তৃতীয় অধ্যায়
রাজনৈতিক জীবনে সমবায়িক কাজকর্ম
দুই
বেদ যুগের পরের সময়েও প্রজাতান্ত্রিক সরকার কাঠামোর বেশ কিছু উদাহরণ আমরা পাচ্ছি। সব থেকে পুরোনো উদাহরণটি পাণিনির ব্যাকরণ লেখার সময়কালের। তাঁর লেখাতে সমবায়িক রাজনীতির উপস্থিতির ইঙ্গিত স্পষ্টভাবে আছে।

এই সূত্র থেকে আমরা আন্দাজ করতে পারি, সে যুগে সরকারের সমবায়িক চরিত্র মানুষের কাছে সম্পূর্ণভাবে জ্ঞাত ছিল। এখানে যে সংঘের কথা বলা হয়েছে সেটি যে শুধু মানুষের কয়েকটি দলের একজোট হওয়া নয়, এই সংঘের আইনি এবং সাংবিধানিক ভিত্তি রয়েছে।
অধ্যাপক ডি আর ভাণ্ডারকর কারমাইকেল বক্তৃতামালায় দেখিয়েছেন আরেকটি সূত্র থেকে একই সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারি যে সংঘ শুধুই সংঘট শব্দের প্রতিরূপ নয়, এটা গণ অর্থাৎ বিশেষ চরিত্রের জোটবদ্ধতা বা সমবায়িক সংঘ। তাছাড়া কে পি জয়সোয়াল পাণীনির যে সূত্র উদ্ধৃত করেছেন সংঘ=অঙ্কলক্ষ্মণেশভ=অন-ইয়ান-ইনাম=অন অর্থাৎ an-suffix takes place in nouns ending in an, yan, an in the case of (i.e.y to denote) ahkas and lakshanas of sanghas, সেটা শুধু যে সংঘের অস্তিত্বেরই প্রমান নয়, সংঘের অঙ্ক (anka) এবং লক্ষ্মণ (lakshana,) উভয় বর্তমান, পরে যাকে কে পি জয়সোয়াল লছছন (lahchchhana) বা হেরাল্ডিক ক্রেস্ট (heraldic Crest) অথবা অগ্রবর্তী কুলচিহ্ন হিসেবে গণ্য করেছেন।
নানান সূত্রতে পাণিনী নানান ধরণের সমবায়িক সংঘের নাম করছেন যেমন পুগ (puga), ব্রত (Vrata), আয়ুধজীবিসংঘ (ayiidhajlmsamgha)। পুগএর ধারণা আগে আমরা আলোচনা কপরেছি। ব্রতের মূল মানে আজ আর খুঁজে বার করা সমস্যাজনক। এর পরিতোষজনক ব্যাখ্যা পাছি না। কষিক (Kasika) টিকায় বলা হয়েছে —

(Vrata is a corporation (of people), belonging to different castes, having no definite means of livelihood, and living by means of slaughter or killing)। প্রথম কোয়ালিফায়িং ফ্রেজটি এই উক্তিকে সামাজিক সমবায় (social corporations) থেকে পার্থক্য করেছে এবং দ্বিতীয় কোয়ালিফায়িং ফ্রেজটি একে উতপাদন সংক্রান্ত সমবায় (industrial corporations) থেকেও পার্থক্য করেছে। তৃতীয় শব্দবন্ধটির আমি মানে করেছি ‘living by means of slaughter or killing’। এই মানেটিকে ধরে যদি ব্রতর উৎস খুঁজতে হয় তাহলে এর মানে দাঁড়ায় [আজকের দিনের] চোর, ডাকাত, লুঠেরাদের সংগঠন। কাত্যায়নের লেখা স্তবক —

