| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

কর্পোরেট লাইফ ইন এন্সিয়েন্ট ইন্ডিয়া : রমেশ চন্দ্র মজুমদার (২২নং কিস্তি) অনুবাদ : বিশ্বেন্দু নন্দ

Reporter
বিশ্বেন্দু নন্দ / ৩১৪ জন পড়েছেন
আপডেট শুক্রবার, ৩০ ডিসেম্বর, ২০২২

তৃতীয় অধ্যায়

রাজনৈতিক জীবনে সমবায়িক কাজকর্ম

ছয়

নতুন সময়ে নতুন রাজনৈতিক দর্শনের যে আঙ্গিক উঠে এল। সেই দর্শন আঙ্গিকে স্পষ্টভাবে রাজনৈতিক সমবায়িক কাঠামোর প্রতি অকৃত্রিম সহানুভূতি লক্ষ্য না করে পারলাম না। কৌটিল্যের রাজনৈতিক দর্শনের সম্পূর্ণ বিপরীক্রমে দাঁড়িয়ে নতুনতর দার্শনিক ভাবনা চয়ন করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। গণগুলি কীভাবে ধ্বংস করা যাবে সেই বিষয়ে আলাপের বিপ্রতীপে অবস্থান করে নতুন দার্শনিক আঙ্গিকে স্বাস্থ্যকরভাবে বলা হল কী কী সমস্যা এবং বিপদ এড়িয়ে চললে গণগুলো তাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া দুর্দশা এড়াতে পারে। আলোচনায় বোঝা গেল পরস্পরের মধ্যে দ্বন্দ্ব এবং অনৈক্যের বিতণ্ডা যে কোনও জনপ্রিয় সরকারের বিপদের অন্যতম কারন। ধৈর্য সহশীলতা আলাপ-আলোচনা বিপদ এড়ানোর কার্যকর নিদান। আরেকটা বড় সমস্যা হল সভার বৈঠকের আলোচ্য বিষয়কে গোপন রাখতে না পারা। এই ঝামেলা দূর করার জন্যে একটি ছোট কাজ চালাবার মর মন্ত্রণাগোষ্ঠী তৈরি করার নিদান দেওয়া হল যাতে চূড়ান্ত গোপনীয় বিষয়গুলি চার কান না হয়। আমরা বিশ্বাস করতে পারি এই প্রস্তাবনাগুলি নির্দিষ্ট উদাহরণ সহযোগে উপস্থাপিত করা হয়েছে এবং সে সময়ে যত গুরুত্বপূর্ণ গণ ছিল প্রত্যেকটিতে এই ধরণের ছোট মন্ত্রীপরিষদ নির্ভর সরকারি কাঠামো তৈরি হয়। অন্যান্য বিষয়ের মধ্যে নির্দিষ্ট বিষয়ে আইন প্রণয়ন এবং সেগুলিকে কঠোর হাতে প্রয়োগ করা, সাম্রাজ্যের প্রশাসনের কাঠামো তৈরি, সবার উদ্দেশ্যে অপক্ষপাত বিচার ব্যবস্থার বিকাশ বিশেষ করে রাজপরিবারে এবং অভিজাতদের পুত্র এবং আত্মীয়দের জন্যে বিশেষ বিচার ব্যবস্থা তৈরি না করা, চর ব্যবস্থা তৈরি করা, রাষ্ট্রীয় কোষে যথেষ্ট অর্থের যোগান আসা এবং সঞ্চয় তৈরি হওয়া এবং গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিকে যথেষ্ট সম্মান দেওয়া — এই সব নিয়ম নীতি গণ বিকাশের উদ্দেশ্যে গ্রহণ করা হল। সাধারণভাবে বাইরে থেকে আসা বিপদের তুলনায় গোষ্ঠীর ভিতর থেকে তৈরি হওয়া বিপদকে অনেক বেশি গুরুত্ব দেওয়ার নিন্তা করা হল। এই নীতিতে বলা হল, গোষ্ঠীর মধ্যে যদি আভ্যন্তরীণ বিভেদ তৈরি না হয়, তাহলে গোষ্ঠী অনেক বেশি শক্তিশালী একক হিসেবে যে কোনও শক্তিশালী শত্রুর মোকাবিলা করতে পারবে। এই ধারণাটা গৌতম বুদ্ধের সময়ে বিকশিত হয়েছে। অজাতশত্রু যখন বৈশালী আক্রমন করেন, সে সময় এই নীতি বিশদে বিবৃত হয়েছে। অজাতশত্রুর মত শক্তিশালী রাজাও প্রথমে গণকে আক্রমণ না করে তার মন্ত্রীকে চর হিসেবে পাঠিয়ে গণের মধ্যে বিভেদ তৈরি করে বৈশালী আক্রমন করেন। নতুন রাজনৈতিক দর্শন প্রত্যেকটি গণের মধ্যে একতা সৃষ্টির নিদান দিল। এই ধরণের গণমহাসঙ্ঘ শক্তিশালী শত্রুর বিরুদ্ধে প্রতিরোধের দেওয়াল তোলার সম্ভাবনা তৈরি করল।

