তৃতীয় অধ্যায়
রাজনৈতিক জীবনে সমবায়িক কাজকর্ম
তিন
ফলে বৌদ্ধ সংঘের গণতান্ত্রিক রীতিনীতিকে আদর্শ হিসেবে গণ্য করে মহান গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোর রাজনৈতিক সর্বোচ্চ নীতি নির্ধারণ সমিতির বিশদ কর্মপদ্ধতি আন্দাজ করাটা ঠিক হবে না। তবে ঐতিহাসিকেরা সভাগুলোর বিকাশ বুঝতে সংঘের নিয়মনীতিগুলো আর বিকাশের স্তর বিচারের পথ ধরতেই পারেন। এবং এই নীতি/পদ্ধতিগুলির সতর্ক বিশ্লেষণে, আমাদের সামনে স্বাভাবিকভাবে বিকশিত হয়ে ওঠা সর্বোচ্চ নীতি নির্ধারণ সমিতির বেশ কয়েকটি চরিত্র উদ্ভাসিত হয়ে উঠলে আমরা আন্দাজ না করে উপায় থাকে না যে তাদের জ্ঞান জীবনের কোনও একটা বিশেষ ক্ষেত্রে আবদ্ধ ছিল না। বড় সভা আয়োজনে সে সব নীতিমালা এতই অপরিহার্য ছিল যে আমরা বুঝতে পারি তারা যখন জীবনের একটি বিষয় এত ভাল করে জানে, অন্যগুলো আরও ভালভাবে জানতে বাধ্য। চুল্লভগ্গতে IV 14. 19 ff দেখি সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণ কমিটি যখন কোনও একটি বিষয় অন্য কোনও সমিতিকে বিবেচনার জন্যে পাঠায়, আমরা তখন বুঝতে পারি আধুনিক সময়ের অনুসৃত কোনও একটি জটিল বিষয়কে বিশেষ কোনও কমিটির বিবেচনার জন্যে পাঠিয়ে দেওয়ার পদ্ধতিটি প্রাচীন ভারতের ধর্মীয়, রাজনৈতিক অথবা সামাজিক সংগঠনের অজানা ছিল না। এই চরিত্রটি প্রাচীন সভাগুলি কাজ চালানোর কাজে এতই অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত ছিল এবং এই পদ্ধতিটি সংঘ থেকে উদ্ভুতই হোক অথবা এটি রাজনৈতিক সমিতিজাতই হোক, এই কার্যকরী পদ্ধতিটি সাধারণের মনে গভীরে দৃঢ়বদ্ধ হয়েছিল এবং হয়ত এই পদ্ধতি একে অপরে নকলও করে থাকতে পারে। একই যুক্তিতে আমরা বিভিন্ন বৌদ্ধ শাস্ত্রে উল্লিখিত পদ্ধতিগুলির নীতিমালা অবলম্বন করে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জনপ্রিয়তম সভার গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রগুলি নিচে আলোচনা করলাম
১) সভায় কোনও সিদ্ধান্ত নিতে গেলে নির্দিষ্ট নীতিমালা তৈরি থাকত সূত্র চুল্লবগ্গ IV. II. 2; XI. 1. 4 বৌদ্ধ সংঘের উদাহরণ
২) কোরামের রীতিনীতি অনুসরণ করা হত (মহাবগ্গ, IX.3.2)
৩) মত পার্থক্য উপস্থিত হলে সভার মতামত নেওয়া হত সংখ্যাধিক্যের ভোটে। ভোট গোনার জন্যে লিখিত বিধি ছিল, ব্যালটের মাধ্যমে ভোট গ্রহণ অজানা ছিল না (চুল্লবগ্গ, IV. 9; IV. 14. 26)
৪) খুব জটিল বিষয় কমিটিতে পাঠনো হত এবং পরে এটি সভায় ফেরত পাঠানো হত (চুল্লবগ্গ, IV. 14. 26)
৫) ভোটে অনুপস্থিত থাকাদের সম্বন্ধে নির্দিষ্ট লিখিত নিয়ম তৈরি করা ছিল (মহাবগ্গ, IX.3.2); বেআইনিভাবে তৈরি হওয়া সমিতিকে আইনি করে নেওয়ার লিখিত পদ্ধতি ছিল (চুল্লবগ্গ, XII. 1. 10)
চার
বৌদ্ধ সাহিত্য এবং শাস্ত্র আলোচনা এবং বিচারের পরে আমরা গ্রিসিয়দের লেখাপত্র নিয়ে আলোচনা করব। এগুলিও খুব আমাদের আলোচ্য বিষয় বুঝতে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হয়ে উঠবে। গ্রিসিয়দের লেখায় চতুর্থ শতকের শেষার্ধে যখন মহান মৌর্য সাম্রাজ্য ক্ষমতায় ছিল, সে সময়ের স্পষ্টত রাজা নিরপেক্ষ — অভিজাতীয় এবং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার বিশদে উল্লেখ পাচ্ছি। গ্রিসিয় রাজনীতিবিদ মেগাস্থিনিস বেশ কিছু কাল ভারতবর্ষে অতিবাহিত করেন। স্বাভাবিকভাবে অভিজাতীয় এবং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার আকারের পার্থক্য তার লেখায় নিশ্চই আমরা পাচ্ছি। ফলে মেগাস্থিনিসের অনুবাদক ম্যাকক্রিন্ডল বলছেন ‘তাঁর সময় অধিকাংশ শহরই গণতান্ত্রিক কাঠামো অবলম্বনে প্রশাসিত হত’। তাঁর একটা মন্তব্য উল্লেখ করা গেল, ‘মালটিকুরি, সিঙ্ঘি (এবং আরও অন্যান্য সমাজ) মুক্ত ছিল আর তাদের কোনও রাজাও ছিল না’ এর সঙ্গে তিনি আরও বলছেন ‘যারা সমুদ্রের পাশে বাস করত তাদেরও কোনো রাজা ছিল না’। ফিক মনে করেন মেগাস্থিনিস যখন ভারতবর্ষে এসেছিলেন, সে সময় গণতন্ত্রিক রাষ্ট্রের/সমাজের অস্তিত্ব ছিল না। তিনি মনে করতেন, গ্রিসিয়রা ভারতবর্ষে এসে মগধের আশেপাশের শুধুই কিছু ছোট স্বাধীন শহর এবং রাষ্ট্র দেখেছিল। সেইও সব শহরিগুলো তখনও তাদের স্বাধীনতা বজায় রেখেছিল। আমি ফিক সাহেবের মন্তব্যকে অস্বীকার করছি, কারন কেন তিনি এই মত পেশ করলেন, তার কোনও যুক্তি দেন নি। অথচ মেগাস্থিনিসের লেখার তথ্যগুলিকে অন্যান্য গ্রিসিয় লেখকের তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয়েছে। ম্যাকক্রিন্ডলের অনুবাদে আরিয়ান’স ইন্ডিয়া নামক বইতে পাচ্ছি সান্ড্রাকটসের আগে ভারতবর্ষে গণপ্রজাতন্ত্র তিনবার প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এ প্রসঙ্গে আমার যুক্তি হল, এ সব বিষয়ে গ্রিসিয়দের প্রামাণিক জ্ঞান নাও থাকতে পারে, কিন্তু সে সময়ের এই ধরণের রাষ্ট্র চরিত্র তাদের দৃষ্টি এড়িয়ে যাওয়াও বাস্তবসম্মত নয়। আরিয়ান বিশেষভাবে সুপারিন্টেন্ডেন্ট নামক আধিকারিক বিষয়ে যা বলছেন, সেটা হল they report everything to the king where the people have a king and to the magistrates where the people are self-governed. এই উক্তি থেকে অস্বীকার করার উপায় নেই যে আরিয়ান রাজা নিরপেক্ষ রাষ্ট্রের কথাই বলেছেন।
আবার কুইন্টাস কিউরিটাস ‘সাবারিকাই’কে বলেছেন a powerful Indian tribe where the form of government was democratic and not regal [ডিওডোরাস, সাম্বাস্তাই (যাদের সাবারিকাই-এর সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে) সম্বন্ধে বলছেন, তারা এমন শহরে থাকে যেখানে গণতান্ত্রিক কাঠামোর সরকার রয়েছে (Ibid, p. 292).]। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোর সম্পদ হিসেবে ছিল ৬০,০০০ পদাতিক, ৬,০০০ অশ্বারোহী এবং ৫০০ রথারোহী সেনা। আলেকজান্ডার যখন তাদের বিরুদ্ধে অভিযান করছিলেন, তারা তাদের গণতান্ত্রিক পরম্পরা অনুসরণ করে ৩ জনকে সেনাপতি নির্বাচিত করে। এখানে বলা দরকার, তারা আদৌ শহর-রাষ্ট্র ছিল কী না এই উক্তি মাথায় রাখলে সে প্রসঙ্গ আর ওঠে না সিন্ধুর পারে এটা ছিল most thickly studded with their villages।
গ্রিসিয় পর্যটকেরাও অভিজাত শাসিত রাষ্ট্রের বর্ণনা দিয়ে গেছেন। ফলে আরিয়ানের এনাবাসিস যখন চলে যাচ্ছেন, সে সময় ন্যসা নামক শহর রাষ্ট্র ছিল একটি অভিজাততন্ত্রিয় রাষ্ট্র ব্যবস্থা। শাসনকর্তাদের মধ্যে ছিল অভিজাতদের মধ্যের ৩০০ সদস্য এবং একজন প্রেসিডেন্ট। আমরা জানছি, when Alexander came to Nysa, the Nysaians sent out to him their President whose name was A-kouphis, and along with him thirty deputies of their most eminent citizens। আমরা আরও জানতে পারছি যে আলেকজান্ডার confirmed the inhabitants of Nysa in the enjoyment of their freedom and their own laws ; and when he enquired about their laws he praised them because the government of their state Avas in the hands of the aristocracy. He moreover requested them to send with him 100 of their best men selected from the governing body, which consisted of three hundred members.
আবারও আরিয়ান মন্তব্য করছেন, It was reported that the country beyond the Hyphasis was exceedingly fertile, and that the inhabitants were good agriculturists, brave in war, and living under an excellent system of internal government; for the multitude was governed by the aristocracy, who exercised their authority with justice and moderation। স্ট্রবো একই দেশে এজকটি পরম্পরা উল্লেখ করে বলছেন an aristocratical form of government consisting of five thousand councillors, each of whom furnishes the state with an elephant।
গ্রিসিয় লেখকেরা অন্যান্য আদিবাসী গোষ্ঠী সম্বন্ধেও বর্ণনা করেছেন যেমন মাল্লোই, অক্সিন্দ্রাকাই, জাথোরাই, আদ্রাইয়স্তাই ইত্যাদি। এরা সক্কলে হয় রাজা নিরপেক্ষ অভিজাততন্ত্র না হয় প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় বসবাস করেন। অ্যালেক্সান্ডার যখন ভারতবর্ষে এসেছিলেন সে সময়ের অধিকাংশ রাষ্ট্রই এই দুটর কোনও না কোনও ব্যবস্থার অন্তর্গত ছিল। আমরা মনে করতে পারি, ৪ খ্রিঃপূতে পাঞ্জাব অঞ্চলের অধিকাংশ রাষ্ট্র রাজা নির্ভর রাষ্ট্রের বদলে ছিল প্রজাতান্ত্রিক অথবা অভজাততান্ত্রিক ব্যবস্থা।
পাঁচ
চতুর্থ খ্রিঃপূ সময়ে রাজা নিরপেক্ষ রাজ্যগুলির বিশদ বর্ণনা আমরা মৌর্য সাম্রাজ্যের অর্থমন্ত্রী কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রে পেয়ে থাকি। কৌটিল্য তার আর্থশাস্ত্রের একটি অধ্যায় বরাদ্দ করেছেন সমবায়িক কাঠামো নিয়ে এবং তাকে দুটি ভাগে ভাগ করেছেন

প্রথম শ্রেণীর শ্রেণী সংঘ হল ক্ষত্রিয় শ্রেণী সংঘ, যাদের পেশা মূলত ব্যবসা, কৃষি এবং সামরিক কর্ম। আমরা এগুলি এর আগে শ্রেণী সংঘ আলোচনা করতে গিয়ে বিস্তৃতভাবে উল্লেখ করেছি। উল্লেখযোগ্য হল, কৌটিল্যের সময় কখনো কখনো এগুলি স্বাধীন পেশাও হয়ে উঠত।
অন্য সংঘগুলি হল লিচ্ছবিক, বজ্জিক, মল্লক মদ্রক, কুরুর, কুরু এবং পাঞ্চাল …এরা প্রত্যেকেই রাজা উপাধি ধারণ করতেন। লিচ্ছবিকরা রাজা উপাধি ধারণ করতেন বলতে কী বোঝাতে চেয়েছেন, সেটা আমরা এর আগে বৌদ্ধ সাহিত্য অবলম্বনে আলোচনা করেছি। অর্থশাস্ত্র প্রমান করল লিচ্ছবিরা অজাতশত্রুর আক্রমণ রুখে দিয়েছিল এবং তাদের গণতান্ত্রিক সংবিধান কার্যকর ছিল চতুর্থ খ্রিঃপূর্বর শেষ থেকে তৃতীয় খ্রিঃপূর্বর শুরুর সময় পর্যন্ত। এর আগে আমি লিচ্ছবিদের সংবিধান বিষয়ে আলোচনা করেছি। আমার মনে হয় কৌটিল্যের সময় পর্যন্তও এই সংবিধানে বদল আসে নি। এবং তিনি অন্য যে সব সমবায়িক সমাজের নাম করছেন, সে সবের সংবিধানও লচ্ছবিদের মত ছিল এবং একই সময় পর্যন্ত কার্যকর ছিল। তিনি এ বিষয়ে খুব বেশি কিছু আলোচনা করছেন না, কিন্তু তিনি যতটুকু আলোচনায় আনছেন, সেটাই আমাদের জন্যে যথেষ্ট।
এবারে আমরা যে স্তবকটি আলোচনা করব, সেটি থেকে বোঝা যাবে সমবায়িক সমাজগুলির সাধারণ সভা ছিল এবং এটি পরিচালনায় একজন কার্যকরী অধস্তন আধিকারিক ছিলেন, যার নাম মুখ্য Mtikhyas

