| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

কর্পোরেট লাইফ ইন এন্সিয়েন্ট ইন্ডিয়া : রমেশ চন্দ্র মজুমদার (২নং কিস্তি) অনুবাদ : বিশ্বেন্দু নন্দ

Reporter
বিশ্বেন্দু নন্দ / ৫৮০ জন পড়েছেন
আপডেট শনিবার, ১০ ডিসেম্বর, ২০২২

প্রথম অধ্যায়

অর্থনৈতিক জীবনে সমবায়িক কাজকর্ম

এক

সহযোগিতার চেতনা মানুষের আদিম সামাজিক প্রবৃত্তি। যে অনাদি অতীত থেকে আমরা তথ্য রাখতে শিখেছি, তখন থেকেই মানব সমাজে কোনও না কোনওভাবেই সহযোগিতার অনুপম আদর্শটি উজ্জ্বলভাবে ফুটে উঠেছে। যাই হোক, ক্রমশ সহযোগিতার পরিবেশটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে উঠতে মানুষের মানসিকতা এবং পরিবেশ অনুযায়ী চেতন সংগঠনে রূপান্তরিত হতে থাকে। আমরা দেখি প্রায় প্রত্যেক যুগে এবং সব দেশে সমবায়িক সংগঠন যতই প্রাথমিকস্তরে থাকুক না কেন, সহযোগিতার পরিবেশ মানুষের সামাজিক, রাজনৈতিক, ধর্মীয় এবং অর্থনৈতিক জীবনে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। তবে ভিন্ন ভিন্ন দেশে এই ধরণের সংগঠনের বিকাশের মাত্রা ভিন্ন ভিন্ন থেকেছে।

প্রাচীন ভারতে সহযোগিতামূলক কাজকর্মের নিদর্শন পাই প্রাথমিকভাবে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে এবং বৃহদারণ্যক উপনিষদে। উপনিষদের এক শ্লোকে এই ধারণার উপস্থিতি লক্ষ্য করি শঙ্করাচার্যের মন্তব্যের প্রেক্ষিতে। সর্বশক্তিমান, মানব সমাজে ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয় বৈশ্য এবং শূদ্র তৈরি করার সঙ্গে সঙ্গে দেব সমাজেও তিনি একই শ্রেণী বিন্যাস করলেন। প্রথম দুই শ্রেণী তৈরি করে তিনি শান্ত হলেন না কারন এরা কেউই সম্পদ তৈরি করে না। ফলে তিনি বৈশ্য সম্প্রদায় তৈরি করলেন। এদের নাম হল ganasah এটা বোঝাতে যে, মানুষ একক উদ্যমে নয়, বরং যৌথ উদ্যমেই সম্পদ তৈরিতে সক্ষম।

এই স্তবক থেকে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয়, বৈদিক যুগের শেষ পাদে সমবায়িক উদ্যমের একটি উন্নততর কর্মপ্রণালীর বিকাশ ঘটেছিল। আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল বৈশ্য সম্প্রদায় বোঝাতে গণ বা যৌথ সঙ্গঠন শব্দটির ব্যবহার হয়েছে এমনভাবে যে, এই শব্দটি কোনও ভাবেই প্রথমে উল্লিখিত দুটি সম্প্রদায়, ব্রাহ্মণ আর ক্ষত্রিয় বোঝাতে ব্যবহার হয় নি। এই আলোচনা থেকে সঙ্গত কারনেই আমরা সিদ্ধান্ত করতে পারি ব্রাহ্মণ এবং ক্ষত্রিয় সমাজের সম্প্রদায়গত জীবনে অর্থাৎ রাজনৈতিক এবং ধার্মিক চরিত্রের যৌথ সমবায়িক সংগঠনগুলি খুব বেশি গুরুত্ব অর্জন করে নি।