মহাভারতের অন্যান্য স্তবকেও রাজনৈতিক গণ এবং সংঘগুলির প্রতি একই অনুরোধ করা হয়েছে। শান্তিপর্বের ৮১ অধ্যায়ে ভীষ্ম, যুধিষ্ঠিরকে বাসুদেবন এবং নারদের প্রাচীন আখ্যান বর্ণনায় এটা পাই। বাসুদেব নারদকে বর্ণনা করেছেন অন্ধক, বৃষ্ণি, কুরুরার এবং ভোজদের মধ্যে মহাসঙ্ঘ তৈরি করার সমস্যাগুলি। মূল সমস্যা হল নেতৃত্বের সঙ্গে থাকা ধরণের অপরিবর্তনীয় দল, তাদের মধ্যে স্বাভাবিক বোঝাপড়ার অভাব এবং অভিযোগপ্রত্যাভিযোগের মাত্রা বৃদ্ধি। উত্তরে নারদ কৃষ্ণকে বললেন নিদান কিন্তু হিংসায় লুকিয়ে নেই বরং সমঝোতার নীতি গ্রহণের মহত্ত্বের মধ্যে লুকিয়ে আছে।

 

কৃষ্ণের প্রশ্নের উত্তরে ধারণাটা আরও বিকশিত হল —

 

শেষ স্তবটি স্পষ্টভাবে সংঘের সংবিধান বিষয়ে উল্লেখ রয়েছে। এই ধরণী বর্ণনা পাচ্ছি সভাপর্বের ১৪ অধ্যায়ে। সেখানে, সে সময়ের ১৮টি কুল এবং ১৮,০০০ ভাই (brethren) হয়ত বয়স্ক পুরুষ সদস্যের উল্লেখ রয়েছে। এছাড়াও ভোজ-রাজণ্য-বৃদ্ধায়ি নামক শব্দবন্ধের উল্লেখ রয়েছে। আমার মনে হয় শব্দটার মানে হল সদস্যদের কার্যকরী সভা। ওপরের উদ্ধৃতিতে দেখছি সংঘ নেতা কৃষ্ণ প্রত্যেককে কৌশলী ব্যবস্থাপনার পদক্ষেপ গ্রহণ করার আহ্বান জানাচ্ছেন। এই আলোচনায় বলা হল ‘অনৈক্য’ই সংঘগুলোর পতনের মূল কারন এবং কৃষ্ণ এ বিষয়ে সকলকে সতর্ক করছেন। সংঘ শব্দের ব্যবহার থেকে পরিষ্কার, ভীষ্ম এই অধ্যায়কে রূপে যে অভিহিত করেছিলেন, সেটি কতটা সত্য।