(ব্রত হল এমন এক ধরণের মানুষের সংঘ যাদের হাতে এরিয়াস arious অস্ত্র বর্তমান। যেহেতু উতসেধ (utsedha)-র আরেকটি অর্থ ‘দেহ’ উতসেধজীবন অর্থ হতেই পারে নানান ধরণের খেটেখাওয়া মানুষের সংঘ) এই অর্থটিকে পুষ্ট করে। আয়ুদ্ধজীবিসংঘ (ayudhajivisamgha)-র অর্থ হল সেনানীদের সংগঠন। পাণিনী V.3, 117 থেকে পরিষ্কার যৌধেয়রা এই বিভাগে অন্তর্ভূক্ত সমাজ। যৌধেয়দের ইতিহাস আমরা পরে আরও বিশদে আলোচনা করব, কিন্তু এই শব্দগুলি আমাদের বুঝতে সাহায্য করে আয়ুদ্ধজীবিসংঘ’র অর্থ হল স্বাধীন রাজনৈতিক, রাজানিরপেক্ষ সংগঠন।
তিন
ধারণাটি প্রমানে আমারা আরও কিছুদূর এগোব। পরের সূত্রগুলো সংগ্রহ করব বৌদ্ধ, জৈন সাহিত্য আর শাস্ত্র থেকে। রাজণ্যশাসিত রাজ্যগুলোর পাশাপাশি অরাজন্যবর্গীয় গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক কাঠামো অস্তিত্বের অকাট্য প্রমান পাচ্ছি অবদান শতকএ(Avadana Sataka)। ৮৮ সংখ্যক অবদানে বলা হচ্ছে, মধ্যে দেশের [মধ্য ভারতের] কিছু শ্রেষ্ঠী দক্ষিণ [আমরা যাবে দাক্ষিণাত্য বলি] ভ্রমণে গেলে তাদের রাষ্ট্র ব্যবস্থা সম্বন্ধে প্রশ্ন করা হয়; তাদের উত্তর ছিল ‘কিছু রাজ্য রাজারা শাসন করেন, কিছু গণ (ganas) শাসনাধীন

প্রাচীন শাস্ত্র জৈন আচারঙ্গ সুত্ত Jaina Ayaramga-Sutta গণ রাজ্যের কথা বলা হয়েছে।
গৌতম বুদ্ধের সময়ে বৌদ্ধ লেখকদের সূত্রে গণরাজ্যগুলির তালিকা তৈরি করেছেন অধ্যাপক রিজ ডেভিস
১। কপিলাবস্তুর শাক্য সমাজ (The Sakyas of Kapilavastu)
২। সুমসুমারা পাহাড়ের ভাগ্য সমাজ (The Bhaggas of Sumsumara Hill)
৩। অল্লকাপ্প’র বুলি সমাজ (The Bulis of Allakappa)
৪। কেশপুত্তর কল্মশ সমাজ (Kalamas of Kesaputta)
৫। রাম-গমের কোলিয় সমাজ (The Koliyas of Rama-gama)
৬। কুশিনরের মল্ল সমাজ (The Mallas of Kusinara)
৭। পাবার মল্ল সমাজ (The Mallas of Pava)
৮। পিফালিবনের মৌর্যরা (The Moriyas of Pipphalivana)
৯। মিথিলার বিদেহ সমাজ (The Videhas of Mithila)
এবং ১০। বৈশালীর লিচ্ছবী (The Lichchhavis of Vesali)
৯ এবং ১০ দুয়ে মিলে ভজ্জিয়ন (Vajjins)।
ওপরের সব কটি সমাজই যে রাজা নিরপেক্ষ রাজনৈতিক ব্যবস্থা, সে তথ্য আজ আমরা সকলেই প্রায় নিঃসন্দেহ। কিন্তু স্মস্যা হল, প্রায় কোনও জনপদ বা সমাজেরই সংবিধান আমাদের জানা নেই। মহাপরিনিব্বানসুত্তের বুদ্ধদেবের একটি উক্তি বহুল ব্যবহৃত। তিনি মন্তব্য করেন ভজ্জিরা ধ্বংসের দিকে না গিয়ে কীভাবে বিকাশের পথে যেতে পারে তার রূপরেখা। এই বক্তব্যের মর্মবস্তুটি আজ সাধারণভাবে ভাজ্জিয় সমাজের সংবিধান হিসেবে মান্যতা পেয়েছে। বুদ্ধ যখন রাজগৃহে অবস্থান করছিলেন, মগধের রাজা অজাতশত্রু ভজ্জিদের ধ্বংস করার উদ্যম গ্রহণ করেন। এই কাজে তিনি বুদ্ধের আশীর্বাদ আর পরামর্শ চাইতে প্রধানমন্ত্রীকে পাঠান। বুদ্ধ মন্ত্রীর বক্তব্য শুনে আনন্দকে প্রশ্ন করলেন ‘হে আনন্দ, তুমি কী জান আনন্দ, ভজ্জীয়রা আজও বড় আকারের এবং নিয়মিত গণবৈঠক আয়োজন করে?’
‘ভগবন, আমি সেটাই শুনেছি’ জানাল আনন্দ। বুদ্ধ উত্তর দিলেন ‘যতদিন ভজ্জিরা বড়ভাবে এবং নিয়মিত গণবৈঠক আয়োজন করতে পারবে, ততদিন তারা পতনের পথে না গিয়ে উন্নতির পথে যাবে’।
এইভাবে তিনি একে একে আনন্দকে প্রশ্ন করতে থাকেন আর আনন্দ তার জ্ঞান মত উত্তর দিতে থাকেন। আদতে বুদ্ধ তাঁর কথা আনন্দর মুখ থেকে বলিয়ে নিচ্ছিলেন। তিনি ভজ্জিয় মৈত্রী সংঘর (কনফেডারেসি) উন্নতির জন্যে আরও কতগুলি পরামর্শ দেন ‘So long, Ananda, as the Vajjians meet together in concord, and carry out their undertakings in concord—so long as they enact nothing not already established, abrogate nothing that has been already enacted, and act in accordance with the ancient institutions of the Yajjians as establislied in former days—so long as they honour and esteem and revere and support the Yajjian elders, and hold it a point of duty to hearken to their words so long may the Vajjians be expected not to decline but to prosper.
এখানে স্পষ্টভাবে গণতান্ত্রিক সংগঠনের উতকর্ষ এবং ত্রুটিগুলি স্পষ্টভাবে বুদ্ধের বয়ানে উঠে এসেছে। ভজ্জিয়দের একদিকে আছে সাধারণ সভা, যেখানে যুবা এবং বৃদ্ধ উভয়েরই আলোচনায় স্থান পায়। সাধারণ সভা রাষ্ট্র পরিচালনায় প্রধান ভূমিকা পালন করে, নতুন আইন প্রণয়ন করে, পুরোনো আইন বাতিল করে। অন্যদিকে সাধারণ সভার শক্তিশালী রাজতন্ত্রের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ, স্থায়িত্ব চায়, আমূল কাঠামোগত পরিবর্তন চায়, যা তাদের ধ্বংসের অন্যতম কারন হয়ে ওঠার বীজ বপন করে। তবুও তাদের সংবিধানকে সদর্থকভাবে দেখা হত, এবং সেটি ভগবান বুদ্ধের তারিফও কুড়িয়েছে। একইভাবে লিচ্ছবিদের বিষয়ে তিনি বললেন O brethren, let those of the brethren who have never seen the Tavatimsa gods, gaze upon this assembly (parisam) of the Lichchhavis, behold this assembly of the Lichchhavis, compare this assembly of the Lichchhavis even as an assembly of Tavatimsa gods.
মহান বুদ্ধ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান প্রচারক। তিনি যে ধর্মব্যবস্থা প্রচলন করেন সেখানে তিনি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রণয়ন করেন, সেই শিক্ষা তিনি ভজ্জিয়দের দিলেন। এবং বললেন যে শর্ত ওপরে আমরা উল্লেখ করেছি, সে সব অনুসরণ করলে তাদের পতন না হয়ে উন্নতি ঘটবে। এটাও আমরা যেন মনে রাখি, তিনি নিজের গোষ্ঠীর উন্নতির জন্যেও একই শিক্ষা দিয়েছিলেন। ইন্টারেস্টিং হল তিনি দুটি আলাদা আলাদা পরিবেশে বেড়ে ওঠা দুটো আলাদা আলাদা সমাজের সংবিধানের মধ্যে সমতা লক্ষ্য করেছিলেন এবং উভয়ের শত্রুও তিনি স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করেছিলেন।
জাতক আখ্যানের শুরুর গল্পগুলোয় লিচ্ছিবি গোষ্ঠীর সংবিধান বিষয়ে আমাদের একটা ধারণা তৈরি করে। একাপন্ন জাতকে আমরা জানতে পারছি বৈশালী শহরে ‘সবসময় ৭ হাজার ৭ শত ৭ জন রাজা রাজত্ব চালানোর জন্যে উপস্থিত থাকত, এবং একই সংখ্যায়থাকত মুখ্য প্রশাসক, সেনাপতি এবং কোষাধ্যক্ষ্য’। চুল্লকলিঙ্গ জাতকে একই তথ্য পাচ্ছি আরেও বিশদ বর্ণনা সহযোগে, ‘পরম্পরা সূত্রে শাসক পরিবার লিচ্ছিবিদের সংখ্যা ৭ হাজার ৭ শত ৭ জন বৈশালীতে বাস করেন ;প্রত্যেকেই যুক্তি দেন এবং বিতর্কতে অংশগ্রহণ করেন’। বুদ্ধশাল জাতকে পাচ্ছি, ‘বৈশালী শহরে, উৎসব উপলক্ষ্যে জল ছড়ানোর জন্যে পুষ্করণীতে রাজার পরিবার জল আনতে আসে’। আমরা জানছি ‘পুকুরের ভেতরে বাইরে সুঠাম শক্তিশালী রক্ষী থাকত; একটিও পাখির সেখানে প্রবেশ করার সামর্থ্য ছিল না’। একই জাতকে বলা হচ্ছে কীভাবে কোশলের সেনাপতি পুষ্করণীর পবিত্রতা ক্ষুণ্ণ করে তার স্ত্রীকে সেই সঙ্গরক্ষিত পবিত্র পুকুরে স্নান করালে ৫০০ ক্রুদ্ধ লিচ্ছবি রাজা তাদের ধাওয়া করে’।
যদিও জাতক আখ্যানের মুখবন্ধের গল্পগুলো থেকে আমরা ওপরে উল্লিখিত বিষয়গুলি তুলে এনেছি, কিন্তু একই সঙ্গে আমাদের মাথায় রাখতে হবে আমরা যে সময়ের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার চরিত্র, গঠোন বোঝার চেষ্টা করছি, আলোচ্য ঘটনাগুলো তার অনেক পরে ঘটেছিল। কিন্তু আমরা সেই সব ঘটনা, সঙ্গঠনের মৌলিক চরিত্রকে অস্বীকার করতে পারি না। ওপরের আলোচনায় সভ্যদের যে বিপুল সংখ্যায় অংশ নেওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে, তাকে খুব বেশি গুরুত্ব দিলে মূল আলোচনা থেকে সরে যাওয়ার আশংকা রয়েছে। তাই সে সব আলঙ্কারিক আলোচনাকে পাশে সরিয়ে রেখে, যদি সেসব গল্পে বর্ণিত রাজনৈতিক ব্যবস্থা বুঝতে চেষ্টা করি, তাহলে আমরা সে সময়ের সেই সব অঞ্চলের গণতান্ত্রিক প্রশাসনিক ব্যবস্থার রীতিনীতিগুলি কিছুটা আন্দাজ করতে পারব। সর্বোচ্চ নীতি নিয়ামক সংগঠনের সদস্যতা হিসেবে যে ৭ হাজার ৭ শত ৭ সংখ্যা বলা হচ্ছে সেটিকে আমরা আলঙ্কারিক সংখ্যা হিসেবে ধরে নিয়ে সেই সংখ্যাটিকে সংগঠনে বহু মানুষের অংশগ্রহণের চরিত্র হিসেবে ভেবে নিতে পারি এবং তার জনপ্রিয়তাও আন্দাজ করতে পারি। মহাপরিনির্বান সুত্তে মহাজন বুদ্ধদেব যে নিরীক্ষণ উপস্থিত করেছেন, এই ভাবনাটা তার সঙ্গে তুলনীয়। চুল্লকলিঙ্গ জাতকে সদস্যদের যুক্তিপূর্ণ বক্তব্য পেশ আর বক্তব্যের বিরোধিতা করার যে অদ্ভুত সুযোগ দেওয়া হয়েছে, তাতে মনে হয় এই জনপ্রিয় সভাটা শুধু সংবিধান মান্য করা আর করানোর আলঙ্কারিক প্রতিষ্ঠান ছিল না, বরং এই সংঘ নির্ভর করে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার তেজী এবং জোরালো কর্তৃত্বময় জীবনধারার ঐতিহাসিক সত্যটিকে আন্দাজ করতে সাহায্য করে। সদস্যদের পদমর্যাদা এবং দায়িত্বের বিষয়টি বৈশালীর পুষ্করণীর আশ্চর্যজনক গল্প থেকে পেয়ে যাই। অবশ্যই জনপ্রিয় কল্পনায় গল্পর কাঠামো তৈরি করা হয়েছে, কিন্তু এটির মর্মগাথা যদি আমরা বুঝতে ব্যর্থ হই, তাহলে এই বর্ণনা থেকে ইতিহাসের সত্য বোঝার মননটি আমরা হারিয়ে ফেলব। মনে হয় ঠিক যেমন একটি রাজত্বের সঙ্গে রাজা অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে থাকেন, তেমনি সর্বোচ্চ নীতি নির্ধারণ সংগঠনের প্রত্যেকটি সদস্যকে নির্দিষ্ট আচার প্রতিপালন করে আসতে হত। মনে হয় এই সভার সদস্য হতে গেলে সদস্যদের বৈশালীর নির্দিষ্ট পুষ্করণীতে পবিত্র স্নান করে আসা বাধ্যতামূলক ছিল। এই পবিত্র ক্রিয়া সম্পাদন করা থেকে বোঝা যায় বৈশালীর পরিচালক এবং অধিবাসীরা নির্বাচিত সদস্যদের ওপর কী পরিমান বিশ্বাস পেশ করত আর তাকে কী পরিমান দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিতে হত।
স্বাভাবিকভাবে সদস্যরা কীভাবে নির্বাচিত হতেন সেই প্রশ্নটা উঠে আসে। একাপন্ন জাতক (I. 504) থেকে আমরা সঙ্ঘ সভার ৭ হাজার ৭শ ৭ সদস্য সংখ্যা এবং তারই সঙ্গে ৭ হাজার ৭শ ৭ রাষ্ট্রপরিচালক, সেনাপতি এবং কোষাধ্যক্ষের কথাও জানলাম। অর্থাৎ আমরা একটা বিষয় বুঝলাম, প্রধান নীতি নির্ধারণ সভার প্রত্যেকজন সদস্য রাষ্ট্র পরিচালনার নির্দিষ্ট কাজের দায়িত্বপ্রাপ্ত হতেন। প্রত্যেকটা আলাদা আলাদা প্রশাসনিক একক মিলিয়ে মিশিয়ে সামগ্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা গড়ে উঠত, এবং প্রত্যেক সদস্য সেই প্রশাসনিক ব্যবস্থার নেতৃত্ব দিতেন। প্রতিটা প্রশাসনিক এককের কাঠামো রাষ্ট্র কাঠামোর অনুরূপ। এই প্রশাসনিক এককের মাথাদের জুড়ে নিয়ে গড়ে উঠত প্রধান প্রশাসনিক সমিতি। যারা এথেন্সের ক্লিথেনিয়ান (Cleisthenian) ব্যবস্থা সম্পর্কে অবহিত আছেন তারা অবশ্যই বুঝবেন বৈশালীতে সেই ব্যবস্থার একটি অনুসারী ব্যবস্থা চালু ছিল। এথেন্সেও ছিল কেন্দ্রিয় সভা, স্থানীয় সভার ডিমেসের প্রতিনিধি নিয়ে, যারা তাদের অঞ্চলের দায়িত্ব পালন করত যা আদতে corporations with officers, assemblies and corporate property।
লিচ্ছবিদের গণ অভিহিত করা হত। এর আগে আমরা বলেছি শব্দটা স্মৃতিশাস্ত্রে ব্যবহৃত হয়েছে গ্রাম এবং শহরের প্রশাসনিক একক বোঝাতে। শব্দটা স্বাধীন রাজনৈতিক সমবায়িক সভা হিসেবে বিভিন্ন মুদ্রা এবং শিলালেখয় বহুবার ব্যবহার হয়েছে। ফলে যে সব শিলালেখয় মালব এবং যৌধেয় গণের কথা উল্লিখত হয়েছে এবং সমুদ্রগুপ্তের এলাহাবাদ স্তম্ভ লেখতেও ব্যবহার করা হয়েছে, সেগুলি মোটামুটি রাজা পরিচালিত রাজ্য থেকে সম্পূর্ণ আলাদা রাষ্ট্র ব্যবস্থা ছিল। তারা যে সব মুদ্রা জারি করত, সেগুলির কাঠামো থেকে প্রমান করা যায় সে সব রাষ্ট্র ব্যবস্থা ছিল স্বাধীন সার্বভৌম সংগঠন। বিজয়গড় শিলালেখ থেকে আমরা পাচ্ছি যে যৌধেয় গণ এমন একজন রাজা নির্বাচন করত যিনি সেনাপতিরও কাজ করতেন —

ফ্লিটের অনুবাদে Of the Maharaja and Mahasenapati who has been made the leader of the Yaudheya tribe” (Gupta Ins., p. 252). এই অনুবাদ বিষয়ে এখনও কোনও অভিযোগ আসে নি। কারন ‘chosen’-এর শব্দার্থ হল —

বীরমিত্রোদয়ঃতে কাত্যায়নের একটা উদ্ধৃতি পাচ্ছি —

কুল শব্দের অর্থ দল, জনতা, সমাজ (যদিও ডি আর ভণ্ডারকর কুলের অর্থ করেছেন পরিবার; তিনি গণর সংবিধান আলাদাভাবে বর্ণনা করেছেন)। এই ব্যাখ্যা অনুসারে গণ হল বভিন্ন দল বা সমাজের সংঘ। লিচ্ছবিদের সর্বোচ্চ নীতি নির্ধারণকারী কমিটির সংবিধান নিয়ে, জাতক আখ্যান উল্লেখ করে আমি আগে যে তথ্য দিয়েছিলাম এটা সেই তথ্যের সঙ্গে মিলে যাচ্ছে। এই সমাজগুলো, তাদের আধিকারিক আর পরিচালকদের নিয়ে রাষ্ট্র ব্যবস্থার একটা ক্ষুদ্র প্রতিরূপ ছিল এবং সর্বোচ্চ নীতি নির্ধারক কমিটি সমগ্র সমাজ নিয়ন্ত্রণ করত। বলা দরকার মগধ রাজত্বে বিভিন্ন ছোট ছোট সমাজের গ্রাম সভাদের মাথাদের নিয়ে একটা কেন্দ্রিয় সভার উদাহরণ মহাভগ্গতে রয়েছে। সে সময়ের লিচ্ছবিদের সংবিধান নিয়ে আমরা আলোচনা করছি, সে সময়ে সর্বোচ্চ নীতি নির্ধারক সভার বৈঠক বিম্বিসারের রাজত্বে আয়োজিত হয়েছিল।
জৈন কল্প সূত্রে —

এই উদ্ধৃতিটি করা হয়েছিল মহাবীরের মৃত্যুর সময়ের উজ্জ্বল রাত্রি সম্পর্কে।

এর মূল মানে আজও জানা যায় নি। এটা হয়ত ৭৭০৭ টি তথাকথিত লিচ্ছবি রাজাদের মধ্যে ৯ জন রাজার কথা বলা হচ্ছে যারা সর্বোচ্চ নীতি নির্ধারণ সমতির তৈরি করত। এর সঙ্গে আরও একটা কথা বলা দরকার জৈনরা লিচ্ছবিদের ওপরে খুব বেশি প্রভাব ফেলতে পারে নি। ফলে এ ৯ জন রাজার তথ্য জৈন লেখক দ্বারা স্বীকৃত নয়। অন্য সম্ভাব্য ব্যাখ্যাটি হতে পারে এই শব্দবন্ধতে ৯ জন লিছবি গণের রাজা বা প্রধান চিহ্নিত হয়েছে। আমরা এর আগে দেখেছি কাজকর্ম নির্বাহ করতে শ্রেণী সংগঠন প্রধান আধিকারিক নিযুক্ত করত। এই কাঠামোয় একের বেশি আধিকারিক ছাড়া সামগ্রিক রাষ্ট্রীয় প্রশাসনিক কাঠামো চালানোর ভাবনাটাই অবান্তর। তাই —

সামগ্রিক লিচ্ছবিদের রাষ্ট্র ব্যবস্থাকে বিবৃত করে এবং এটাই ওপরে উল্লিখিত স্তবকের আদত বক্তব্য।
লিচ্ছবিদের রাষ্ট্র ব্যবস্থায় কীভাবে বিচার প্রশাসন চলত তার কিছু বর্ণনা আমাদের হাতে আছে। এই ব্যবস্থা রাজা নিরপেক্ষ রাষ্ট্র ব্যবস্থার রূপ এবং তার কাজকর্ম চরমতম গণতান্ত্রিকতার সঙ্গে নির্বাহ করা হত। অত্থকথা থেকে আমরা জানতে পারছি দুষ্কৃতিদের প্রথমে বিচারের জন্যে পাঠানো হত ‘বিনিচ্চয় মহামাত্য’ নামক আধিকারিকের কাছে। তিনি যদি বুঝতেন অভিযুক্ত নিরপরাধ, তাহলে মুক্তি দিতেন, কিন্তু যদি মনে করতেন যাকে বা যাদের পাঠানো হয়েছে সে বা তারা অপরাধী তাহলে তাকে বা তাদের শাস্তি না দিয়ে উচ্চতর আদালত ‘বোহারিক’এ পাঠিয়ে দিতেন। সেখানেও একই ঘটনা ঘটত, তারা যদি অপরাধীকে নিরপরাধ মনে করত তাহলে তাকে ছেড়ে দিত নয়ত আরও উচ্চতর আদালতে পাঠাত যার নাম ‘সূত্তধর’। একইভাবে আরও তিনটে বিচারসভা ছিল যেমন অত্থকুলক, সেনাপতি, উপরজ। প্রত্যেকটাতেই অপরাধীকে নির্দোষ প্রমান হলে হয় মুক্তি মিলত না হয় তার ওপরের স্তরের আদালতে পাঠানো হত। সর্বোচ্চস্তরে বিচার করার অধিকারী ছিলেন একা রাজা, তিনি ‘পাবেনী পুস্তক’ নজির পুস্তক অনুযায়ী বিচার করতেন। সে সময়ের বিশ্ব বিচার ব্যবস্থার ইতিহাসে এ ধরণের ব্যক্তির অধিকার রক্ষার এরকম গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা বোধহয় আর কোথাও ছিল না। কোনও একজন ব্যক্তিকে শাস্তি দেওয়া হত তখনই, যখন সাতটি স্তরের আদালত তাকে পর পর দোষী হিসেবে অভিযুক্ত করত। আর যদি ব্যক্তিটি নির্দোষ হত তাহলে তার কোনও সমস্যাই থাকত না। আমরা দেখলাম, যে রাজ্যে জনগণের বিচার চলে সেখানে ব্যক্তি জনগণের অধিকার অক্ষুণ্ণ থাকে। (চলবে)