ড্য রাজত্বের এবং দ্বিতীয় চালুক্য ভীম রাজত্বে মুসলিপত্তনম সহ নানান শিলালেখয় এই ধরণের সংগঠনের অস্তিত্বের উল্লেখ পাচ্ছি। এরপরে আরও দক্ষিণে অর্থাৎ তামিল এবং তেলুগু দেশেও এই সভা বিস্তৃত হয়। মনে হয় সামগ্রিক দক্ষিণ ভারতে এই ধরণের সংগঠনের একটা জাল গড়ে উঠেছিল। চোল রাজা রাজারাজাদেব তাঞ্জোরে নির্দিষ্ট একটি মন্দিরের ব্যবস্থাপনা করার জন্যে উতকীর্ণ শিলালেখয় ২৬৬টি গ্রামের উল্লেখে এই ধরণের ব্যপ্ত সংগঠনের অস্তিত্বের উল্লেখ পাচ্ছি। এই উদাহরণ প্রমান করে এই সঙ্গঠনগুলো এই সময়ে দক্ষিণ ভারতের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ছড়িয়েছিল।
তৃতীয় অধ্যায়
রাজনৈতিক জীবনে সমবায়িক কাজকর্ম (২)
এক
এতক্ষণ আমরা একন একটা রাজনৈতিক পরিবেশের কথা আলোচনা করলাম, যেখানে জনগণ রাজার অধীনে বাস করেন। রাজকীয় কর্তৃত্ব চারিয়ে যায় নানান সভা সমিতি অন্যান্য সংগঠন এবং রাজ আধিকারিক মার্ফৎ এবং এরা সকলেই মোটামুটি রাজকীয় ক্ষমতার অধীনস্থ হিসেবেই কাজ করতেন। প্রাচীন ভারতে রাজানিরপেক্ষ রাজ্যও ছিল যেখানে আলোচ্য জনগণের সংগঠন আরও মুক্ত ছিল এবং তাদের পরিবেশও কাজের উপযোগী ছিল। দুঃখের বিষয় আমরা তাদের কাজকর্ম বিষয়ে খুব বেশি কিছুই জানি না। কিন্তু তাদের অস্তিত্ব প্রমান করে সে সময়ে সমাবায়িক সংঘ হিসেবে জনগণের সর্বোচ্চ ক্ষমতা নির্ঘোষের তথ্য। এর আগের অংশে আমরা একটি একচ্ছত্র রাজার অধীনে জনগনের সংঘের কাজকর্ম বর্ণনা করেছি। আমরা এবারে রাজা নিরপেক্ষ প্রজাতান্ত্রিক কাজকর্মের এবং সঙ্গঠনগুলোর চরিত্র বিষয়ে আলোচনা করব। এই আলোচনায় আমাদের রাষ্ট্রের সঙ্গে জুড়ে থাকা প্রশাসনের প্রত্যেকটি দপ্তর বিষয়ে জানতে হবে।
বহু বছর আগে অধ্যাপক রিজ ডেভিস বৌদ্ধ সাহিত্য থেকে ‘প্রজাতান্ত্রিক’ রাষ্ট্রের অস্তিত্বের স্বীকৃতি দিয়েছিলেন। তার পরে মডার্ন রিভিউর পাতায় শ্রী কে পি জয়সোয়াল এবং কালমাইকেল বক্তৃতায় অধ্যাপক ডি আর ভাণ্ডারকর বিশদে এই বিষয় নিয়ে গবেষণা করেছেন। যদিও এই পণ্ডিতদের যুক্তি অন্যান্য পণ্ডিতেরা সার্বিকভাবে গ্রহণ করেন নি, কিন্তু তারা সে সময় প্রাচীন ভারতে রাজা নিরপেক্ষ রাষ্ট্রের অস্তিত্বের পক্ষে যে যুক্তি সমূহ প্রচার করেছিলেন, সেগুলি ক্রমশ পণ্ডিত সমাজে গৃহীত হচ্ছে। আমরা প্রথম অধ্যায়ে ঠিক যেমন করে শ্রেণী সংঘ বিষয়ে যুক্তি সাজিয়েছিলাম, এখন সে রকম করে এই সব রাষ্ট্র চরিত্র বিশদে বোঝার চেষ্টা করব।
রাজানিরপেক্ষ সরকারের কাঠামো বিষয়ে আলোচনা করতে গিয়ে শুরুতেই একটা সহজ বিষয়ে মন্তব্য করা দরকার, এ ধরণের রাষ্ট্র ব্যবস্থা বৈদিক সময়ে অজানা ছিল না। জিমার ঋগ্বেদের নিম্নলিখিত স্তবে অভিজাতদের (oligarchical) তৈরি কাঠামো রাষ্ট্র ব্যবস্থার ইঙ্গিত পেয়েছেন (Bei dem die KrSuter zusammenkommen wie die Rajanah in der Samiti, der gilt fur geschickten Arzt, Krankheitvertreiber, DSmonenvernichter.” Alt-indische Leben, p. 176. Macdonell, however, interprets it differently and does not accept the conclusion of Zimmer although he thinks that this state of affairs is perfectly possible. V. 1, 11-216 বা Where the KrSuter come together like the Rajanah in the Samiti, who is considered a skillful doctor, disease banisher, dmon annihilator.” Alt-Indische Leben, p. 176. Macdonell, however, interprets it differently and does not accept the conclusion of Zimmer although he thinks that this state of affairs is perfectly possible. 1:11-216.) ‘রাজারা যেহেতু যৌথভাবে সমিতিতে মিলিত হন, তার সঙ্গে যে সব গাছপালা (ওষধি) একযোগে মিলিত হয়, যাদের চিকিতসক বলয়া হয়, যারা রোগ নিরাময় করে এবং দৈত্য নিধন করে’ [As the kings (rajanah) assemble together in the Samiti, the plants (oshadhi) gather together in him who is called a physician, one who heals disease and destroys demon]।
জিমার মনে করছেন এই শ্লোকে যে রাষ্ট্র ব্যবস্থার কথা ইঙ্গিত করা হয়েছে সেটি কোনওভাবেই জনৈক ক্ষমতাবানের দ্বারা শাসিত রাষ্ট্র ব্যবস্থা নয় বরং সেখানে রাজপরিবারের কয়েকজন মিলে শাসন করেন। রাজা নির্বাচন করা বিষয়ে অথর্ববেদের উপরে উল্লিখিত কিছু স্তবক উল্লেখ করে বলছেন উচ্চস্তরে রাজ পরিবারে প্রধানের পদের জন্যে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা হত। তিনি অথর্ববেদের I.9.3 স্তবক উল্লেখ করে বলছেন অগ্নির কাছে প্রার্থনা করে অন্যান্যদের (sajata) ওপর তার কর্তৃত্ব বজায় রাখার কথা বলা হত। অথর্ববেদের III.4.3এ সফল প্রার্থীর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে শেষ অবদি যেন তারা আমার অনুগামী হয়। রবং অথর্ববেদের IV.22.1-2-তে বলা হয়েছে ইন্দ্রের কাছে প্রার্থনা করা হচ্ছে গোষ্ঠীর প্রধান হিসেবে ক্ষত্রিয়কে বেছে নিতে এবং তাকে রাজা করতে আর রাজপরিবারের সর্বোচ্চ স্থা দিতে (Kshatranam, ক্ষত্রনম)। জিমার বলছেন প্রাচীন ভারতের অভিজাত শাসনের মত জার্মানীর চেরুস্কি গোষ্ঠীর (এরা প্রথমে রাজা উপাধি নিয়ে আরমিনিয়াস এবং তার আত্মীয়দের দ্বারা শাসিত হত। আরমিনিয়াস একা গোষ্ঠীপতি হতে চাইলে লড়াই শুরু হয় এবং তিনি হেরে যান) আদিবাসীদের মধ্যেও অভিজাত শাসন ছিল। জিমারের দৃষ্টভঙ্গী সম্পূর্ণ সমর্থন পাচ্ছে আবেস্তায়। এখানে অভিজাত শ্রেণীর শাসনের উদাহরণ পাওয়া যায়। এই বিষয়টি স্পষ্টভাবে দেখিয়েছেন স্পিগেল ইয়াস্না, ১৯, ১৮ থেকে (ড আই জে এস তারাপোরেওয়ালা এই স্তবকের আক্ষরিক অনুবাদ পাঠিয়েছেন (Who (are the five) leaders? (He) of the house, (he) of the street, (he) of the town, (he) of the country, (and) Zarathustra, the fifth, (is leader) of those countries which (are) different from those under Zoroastrian laws (lit. other than those ruled over by Zoroastrian laws). (The city of) Ragha belonging to Zarathustra is under four leaders. Who (are) its leaders? (He) of the house, (he) of the street, (he) of the town, (and) the fourth Zarathustra (Himself).”)) যেখানে দুই প্রদেশের শাসন ক্ষমতা তৈরি করা হয়। এই প্রদেশগুলোর একটিতে সার্বভৌম ক্ষমতা জরাথ্রুষ্ট ছাড়া পরিবার, রাস্তা এবং শহরের কয়েজন প্রধানের হাতে থাকে এবং সেখানে কোথাও দেশের [একজন] শাসকের কথা বলা নেই, যদিও সে সব কথা অন্যান্য জায়গায় উল্লিখিত হয়েছে।
