চতুর্থ অধ্যায়
ধর্মীয় জীবনে সমবায়িক উদ্যম
সাত
বৌদ্ধ সংঘের বহু সঙ্গঠন সংঘের সদস্যদের মনে সমবায়িক মনোভাব জাগিয়ে রাখার কাজ করত। এ প্রসঙ্গ আলোচনায় সর্ব প্রথম স্থানীয় ভিক্ষুদের নিয়মিত সম্মিলন চালিয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়াটি বিশেষভাবে উল্লেখ করতে হয়। সংঘ তৈরির প্রথম দিককার সময়ে বুদ্ধদেবের নির্দেশ ছিল, মাসের প্রত্যেক পক্ষের ৮, ১৪ এবং ১৫তম দিনে ভিক্ষুদের একযোগে মিলিত হয়ে ধম্ম আবৃত্তি করতে হবে। পক্ষের শেষ দুই দিনের একদিন উপসোত্থ পালন করা হবে এবং অন্য দিন পতিমোক্ষ [পাতিমোখা Patimokkha) পড়তে হবে। সংঘ সুষ্ঠুভাবে চালনার করা জন্যে এইগুলোকেই গুরুত্বপূর্ণ এবং ব্যপ্ত নীতিমালা হিসেবে স্বীকৃত হয়েছে।
এই পাতিমোখা নামক সম্মিলনের সেবাটি স্থানীয় অঞ্চলের বৌদ্ধ ফ্রাটারনিটিকে সঙ্গে নিয়ে আয়োজন করার নির্দেশ দেওয়া ছিল। কোন ভূখণ্ডের ভিক্ষুদের জন্যে সম্মিলন আয়োজন করা হচ্ছে, সে বিষয়ে নির্দেশ জারি করে এলাকার একটি সীমান্ত (যদি কোনও নির্দিষ্ট সীমান্ত টানা না যায় তাহলে গ্রাম অথবা শহরের সীমান্ত, যেখান ভিক্ষুরা বাস করে, সেখানে উপসোত্থ সেবা নির্দিষ্ট করতে হবে) নির্দিষ্ট করে দেওয়া হত। সেই এলাকাটি খুব বড়ও হত না অথবা প্রাকৃতিক প্রতিবন্ধকতা যেমন নদীর দু-প্রান্তে নিয়মিত যোগাযোগ থাকা যেমন ফেরি সেনা নেই, এমন কোনও নদীকে সীমান্ত হিসেবে চিহ্নিত করা যেত না। সতর্কতা নেওয়া হত যাতে এই অঞ্চলের প্রত্যেক সদস্যই এই সম্মিলনে এসে উপস্থিত হতে পারেন। যে জন্যে পক্ষ কালে মাত্র একটা দিনেই সদস্যদের জন্যে একটাই মাত্র উপসোত্থ সেবা আয়োজিত হত এবং তার জন্যে একটা নির্দিষ্ট স্থানও বেছে রাখা হত।
সংঘের ভায়েরা একসঙ্গে উপস্থিত হয়ে কোনও এক জ্ঞানী যোগ্য ভিক্ষুকে দিয়ে নিয়মমাফিক সভার অনুমতি সাপেক্ষে পাতিমোক্ষ পড়তে অনুরোধ করত (পাতিমোক্ষ — বিভিন্ন অপরাধের শ্রেণিবদ্ধ ক্যাটালগ এবং সে সবের উপযুক্ত শাস্তি — সম্পূর্ণভাবে পাঠ করা হত, কিন্তু জরুরি বা বিপদের সময় পাঠ সংক্ষেপিত ভাবেও উপস্থাপন করার বিধি ছিল)। পাঠ শুরু হল এবং পাঠ শেষে প্রত্যেকটি শ্রেণীর অপরাধ বর্ণনা করা করা হত এবং প্রতিটি ভিক্ষুর কাছে প্রশ্ন রাখা হত তারা এই সব অপরাধ থেকে কতটা পবিত্র [মুক্ত আছেন]। সম্মেলনে দোষ বিষয়ক প্রশ্নগুলো তিনবার করে উচ্চারণ করা হত। বৈঠকে অংশ নেওয়া শ্রোতা ভিক্ষুরা চুপ করে থাকলে সেই পাঠটা বারবার উচ্চারিত হত। চুপ করে থাকা অপরাধশূন্যতার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে ধরে নেওয়া হত। আবার নির্দিষ্ট কোনও অপরাধ পাঠের সময় ভিক্ষু দোষ স্বীকার করলে তাকে সংঘের নির্দিষ্ট নিয়ম অনুযায়ী শাস্তি পেতে হত। পাতিমোক্ষ পড়া শেষ হয়ে গেলে সভায় সংঘ বিষয়ে নানান বিষয় আলোচনা হত। এ রকম কিছু সময়ে দপ্তরীর, করণিকের কাজও সম্পন্ন করা হত। সংঘের প্রবীণতম ভিক্ষু অনুষ্ঠানের প্রধান পাঠক হিসেবে গণ্য হতেন, কিন্তু তিনি বিষয় সম্বন্ধে অজ্ঞাত হলে অথবা পাঠের উপযুক্ত হিসেবে স্বীকৃত না হলে তার জায়গা নিতেন সংঘের সব থেকে জ্ঞানী এবং সক্রিয় ভিক্ষু। পাতিমোক্ষ বিষয়ে সংঘের ভিক্ষুরা যদি অজ্ঞ হত, তাহলে সংঘের কর্তারা প্রতিবেশী সংঘে কাউকে পাঠয়ে পতিমোক্ষর সংক্ষিপ্তসার সম্বন্ধে জ্ঞান আহরণ করার ব্যবস্থা করতেন। সেই সংঘ যদি জ্ঞান সরবরাহ করার কাজে ব্যর্থ হত, তাহলে তার পাশের সংঘ থেকে ভিক্ষু নিয়ে এসে পতিমোক্ষ পড়ানো হত।
অনুষ্ঠানে প্রতিটি সদস্যের উপস্থিতির নিশ্চয় করার বিষয়ে জোর দেওয়া হত। অসুস্থতার দরুন কেউ যদি উপস্থিত না থাকতে পারে, তাহলে সেই অসুস্থ ভিক্ষু কোনও এক ভিক্ষুকে তার চিত্ত পরিশুদ্ধির দায়িত্ব দেবেন অর্থাৎ তিনি প্রাতিষ্ঠনিকভাবে ঘোষণা করবেন পাতিমোক্ষতে যে সব অপরাধের তালিকা করা রয়েছে, সে সব থেকে তিনি মুক্ত এবং পবিত্রচিত্ত। একইসঙ্গে তাকে বিবৃতি দিয়ে বলতে হত, তিনি সম্মেলনটি আয়জনের পক্ষে থাকছেন এবং এটি আয়োজনে সম্মতি দিচ্ছেন। যদি অসুস্থ ভিক্ষু পরিশুদ্ধির বার্তা না দিতে পারতেন, তাহলে তাকে বিছানায় করে বা কেদারায় করে সভা ঘরে নিয়ে যাওয়া হত। সেবিকা/সেবক যদি মনে করত অসুস্থ ব্যক্তিটি উপাসনা গৃহে পৌঁছতে পারবে না অথবা তাকে নিয়ে গেলে তার মৃত্যু নিশ্চিত, অথবা তিনি পরিশুদ্ধি প্রক্রিয়া কারোর সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার অবস্থায় নেই, তাহলে সংঘের ভিক্ষুরা সকলে মিলে সমগ্র পাঠ প্রক্রিয়াটি তার বিছানা বা কেদারার সামনে করত এবং সেখানেই উপাসাথ অনুষ্ঠান সমাপ্ত করত।
কিন্তু কোনও ভাবেই কোনও সম্মেলনই সব সদস্য না এলে অসমাপ্তভাবে শেষ করা হত না। সম্মেলনের সময় কোনও স্থানীয় সংঘের সদস্য ভিক্ষু যদি রাজার বাহিনীর হাতে, অথবা ডাকাতের হাতে ধরা পড়ত, তাহলে সর্বপ্রথম সে উপসত্থ অনুষ্ঠানে পৌঁছবার উদ্দেশ্যে নিজেকে তাদের কবল থেকে বুঝিয়ে শুনিয়ে সাময়িকভাবে ছাড়ানোর চেষ্টা করে সংঘে পৌঁছবার উদ্যম নেবে যাতে এই সম্মিলন প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সম্পূর্ণতা অর্জন করে। নির্দিষ্ট কোনও ভিক্ষু/সদস্য অনুপস্থিত থাকার আশংকা থাকলে, খণ্ডিত অনুষ্ঠান আয়োজন না করে উপসত্থ অনুষ্ঠানটিই বাতিল করা হত। যদি কোনও ভিক্ষু পাগল হয়ে যেত তাহলে উপসত্থ অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার আগে তার থেকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে উম্মাত্তকসম্মতি (ummattakasammuti বাতুলের ছুটি) নির্দেশ জারি করা হত যাতে তাকে বাদ দিয়েই সম্মিলন আয়োজন করা যায়। সদস্যদের অপরাধ বিষয়ে আত্মউন্মোচনের অনুষ্ঠানে প্রত্যেক সদস্যকে উপস্থাপন করানোর উদ্যম থেকে পরিষ্কার, বৌদ্ধ সংঘে যৌথ উদ্যমের স্পিরিটটি যথাসম্ভব কার্যকর করার চেষ্টা করা হত।
বর্ষায় মৌসুমে বাসা/বাস (Vassa) ছিল আরেকটি সাময়িক কয়েক মাসের সংঘ। এরও অন্যতম উদ্দেশ্য ভিক্ষুদের মধ্যে সহযোগিতার পরিবেশ তৈরি করা। সংঘের স্পষ্ট নির্দেশ ছিল প্রতি বছরের বর্ষার তিন মাস অর্থাৎ আষাঢ়ের পূর্ণিমার পরে অথবা তার পরের মাসে ভিক্ষুরা নির্দিষ্ট বাসস্থানে নিরবিচ্ছিন্নভাবে বাস করবে। বর্ষার তিন মাস, মহাভগ্গে উল্লিখিত নির্দিষ্ট কয়েকটি জরুরি অবস্থা, নির্দিষ্ট কিছু জরুরি কাজ ছাড়া ভিক্ষুদের সেই বাস ছেড়ে বেরোনোর অনুমতি ছিল না। তিন মাস ধরে ভিক্ষুরা একসঙ্গে বাস করার মধ্যে দিয়ে তাদের নিজেদের মধ্যে বোঝাপড়া বাড়ত। বাসেভিক্ষুরা কী ধরণের জীবন কাটান তার একটা ছোট্ট ছবি উল্লেখ করা গেল, ‘যে প্রথম ভিক্ষু গ্রাম থেকে ভিক্ষাতীর্থ সেরে বাসে ফিরবেন, তার কাজ হবে বিছানা তৈরি করা, হাত পা ধোয়ার জল তোলা, বসার পিঁড়ির ব্যবস্থা করা, হাতপা মোছার জন্যে গামছা ব্যবস্থা করা, খাবার রাখার জায়গা পরিষ্কার করা এবং খাবার এলাকাটিকে খাদ্য পানীয় রাখার যোগ্য করে তোলা। যিনি গ্রাম থেকে সর্বশেষ তার ভিক্ষাতীর্থ সেরে বাসে ফিরবেন, রাতে অন্যান্যদের খাওয়ার পরে যদি কিছু পড়ে থাকে তাহলে তিনি পাবেন, আর তার যদি [বাকি পড়ে থাকা] খাওয়ারটি গ্রহণ করতে ইছে না হয় তাহলে যেখানে ঘাস বা অন্যান্য জীবিত বস্তু নেই, সেখানে গ্রহণ না করা খাদ্যবস্তুটি ফেলে দেবেন, বিছানা তৈরি করবেন, হাত পা ধোয়ার জল তুলবেন, বসার পিঁড়ি সরাবেন, হাত পা ধোয়ার গামছা সরাবেন, সবাই খেয়ে গেলে খাবার জায়গা পরিষ্কার করে রাখবেন’।
সংঘে বর্ষাকালের বাস শেষে আয়জিত হয় পবরানা (Pavarana) অনুষ্ঠান; যেখানে প্রতিটি ভিক্ষুকে সংঘ আলাদা করে তাদের [তিন মাসের বাস] জীবনে ঘটে যাওয়া পাপগুলি বর্ণনা করতে বলে।
পরবানার পরে প্রত্যেক স্থানীয় সংঘ ভিক্ষুকে চিবর বিতরণ করে। এটাকে কঠিন (Kathina) অনুষ্ঠান নামে অভিহত করা হয়েছে। কঠিন অর্থে সারা বছর ব্যবহার করার জন্যে সুতির তৈরি বসন। কোনও একজন ভিক্ষুকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে নির্দেশ দেওয়া হয় চিবরগুলি রঙ এবং সেলাই করার জন্যে। চিবরগুলি পরিধানযোগ্য হয়ে উঠলে তিনি নিজের চিবরটা বেছে নেবেন এবং বাকিগুলো অন্য ভিক্ষুদের জন্যে বিলি ব্যবস্থা করবেন এবং নির্দেশ করে দেবেন, কোনটা বৃদ্ধ ভিক্ষুর জন্যে কোনটা বা যুবাদের জন্যে পরিধানযোগ্য। এই কাজের জন্যে তিনি সংঘের প্রাতিষ্ঠানিক অনুমতি প্রার্থনা করবেন। অনুমতি পাওয়ার পর প্রত্যেক ভিক্ষু তাঁদের চিবর গ্রহণ করবেন এবং তার পরই অনুষ্ঠানটি শেষ হবে।
আট
বৌদ্ধ সংঘ প্রাচীন ভারতের সমবায়িক সংঘগুলোর অন্যতম প্রকৃষ্ট উদাহরণ। বৌদ্ধ ছাড়া একমাত্র জৈন সমাজের ধার্মিক সমবায়িক সংঘ বিষয়ে আমরা কিছু তথ্য পাই। বাকিদের কোনও তথ্য পাওয়া যায় না, অথচ প্রাচীন ভারতের সমাজে প্রত্যেক ধর্মীয় সংগঠন খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। আমরা আগেই বলেছি বুদ্ধদেব যখন সংঘ তৈরি করেন তখন আরও অনেক ধর্মীয় সংগঠনের অস্তিত্ব ছিল। পরবর্তীকালে তাদের অস্তিত্বের বর্ণনা পাচ্ছি ধর্মশাস্ত্র এবং শিলালিপি সূত্রে। যাজ্ঞবল্ক্য অন্য মতের সমবায়িক ধর্ম সংঘকে পাষণ্ডি রূপে আখ্যা দিয়েছেন এবং তাদের প্রত্যেকের সংবিধান থাকার কথা উল্লেখ করেছেন। পাষণ্ডির উল্লেখ আমরা নারদ সংহিতায় পাচ্ছি —


দ্বিতীয় খ্রিশতকের শিলালিপিতে চরকদের সমাবায়িক সংঘ বা পর্ষদে দান দেওয়ার উল্লেখ করা হয়েছে। আমার মনে হয় চরক হল কোনও এক ব্রাহ্মণ্যপন্থী সন্ন্যাসীদের সংঘ। অন্য এক শিলালিপিতে অপরাজিতদের সংঘ বা সমবায়িক সংঘের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
হিন্দু যুগের পরের সময়ে বিভিন্ন ধরণের বৈষ্ণব এবং শাক্ত গোষ্ঠী দক্ষিণ ভারতজুড়ে বিকশিত হচ্ছিল। বিভিন্ন শিলালিপিতে বহু মন্দিরের কথা বারবার উল্লিখিত হয়েছে। সেই সব বর্ণনা সূত্রে আমাদের বুঝতে সমস্যা হয় না প্রত্যেকটি স্থানীয় সংঘর নির্দিষ্ট সংজ্ঞায়িত কর্মপদ্ধতি ছিল। তাদের কর্মপদ্ধতি অনেকটা বৌদ্ধ সংঘগুলিরমত করে পরিচালিত করত, কিন্তু বৌদ্ধদের সমবায়িক সংঘের মত করে কেউই প্রায় ততটা বিকশিত হতে পারে নি। আমার বর্তমানে কাজে অন্যান্য সংগঠনের সমবায়িক চরিত্রের বিশদ বর্ণনা করাটা খুব প্রাসঙ্গিক নয়, কিন্তু ভারত ইতিহাসের ছাত্রদের কাছে এই বিষয়টা খুব আকর্ষণীয় হতে পারে। উত্তর ভারতের নানান সংঘ বিষয়েও একই মন্তব্য করা যায়।
পঞ্চম অধ্যায়
সামাজিক জীবনে সমবায়িক কাজকর্ম
এক
প্রাচীন ভারতের মানুষদের জীবনে সমবায়িক কাজকর্ম তাদের সামাজিক জীবনে খুবই সুন্দরভাবে উদ্ভাসিত হয়েছে। তারা সেই কাজকর্মগুলির চর্চা চরম শিখরে নিয়ে গিয়েছে এবং সে ধরণের চর্চার খুব বেশি নিদর্শন বিশ্বজুড়ে পাওয়া যায় না। সমাজে বর্ণ এবং জাতি, আজকে যাকে কাস্ট নামে অভিহিত করে থাকি সেটা বিকাশের উচ্চতমস্তরে পৌঁছেছিল এবং ইতিহাসে সামাজিক সমবায়ের প্রকৃষ্ট উদাহরণ হিসেবে গণ্য হয়েছে। আমার বর্তমান গবেষণায় সামগ্রিক জাতি ব্যবস্থার উদ্ভব বা বিকাশ নিয়ে ব্যাখ্যা করার সুযোগ নেই। এটা একটা খুবই বড় আলোপচ্য বিষয়। তার জন্যে আলাদা চিন্তাভাবনা করা জরুরি। আমি এখানে এগুলির মূল চরিত্র বিশ্লেষণ এবং তার সঙ্গে কেন সমবায়িক শব্দটা জুড়ছি সেটি বর্ণনা করব এবং নানান সংগঠনের সমবায়িক চরিত্র উদ্ঘাটন করব।
ভারত ইতিহাসের প্রাচীন পর্ব ঋগ্বেদের সময় দিয়েই আলোচনা শুরু করি। এখানে একটা প্রশ্ন উঠতে পারে সে সময় জাতি ব্যবস্থা জ্ঞাত ছিল কী না। এবাবদে প্রাচ্যবাদীরা দ্বিধাবিভক্ত। Aufrecht, Benfey, M. Miiller, Muir, Roth, Weber এবং Zimmer মনে করেন ব্রাহ্মণ্য পরবর্তী সময়ে যে ধরণের সংগঠন গড়ে উঠেছিল, বৈদিক সময়ে সে ধরণের সংগঠন গড়ে ওঠে নি। তাদের সঙ্গে একমত হয়েছেন Senart, Macdonell, Von Schroeder and Kaegi। অন্যদিকে Haug, Kern এবং Ludwig উল্টোতত্ত্বে বিশ্বাসী। তাদের সমর্থন করেছেন Oldenberg এবং Geldner। তাদের সমর্থনে বা বিপক্ষে তত্ত্ব সাজিয়ে বসার কোনও সুযোগ এখন নেই, কিন্তু যে সব তত্ত্ব এইসব জ্ঞানীদের ধারণার বাইরে থেকে গিয়েছে সে সব নিয়ে আলোচনা করতে পারি।
ঋগ্বেদে একটাই পুরুষ সুক্ত রয়েছে যেটি সমাজের চারটি শ্রেণী ভাগের কথা বলেছে। তবে অনেকেই মনে করেন এই সুক্তটি পরের সময়ে যোগ হয়েছে — প্রক্ষিপ্ত। ফলে প্রাচীন কালে চতুর্বণের উপস্থিতি না থাকারই সম্ভাবনা বেশি। মোটামুটি ধরে নেওয়া হয় প্রাচীন এই ভূমিতে ইন্দো-আর্যরা আসার আগে চতুর্বণের ধারণাটা ছিল না। পুরুষ সূক্ততে যে চার বর্ণের উল্লেখ আছে, সেই ইরাণীয় সমাজ চার শ্রেণীতে (pishtras) বিভক্ত ছিল। Athrava-দের চিহ্নিত করা হয়েছে ব্রাহ্মণ সমাজ হিসেবে, Rathaesthas হল ক্ষত্রিয় হিসেবে, Vastriyas Fshouyants (পরিবারে প্রধান) বৈশ্য হিসেবে আর Huitis-কে শূদ্র ধরা হয়েছে। লুডউইগ মনে করেন ঋগ্বেদে যখন ধর্ম ধারণা বিকশিত হয়েছে তখন ইরাণীয় এবং আর্যরা একসঙ্গে বাস করত এবং সেটাই তখনকার সামাজিক অবস্থার প্রতিফলন; কিন্তু আমরা যদি মেনে নিই ঋগ্বদের সময়ে আমাদের আলোচ্য শ্রেণীবিভাগ ছিল না তাহলে আমাদের ধরে নিতে হয় আর্যদের সমাজে এই ধরণের বিভাগ বর্তমান ছিল কিন্তু পরে এটা হারিয়ে যায় আবার ভবিষ্যতে তারা এটাকে আবিষ্কার করে।
আমরা স্বীকার করছি পুরুষসূক্তে যে চার বর্ণের উল্লেখ করা হয়েছে, সেই বিভাগটি ঋগ্বেদের সময়ে জ্ঞাত ছিল। তবে এই বর্ণ যে সে সময় চারটি জাতিতে পরিণত হয়েছিল, এমন কোনও নিদর্শন আমরা দেখাতে পারব না। সভ্যতা অগ্রসর হলে ব্যক্তিদের চারটি (হয়ত আরও বেশি) বিভাগে ভাগ করা হতে থাকে। ঠিক যেমন ব্রিটশেরা পুরোহিত, অভিজাত, মধ্যবিত্ত, এবং শ্রমিকশ্রেণীতে বিভক্ত। আজ ইংলন্ডে যে ধরণের শ্রেণী বিভাগ রয়েছে, ঋগ্বেদের সময় তার থেকেও কঠোর শ্রেণী বিভাগ ছিল, এমন ধারণা করার অবস্থায় আমরা আপাতত নেই। ভারতবর্ষের ক্ষেত্রে ঋগ্বেদের যুগের ঠিক পরের দিকের সাহিত্যে জাতিবাদের কঠোরতা দেখতে পাই, অথচ জাতিবাদের কঠোরতার অভাবটা ঋগ্বেদের যুগে ছিল, এটা অস্বীকার করার উপায় নেই। ইরানীয় সমাজে যে বিভাগ দেখিয়েছি, তাতে যে শ্রেণী বিভাজন রয়েছে, সেটি জাতিবিভাজনের সঙ্গে সমার্থবোধক নয় এবং খুবই গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হল, শ্রেণী বিভাজনই জাত বিভাজন ঘটিয়েছে, এই সিদ্ধান্তে পৌঁছবার কোনও সুযোগ নেই।
এবারে আমরা পরীক্ষা করব এই শ্রেণীগুলো আদৌ সমবায়িক চরিত্রের ছিল কী না। সমবায়িক চরিত্র বলতে আমরা বুঝি কিছু মানুষ যখন একসঙ্গে যুক্ত হয়ে কিছু করতে চায় — সেটা সমাজেও হতে পারে, পেশাতেও হতে পারে অথবা অন্যান্য কিছুতেও হতে পারে। কিন্তু ঋগ্বেদের স্তবে যে চারটে শ্রেণীর উল্লেখ রয়েছে, সেগুলো কোনও একটাও পেশাদার গোষ্ঠী অথবা সামাজিক এককে পরিণত হয়েছিল এমন কোনও নিদর্শন আমাদের কাছে মজুদ নেই। তবে ব্রাহ্মণ অথবা শূদ্ররা ব্যতিক্রম হলেও হতে পারে। মুইর বলছেন হয়ত পুরোহিতত্ব ততদিনে পেশায় রূপান্তরিত হয়েছে এবং শূদ্র অথবা দাসেরা স্বতন্ত্র জাতি গোষ্ঠীতে উত্তীর্ণ হয়েছে। ব্রাহ্মণদের ক্ষেত্রে বলা যায় নির্দিষ্ট শ্রেণীর কোনও একদল মানুষ একচ্ছত্রভাবে ব্রাহ্মণত্বকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেছিল এরকম কোনও তথ্য আমাদের হাতে নেই। আর শূদ্র বা দাস আর্যদের তুলনায় জাতিগতভাবে আলাদা হলেও তাদের বিরুদ্ধে লড়ে আর্যরা এদেশে বসতি স্থাপন করলেও শূদ্ররা যে একটি সমসত্ত্ব জাতি এরকম কোনও নিদর্শন আমাদের হাতে নেই। আমরা শুধু বলতে পারি, বৈদিক যুগে আর্যদের মধ্যে নানান ধরণের শ্রেণী বিভাগ ছিল ঠিকই কিন্তু সেগুলো জাতিতে রূপান্তরিত হয়ন নি। (চলবে)