এ প্রসঙ্গে আমরা বুঝতে চেষ্টা করব, প্রাচীন ভারতবর্ষের কোন ধরণের নিরাপত্তাহীনতা ব্যবসায়িকদের সঙ্গে যৌথ সমবায়িক সংগঠন তৈরি করার কাজে প্রণোদিত করেছিল। রাজপথে লুঠেরাদের রমরমার জন্যে বণিকেরা এককভাবে যাত্রা না করে যৌথভাবে যাত্রা করতে বাধ্য হত, যাতে তারা লুঠেরাদের যৌথভাবে মোকাবিলা করতে পারে। পরের দিকের সাহিত্যে বিশেষ করে জাতকে এই ধরণের বিপদের কথা বার বার উল্লিখিত হয়েছে। একটি জাতক গল্পে একটি গ্রামের কথা বলা হয়েছে, যেখানে একজন লুঠেরার নেতৃত্বে ৫০০ জন মানুষ বাস করত। এই ধরণের লুঠেরার মোকাবিলা করতে শ্রেষ্ঠীদের পাল্টা যৌথ সংগঠন তৈরি করার কথা ভাবতে হয়েছে। বহু জাতক গল্পে এধরনের নানান উদাহরণ আমরা লক্ষ করি। এই সময়ের আগেও ভারত ইতিহাসে এই ধরণের সংগঠন গড়ে ওঠার নিদর্শন আছে, এবং তার প্রমানও আমরা পেয়েছি।

ঋক বেদে পাণি শব্দটা বহুবার পেয়েছি। শব্দটাকে বহু গুণী নানাভাবে তাদের মত করে বিশ্লেষণ করেছেন। সেন্ট পিটার্সবার্গের মানে বই সূত্রে জানতে পারছি শব্দটির উৎস যতদূরসম্ভব পান বা হাত বদল করার অর্থে অর্থাৎ এটি ব্যবসায়িকের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হতে পারে। জিমার এবং লুডভিগ শব্দটির কাছাকাছি অর্থ নির্দেশ করেছেন।

কয়েকটি শ্লোকে পাণিদের আক্রমন করে পরাজিত এবং হত্যা করতে ভগবানদের উল্লেখ করা হচ্ছে। লুডভিগ মনে করেন পানিদের বিরুদ্ধে যে যুদ্ধের সূত্র আমরা পাচ্ছি, তাতে মনে হচ্ছে, এরা হয়ত আরব বা উত্তর আফ্রিকার ব্যবসায়ীদের মত কাফেলা বা ক্যারাভানের সঙ্গে যাত্রা করা দেশিয় ব্যবসায়ী/সওদাগর — তাঁদের পণ্য রক্ষার জন্যে আর্যরা প্রয়োজনে শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতেও পিছপা হতেন না এবং একে আর্যরা স্বাভাবিক ন্যায়সঙ্গত কাজ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। আমরা এই বাক্যের গভীরে গেলে বুঝতে পারব কেন শ্রেষ্ঠীদের বড় এবং শক্তিশালী যৌথ উদ্যমের শরণাপন্ন হতে হয়েছিল এবং বিরোধী আক্রমণকারীদের আক্রমন রুখে তাদের বিরুদ্ধে পাল্টা যুদ্ধ চালাতে হয়েছে। আমরা জাতকে যে সংগঠনের কথা পেলাম, সেটিকে আমরা পাচ্ছি আরও অতীতে ঋক বেদের শ্লোকে (তবে আমরা ইতিমধ্যেই লক্ষ্য করেছি, পাণি সূত্রে শব্দের যে অর্থ এখানে উল্লিখিত হয়েছে, সে অর্থ সর্বসম্মতভাবে গৃহীত হয় নি)।

এই ধরণের যৌথ সংগঠন কারিগরদেরও ছিল। কিন্তু তার বাধ্যবাধকতা, আবির্ভাব এবং চরিত্র স্বাভাবিকভাবে আলাদা রকমের হওয়ার কথা। মধ্যযুগের ইওরোপে যে সব কারিগর শ্রেণী সংগঠনের উল্লেখ পাই তার সঙ্গে বৈদিক সময়ে উদ্ভব হওয়া কারিগর সঙ্গঠনের চরিত্র বা অন্যান্য পার্থক্য বিষয়ে খুব একটা গবেষণার কাজ হয় নি। আপাতত আমরা বৈদিক সাহিত্যে উল্লিখিত দুটি শব্দ শ্রেষ্ঠী এবং গণ বিষয়ে আলোচনা করব।