শ্রী কে পি জয়সোয়াল ১৯১৩-র মডার্ন রিভিউ-এর ৫৩৭ পাতার একটি প্রবন্ধে বৈদিক যুগে আরও একটি অরাজকীয় সরকারি কাঠামোর কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন। তিনি লিখছেন ঐতরেয় ব্রাহ্মণে (VII.3.14) বলা হচ্ছে উত্তর কুরু এবং উত্তর মাদ্রাজ অঞ্চলের জনগণ শাসনের জন্যে শুচি হিসেবে গণ্য হত এবং এই সঙ্গঠনকে ‘বৈরাজ্য’ (Vairajya) বা রাজা হীন রাষ্ট্র বলা হয়।
এই দৃষ্টিভঙ্গীর বিরোধে দুটো বিষয় উল্লেখ করা যাক। ঐতরেয় ব্রাহ্মণের একই স্তবকে দুটি আদিবাসী গোষ্ঠীকে হিমালয়ের বাইরের (parena Himavantam পারেনা হিমবন্তম) অঞ্চলের বলা হয়েছে, ফলে একে কখনোই ভারতবর্ষীয় রাষ্ট্র ব্যবস্থার উদাহরণ হিসেবে গণ্য করা যাবে না। তবে জিমার বলেছেন এই দুই আদিবাসী গোষ্ঠী ভারতীয়, কাশ্মীর এবং তার প্রতিবেশী অঞ্চলের; তবে যদি এরা মধ্যদেশ কাশ্মীরে বাস করে তাহলে তারা অবশ্যই পারেনা হিমবন্তম অঞ্চলের আদিবাসী হতে পারে।
দ্বিতীয়ত কে পি জয়সোয়াল বৈরাজ্যকে জনগণ চালিত ‘রাজাহীন রাষ্ট্র’ রূপে অভিহিত করেছেন। ম্যাকডোনেল এবং কিথ একে কোনও এক ধরণের রাজকীয় কর্তৃত্ব হিসেবে গণ্য করেছেন। তবে এটা সম্ভব নাও হতে পারে যদি আমরা সঙ্গে চারটি স্তবকে উল্লিখিত চার দিকের চারটি সরকারি কাঠামো বিষয়ে আলোচনা করি —

শেষ বাক্যে রাজানঃ শব্দকে জনপদাঃ শব্দে প্রতিস্থাপন শুধুই আকস্মিক হিসেবে উড়িয়ে দিতে পারি না; আমরা স্পষ্টভাবে কে পি জয়সোয়ালের গণতান্ত্রিক কাঠামো সরকারের বক্তব্যকেই মান্যতা দিলাম।
অথর্ব বেদের V.18.10 এই স্তবটি, বৈদিক সময়ের অরাজন্য মূলক সরকারের ধারণার অকাট্য দলিল। ব্রাহ্মণের গরু হত্যা নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা চলে এবং আমরা শুনি —

হুইটনি অনুবাদ করছেন’ They that ruled, a thousand, and were ten hundreds, those Yaitahavyas, having devoured the cow of the Brahman, perished.” (W. A. V., p. 251.)
আবার জিমার, মুইর একটু আলাদা অন্বয় করছেন ‘The descendants of Vitahavya, who ruled over a thousand men, and were ten hundred in number, were overwhelmed after they had eaten a Brahman’s cow.” (Muir S. T. I. 285.)
পার্থক্য যাই থাকুক না কেন মূল ধারণাটি হল সংখ্যায় ১০০০ বৈতব্য (Vaitahavyas) ওই অঞ্চল শাসন করত এবং এই অঞ্চলে অভিজাতীয় শাসনের একটা নমুনা পেলাম (আমরা যদি জিমার আর মুইরের অনুবাদকে গ্রহণও করি যে ১,০০০ জন ১,০০০ জনকে শাসন করছেন, তাহলেও স্বীকার করে নিতে হবে সরকারের কাঠামোটি প্রজাতান্ত্রিক)।
এখানে মাথায় রাখা জরুরি পরের দিকে অরাজণ্যবর্গীয় গোষ্ঠীগুলি কিন্তু ব্রাহ্মণ্যবাদ বিরোধী ছিল। (চলবে)