চতুর্থ অধ্যায়
ধর্মীয় জীবনে সমবায়িক উদ্যম
পাঁচ
বৌদ্ধ সংঘে ভিক্ষুণীরা প্রথম থেকেই আলাদা সমাজ হিসেবে গণ্য হয়েছে। ভিক্ষুদের মত একই নিয়মের অধীনে ভিক্ষুণীদের নিজস্ব সংঘ কাঠামো ছিল। তবে ভিক্ষুণী সংঘকে বাস্তবিক ব্যবহারিক উদ্দেশ্যেই ভিক্ষুসংঘের অধীনে থাকতে হত। ভিক্ষুণী সংঘে ভিক্ষুণির অন্তর্ভূক্তির পদ্ধতি ভিক্ষু সংঘের কাছাকাছি নিয়মেই হত। তবে সাধারণভাবে বৌদ্ধ শাস্ত্রে ভিক্ষুদের তুলনায় ভিক্ষুণীদের অবস্থান তুলনামূলকভাবে অপকৃষ্ট হিসেবে গণ্য হয়েছে, কারন মহান বুদ্ধ মনে করতেন সংঘে মহিলাদের প্রবেশ ঘটলে সংঘের বিশুদ্ধতা ধ্বংস হবে। সংঘকে পতন থেকে বাঁচাতে নানান ধরণের নিরাপত্তার বেড়াজাল তৈরি করা হলেও ভিক্ষুদের নিয়ন্ত্রণ করার সূত্রগুলি ভিক্ষুণীদের ওপরেও কার্যকর হত। চুল্লবগ্গের দশম অধ্যায়ে মহান বুদ্ধ আনন্দকে বলেছিলেন অন্যান্য ধর্মীয় গোষ্ঠী মহিলাদেরও তাদের সংঘে প্রবেশ করার অনুমতি দিয়েছিলেন (এ প্রসঙ্গে নারীদের বৌদ্ধ সংঘে প্রবেশাধিকার এবং সংঘে প্রবেশের আন্দোলন বিষয়ে বুদ্ধদেবের প্রতিক্রিয়া জানিতে পাঠকের জন্যে একটা আশ্চর্যজনক পাঠ দেওয়া গেল। সিদ্ধার্থের জন্মের সাত দিন পর মা মায়াদেবীর মৃত্যু হয়। মহাপ্রজাপতি গৌতমী শিশুকাল থেকে সিদ্ধার্থকে লালন পালনের ভার স্বহস্তে গ্রহণ করলেন। ভ্রাতা নন্দের মাতা গৌতমী নিজ পুত্রের [নন্দের] দেখাশোনার ভার ধাত্রীর হাতে অর্পণ করে, শিশু সিদ্ধার্থের পরিচর্যা করেন। বহুকাল কেটে গেছে। গৌতম বোধি লাভ করেছেন। তিনি বৈশালীতে অবস্থান করার সময় রাজা শুদ্ধোদন দেহ ত্যাগ করেছেন। রাজা শুদ্ধোদনের মৃত্যুর পর মহাপ্রজাপতি গৌতমী সংসার ত্যাগে সংকল্পাবদ্ধ হন। পালিত মাতা, সঙ্ঘে প্রবেশের জন্যে বুদ্ধের অনুমতি লাভের অপেক্ষায় রইলেন দীর্ঘকাল। যে সময়ে তিনি সঙ্ঘে প্রবেশের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, সে সময় শাক্য ও কোলীয়দের মধ্যে রোহিনী নদীর জল বন্টন নিয়ে বিবাদের সুত্রপাত ঘটছিল। দুই সমাজের কলহের মীমাংসার জন্য বুদ্ধদেব কপিলবস্তু এলেন। কপিলাবস্তুতে বুদ্ধ এসেছেন সংবাদ পেয়ে মহাপ্রজাপতি গৌতমী পাঁচশত শাক্য রমণী সমবিব্যহারে বুদ্ধের নিকট কপিলাবস্তুতে উপস্থিত হন। তিনি বুদ্ধের কাছে নারীদের জন্যে ভিক্ষুণীব্রত পালনের অনুমতি প্রার্থনা করলেন। বুদ্ধ পালিত মাতার আবেদনে অসম্মত হলেন এবং বৈশালী চলে যান। মহাপ্রজাপতি গৌতমী হতাশ হলেন না। তিনি পাঁচশত সহচরীসহ ৩৪৫ দীর্ঘপথ হেঁটে বৈশালীতেও বুদ্ধের সম্মুখে উপস্থিত হলেন। তিনি ভিক্ষুণীব্রত গ্রহণের জন্য বুদ্ধকে দ্বিতীয়বার অনুরোধ করলেন। এবারও বুদ্ধ সম্মত হলেন না। প্রধান শিষ্য (ঘনিষ্ঠতম সহচর) আনন্দ স্থবির দীর্ঘ দিন ধরে ভিক্ষুণীদের সঙ্ঘে নেওয়ার বিষয়ে বুদ্ধর সঙ্গে নিরন্তর আলাপ আলোচনা করছিলেন।
এবারে আনন্দ নতুন করে বিষয়টা বুদ্ধদেবের সামনে উপস্থিত করলেন। এই অনুরোধে কাজ হল। অবশেষে বুদ্ধ সম্মত হলেন। প্রথম ভিক্ষুণী সংঘ প্রতিষ্ঠিত হল গৌতমীর উদ্যমে। ভিক্ষুণী সংঘের জন্যে কঠিনতম আটটা নিয়ম তৈরি করে দিলেনন স্বয়ং গৌতম। ধম্মপদত্থকথা অনুসারে, গৌতমীর উপসম্পদা আনুষ্ঠানিক ভাবে না হওয়ায়, পরবর্তীকালে ভিক্ষুণীরা তাঁর সঙ্গে উপোসত্থ করতে অরাজী হন, যদিও জানা যায় গৌতম বুদ্ধ স্বয়ং ঘোষণা করেছিলেন তিনি গৌতমীকে নিয়মনিষ্ঠভাবে উপসম্পদাপ্রদান করেছিলেন। গৌতম তাঁকে ধর্মশিক্ষা দিলে তিনি অর্হৎ হন।