কৌটিল্যের রাজনৈতিক দর্শনের উদ্দেশ্য ছিল সংঘগুলোর পতন ঘটানো। বিরোধী পক্ষরা স্পষ্টতই কৌটিল্যের দর্শনের বিরোধিতা করেছে। মহাভারতেই প্রচুর রাজা নিরপেক্ষ গোত্রের উদাহরণ পাচ্ছি যেমন কিরাত, দারদ, অডুম্বর, পারাদা (Parada), বহ্লিক, শিবি, ত্রিগারত্ত, যৌধেয়, কেকয়, অম্বষ্ঠ, ক্ষুদ্রক, মালব, পুণ্ড্র, অঙ্গ এবং বঙ্গ। তাদের বলা হল শ্রেণীমন্ত (srenimanta) এবং শাস্ত্রধিকারিণ (sastradharin)। শব্দদুটিকে আমরা তুলনা করতে পারি কৌটিল্যের ক্ষত্রিয়-শ্রেণী এবং পাণিনির আয়ুধ-জীবি-সঙ্ঘের সঙ্গে। যৌধেয়দের উল্লেখ করতে আয়ুধ-জীবি-সঙ্ঘ শব্দবন্ধ ব্যবহার করা হয়। বহ্লিকদের বিষয়ে মহাভারতে বলা হয়েছে, ‘তাদের সব নায়কই রাজা’। এই উক্তির সঙ্গে আমরা তুলনা করতে পারি কৌটল্যের অর্থশাস্ত্রে উল্লিখিত রাজা-শব্দ-অপজীবি-কে। এছাড়াও জাতকে বলা হয়েছে লিচ্ছবিদের প্রত্যেককে রাজা নামে অভিহিত করা হয়। একই সঙ্গে উল্লিখিত হয়েছে অনর্ত্ত, কালকূট, কুলিন্দ ইত্যাদি গণের নাম, যদিও তাদের রাষ্ট্র ব্যবস্থার চরিত্র সম্বন্ধে আমরা কিছুই জানি না।

মহাভারতে উল্লিখিত আদিবাসী এই রাষ্ট্রগুলোর নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক অস্তিত্বের সময় খুঁজে বার করা মুশকিল। কিন্তু মুদ্রার উদাহরণ আমাদের এ কাজে সহায়ক হয়েছে। আমরা ওপরে উল্লিখিত রাজনৈতিক সংঘ ছাড়াও সমসাময়িক বেশ কিছু অন্যান্য রাজনৈতিক সংঘের উল্লেখ পাচ্ছি যারা মৌর্য শাসনে অস্তাচলে যাওয়ার পর নতুন করে মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছিল। এগুলির ছোট ছোট ইতিহাস সম্মত বর্ণনা দেওয়া হল —

১। যৌধেয় — আগেই আমরা উল্লেখ করেছি, যৌধেয়রা পাণিনির সময়কালে আয়ুধজীবি সংঘ নামে পরিচিত ছিল। কানিংহাম সূত্রে তাদের প্রচলিত প্রাচীনতম মুদ্রাটি প্রথম শতাব্দ খ্রিঃপূ প্রচলিত ছিল। রাপসন এবং ভিনসেন্ট স্মিথ কানিংহ্যামের সঙ্গে একমত যে যৌধেয়রা তাদের রাজত্ব ১০০ খ্রিপূতে স্থাপন করেছেন। প্রথম দিকের মুদ্রায় লিখা আছে যৌধেয়ন, তার পরেরগুলোয় এই লেখা পরিবর্তিত হয়ে খোদিত হচ্ছে যৌধেয়-গণস্য জয় শব্দবন্ধ। তাদের ক্ষমতা এবং সম্পদ বিষয়ে আমরা আন্দাজ করতে পারি গিরনার শিলালেখ সূত্রে —

অর্থাৎ ক্ষত্রিয়দের মধ্যে যৌধেয়রা নিজেদের বীর উপাধিতে চিহ্নিত করে গর্ব বধ করে (of the Yaudheyas, rendered proud by having manifested their title of heroes among all Kshatriyas)। ওপরের উক্তিটি শত্রুর থেকে নির্গত স্তুতিবাক্য। যৌধেয়দের নিজেদের সম্বন্ধে বলেছে ‘তারা বিজয়ের গোপন কবজ ধারণ করেতে ভালবাসে’ (that they possessed the secret charm of winning victories)। এই আপ্তবাক্যটি কার স্টিফেন লুধিয়ানার কাছে একটি বড় পোড়ামাটির সিলে আবিষ্কার করেন)। গিরিনার লিপিতে রুদ্রদমনের পক্ষ থেকে যৌধেয়দের নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার গর্বিত ইতিহাস উল্লেখ পাওয়া গেলেও মুদ্রা এবং অন্যান্য শিলালেখ সূত্রে বুঝতে পারি তারা রাজাদের এই আঘাত সহ্য করেও চতুর্থ শতাব্দ পর্যন্ত খুবই বড় রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে টিকেছিল। এর পরে যৌধেয়দের নামোল্লেখ পাচ্ছি সমুদ্রগুপ্তের এলাহাবাদ স্তম্ভলিপিতে। সেখানে তাদের নাম করে বলা হচ্ছে তারা মহান গুপ্ত সাম্রাজ্যের সম্রাটের নির্দেশে ‘সব ধরণের রাজস্ব দিয়েছে, নির্দেশ পালন করেছে এবং উপাসনা করেছে’। কিন্তু শিলালিপির বাক্যগঠন এবং প্রেক্ষিত থেকে পরিষ্কার যৌধেয়রা মৌর্য রাষ্ট্র প্রশাসনিক ব্যবস্থার সরাসরি অংশ ছিল না, হয়ত ছিল সীমান্তবর্তী রাজ্য যারা মৌর্যদের বশ্যতা স্বীকার করে রাজস্ব দিত (যদিও ফ্লিট এই তথ্যটা পুরোপুরি মানেন না, কিন্তু সিলভ্যাঁ লেভি হিস্ট্রি অব নেপালের প্রথম খণ্ডে এই ধারণাটিকে সমর্থন দিয়েছেন)।

যৌধেয়দের ভৌগোলিক শাসন এলাকা তাদের মুদ্রা এবং শিলালিপি প্রাপ্তি অঞ্চল সূত্রে নির্ণয় করতে পারি। ভরতপুর রাজ্যের বিজয়গড়ে যৌধেয়দের যেমন একটি শিলালিপিতে পাওয়া গিয়েছে, তেমনি লুধিয়ানার কাছে সোনাইতএ পাওয়া গিয়েছে একটি সিল। যৌধেয় মুদ্রা পাওয়া গিয়েছে সাহারানপুরের বেহাত, শতদ্রুর পশ্চিমে দেপালপুর, সাতঘড়া, অযুধান, কাহরোর এবং মুলতানে আর পূর্বাঞ্চলের ভরতনগর, অবহোর, সির্সা, হানসি, পানিপথ, সোনাপথ অঞ্চলজুড়ে। এছাড়াও মুদ্রা পাওয়া গিয়েছে পূর্ব পাঞ্জাব, শতদ্রু আর যমুনার মধ্যেকার অঞ্চলে। দিল্লি আর কারনালের মধ্যে সোনাপথে দুটি বড় আকারে মুদ্রা পাওয়া গিয়েছে; চারটি মুদ্রা পাওয়া গিয়েছে কাংড়া জেলায় আর প্রচুর সংখ্যায় মুদ্রা পাওয়া গিয়েছে পূর্ব পাঞ্জাবের যোগাধহেরিতে। আদিবাসী সমাজের জারি করা মুদ্রা যে সব অঞ্চলে পাওয়া গিয়েছে, সেই অঞ্চলকে সেই সমাজ অধ্যুষিত অঞ্চল হিসেবে মোটামুটি ধরে নেওয়া যায়। যদিও ইতিহাসে এইটুকু তথ্য দিয়ে সন্তোষজনকভাবে আমাদের আলোচ্য বিষয় প্রমান করা মুশকিল। তবুও আমরা মুদ্রা আবিষ্কারের অঞ্চলগুলিকে শাসক সমাজের অধ্যুষিত এলাকা হিসেবে ধরে নিতে পারি যদিনা এই সত্যটি সাধারণ সম্ভাবনা এবং প্রমাণিত ধারণার বিপক্ষে যায়। মুদ্রার প্রাপ্তিস্থানগুলোর সঙ্গে প্রাপ্ত পোড়ামাটির সিল আর শিলালিপির উদ্ধার করার অঞ্চলের তথ্য মিলিয়ে যৌধেয়দের যে ভৌগোলিক এলাকার আন্দাজ পাই সেটি হল পশ্চিমে শতদ্রুর ভাওয়ালপুর বিতস্তা থেকে কাংড়া অবদি অঞ্চল, উত্তরে কাংড়া থেকে সরলরেখা ধরে পানিপথ হয়ে সাহারানপুর এবং সোনাপথ থেকে ভরতপুর এবং দক্ষিণে ভাওয়ালপুর থেকে একটা সরলরেখা ধরে সুতরঘট হয়ে ভাতনের এবং সির্সা থেকে ভরতপুর পর্যন্ত এলাকা পর্যন্ত।

এখানে বলা দরকার যৌধেয়দের রাজত্বের যে ভৌগোলিক এলাকা আমরা টানলাম, সেটি কিন্তু এলাহাবাদ স্তম্ভের শিলালিপি থেকে প্রাপ্ত তথ্যের সঙ্গে মিলে যায় — সেই শিলালিপিতে বলা হচ্ছে যৌধেয়দের রাজ্যের একদিকে মাদরাস এবং মালব এবং অন্যদিকে অর্জুনায়ন রাজ্য। আমরা বলার চেষ্টা করছি না, যৌধেয় রাজ্যের অস্তিত্ব যতদিন টিকে ছিল, ততদিনই এই সীমান্ত বজায় ছিল। আমরা যে মানচিত্রের একটা সাধারণ ধারণা এখানে পেশ করলাম, সেটা যৌধেয়দের সর্বোচ্চ ক্ষমতা পৌঁছনোর সময়ের সীমান্ত।

২। মালব — স্যর আর জি ভাণ্ডারকরের ব্যাখ্যা অনুসারে পাণিনি মালবদের পাঞ্জাবের অস্ত্র নির্ভর পেশাদার হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। আলেকজান্ডার যে মালয় সমাজকে জয় করেছিলেন, তারই অন্য নাম মালব। আজকের জয়পুরের রাজস্বদায়ী এলাকা উনিয়ারা রাজত্বের কাছে প্রাচীন নগরের অদূরে ৬,০০০ মালব রাষ্ট্রের জারি করা মুদ্রা আবিষ্কৃত হয়েছিল। মুদ্রায় খোদিত আছে মালবাহন জয়, মালবানম জয়, মালব গণস্য জয়। কোনও কোনও মুদ্রায় মাপায়া, মাগাযাস ইত্যাদি নামোল্লেখ করা হয়েছে, আন্দাজ করা হয় এগুলি মালব গোষ্ঠী প্রধানদের নাম। তবে পাণিনি যে আধিবাসী গোষ্ঠীর কথা বলছেন, সেটি আদৌ মালব গোষ্ঠী কী না সে বিষয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে।

মুদ্রার প্রাচীনত্ব নিয়ে বিতর্ক আছে। কার্লাইল এবং কানিংহ্যাম এই মুদ্রাগুলি সর্বোচ্চ ২৫০ খ্রীঃপূ সময়ের আর রাপসন এবং ভিনসেন্ট স্মিথ একে ১৫০ খ্রিঃপূ সময়ের বলেছেন। যে সব মুদ্রার বর্ণনা পাওয়াগিয়েছে, তাতে পরিষ্কার রাপসন বা স্মিথের বক্তব্য অগ্রহণযোগ্য কারন মুদ্রায় যে সব ছবি রয়েছে, সেগুলি কোনওভাবেই অশোকের সময়ে মনে হয় না।

নহপনের জামাই উষাভদত্ত তাঁর নাসিক শিলালেখয় বলছেন তিনি মালয়দের পরাজিত করেছেন। পশ্চিম ভারতের শিলালেখতে বহুবার দেখা গিয়েছে ইয় বা ভ প্রাকৃতে একে অপরের জায়গায় বসে। ফলে আমরা ধরে নিতে পারি তিনি যে মালয়দের কথা বলছেন সেটি আমাদের আলোচ্য মালব রাজ্যও হতে পারে। এই শিলালেখতে পাচ্ছি মালবদের বিরুদ্ধে বিজয়লাভ করে উষাভদত্ত পুষ্কর হ্রদে গেছেন। মাথায় রাখা দরকার পুষ্কর হ্রদ মালব শহর নগরের কাছে অবস্থিত। এখানেও প্রচুর মালব মুদ্রা পাওয়া গিয়েছে।

উষাভদত্ত শিলালেখয় লিখছেন, — And by the order of the lord I went to relieve the chief of the Uttamabhadras who was besieged for the rainy season by the Malayas, and the Malayas fled, as it were, at the sound (of my approach), and were made prisoners by the Uttamabhadras. মনে হচ্ছে যৌধেয়দের মতই মালবদের সঙ্গে শক গোষ্ঠীর প্রত্যক্ষ্য দ্বন্দ্ব ছিল, কারন তারা প্রথম খ্রিষ্টিয় শতের শেষের দিকে প্রতিবেশীদের ওপর আক্রমন করে নহপনের নেতৃত্বে একটি রাজত্ব স্থাপন করে। স্বাভাবিকভাবে ধরে নেওয়া হয় যে নহপনই আগ্রাসী ভূমিকা পালন করেছেন, কিন্তু উল্টোটাই ঘটেছিল, মালব রাজত্ব নহপন আক্রমন করে বিজয়ী হওয়ার আগে মালবেরা উত্তমভদ্র আক্রমন করে। উত্তমভদ্র ছিল যতদূরসম্ভব শক প্রধান নহপনকে রাজস্বদায়ী সমাজ।

পরের শিলালেখগুলোয় বিক্রম সম্বত অনুযায়ী বেশ কিছু তারিখ উল্লেখ করা শব্দবন্ধ পাওয়া গিয়েছে যা দিয়ে আমরা মালবদের ইতিহাস খুঁজে পেতে পারি। এগুলি হল —

ড টমাস এবং স্যর ড আর জি ভাণ্ডারেকর বলছেন গণ শব্দটি সমবায়ী সমাজের প্রতিশব্দ হিসেবে ধরা উচিত। ওপরের শব্দবন্ধ থেকে সিদ্ধান্তে এসেছেন ৫৮ খ্রিঃপূকে ‘মালব আদিবাসীদের স্বাধীনতার ভিত্তি’। তার পরের দিকে অন্যভাবে বলা হয়েছে এ বছরটিতে ‘মালবেরা গণ বা সমবায়িক সংঘ হিসেবে গঠিত হল’। অন্যদিকে ড ফ্লিট এবং অধ্যাপক ডি আর ভাণ্ডারকর অভিব্যক্তিটিকে মালব আদিবাসীদের বর্ষ গণনা শুরুর সময় মালব আদিবাসীদের বর্ষ গণনা শুরুর সময় হিসেবে গণ্য করার পক্ষপাতী।

স্পষ্টভাবে বলা দরকার, আমি টমাস আর ভাণ্ডারেকরের প্রথম ব্যাখ্যা গণ হল সমবায়িক সমাজ এই তথ্যটি মেনে নিতে রাজি, কিন্তু তাদের দ্বিতীয় সিদ্ধান্ত মালব আদিবাসীদের বর্ষ গণনা শুরুর সময় হিসেবে গণয় করছি না। তাদের দেওয়া ব্যাখ্যাকে সমর্থন জানানোর মত তথ্য ভিত্তি পাওয়া যায় নি — এটি স্রেফ উপপাদ্যমাত্র।

চতুর্থ শতের পরের সময় থেকে মালবেরা খুবই গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক রাষ্ট্র হিসেবে গণ্য হত। তারা সমুদ্রগুপ্তের কাছে পরাজিত হয় এবং যৌধেয়দের মতই গুপ্ত সাম্রাজ্যে অঙ্গীভূত হয়ে যায়। (চলবে)

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev