চতুর্থ অধ্যায়
ধর্মীয় জীবনে সমবায়িক উদ্যম
চার
বুদ্ধদেবের প্রয়াণের পর দুর্বল কেন্দ্রিয় কর্তৃপক্ষ অদৃশ্য হয়ে গেল কারন মহান নেতা কাউকেই তার উত্তরসূরী (হেন্ড্রিক কার্ন বলছেন বুদ্ধ মহান কাশ্যপকে তার উত্তরসূরী মনোনীত করেন। কিন্তু মহাপরিনিব্বানসুত্ত অনুযায়ী যে ভাষ্যকে বুদ্ধের নিজস্ব বক্তব্য হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে, তাতে আরও ভাবনার খোরাক থেকে যায় “It may be, Ananda, that in some of you the thought may arise,” The word of the Master is ended, we have no teacher more!” But it is not thus Ananda that you should regard it. The truths and the rules of the Order which I have set forth and laid down for you all, let them, after I am gone, be the Teacher to yon.”) মনোনীত করেন নি এবং তার অবর্তমানে সংঘের ব্যবস্থাপনা কী হবে সেটাও তিনি স্পষ্টভাবে দিশা নির্দেশ দিয়ে যান নি। ফলে বুদ্ধ সংঘের কেন্দ্রিয় ক্ষমতা হ্রাস পাওয়ায় সেটি বেশ কয়েকটি স্থানীয় সমবায়িক সমাজে পরিণত হওয়ার আশংকা দেখা দিল। কিন্তু বেশ কিছু সে সময়ে এমন কিছু পরিস্থিতি তৈরি হল যে সংঘ বিচ্ছিন্নতার ঢালে গড়িয়ে গেল না।
প্রথমত স্থানীয় শাখা সংগঠনগুলি কেন্দ্র নিরপেক্ষ স্বশাসিত সংগঠন হয়ে ওঠার প্রক্রিয়ায় সমস্যা ছিল — যেহেতু ভিক্ষুদের কোনও একটি শাখায় বেশিদিন থাকার নিয়ম ছিল না, তাদের একটার পর একটা স্থানীয় সংঘ শাখায় ঘুরে বেড়াতে হত। বৌদ্ধ ভিক্ষুদের ঘুরে বেড়াবার চরিত্র থেকে সিদ্ধান্ত করা যায় অস্থায়ীভাবে কোনও একটি সংঘ এককে কিছু দিন করে থাকায়, স্থানীয় সংঘগুলিতে স্বাধীনতার ইচ্ছে জেগে ওঠা সম্ভব ছিল না।
দ্বিতীয়ত পরের দিকে বৌদ্ধ সাম্রাজ্যকে বৌদ্ধ সংঘের কর্তা হিসেবে গণ্য করা হতে থাকে এবং মোর্য সম্রাট অশোক সংঘের সর্বোচ্চ কর্তার স্থান গ্রহণ করেন।
তৃতীয়ত সংঘের সাধারণ সভা নিয়মিত আয়োজনের মাধ্যমে অবিভক্ত ঐক্যবদ্ধ সংঘের ধারণাটি ক্রমশ পুষ্ট হতে থাকে। সংঘ ভাগ হয়ে যাওয়ার অবস্থায় এসে দাঁড়ালে এই পরিস্থিতিগুলো, ব্যবস্থাগুলো সেই বিভাজনের প্রক্রিয়া রুদ্ধ করে। এই প্রচেষ্টার ফলে প্রাচীন ভারতের সঙ্ঘগুলোর সমবায়িক ধারণার মর্মার্থটি নতুন করে পুনরুত্থান হয়। চারটি সঙ্গীতি এবং বৈশালীর আরেকটি সম্মিলনের যে বিশদ বিবরণ পাচ্ছি, সেই তথ্য এবং তার পরের ঘটনাবলীর প্রবাহ থেকে পরিষ্কার, এই সব প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সংঘ তার একতা বজায় রাখতে সমর্থ হয় (সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ পারিপার্শ্বিক ঘটনা বিবৃত হয়েছে বিনয়পিটপকের চুল্লভগগের দ্বাদশ সর্গে। কার্ন বিষয়টি সংক্ষিপ্তভাবে উল্লেখ করছেন এইভাবে, ভগবান তথাগতের পরিনির্বাণের এক শতাব্দ কেটে গেছে। বৈশালীর বৃজ্জি গোত্রের ভিক্ষুরা (বজ্জিপুত্রীয় ভিক্ষুরা) বিনয় বহির্ভূত দশ শীল (এর আগে আমরা শীল বা দশ বত্থুনি সংক্ষেপে উল্লেখ করেছি) নিজেদের মত করে পালন করার কথা ঘোষণা করেছে। এই সময়ে, কাকন্দকের পুত্র স্থবির যশ বৈশালীর মহাবনে উপস্থিত হলেন এবং বৃজ্জি ভিক্ষুদের বিনয় বহির্ভূত এবং সংঘ পরিপন্থী গর্হিত আচরণ করা থেকে বিরত থাকার অনুরোধ জানালেন। বৃজ্জি গোত্রের ভিক্ষুরা (বজ্জিপুত্রীয় ভিক্ষুরা) তাঁর অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করলেন। তখন যশ স্থবির বিনয়ী এবং ধার্মিক ভিক্ষুদের বিনয় বহির্ভূত কর্ম পালন না করার অনুরোধ জানান। তারা ক্ষিপ্ত হয়ে যশ স্থবিরকে পাল্টা পাটসারনীয় কর্ম অর্থাৎ পুনর্মিলনের আহ্বান জানান। যশ স্থবির দুর্বিনীত ভিক্ষুদের কথায় প্রভাবিত না হয়ে ধর্ম রক্ষার জন্যে ধার্মিক বৈশালীবাসীদের অনুরোধ করেন। তিনি অসামান্য বাকচাতুর্যে প্রত্যেককে তার যুক্তি বোঝাতে সক্ষম হন এবং বৈশালীবাসীরা তাঁকে যোগ্য শাক্যপুত্র এবং শ্রমণ হিসেবে স্বীকার করলেন। কিন্তু বজ্জিপুত্র ভিক্ষুরা উৎক্ষেপনী দণ্ড দিয়ে যশকে সংঘ থেকে বহিষ্কার করে। যশ স্বয়ং মহাসঙ্গীতি আয়োজন করার বার্তা নিয়ে কৌশাম্বী গেলেন; একইসঙ্গে তিনি বার্তা পাঠালেন পশ্চিম দেশগুলো যেমন অবন্তী এবং দক্ষিণ দেশগুলোর ভিক্ষুদের কাছেও। যশের ডাকে এই সব অঞ্চল থেকে ৭০০ ভিক্ষু কৌশাম্বী এলেন। যথাযথ বিনয় পালন বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের সম্মিলনীটি শুরু হল। রেবতের প্রস্তাব ছিল আলোচনাটা হওয়া উচিৎ যেখানে সমস্যাটা শুরু হয়েছিল সেই অবচল অর্থাৎ বৈশালীতে। সিদ্ধান্ত নেওয়া হল। প্রত্যেক ভিক্ষু বৈশালীতে চললেন। বৈশালীতে সংঘের বৈঠকে কোনও সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা গেল না। রেবত উপস্থিত ভিক্ষুদের সামনে এই বিষয়টি বিবেচনার জন্যে একটি সমিতি গড়ার প্রস্তাব পেশ করেন। তিনি পূর্ব দেশের ৪ জন ভিক্ষু এবং পশ্চিমের ৪ জন ভিক্ষুকে নিয়ে মোট ৮ জনের একটি সমিতি তৈরি করেন। কনিষ্ঠতম ভিক্ষু অজিত এই কাজ নিরীক্ষণ করার দায়িত্ব পান। এই কাজের জন্যে বলিকর্ম নামক শান্তিপূর্ণ স্থান বেছে নেওয়া হল। সমিতির কাজকর্ম চলতে থাকে এরকম করে, রেবত একটি করে প্রশ্ন তুলতে থাকেন তার প্রামাণিক পাণ্ডিত্যপূর্ণ উত্তর দিতে থাকেন সব্বকামিন। বৈশালীর বৃজ্জি গোত্রের ভিক্ষুরা (বজ্জিপুত্রীয় ভিক্ষুরা) যে সব বিনয় বহির্ভূত দশ শীল বা দশ বত্থুনি নিজেদের মত করে পালন করছিলেন সেগুলি সংঘ বহির্ভূত নিয়ম হিসেবে ঘোষণা করা হল (Kern’s Manual of Indian Buddhism,pp. 103-5.)।
তবে এগুলোর কোনওটাই শাখাগুলোর মধ্যে দৈনন্দিনের সফল সংযোগ রক্ষার ব্যবস্থার জন্যে যথেষ্ট ছিল না। ওপরে যে তিনটে অবস্থার কথা আলোচনা করলাম, তার প্রথমটার ব্যবহারিক উপযোগিতা সংঘের বিচ্ছিন্নতাবাদী প্রবণতা রুখতে পারছিল না। কেন্দ্র থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার প্রবণতা ক্রমশ বৃদ্ধি পেতে থাকে। দ্বিতীয়তা অনিশ্চিত চরিত্রের এবং দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে অনুষ্ঠিত হত — বাস্তবিকই ১,০০০ বছরের বুদ্ধপন্থের ইতিহাসে সংঘ রক্ষক হিসেবে তিনজন মাত্র গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্র চরিত্র অশোক, কণিষ্ক এবং হর্ষ আবির্ভূত হয়েছেন এবং বাঁধ দিতে সক্ষম হয়েছেন। শেষতম মহাসঙ্গীতি আহ্বান করে পতন বাঁচাবার চেষ্টা কার্যকর প্রমানিত হল। কিন্তু আমার ধারণা মহাসঙ্গীতিককে বিবেচনা করতে হবে সংঘের সংবিধানের চরিত্রের মধ্যেই যে সব ত্রুটিবিচ্যুতি রয়েছে সেগুলিকে মেরামত করার মরিয়া এবং ব্যতিক্রমী প্রয়াস হিসেবে ।
এই অনৈক্যের ছাপ সংঘের দেহে পরিষ্কারভাবে ফুটে উঠতে শুরু করেছে। প্রত্যেকটি সফল মহাসঙ্গীতি আয়োজনে সংঘের প্রতিনিধি চরিত্র হ্রাস ঘটল (The result of this state ol things is clearly seen in the repeated schisms within the bosom of the Church, and the less and less representative character of each succeeding general Council)। তবুও বলা দরকার কেন্দ্রীভূত বৌদ্ধ সংঘের ধারণাটি বৌদ্ধপন্থের চরিত্রে সে তাত্ত্বিকভাবেই হোক, বা জনগণের মনেই হোক, মুছে যায় নি। কিন্তু বাস্তবিক ব্যাপার হল মানুষ সংঘ বলতে কোনও বিশালকায় কেন্দ্রিয় বৌদ্ধ সংঘ বুঝত না। তার দৈনন্দিন জীবনে সংঘ বলতে তার এলাকার ছোট্ট বৌদ্ধ সংঘটিকেই সে মান্যতা দিয়েছে এবং নিজের জীবনের সঙ্গে জুড়ে রেখেছে।
বিভিন্ন শিলালেখ সূত্রে সংঘের এই দ্বৈতসত্ত্বাকে আমরা খুঁজে পাই। কোনও প্রশস্তিতে যেমন স্থানীয় সংঘ বা ভিক্ষুদের বিশেষ সমাজকে দানের বিষয়টি উল্লিখিত হচ্ছে, তেমনি সামগ্রিকভাবে বৌদ্ধজনসমাজকেও (সংঘস চতুদিসস Samghasa chatudisasa) লক্ষ্য রেখে দান করা হয়েছে।
পাঁচ
স্থানীয় সংঘগুলো শাসিত হত কঠোরভাবে গণতান্ত্রিক রীতিনীতি মেনে। ভিক্ষুদের সম্মিলন অথবা মহাসঙ্গীতিতে সার্বভৌম কর্তৃত্ব এবং বৈঠকের পদ্ধতি সমূহ বিশদে লেখা হল।
প্রাথমিকভাবে কোনও এক স্থানীয় সংঘ সমাজ এককে প্রত্যেক দীক্ষিত ভিক্ষুকে সমাজ সভার সদস্য হতে হত। শাস্তিপ্রাপ্ত ভিক্ষু বাদ দিলে, প্রত্যেক ভিক্ষুই ভোট দেওয়ার অধিকারী ছিলেন। যারা ভোট দেওয়ার অধিকারী অথচ ভোটের দিন সভায় উপস্থিত নন বা উপস্থিত থাকতে পারেন না, তারাও পছন্দের সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিতেন। ন্যুনতম কতজন সদস্য উপস্থিত থাকলে আলোচনাসভাটি বৈধরূপে গণ্য হবে তার বিশদ বিবরণ মহাভগগের নবম অধ্যায়ে উল্লিখিত হয়েছে। বিভিন্ন শ্রেণী এবং বিভিন্ন কাজের জন্যে এই অংশ নিতে পারা ভিক্ষুদের সংখ্যা পরিবর্তিত হয়। কোনও কোনও বৈঠক ৪ নেও বৈধ হয়, কোনও কোনও বৈঠকে ২০ জন ভিক্ষুর উপস্থিত প্রয়োজন হয়। বৈঠকে কোনও সদস্য যদি মনে করেন যে আলোচনাটি সংবিধান সম্মত হচ্ছে না, তিনি প্রতিবাদ করতে পারতেন।
নিয়ম মেনে সংঘ, সভা আয়োজনের পরে বৈঠকের আহ্বায়ক সেদিনের আলোচ্য বিষয় উপস্থিত করতেন — এই ঘোষণাকর নাম ছিল নাত্তি (natti)। নাত্তি ঘোষণার পরে উপস্থিত ভিক্ষুদের প্রতি প্রশ্ন বা কম্মবচ্ছ (kammavacha) করে তাদের সম্মতি চাওয়া হত। প্রশ্নগুলো হয় এক বা তিনবার উপস্থাপন করা হত — একবার উত্থাপনকে বলা হত নাত্তিদুতিয় কম্ম (nattidtitiya kamma); তিনবার উপস্থাপনকে বলা হত নাত্তিচতুত্থ কম্ম (nattichatuttha Kamma)। প্রথম এবং দ্বিতীয়, প্রত্যেকটি কাজ কোন ধারা অনুযায়ী উপস্থপন করা হল, সেটিও বিশদে লিখে রাখা হত। এই বাঁধাধরা পথ থেকে বিন্দুমাত্র বিচ্যুত ঘটলে সামগ্রিক প্রক্রিয়াকে কেন্দ্রিয়ভাবে অবৈধ ঘোষণা করা হত। মহাভগগতে বলা হয়েছে, If one performs, O Bhikkhus, a nattidtitiya act with one natti, and does not proclaim a kammavacha, such an act is unlawful. If one performs, O Bhikkhus, a nattidutiya act with two nattis and does not proclaim a kammavacha with one kammavacha and does not propose a natti with two kammavachas and does not propose natti, such an act is unlawful.
কোনও প্রস্তাব সংঘের সামনে একবার বা তিনবার উপস্থিত করার পরে যদি প্রত্যেক সদস্য উত্তর না দিয়ে নীরব থাকার সিদ্ধান্ত নেন, তাহলে প্রস্তাবটি স্বাভাবিকভাবে গৃহীত হয়। যদি কেউ প্রস্তাবের বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট মত প্রকাশ করেন তাহলে সংখ্যাগরিষ্ঠের মত প্রাধান্য পায়। বৈঠকে নিয়মিত ভোট নেওয়া হত এবং ভোট সংগ্রাহকের নাম সংঘ প্রস্তাব করত।
আলোচ্য বিষয় যদি খুবই গুরুত্বপূর্ণ অথবা জটিল হিসেবে চিহ্নিত হয়, তাহলে সেই বিষয়টিকে বিবেচনার জন্যে আরও বড় সংখ্যার ভিক্ষু বাস করা সঙ্ঘে নতুন করে বিবেচনার জন্যে পাঠানো হত। এই পদ্ধতির বর্ণনা চুল্লবগ্গে বিশদে লিখিত হয়েছে। যে সংঘকে বিষয়টি নতুন করে বিবেচনার জন্যে পাঠানোর কথা ভাবা হছে, প্রাথমিকভাবে তাদেরকে জিজ্ঞাসা করা হয় আদৌ ত্যতারা বিষয়টি বিবেচনা করতে রাজি আছেন কী না। তাদের সম্মতি পাওয়া গেলে নিশ্চিত করা হয় যে তাদের গৃহীত সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়া হবে। যে সংঘে বিষয়টা পর্যালোচনার জন্যে পাঠানো হল, সেখানেও একই পদ্ধতিতে আলোচনা এগোত। সেখানেও বিষয়টাকে যদি খুবই জটিল মনে করা হত বা আলোচ্য বৈঠকে উদেশ্যহীন বক্তব্য উপস্থাপিত হত, বিষয়টিকে একটি ছোট সমিতিতে বিচারের জন্যে পাঠানো হত। কমিটিটি তৈরি হয় সর্বোচ্চ খ্যাতি সমৃদ্ধ কয়েকজন ভিক্ষুকে নিয়ে। তাদের নিয়োগের জন্যে একটি নির্দেশনামা জারি করা হয়। তারাও যদি কোনও সিদ্ধান্তে অবতীর্ণ না হতে পারে, তাহলে যে সংঘটি তাদের কাছে বিষয়টি পাঠিয়েছিল তাদের কাছে পাঠিয়ে দেয় সংখ্যাগরিষ্ঠের সিদ্ধান্তর জন্যে।
যদিও সংখ্যাগরিষ্ঠের সিদ্ধান্তই সাধারণভাবে দ্বন্দ্ব মেটাবার জন্যে পদ্ধতি হিসেবে ব্যবহার করা হয় কিন্তু বৌদ্ধ সাহিত্য বা শাস্ত্রে বলা হয়েছে এটাই সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়ার সাধারণ অথবা একমাত্র পদ্ধতি নয়। চুল্লবগ্গ চতুর্থ অধ্যায়ে কোনও সিদ্ধান্তের পক্ষে পড়া ভোট অসিদ্ধ হয়ে যায়, যখন দেখা যায়, যিনি ভোট গ্রহণ করছেন, বোঝেন যারা ভোট দিয়েছেন তারা আইনানুগ সিদ্ধান্ত নিতে ব্যর্থ হচ্ছেন এবং তারা সংখ্যাগরিষ্ঠ। আবার গোপন ভোটেরও ব্যবস্থা ছিল, if the taker of votes ascertained that those whose opinion was against the Dhamma were in the majority, he was to reject the vote as wrongly taken। তবে সাধারণভাবে অনুসৃত গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রক্রিয়া থেকে বিচ্যুতি কেন ঘটল, সেটা ব্যাখ্যা করা মুশকিল। কীভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠের সিদ্ধান্ত অগ্রাহ্য করার প্রক্রিয়া গৃহীত হল, সে বিষয়ে বৌদ্ধ সাহিত্য এবং শাস্ত্র নিশ্চুপ।
স্থানীয় সংঘের ভিক্ষুরা নানান ধর্মনিরপেক্ষ কাজকর্ম সম্পাদন করতেন নির্দিষ্ট আধিকারিক মার্ফত। এই আধিকারিকেরা যথাবিহিত পদ্ধতিতে নিযুক্ত হতেন। আধিকারিকদের পদের নাম এবং সংখ্যা ভিন্ন ভিন্ন এলাকায় ভিন্ন ভিন্ন হত। এদের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণরা ছিলেন, ১। খাদ্য ফল আর চালের মণ্ড সরবরাহকারী, ২। ভাণ্ডার রক্ষক, ৩। থাকার ব্যবস্থা নিয়ামক, ৪। চিবর গ্রাহক, ৫। চিবর বিতরক, ৬। বর্ষাতি আর স্নানের কাপড় রক্ষক, ৭। ভিক্ষাপাত্র রক্ষক, ৮। মালিদের সর্বাধিনায়ক। ভিক্ষুদের থেকেই আধিকারিক নিযুক্ত হতেন এবং তাদের মধ্যে সব থেকে সম্মানিতরাই কাজের দায়িত্বভার পেতেন।
স্থানীয় সংঘ ব্যক্তি ভিক্ষুর ওপর সম্পূর্ণ কর্তৃত্ব স্থাপন করত এবং তাদের ওপর নানাস্তরের শাস্তির বোঝা চাপিয়ে দিত যেমন ১। তাজ্জানিয় কম্ম (Tajjaniya kamma বা তিরষ্কার করা) ২। নিসায় কম্ম (Nissaya kamma বা শিক্ষাধীন রাখা) ৩। পবজ্জনীয় কম্ম (Pabbajaniya kamma বা বহিষ্কার/নির্বাসন) ৪। পাটিসরনীয় কম্ম (Fatisaraniya kamma বা আইন সংশোধন করা) ৫। উক্ষেপনিয় কম্ম (Ukkhepaniya kafuma বা বরখাস্ত করা)। কারা কারা এই শাস্তির যোগ্য হয় অতগবা কেনই বা এই শাস্তি দেওয়া হয়, তার বিশদ বিবরণ চুল্লবগ্গের প্রথম খণ্ডকতে আছে। এছাড়াও শিক্ষানবিশী বা পরিবাসা এবং অনুতাপ/প্রায়শ্চিত্ত অথবা মনত্ত – বিষয়গুলি বিশদে লিখিত হয়েছে চুল্লবগ্গের দ্বিতীয় এবং তৃতীয় খণ্ডকতে। এছাড়াও ছিল সংঘ থেকে বহিষ্কার। বৌদ্ধপন্থের সব থেকে বড় শাস্তি। চরমতম শাস্তিগুলি দেওয়ার কারনগুলি বর্ণিত হয়েছে পত্তিমোক্ষর ( Patimokkha) পরাজিক (Parajika) অধ্যায়ে। (চলবে)