আমরা সক্কলে জানি পরবর্তীকালের নানান সাহিত্যে উল্লিখত শ্রেষ্ঠীন নামক শব্দ নির্দিষ্ট করা ছিল শ্রেণী বা কারিগর সংগঠনের প্রধানের পদ নির্দেশ করতে। ড. ম্যাকডোনেল মনে করেন শ্রেষ্ঠীন শব্দটি বৈদিক যুগেও একই অর্থে প্রযুক্ত হয়েছে (ড. রাধা কমল মুখার্জী ‘লোকাল গভর্নমেন্ট ইন এনসিয়েন্ট ইন্ডিয়া’য় বলছেন বৈদিক সাহিত্যে উল্লিখিত Sraisthya শব্দটি সে সময়েই কারিগর সংগঠনের প্রধান হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। আমি এই ভাবনাটির সঙ্গে একমত নই কারন অথর্ব বেদ বা শতপথ ব্রাহ্মণে শব্দটি অন্য অর্থে প্রযুক্ত হয়েছে)।

আবার গণ শব্দের অর্থ সমবায়িক সংগঠন, যদিও পরের দিকের সাহিত্যে এটি রাজনৈতিক বা ধর্মীয় সংগঠনের প্রতিশব্দ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। রথ বলছেন, শব্দটি বৈদিক সাহিত্যে কারিগর সংগঠন বা গিল্ড হিসেবেই ব্যবহৃত হয়েছে।

পূর্বে বৃহদারণ্যক উপনিষদএর যে উদ্ধৃতি দিয়েছি তার সঙ্গে রথ আর ম্যাকডোনেলের ভাবনা অনেকটা মিলে যায়। এই আলোচনা আমায় বুঝতে শেখায় ভারতীয় সমাজের অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সমবায়িক কাজকর্মের অনন্য গুরুত্ব ছিল। হয়ত এই ধরণের উদ্যোগের ভ্রুণ আমরা বৈদিক যুগের প্রথম সময় থেকেই চিহ্নিত করতে পারি এবং বলতে পারি বৈদিক যুগের পরবর্তী সময়ে এই ধরণের উদ্যম পরিপূর্ণতা লাভ করে। এই সময়কে আমরা নির্দিষ্ট করতে পারি ৮০০ খ্রিঃপূর্বাব্দতে।

দুই

বৈদিক পরবর্তী যুগের অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় এই ধরণের সমবায়িক কাঠামো জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। এই সময়ের সাহিত্য খুঁজে দেখলে দেখতে পাব, একই ধরণের পেশার মানুষ, নির্দিষ্ট নিয়ম আর প্রথা মেনে একত্রিত হয়ে সংগঠন গড়ে তুলেছে। গৌতম সূত্রে আমরা পাচ্ছি বৈশ্যদের প্রাথমিক পেশার পাশাপাশি অতিরিক্ত পেশা হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে কৃষি, ব্যবসা, গরু ব্যবসা এবং সুদে টাকা খাটানোকে।

গৌতম সূত্রে আমরা যে সব মনুষ্য পেশার মোটামুটি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পেশাদারি কাজকর্মের তালিকা পাচ্ছি (বিষয়টা লেখকের আলোচনার পরিধির মধ্যে রয়েছ) সেটা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, যখন তিনি পরের অধ্যায়ে বলেন, cultivators, traders, herdsmen, money-lenders and artisans (have authority to lay down rules) for their respective classes. Having learned the (state of) affairs from those who in each case have authority (to speak, he shall give) the legal decision। এর অর্থ হল, ওপরে উল্লিখিত মনুষ্য সমাজের গুরুত্বপূর্ণতম পেশাগুলির এক ধরণের বিশেষ সংগঠনের অস্তিত্ব বাস্তবে ছিল। এগুলিকে গুরুত্বপূর্ণ সংগঠন হিসেবেই গণ্য করা হত; প্রত্যেকটি সংগঠনের নিয়ম এবং প্রথা আইনের চোখে মান্যতা দেওয়া হত; সংগঠনের প্রতিনিধির অধিকার থাকত পেশাদারদের সংগঠনের নানান বিষয় নিয়ে রাজার সঙ্গে আলোচনা চালানোর।

শ্রেষ্ঠী বা কারিগরদের সঙ্গঠনকে চিহ্নিত করা হত শ্রেণী হিসেবে। শ্রেণীকে বর্ণনা করা হয়েছে একই জাতি বা ভিন্ন জাতির কিন্তু একই ব্যবসা বা শিল্পের সঙ্গে জুড়ে থাকা জনগণের সমবায়িক সংগঠন রূপে। মধ্যযুগের ইওরোপে এই ধরণের সঙ্গঠনকে গিল্ড নামে অভিহিত করা হয়েছে। প্রাচীন বৌদ্ধ বা ব্রাহ্মণ্য সাহিত্যে এমন কী পুরোনো শিলালেখগুলিতে শ্রেণী শব্দের নানান রকমের উল্লেখ পাই। এই সূত্র থেকে পূর্বে আমরা গৌতম সূত্রে যে সিদ্ধান্ত করেছিলাম, সেটি পুষ্ট হয় — কারিগরির প্রত্যেকটি গুরুত্বপূর্ণ শাখায় শ্রেণী বা কারিগর সংগঠনের বিকাশ ঘটেছিল। এই শ্রেণী সংগঠনগুলির চরিত্র যেমন আলাদা ছিল, তেমনি তাদের উদ্ভবও ভিন্ন ভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্নভাবে ভিন্ন ভিন্ন অঞ্চলেও ঘটে থাকবে। মুগ পক্ষ জাতকে বলা হয়েছে রাজা, রাষ্ট্রের ষড়ৈশ্বর্য প্রকাশ করে অভিযানে বেরোবার সময়ে চারটে জাতি, আঠেরোটি শ্রেণী অথবা কারিগর সঙ্গঠন (গিল্ড) এবং সামগ্রিকভাবে সামরিক বাহিনী বা চতুরঙ্গ সমবেত করা হয়। এর থেকে আরেকটি বিষয় পরিষ্কার হয় বিভিন্ন পেশাদার সংগঠনের প্রাতিষ্ঠানিক সংখ্যা ছিল ১৮। এই ১৮টি কারিগর সংগঠন কী ছিল সেটি আজ আর জানার উপায় নেই, কিন্তু সাহিত্য, শিলালেখর নানান ছড়ানো ছিটোনো সূত্র থেকে খুঁটে খুঁটে আমরা এর থেকেও বেশি সংখ্যার কারিগর সংগঠনের অস্তিত্ব জানতে পারছি। নিম্নলিখিত তালিকা থেকে আমরা এই সঙ্গঠনগুলির বিস্তৃতির বিষয়টির একটা আন্দাজ করতে পারব

১। কাঠের কারিগর [সূত্রধর — আসবাব কারিগর সহ, চাকা তৈরি কারিগর, ঘরামি এবং রাজমিস্ত্রি, নৌকো, জাহাজ এবং অন্যান্য যানবাহন তৈরি কারিগর)

২। সোনা এবং রূপা সহ অন্যান্য ধাতুর কারিগর

৩। পাথরের কারিগর

৪। চামড়ার কারিগর

৫। হাতির দাঁতের ভাষ্কর

৬। জল তোলার যন্ত্র তৈরি করার কারিগর (ঔডায়মত্রিক)

৭। বাঁশের কারিগর (ভাষ্কর)

৮। কাঁসারি

৯। জহুরি ও মণিকার

১০। বুনক/তাঁতি

১১। কুম্ভকার

১২। তেলি (তিলপিষক)

১৩। ঝুড়ি কারিগর

১৪। রঞ্জক

১৫। পটুয়া

১৬। শস্য ব্যবসায়ী (ধামনিক)

১৭। চাষী

১৮। ধীবর

১৯। কসাই

২০। ক্ষৌরকার এবং প্রসাধক

২১। মালাকার এবং ফুল বিক্রেতা

২২। নাবিক

২৩। পশুচারক

২৪। শ্রেষ্ঠী এবং দূরদেশে স্বার্থবাহ নিয়ে যাওয়া ব্যবসায়ী

২৫। লুঠেরা এবং দস্যু

২৬। জঙ্গল রক্ষী যারা স্বার্থবাহগুলিকে সুরক্ষা দেয়

২৭। মহাজন

তথ্যের অভাবহেতু এই কারিগর সঙ্গঠনগুলির ইতিহাস খুঁজে বার করা প্রায় অসাধ্য। আমরা বিভিন্ন যুগে কারিগর সংগঠনের বিবর্তন আর বিকাশের সামান্য কিছু তথ্য উল্লেখ করতে পারি মাত্র।