এখানে আমরা ধরে নিতে পারি, সমবায়িক সমাজগুলোর সাধারণ সভায়

বোঝাতে ‘সভার মধ্যস্থলে’ বা ‘সভা চলাকালীন’ বোঝানো ছাড়া কোনও মানে বোঝায় না। মাথায় রাখতে হবে সভা, মুখ্য Mukhyas-দের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ শুনত এবং বিচার করত, শাস্তি দিতে পারত তাই আমরা তাকে সভার অধস্তন আধিকারিক অভিধা দিয়েছি।
আর শ্যামাশাস্ত্রী ‘মুখ্য’ Mukhyas শব্দের অর্থ করেছেন সমবায়িক সমাজের প্রধান। এর অর্থ হয়ত সর্বময় প্রধান কর্তাও হতে পারে। কিন্তু আমি তার মতটি স্বীকার করছি না। সে সময় যে বহু মুখ্য ছিল সেটা আমরা বুঝতে পারি

শব্দবন্ধ থেকে। অর্থাৎ মুখ্যর মানে দাঁড়াল কার্যকরী আধিকারিক।
সভার সদস্যদের রাজা নামে অভিহিত করা হত। এই শব্দটা আমরা


থেকে পাই তাই নয়, এই

শব্দবন্ধ থেকেও পাচ্ছি। সভার নির্দেশে কাউকে কারাগারে নিক্ষেপ করা যেত অথবা রাজ্য থেকে বহিষ্কার করা যেত। ফলে

শব্দটার মানে হল সভার সদস্যবৃন্দ অথবা অন্য ভাষায় প্রত্যেকের নাম হল রাজ বা রাজা । এই সংগঠনের গণতান্ত্রিক চরিত্রটি কৌটিল্য উল্লেখ করেছেন নিম্নলিখিত স্তবকে

ফলে

সেই পথই অনুসরণ করত
-র
সদস্যরা যে কাজ করার নির্দেশ দিত। (চলবে)