সংঘে নারীদের অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন ওঠা শেষ হল না। জল গড়াল বুদ্ধের তিরোধানের পরেও। বহু পন্থগুরুর মত বুদ্ধও জীবিতকালে তাঁর মতামত ইত্যাদি কিছুই লিখে যান নি। কিন্তু বুদ্ধ রাজারপুত্র, তার বন্ধু এবং অনুগামীরা শ্রেষ্ঠীপুত্র। তিনি জীবিত থাকার সময়েই বিশাল বিপুল সন্নাসীনির্ভর কাঠামো তৈরি হয়ে গিয়েছে দেশ জুড়ে। তাঁর সঙ্গে জুড়ে রয়েছেন লক্ষ লক্ষ ভিক্ষু ইত্যাদি। তাই বুদ্ধ সংঘ ধর্ম ইত্যাদি বিষয়ে কী নিদান দিছেন সেটা লিখে রাখা জরুরি হয়ে পড়ল, না হলে সংঘর কর্তৃত্ব আর কেন্দ্রিভবন বাঁচানো দায়। বুদ্ধ থাকাকালীন সংঘের কঠোরতা নিয়ে ভিক্ষুদের মধ্যে ব্যাপক অশান্তি চলছিল। বুদ্ধ যেদিন মারা যান, মণিকুন্তলা হালদার বৌদ্ধধর্মের ইতিহাসে লিখছেন, সেই সংবাদে এক ভিক্ষু বললেন শান্তি পাওয়া গেল, এবারে সঙ্ঘে কঠোরতা কমবে।
এছাড়াও নানান অনুগামী সমাজেও সমাজে ব্যাপক বিরোধ দেখা দিচ্ছিল। সে জন্যে বুদ্ধের বাণীগুলি লিখিত আকার দেওয়ার জন্যে প্রথম সঙ্গীতির আয়োজন করা হল। প্রাথমিকভাবে বুদ্ধের একান্ত সচিব বা ঘনিষ্ঠতম আনন্দকে (যিনি সংগীতির আগে অর্হৎ ছিলেন না, এবং সেই জন্যে সংগীতিতে তাঁর যোগদান করা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছিল। তিনি সংগীতির আগের রাতে অর্হত্ব লাভ করেন) ভার দেওয়া হয় বাণীগুলি সংকলন করার জন্যে। প্রক্রিয়াটা প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে চলছিল। নানান জিজ্ঞাসার মধ্যে আনন্দকে মহিলা বিষয়ে দুটি প্রশ্ন করা হয়, সেই দুটি আপাতত আমাদের আলোচ্য বিষয় — প্রথমটি কেন তিনি নারীদের সংঘে যোগদানের জন্য বুদ্ধকে আবেদন করেন এবং দ্বিতীয়টি, বুদ্ধের পরিনির্বাণের পর কেন তিনি প্রথমে নারী সংঘকে সর্বাগ্রে শাস্তার দেহবন্দনা করিবার সুযোগ করে দিয়েছিলেন। এটাও বলা জরুরি যে বুদ্ধের পালিতা মাতাকে সংঘে আনার জন্যে আনন্দকে স্বয়ং গৌতম বহুবার গঞ্জনা দিয়েছেন। বুদ্ধ থাকার সময় এবং সদ্য পরিনির্বানের পরেই বৌদ্ধপন্থে নারীদের এই হেনস্থার অবস্থা হয়, তাহলে বুদ্ধদেবের প্রয়াণের পরে ভিক্ষুণী মহিলাদের কী অবস্থা ছিল অনুমেয় — অনুবাদক)।
ছয়
এতক্ষণ বৌদ্ধ সংঘ নিয়ে আলোচনা করে তাদের সমবায়িক চরিত্র এবং সংগঠন বিষয়ে একটা ধারণা তৈরি করা গেল। এবারে আমরা সংগঠনের বিশেষ চরিত্র নিয়ে আলোচনা করব যা আমাদের বিষয়টি বুঝতে আরও সাহায্য করবে।
এর আগে আমরা বলেছি সংঘে ব্যক্তির কোনও ভূমিকা থাকত না, ব্যক্তিকে সমবায়িক সংঘে লীন হয়ে যেতে হত। সংঘে ব্যক্তির স্বাধীনতা ছিল না এবং সংঘ প্রণীত বিস্তৃতভাবে লিখিত নিয়ম নীতি অনুসরণ করে সংঘে যোগ দেওয়া ব্যক্তির জীবনের ছোটখাট বিষয়ও নিয়ন্ত্রিত হত। বিষয়টি বূঝানোর জন্যে কিছু উদ্ধৃতি আমরা ব্যবহার করব
১। Whatsoever Bhikkhu who is not sick, shall, desiring to warm himself, kindle a fire, or have a fire kindled, without cause sufficient thereto — that is a Pachittiya (প্রায়শ্চিত্ত)
২। Whatsoever Bhikkhii shall hathe at intervals of less than half a month, except on the proper occasion—that is a Pachittiya ৩। In case people should offer a Bhikkhu, who has gone to some house, to take as much as he chose of their sweetmeats and cakes, that Bhikkhu, should he so wish, may accept two or three howls full. If he should accept more than that — that is a Pachittiya
৪। Whatsoever Bhikkhu shall have a rug or mat made with silk in it — that is a Pachittiya offence involving forfeiture
৫। When a Bhikkhu has had a new rug made, he should use it for six years. If he should have another new rug made within the six years, whether he has got rid, or has not got rid of the former one, — unless with the permission of the Samgha — that is a Pachittiya offence involving forfeiture (প্রসঙ্গটি বুঝতে বিভঙ্গ সূত্র একটি গল্প তুলে দিয়ে বোঝাতে চেষ্টা করব কেন পঞ্চম ধারাটি সংঘে যোগ করা হল — এক অসুস্থ ভিক্ষুকে আত্মীয়রা শুশ্রূষার জন্যে বাড়ি আসার অনুরোধ করল। ভিক্ষু উত্তর দিলেন তিনি এতই অসুস্থ যে তার পক্ষে কম্বলটি বয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে না, আবার এটি ছাড়া তার চলবেও না কারন নতুন কম্বল ছ’বছর আগে পাওয়ার নিয়ম নেই। তখন মহামহিম বুদ্ধদেব এই ব্যতিক্রমী ধারাটি রচনা করেন)।
বৌদ্ধ শাস্ত্র সূত্রে সাধারণভাবে একটা ধারণা তৈরি করা যায় সংঘে ব্যবহৃত ভিক্ষু কাছে থাকা সব কটা কটা দ্রবের অধিকার সংঘের এবং সংঘ যদি কোনও কিছু তার অধিকারে রাখার অনুমতি দেয়, সেটিই একমাত্র তার হিসেবে স্বীকৃতি পাবে। সেই জন্যে সাধারণ নিয়ম ছিল ভিক্ষুর অধিকারে মাত্র একটাই খাদ্যপাত্র থাকবে এবং যখন এই পাত্র পাঁচটি জায়গায় ভেঙে যাবে তখনই সে নতুন একটি পাত্রের জন্যে আবেদন করতে পারবে। কেউ যদি এই নিয়ম ভেঙে নতুন পাত্র পায় তাহলে সেটি তার থেকে বাজেয়াপ্ত করা হবে এবং যে ভিক্ষুর কাছে খারাপ পাত্র আছে, তাকে সেটি দেওয়া হবে। সাধারণভাবে ভিক্ষুর কাছে সোনা রূপো থাকবে না। তার কাছে যদি কোনও সোনা রূপো থাকে, কেউ যদি তাকে সেটা দেয়, বা তার কাছে গচ্ছিত রাখে, তাকে সেগুলি সংঘকে অর্পণ করতে হবে। কোনও কিছু যদি ভিক্ষু তার ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্যে ব্যবহার করে, তাহলেও সেটা ধরে নেওয়া হয় সংঘের সম্পত্তি (‘চিবরের ওপর ভিক্ষুর কোনও অধিকার থাকবে না। যদিও এই ন্যুনতমটি তাকে তার ব্যবহারের জন্যে দেওয়া হয়েছে, কিন্তু সেটি তার সম্পত্তি নয়, যদিও সে সেটা ব্যবহার করে, বিশেষভাবে বললে তার সমগ্র ব্যবহার্য বস্তুই সংঘের সম্পত্তি)। ভিক্ষুর প্রয়াণ হলে তার অধিকারে থাকা সব কিছুই সংঘের অধিকারে যাবে
“On the death of a Bhikkhu, O Bhikkhus, the Samgha becomes the owner of his bowl and of his robes. But, now, those who wait upon the sick are of much service. I prescribe, O Bhikkhus, that the set of robes and the bowl are to be assigned by the Samgha to them who have waited upon the sick. And whatever little property or small supply of a Bhikkhu’s requisites there may be, that is to be divided by the Saiiigha that are present there; but whatever large quantity of property and large supply of a Bhikkhu’s requisites there may be, that is not to be given away and not to be apportioned, but to belong to the Samgha of the four directions^ those who have come in, and those who have not.”
সম্পত্তির সাম্যবাদী তত্ত্ব খুব সুন্দরভাবে এই গল্পে ফুটে উঠেছে —
‘Now at that time the Bhikkhus who dwelt in a certain country residence, not far from Savatthi, were worried by having constantly to provide sleeping accommodation for travelling Bhikkhus who came in (from country places). And those Bhikkhus thought : ‘[This being so,] let us hand over all the sleeping accommodation which is the property of the Samgha to one (of us), and let us use it as belonging to him.’ And they [did so].
Then the incoming Bhikkhus said to them: ‘Prepare, Sirs, sleeping accommodation for us.’
‘There are no beds. Sirs, belonging to the Samgha. We have given them all away to one of us.’
‘What, Sirs? Have you then made away with property belonging to the Samgha?’
That is so, Sirs.
The moderate Bhikkhus murmured, etc., and told the matter to the Blessed One.
‘Is it true, O Bhikkhus, as they say, that Bhikkhus make away with Sarhgha property?’
‘It is true, Lord.’
Then the Blessed One rebuked them, etc., and said to the Bhikkhus : ‘These five things, O Bhikkhus, are untransferable, and are not to be disposed of either by the Samgha, or by a company of two or three Bhikkhus (a Gana), or by a single individual. And what are the five? A park (Arama), or the site for a park — this is the first untransferable thing, that cannot be disposed of by the Samglia, or by a Gana, or by an individual. If it be disposed of, such disposal is void; and whosoever has disposed of it, is guilty of a thullachchaya. A Vihara or the site for a Vihara — this is the second, etc, (as before). A bed, or a chair, or a bolster, or a pillow — this is the third, etc. A brass vessel, or a brass jar or a brass pot, or a brass vase, or a razor, or an axe, or a hatchet, or a hoe, or a spade — this is the fourth, stc. Creepers, or bamboos, or munja, or babbaja grass, or common grass, or clay, or things made of wood, or crockery — this is the fifth, etc. (as before, down to) thullachchaya.’
ফলে ব্যক্তিগত ভিক্ষু সদস্যর সংঘের বৃহত্তর সমবায় নীতি নিয়ে খুব একটা মাথাব্যথা বা ধারনা ছিল না। মাথায় রাখা দরকার, বৌদ্ধ সংঘের কোনও কেন্দ্রিয় সংগঠন ছিল না, অথচ অনেকেরই এই ধারণা বদ্ধমূল থাকায় বিভন্ন স্থানীয় সংগঠনের ভিক্ষুরা মনে করত তারা একটা বড় সংগঠনের অংশবিশেষ। কাশ্মীরের কোনও ভিক্ষু পরিব্রজন কালে পাটলিপুত্রর সংঘে অধিকার বশে রাতকাটাবার জন্যে বিছানা দাবি করত এই ধারণা নিয়ে যে তিনি একটা বৃহত্তর ভ্রাতৃত্ববোধের অদৃশ্য সুতোয় বাঁধা, তাছাড়া তার অন্য কোনও ভাবেই তার এই দাবি করার কোনও যৌক্তিকতা ছিল না। (চলবে)