তিন

ষষ্ঠ এবং সপ্তম খ্রিষ্টপূর্বাব্দে লিখিত জাতক আখ্যানগুলিতে উল্লিখিত বিষয়গুলি নিয়ে বিশদে কাজ করেছেন রিচার্ড ফিক। তিনি লক্ষ্য করেছেন একদিকে ব্যবসায়ী এবং সওদাগর আর অন্য দিকে কারিগরদের তৈরি পেশাদার সংগঠনের মধ্যে লক্ষ্যণীয় পার্থক্য ছিল। ব্যবসায়ী এবং সওদাগরদের বংশ পরম্পরার সদস্যরা নির্দিষ্ট কিছু ব্যবসায় নিয়োজিত থাকেন এবং তাঁরা জেত্থক-কে (সঙ্ঘপ্রধান) শীর্ষে রেখে সমবায়িক নীতর মাধ্যমে সংগঠিত হন। কিন্তু জাতকে এমন কোনও ইঙ্গিত নেই যার মাধ্যমে আমরা আন্দাজ করতে পারি, এই সংগঠনগুলি সে সময় চরমতম রূপে বিকশিত হতেপেরেছিল। কারিগরদের ক্ষেত্রে বিষয়টি সম্পূর্ণ আলাদা। ব্যবসায়ীদের শ্রেণী সংঘে বংশপরম্পরা ততটা গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হিসেবে বিবেচিত হয় না; কিন্তু কারিগর সংগঠনের ক্ষেত্রে বংশপরম্পরাকে খুবই গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রথম যৌবনেই পুত্র, পিতার কারগরি [জ্ঞান দক্ষতা] অর্জন করে, ফলে পারিবারিক জ্ঞান এবং দক্ষতা চারিয়ে যায় বংশ এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে। জাতক আখ্যানগুলিতে কোথাও কারিগরদের অন্য পেশায় যাওয়ার ইঙ্গিত প্রায় দুর্লভ বললেও অত্যুক্তি হয় না বরং পুত্র যে পিতার কারিগরি বহন করে নিয়ে চলেছে জাতক গল্পগুলিতে তার প্রচুর উদাহরণ ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকার উদাহরণ দেখি। কারিগরি উদ্যমে স্থানিকতা খুব বড় চরিত্র ছিল। কোনও রাস্তা, শহরের নির্দিষ্ট এলাকা অথবা বহু ক্ষেত্রে গোটা গ্রাম সমূদায়, সাধারণভাবে নির্দিষ্ট একটি শ্রেণীর কারিগর অধ্যুষিত হত। গ্রামগুলি তুলনামূলকভাবে বড় আকারের ছিল; উদাহরণস্বরূপ মহাভাদ্দাকিগামো গ্রামটিতে ১,০০০ কাঠ ব্যবসায়ী পরিবার এবং কাম্মারাগামো গ্রামে একই সংখ্যায় লোহার কারিগর, কামার [লোহাকম] কুঁড়ে ঘর ছিল। এছাড়া কারিগরদের মধ্যে জেত্থক নামে পূর্বোল্লিখিত পদটির অস্তিত্ব ছিল। তিনটি মূল চরিত্র — বংশ পরম্পরার পেশাদারিত্ব, পেশার আঞ্চলিকতা এবং সংগঠনে জেত্থক পদের প্রতিষ্ঠা থেকে ড. রিচার্ড ফিক মনে করেন সে সময় যে সব কারিগর সংগঠন গড়ে উঠেছিল, তার সঙ্গে মধ্যযুগের ইওরোপের কারিগরদের সংগঠনের যথেষ্ট মিল থাকা সম্ভব।

জাতক আখ্যানের আরও কিছু তথ্য কারিগর এবং ব্যবসায়ী সংগঠনকে আরও ভালভাবে বুঝতে সাহায্য করে। সমুদ্দ বাণিজ্য জাতকে আমরা দেখছি বেনারসের কাকাছি এলাকায় ১,০০০ সূত্রধর পরিবার নিয়ে একটা সমৃদ্ধ শহর ছিল, প্রতি ৫০০ পরিবার কারিগর পিছু একজন প্রধান কারিগর ছিলেন। কোনও একটি কারনে কারিগরেরা শহর ছেড়ে দ্বীপে বাস করতে শুরু করেন। গল্পটি সামাজিক গতিময়তার একটি চমৎকার উদাহরণ হয়ে আছে; এ ধরণের নানান তথ্য বিভিন্ন শিলালেখতে আমরা পেয়েছি। এই আলোচনা থেকে আরেকটা বিষয় সমান্তরালভাবে উঠে আসে, সে যুগে কোনও একটি এলাকায় একটি পেশার একের বেশি কারিগর সংগঠনের অস্তিত্ব সম্ভব ছিল। আজ হয়ত আমরা ধরে নিচ্ছি কারিগরদের সংখ্যাধিক্য হেতু তারা দুটি সংগঠনে আলাদা হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু অন্য গল্পতে আমরা একটি সংগঠনে ১,০০০ সদস্যরও অস্তিত্ব লক্ষ করি।

তবে মনে হয় জেত্থক পদটি বংশপরম্পরাক্রমে প্রবাহিত হত; আমরা জাতকের গল্পে জানছি প্রধান নাবিক মারা গেলে তার পুত্র সেই শূন্যস্থান পূরণ করছে। কারিগর সংগঠনগুলির নেতৃত্বস্থানীয়রা, বহু সময় রাষ্ট্রের নানান পদাধিকারী হিসেবে কাজ করেছে; সংগঠনগুলো যেভাবে রাজা, ধনী এবং অন্যান্য অভিজাতদের প্রশ্রয় পেয়েছে, সে তথ্য থেকে কারিগর সংগঠনের গুরুত্ব আমরা আন্দাজ করতে পারি। কারিগরদের নেতৃত্বর মধ্যে লড়াই ঝগড়া এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতা লেগে থাকত এবং জাতকের গল্প থেকে আমরা দেখতে পাই স্বয়ং বুদ্ধকে সেই দ্বন্দ্ব প্রশমন করতে হস্তক্ষেপ করতে হয়েছে। এই ধরণের লড়াই ঝগড়া খুব ব্যতিক্রমী ঘটনা ছিল না, এই দ্বন্দ্ব নিরসনে বিশেষ বিচারসভা আয়োজন করা হত (রিজ ডেভিস মন্তব্য করেছেন, বেনারসের কাশী রাজার দরবারে প্রথমবার শ্রেণী সংগঠনের নেতৃত্বর পাশাপাশি হিসেব রক্ষকের পদে নিয়োগ করার উদাহরণ পাচ্ছি। যতদূর সম্ভব কোশলের সাবত্থি অঞ্চলের শ্রেণীর সভাপতিদের (প্রমুখ) মধ্যে উদ্ভুত দ্বন্দ্ব দু-দুবার উল্লিখিত হয়েছে এবং সেই দ্বন্দ্বের ফলে কারিগরদের একাংশ সাবত্থির সংগঠন থেকে ভেঙে বেরিয়ে এসে বেনারসে থিতু হয় এবং এর ফলে কাশীর রাজা নতুন কারিগর প্রধান নিযুক্ত করেন, The first appointment to a supreme headship over all the guilds doubled with the office of treasurer is narrated in connection -with the kingdom of Kasi at the court of Benares. Possibly the quarrels twice alluded to as occurring between presidents (pamnkha) of guilds at Savatthi in Kosala may have also broken out at Benares and haA’e led to this appointment)। একটি জাতকের গল্পে জনৈক ভাণ্ডাগারিক নামক (গুদাম ব্যবস্থার সর্বাধ্যক্ষ অথবা খাজাঞ্চি) রাষ্ট্রীয় আধিকারিকের কথা রয়েছে যিনি কারিগর সংগঠনগুলর দ্বন্দ্ব নিরসনে দায়িত্বপ্রাপ্ত ছিলেন এবং এর জন্যে বিচারসভা আয়োজন করতেন। আমরা জেনেছি এই সময়ের আগে এ ধরণের দপ্তরের অস্তিত্ব ছিল না এবং এর পরে এই দপ্তরটি স্থায়ী হয়।

আগেই আমরা দেখেছি দুটি জাতকে ১৮টি কারিগর সংগঠনের উল্লেখ করা হয়েছে এবং ১৮ সংখ্যাকে শুধুই সংখ্যা হিসেবে ধরলে একটা বিষয় পরিষ্কার হয়ে যায় সেই সময় এই ধরণের অনেকগুলি কারিগর এবং ব্যবসায়ীক শ্রেণী সংগঠন গড়ে ওঠে। দুটি জাতক আখ্যানে রাজকীয় শোভাযাত্রার দুটি ঘটনায় ১৮টি শ্রেণী সংগঠনের অংশগ্রহণে পরিষ্কার প্রাচীন ভারতের নীতি নির্ধারণে এই সঙ্গঠনগুলোর যথেষ্ট গুরুত্ব ছিল। (চলবে)

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev