তৃতীয় অধ্যায়
রাজনৈতিক জীবনে সমবায়িক কাজকর্ম
৩। অর্জুনায়ন — অর্জুনায়নদের নাম উল্লেখ করা মুদ্রা খুবই কম পাওয়া গিয়েছে। এই মুদ্রাগুলি প্রথম খ্রিঃপূর। কিন্তু মুদ্রাগুলি কোথায় পাওয়া গিয়েছে তার নথিকরণ করা নেই।
অর্জুনায়নদের নাম প্রথম পাওয়া যায় সমুদ্রগুপ্তের এলাহাবাদ স্তম্ভ প্রশস্তিতে। তারা গুপ্ত সাম্রাজ্যের কাছে পরাজিত হয় এবং তাদের অবস্থা মালব এবং যৌধেয়দের মত হয়।

কোন অঞ্চলজুড়ে তারা বাস করত, সেই এলাকা আজ প্রয়োজনীয় তথ্যের অভাবে খুঁজে পাওয়া মুশকিল। একমাত্র সমুদ্রগুপ্তের এলাহাবাদ স্তম্ভে ধারাবাহিকভাবে বিন্যস্ত গণরাজ্যের নামের ক্রম থেকে অর্জুনায়নদের নাম পাওয়া যায়। মনে করা হয় লিপিটির একটি অংশ পদ্যে লেখা হয়েছিল। লিপির লেখক ছন্দের ব্যকরণের শুদ্ধতা নিয়ে খুব একটা মাথা ঘামাননি, ভৌগোলিক অবস্থান অনুযায়ী বিভিন্ন সীমাবর্তী রাজ্যের ক্রম অবস্থানের সুমারি করে সেই ক্রম অনুযায়ী তাদের নাম উল্লেখ করেছেন। অন্যান্যদের সঙ্গে মালব আর যৌধেয়দের ক্রম অনুযায়ী উল্লেখ করা হয়েছে। এই উদাহরণ থেকে আমরা সিদ্ধান্ত করতে পারি মালব-অর্জুনায়ন-যৌধেয়-মদ্রক রাষ্ট্রগুলিকে নিশ্চই ক্রম অনুযায়ী সেই স্তম্ভে সাজানো হয়েছে। এই সিদ্ধান্তটি যদি সত্যের কাছাকাছি যায়, তাহলে অর্জুনায়ন রাষ্ট্রকে আমরা মালব এবং যৌধেয়দের ভৌগোলিক অবস্থানের মাঝামঝি জায়গায় ফেলতে পারি। আজকের জাতিরাষ্ট্রের সময়ের মানচিত্রের নিরিখে অর্জুনায়ন রাষ্ট্রটি ভরতপুর এবং নগরের মাঝখানে অবস্থিত হওয়ার কথা। ভিনসেন্ট স্মিথ অর্জুনায়নদের অবস্থান নির্ণয় করেছেন আধুনিক ভরতপুর এবং আলওয়ার রাজ্যের মধ্যের অঞ্চলে। তবে বিজয়গড় শিলালিপি অনুযায়ী এই তথ্য মেনে নেওয়া সমস্যার, সেটিকে আরও উত্তরে আলওয়ারের কাছে নয় বরং ভরতপুর রাজ্যের দক্ষিণে উপস্থাপন করা দরকার।
৪। ওদুম্বর — অদুম্বর এবং তাদের দেশের উল্লেখ পাণিনিতে আছে। তাছাড়া মুদ্রাই তার অবস্থানের একমাত্র সূত্র। মুদ্রাগুলি তিনভাবে ভাগ করা যায় —
১। যেগুলিতে শুধুই আদিবাসী সমাজ ‘ওদুম্বর’ নামোল্লেখ রয়েছে
২। যেগুলিতে রাজার নাম এবং আদিবাসী গোষ্ঠী ‘ওদুম্বর’এর নাম আছে
৩। যেগুলিতে রাজার নাম আছে কিন্তু আদিবাসী গোষ্ঠীর নাম নেই।
আর ডি ব্যানার্জীর করা প্রাচীন হস্তলিপিবিদ্যা (palseography) অনুযায়ী মুদ্রাগুলির সময় কাল প্রথম খ্রিঃপূ। রাখালদাসের সময় নির্ধারণের গবেষণার সঙ্গে রাপসনের বক্তব্য হুবহু মিলে যায়, তিনিও সময় ১০০ খ্রিঃপূ নিরূপন করেছিলেন। ফলে ওদুম্বরদের অস্তিত্বের প্রাচীনতম সময় ধরা হল ১০০ খ্রিঃপূ।

কানিংহ্যাম যে মুদ্রাগুলি নিয়ে আলোচনা করেছেন, সে সব লাহোর পেরিয়ে উত্তর পাঞ্জাবের [আজকের পাকিস্তানে — অনুবাদক] জ্বালামুখী এবং পাঠানকোট জেলায় পাওয়া গিয়েছে। আর ডি ব্যানার্জী একসঙ্গে ৩৬৩টি মুদ্রা পাঞ্জাবের কাংড়া জেলার ডেরা তহশীলের ইরিপ্পাল গ্রামে পেয়েছেন। এছাড়া পাওয়া গেছে হোসিয়ারপুর জেলার মানাসওয়াল উপত্যকাতেও। অতএব মুদ্রা পাওয়ার জায়গাগুলি হল উত্তর আর পশ্চিমে রবি নদী, দক্ষিণে কাংড়া, পূর্বে কুলু অঞ্চল। মুদ্রা প্রাপ্তি নিরিখে আমরা যে অঞ্চলটি চিহ্নিত করলাম, তার সঙ্গে বৃহৎসংহিতা, মার্কেণ্ডেয় পুরাণ, এবং বিষ্ণু পুরাণের বর্ণনায় ওডুম্বর রাষ্ট্রের সঙ্গে কপিস্থল, ত্রাইগার্ত্ত এবং কুলিন্দদের বাসস্থান হিসেবে চিহ্নিত (কপিস্থলর সঙ্গে তুলনা করা যায় আধুনিক সময়ের কাইথলএর সঙ্গে যারা আম্বালার দক্ষিণে বাস করে; ত্রিগার্ত্তদের আদি বাসস্থান ছিল কাংড়া, কুলিন্দ অথবা কুনিন্দদের বাসস্থান ছিল শতদ্রুর দুই তীরবর্তী এলাকা)।
৫। কুনিন্দ — খুব হাতে গোণা মুদ্রায় কুনিন্দ নামটি উল্লিখিত হয়েছে কিন্তু অধিকাংশের আদিবাসী পরিচয়ের সঙ্গে রাজার নামও উল্লিখিত হয়েছে। এছাড়া আরও অন্যান্য ধরণের মুদ্রা পাওয়া গিয়েছে সে সব নিয়ে এখানে আর আলোচনা করছি না। মোটামুটি ধারণা করা হয় শুধু কুনিন্দ নামের মুদ্রাগুলি অন্যান্য শ্রেণীর মুদ্রার থেকে বয়সে প্রাচীন। কানিংহ্যাম অন্যান্য শ্রেণীর মুদ্রাকে ১৫০ খ্রিঃপূর পরের সময়ের বলেছেন আর রাপসন এর সময় ১০০ খ্রিঃপূর নির্ধারণ করেছেন। তাহলে সর্বপ্রাচীন মুদ্রাগুলি ২০০ খ্রিঃপূ আমলের।

কুনিন্দদের মুদ্রাগুলি যে সব অঞ্চলে পাওয়া গিয়েছে তার একটা সীমারেখা তৈরি করা গেল। পূর্বে গঙ্গা, দক্ষিণ এবং দক্ষিণ পূর্বে হস্তিনাপুর, সাহারানপুর, আম্বালা , উত্তর এবং উত্তরপূর্বে হিমালয়ের ঢাল আর উত্তর পশ্চিমে এই ঢাল শেষ করে মিশেছে আম্বালায়। এই অঞ্চলটিকে কুনিন্দদের বসবাসকারী এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করতে পারি। টলেমি বর্ণিত ‘কুলিন্দারিন’দের এলাকা ছিল বিতস্তা নদী আর গঙ্গার মধ্যেকার অঞ্চল — এর সঙ্গে মুদ্রা প্রাপ্তির অঞ্চলগুলো মিলিয়ে দেখলে, বর্ণনা অনেকটা কাছাকাছি মিলে যায়। কুনিন্দ বা কুলিন্দ, যাই হোক তাদের পাহাড়ি ঢালে বাস করার প্রমানের সঙ্গে আমরা মিলিয়ে নিতে পারি বিষ্ণু পুরাণের কুলিন্দপট্যয়ক অর্থাৎ ‘কুলিন্দ, যারা পাহাড়ি ঢালে বাস করে’।
৬। বৃষ্ণি — বৃষ্ণি সমবায়িক সমাজের নামে মাত্র ১টাই মুদ্রা পাওয়া গিয়েছে। সেটি প্রথম পাঠ করেন কানিংহ্যাম বৃষ্ণি-জনগণস্য ভূবরস্য রূপে। কানিংহ্যাম পাঠটি যখন আমি পরীক্ষা করি, আমার মনে হয়েছিল ভূবরস্যটি হওয়া উচিৎ ত্রাতরস্য। পরে একই সংশোধনী দেন বার্গনী এবং তাকে সমর্থন করেন রাপসন। বার্গনী লেখাটিকে পড়েন বৃষ্ণির (আ)জ্ঞ-গণস্য ত্র (আ)তরস্য।বার্গনী এবং রাপসন উভয়ের রাজজ্ঞ-র অর্থ করেছেন ক্ষত্রিয়। অর্থাৎ এই মুদ্রাগুলি জারি করেছিল ক্ষত্রিয় বৃষ্ণিরা।

সমাজ হিসেবে বৃষ্ণির নাম আমরা প্রথম পাচ্ছি হর্ষচরিতে, অন্য দিকে কৌটিল্য লিখছেন বৃষ্ণি সংঘ অথবা বৃষ্ণিদের সমবায়িক সমাজ হিসেবে (যতদূর সম্ভব এই ধ্রুপদী আদিবাসী সম্প্রদায়েই কৃষ্ণের জন্ম হয়েছিল)।
প্রাচীন হস্তলেখ সূত্রে আন্দাজ করা যায় মুদ্রাটি প্রথম বা দ্বিতীয় খ্রিঃপূর্বে আবির্ভূত হয়েছিল।
৭। সিবি (শিবি) — ১৮৭২-এ শ্রী কার্লাইল চিতোরের ১১ মাইল দূরে উৎখনন কালে প্রাচীন তম্বাবতী নগরী আবিষ্কার করেন। সেখানে তিনি বহু প্রাচীন মুদ্রা উদ্ধার করেন। এই উৎখনন অঞ্চলটির প্রাচীনত্ব প্রমান হয় প্রাচীনতম পাঞ্চমার্ক মুদ্রাগুলির ১১৭টাই এই অঞ্চলে আবিষ্কৃত হয়েছে। আরও আশ্চর্যের হল এই প্রকারের মুদ্রায় মঝমিকায় সিবিজনপসদ (কানংহ্যাম পড়ছেন মঝিমিকায় সিবিজনিপদস) উতকীর্ণ হয়েছে।
‘জনপদ’ শব্দের স্বীকৃত অর্থ হল সমাজ বা কমিউনিটি। যাজ্ঞবল্ক্যয় এই অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে।

মুদ্রায় উল্লিখিত শব্দবন্ধের অর্থ হল ‘মঝমিকার সিবি সমাজের’। যাজ্ঞবল্ক্য একে মনে করছেন রাজার অধীনে একটি জনপদ কিন্তু সিবি সমাজ যে মুদ্রা জারি করেছে সেখানে তারা নিজেদের চরিত্র বর্ণনা করেছে স্বাধীন রাজনৈতিক সমবায়িক সমাজ হিসেবে।
মুদ্রা সূত্রে আমরা জানছি সিবিরা মাধ্যমিক এলাকার। পতঞ্জলি বলছেন শহরটি গ্রিকেরা অবরোধ করেছিল। মাধ্যমিক সমাজের নাম পাওয়া যায় মহাভারত আর বৃহতসংহিতাতেও। তম্বাবতী নগরীর সঙ্গে মাধ্যমিকদের যোগাযোগের প্রমান হল মুদ্রায় উতকীর্ণ লিপি। এই ধরণের মুদ্রা স্টাসি আবিষ্কার করেছেন চিতোরে। কিন্তু তিনি জানিয়েছেন এই মুদ্রা তিনি চিত্তোরগড়ে কিনেছেন। কার্লাইল সূত্রে জানতে পারছি আশেপাশের নানান অঞ্চলের কৃষক এবং চাষী চিত্তোরে প্রাচীন মুদ্রা নিয়ে আসেন। ফলে কার্লাইল যে মুদ্রা পেয়েছেন বা স্ট্যাসি যে মুদ্রা কিনেছেন সেগুলি আদৌ চিত্তোর অঞ্চলের কী না সে তথ্য নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করা উচিৎ। কিন্তু কার্লাইল তম্বাবতী নগরীরর উৎখনন থেকে যে মুদ্রা সংগ্রহ করেছেন এ তথ্যও সত্য। যেহেতু এই অঞ্চলের ধ্বংসাবশেষে পাঞ্চ মার্কড মুদ্রা পাওয়া গিয়েছে, তাই এই অঞ্চলের প্রাচীনত্ব সম্বন্ধে নিসন্দিগ্ধ হওয়া যায়।
প্রাচীন মুদ্রালিপিবিদ্যা অনুসারে সিবিদের মুদ্রার গায়ে উতকীর্ণ লিপি মুদ্রাকে দ্বিতীয় খ্রিঃপূ সময়ে পেশ করে।
এই বিশদ ঐতিহাসিক আলোচন একটা বিষয়ই প্রমান করে, আমি পূর্বে গণরাজ্য বিষয়ে মন্তব্য করেছিলাম মৌর্য সাম্রাজ্য পতনের পরে বেশ কয়েকটা রাজা নিরপেক্ষ রাজনৈতিক সমবায়িক রাষ্ট্র (এটাকে অন্যভাবেও প্রমান করা যায় বিশেষ করে আগে উল্লিখিত অবদানশতকের ২২৩ পাতা থেকে। বইটি লেখা হয়েছিল প্রথম খ্রিঃপূতে এবং এই বইতে সে সময়ের ভারতের রাজনৈতিক অবস্থা, বিশেষ করে মৌর্য পরবর্তী যুগের অবস্থা লক্ষ্য করা যায়) যেমন যৌধেয়, মালব, অর্জুনায়ন, ওদুম্বর, কুনিন্দ, বৃষ্ণি এবং শিবি’র বিকাশ ঘটতে থাকে। উল্লেখ্য যে যে সব মুদ্রা পাওয়া গিয়েছে সেগুলো কিন্তু রাজার নামে ছাপানো হয় নি, বরং সমাজের নামে প্রচলিত হয়েছে। কোনও কোনও ক্ষেত্রে আদিবাসী সমাজের নামের সঙ্গে গণ শব্দটিও ব্যবহার করা হয়েছে, ফলে আমার সিদ্ধান্ত আরও দৃঢ়রূপে প্রমাণিত হয়েছে। ওডুম্বর এবং কুনিন্দদের জারি করা আদিবাসী গোষ্ঠীর মুদ্রায় সমাজের নাম ছাড়াও পরের দিকের মুদ্রা লিপিতে রাজার নামও উতকীর্ণ হচ্ছে। ফলে আমরা বুঝতে পারি আদিবাসী গোষ্ঠীদের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা রাজতন্ত্রে পরিবর্তিত হয়ে যাওয়ার সময়টাকে। দ্বিতীয় শ্রেণীর ওদুম্বর মুদ্রা থেকে এই ইন্টারমিডিয়েট অবস্থা অর্থাৎ গণতান্ত্রিক মনোভাব আর বাড়তে থাকা রাজতন্ত্রের প্রভাবের সময়টা আন্দাজ করতে পারি। তাই বিচক্ষণতায় গোষ্ঠীর সঙ্গে রাজার নামটাও জুড়ে দেওয়া হয়েছে। পরের দিকে রাজতন্ত্রের সম্পূর্ণ বিজয় ঘটে এবং আদিবাসী পদ এবং নাম সমূহের বিলয় ঘটতে থাকে মুদ্রা লিপিতে। সিবির ক্ষেত্রে যতদূরসম্ভব গ্রিক লেখকদের লেখায় উল্লিখিত ন্যাস বা অছির মত এটা একটা শহর-রাষ্ট্র ছিল।

আমরা দেখেছি কিছু কিছু রাজনৈতিক সমবায়িক সমাজ ক্ষমতা এবং সম্পদের অধিকারী হয়ে দেশের বিপুল জনগণের ওপর প্রভাব বিস্তার করেছিল। যৌধেয়দের খ্যাতি ছিল খুব বড় রাজনৈতিক সমাজ এবং [অবিভক্ত] পাঞ্জাবের বিপুল এলাকায় অসামান্য প্রভাব তৈরি করেছিল। মালবেরাও এতই ক্ষমতাশালী হয়ে ওঠে যে একটা রাজ্যের নাম তাদের নামে চিহ্নিত হতে থাকে। দুটি রাষ্ট্র ব্যবস্থাই বিদেশি হানাদারদের বিশেষ করে Scythian বা শকে হানাদারদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিল। লড়াইটা দীর্ঘকাল ধরে চলেছিল — আমরা দেখি মালবেরা নহপন, রুদ্রদমন আর যৌধেয়দের বাহিনীর বিরুদ্ধে একযোগে লড়েছিল এবং শেষ পর্যন্ত হেরেগিয়েছিল। অন্যান্য রাজনৈতিক সমবায়িক সঙ্গঠনও বিদেশিদের বিরুদ্ধে লড়েছিল এবং তারাও পরাজিত হয়েছিল। রাষ্ট্রগুলোর পতন এবং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা থেকে রাজকীয় ব্যবস্থায় রূপান্তরের এই পর্বটা মুদ্রা লিপিতে ধারা রয়েছে। জাতীয় দুঃসময়ে কীভাবে কোনও উচ্চাভিলাষী ভাগ্যসন্ধানী রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে দুমড়েমুচড়ে নিজের তাঁবে নিয়ে এসে রাজত্ব কায়েম করে তার ইতিহাস খুব কম নয়। এই সময়ে গুপ্তদের উত্থান পর্বটাও মাথায় রাখা দরকার। আমরা দেখেছি কীভাবে অজাতশত্রু সাম্রাজ্য তৈরি করতে এই রাজনৈতিক সমবায় বা গণ রাষ্ট্রগুলিকে দমনব করেছেন। গুপ্তরা দখল করা গণদের সঙ্গে নতুন কোনও সম্পর্ক স্থাপন করছে না। এলাহাবাদ স্তম্ভ প্রশস্তিতে দেখছি সমুদ্রগুপ্ত যৌধেয়, মালব এবং অর্জুনায়নদের রাজস্ব দিতে এবং তাঁর শাসন মেনে নিতে বাধ্য করছেন।
গণগুলির পতনের দুটো কারন, প্রথম হল ভারতবর্ষের বাইরে থেকে আক্রমন এবং দ্বিতীয়ত দেশের মধ্যে থেকেও প্রতিবেশী রাজ্যের আক্রমন। এই যৌথ লড়াইতে রাজনৈতিক সমবায়িক রাষ্ট্রগুলোর পতন ঘটছে। তারা এই আক্রমন বহুকাল ধরেই সহ্য করে আসছে। আলেকজান্ডারের সময় থেকে যে লড়াই শুরু হয়েছে, অজাতশত্রুর সময়েও সে যুদ্ধের বিরাম ঘটে নি। তবুও তারা গুপ্ত রাজত্ব পর্যন্ত আলাদা ধরণের রাজনৈতিক চরিত্র নিয়ে অস্তিত্ব রক্ষা করে এসেছে। একদিকে সাম্রাজ্য বিস্তার করার প্রবক্তারা গণগুলিকে ধ্বংস করে নিজেদের সাম্রাজ্যের অঙ্গীভূত করার উদ্যম নিয়েছে অন্যদিকে অন্যান্য প্রতিবেশী নতুন ধরণের নিয়মকানুন বানিয়ে গণরা যাতে আরও বেশি দিন টিকে থাকতে পারে, বিকাশলাভ করতে পারে তার সুযোগ সুবিধে তৈরির ব্যবস্থা করেছে। এই ঘাত প্রতিঘাত দীর্ঘকাল ধরে চলেছে। বাস্তব হল, পঞ্চম শতাব্দ থেকে গণরাজ্যগুলো ভারতবর্ষীয় রাজনীতিতে তাদের আধিপত্য বজায় রাখা তো দূরস্থান, তাদের অস্তিত্বও টিকিয়ে রাখতে পারল না। একসময়ের ইতিহাসে তাদের অস্তিত্ব পর্যন্ত খুঁজে পাওয়া গেল না। ফলে রাজনৈতিক তাত্ত্বিকেরাও তাদের অগ্রাহ্য করতে থাকে। পুরাণ বা ধর্মশাস্ত্রে তাদের অস্তিত্ব থাকল না এবং ভারতবর্ষ জুড়ে সাম্রাজ্যবাদেরই বিস্তৃতি ঘটতে থাকল একাদিক্রমে। কেন্দ্রিভূত সাম্রাজ্যই একমাত্র রাজনৈতিক ব্যবস্থা হল। কোনও পেশাদার রাজনৈটিক তাত্ত্বিক যেমন শুক্রনীতির লেখক তাদের সম্বন্ধে একটাও বাক্য ব্যয় করলেন না। ক্রমশ এমন অবস্থা তৈরি হল যে বিপুল উদাহরণ সত্ত্বেও এই ব্যবস্থাকে মনে হল পশ্চিমের দান, অথচ এ ধরণের ব্যবস্থা তাদের বহু আগে ভারতে বিকশিত হয়েছিল। (চলবে)