প্রথম অধ্যায়
সাত
আমরা আগের আলোচনায় দেখেছি মিত্রমিশ্র সঙ্ঘে রাজার খবরদারির বিষয়ে স্পষ্ট রায় দিচ্ছেন। শ্রেণী সংঘের বা সমূহের কাজকর্ম অপ্রত্যাশিতভাবে একচ্ছত্র অধিকারে সংগঠন চালানো সর্বোচ্চ আধিকারিককে সঙ্ঘ থেকে বহিষ্কার করা জরুরি — এটা স্বাভাবিক ধারণা ছিল। এই কাজ করতে যদি সমূহ ব্যর্থ হয়, তখনই রাজা তার সিদ্ধান্ত প্রয়োগ করবেন (এর আগে আমরা আলোচনা করেছি কীভাবে মিত্রমিশ্র আইন বহির্ভূত কাজ করা সঙ্ঘের প্রধান আধিকারিককে প্রত্যাহার করার জন্যে রাজাকে সক্রিয় হতে নিদান দিয়েছেন। তিনি বৃহস্পতির একটি শ্লোক উল্লেখ করেছেন মুখিয়া বা সংঘ পরিচালকের কথা বলতে গিয়ে। আরেকটি শ্লোক তিনি উল্লেখ করেছেন যেখানে স্মৃতিকার বৃহস্পতি নারদকে উল্লেখ করে শুধু মুখিয়ার জন্যে লিখেছেন —

‘একজন ভয়াবহ অথবা দূষিত মানুষ যিনি সংঘে অনৈক্য তৈরি করেন অথবা আইন ভঙ্গ করেন তাঁকে সেই মুহূর্তে রাজা হয় সংঘ থেকে অথবা শহর থেকে বহিষ্কার করবেন’। তিনি আরও লিখলেন ‘…তাকে সমূহ থেকে বহিষ্কার করা হবে’। তবে প্রধানকে সমূহের শাস্তি দেওয়ার ক্ষমতা নেই, এই ব্যাখ্যাটি আদৌ ঠিক নয়। কাত্যায়নের সূত্রে বলতে পারি, সমূহের অধিকার রয়েছে প্রধান আধিকারিককে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেওয়ার)।
কীভাবে রাজারা শ্রেণী সংঘের কাজকর্মে মাথা গলাতেন, স্মৃতিশাস্ত্রসূত্রে এতক্ষণ তার কিছু উদাহরণ আমরা উল্লেখ করার চেষ্টা করলাম। সেই দখলদারি সঙ্ঘকে মেনে নিতেও হয়েছিল। রাজা যদি মনে করতেন সমূহে/সঙ্ঘে ব্যক্তির অধিকার ক্ষুণ্ণ হচ্ছে, সদস্যরা বিদ্বেষ বা ঈর্ষার বস্তু হয়ে উঠছে, তাহলে রাজা ব্যক্তিস্বাতন্ত্র রক্ষা করার কাজে সক্রিয় হয়ে উঠতেন। রাজকীয় হস্তক্ষেপের আরও কিছু ক্ষেত্র, নজির নারদ স্মৃতিশাস্ত্রে উল্লেখ করছেন —


আমরা দেখলাম, এইভাবে রাজা একের বেশি শ্রেণী সঙ্গঠনকে একত্রিত হতে (হয়ত পরস্পরের প্রতি বিদ্বেষমুখী), রণসাজে সজ্জিত হতে এবং নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্ব তৈরি করতে বাধা দিতেন। তিনি সঙ্ঘগুলিকে এই ধরণের কাজ করতে বাধা দিতেন, কারন হয় এই কাজগুলি তার ইছা বা স্বার্থের বিপক্ষে গিয়ে সংগঠিত হচ্ছে, অথবা কখনও যদি এই ধরণের উদ্যমকে তিনি অনৈতিক কার্যকলাপ বলে মনে করতেন।
নারদ স্মৃতির বক্ষ্যমান স্তবকের বিদ্যমান মন্তব্যটি আদতে বহু পুরোনো প্রথা পারম্পরিকভাবে প্রজন্মের পর প্রজন্মজুড়ে চলে আসার কথা মনে করিয়ে দেয় এবং রাজা আর শ্রেণী সংঘের মধ্যে সম্পর্কের ওপর নতুন দৃষ্টভঙ্গী তৈরিতে সাহায্য করে —

এই বক্তব্যের মাধ্যমে টিকাকার কী বলতে চেয়েছেন সেটা আমরা এবারে একটু বিশদেই বুঝতে চেষ্টা করব। আমরা আগের সূত্রগুলো আলোচনা করে দেখিয়েছি রাজা শ্রেণী সংগঠন বা অন্যান্য সমূহের প্রণীত নিয়মনীতি অনুমোদন দিতেন আর তাদের কাজকর্ম ইত্যাদি কিছুটা নিজের মত করে নিয়ন্ত্রণ করতে পারতেন। এবারে সংগঠনগুলোর স্বাধীনতা নিয়ে আলোচনা করব — রাজা কোথায় মাথা গলাতে পারত না — সেই বিষয়টা; শ্রেণীর কাজকর্মে কিছু ব্যতিক্রমী অবস্থা নিয়ে আলোচনা সূত্রে ধরে নেওয়া যাক শ্রেণী বা সমূহ তাদের প্রণীত নিয়মে লিপিবদ্ধ করার সময় কোনও শ্রেণী লিখল ‘রাজাকে রাজস্ব না দেওয়ার জন্যে সদস্যদের উস্কে দেবে’, কোনও সংগঠন সিদ্ধান্তে লিখল ‘তারা নগ্ন থাকতে পছন্দ করবে’ বা কেউ সংবিধানে লিখল ‘তারা জুয়া খেলায় প্রণোদনা দেবে’ বা হয়ত ‘নিয়মিত বেশ্যাবাড়ি যাওয়ার জন্যে মানুষকে আগ্রহী করবে’ বা ‘গণরাজপথে তীব্র বেগে যাতায়াত করার জন্যে মানুষকে উতসাহী করানো হবে’ বা ‘যে সব এলাকায় বিষাক্ত গাছড়া জন্মায় সে সব এলাকায় উপাসনা করবে’ ইত্যাদি। রাজা অবস্থায় কী করবে? স্মৃতিসূত্র অনুযায়ী রাজাকে বাধ্য হয়ে তার অপছন্দের এই সব প্রণীত নীয়মনীতিকে সমর্থন করে সংগঠনগুলোর সংবিধানকে মান্যতা দিতে হবে। এই রকম জরুরি, ব্যতিক্রমী অবস্থা মোকাবিলা এবং রাজ্যের নিরাপত্তাবিধান করার জন্যেও রাজাকে তৈরি থাকতে হত। কিন্তু তৎকালীন সময়ে রাজা সঙ্ঘের এই ব্যতিক্রমী নিয়ম, যা সামাজিক নিয়মেরর পরিপন্থী বুঝেও, সে সবের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ করতে পারতেন না; তাত্ত্বিকভাবে বললে তাকে সে সব নিয়ম বাধ্য হয়ে মেনে নিতে হত। একমাত্র ব্যতিক্রমী কিছু ঘটনা ছাড়া রাজার পক্ষে শ্রেণী সংঘের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করা সম্ভব হত না।
আট
আমরা দেখেছি কীভাবে শ্রেণী সঙ্গঠন সামগ্রিক পদ্ধতিগতভাবে তার সদস্যদের ওপর প্রশাসনিক এবং আইনি নিয়ন্ত্রণ কায়েম করতে পেরেছিল। ওপরে যে স্তবকটা উল্লিখিত হয়েছে সেটি সূত্রে বলা যায় শ্রেণী সংগঠন, শুধুই সদস্যদের শ্রেণীর সঙ্গে যুক্ত থাকা কাজ নিয়ন্ত্রণ করতে পারত। অন্য ভাষায় বলতে গেলে শ্রেণী সংগঠন যদি মনে করত তার দৈনন্দিনের কাজকর্মে সদস্য/সদস্যরা বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে, তাহলেই তারা সদস্যদের ওপর নিয়মতান্ত্রিক রীতিনীতি চাপিয়ে দেওয়ার অধিকার তার ছিল। নিচে বৃহস্পতির একটি উদ্ধৃতি থেকে আমরা দেখতে পাব শ্রেণী সংগঠন সাধারণ ন্যায়পীঠ (ট্রাইব্যুনাল) হিসেবে তার দায়িত্ব পালন করছে —
Relatives, guilds assemblies (of cohabitants), and other persons duly authorised by the king, should decide lawsuits among men, excepting causes concerning violent crimes (sahasa).
“When a cause has not been (duly) investigated by (meetings of) kindred, it should be decided after due deliberation by guilds; when it has not been (duly) examined by guilds, it should be decided by assemblies (of cohabitants) ; and when it has not been (sufficiently) made out by such assemblies, (it should be tried) by appointed (judges).
ওপরের স্তবকটি থেকে পরিষ্কার প্রাচীন ভারতের চারটি থাকবন্দীওয়ালা আদালত ব্যবস্থায় শ্রেণী সংগঠন দ্বিতীয় স্তরের আদালত হিসেবে বিচারের কাজ কাজ করত। শ্রেণী সংগঠনের চালানো আদালতের ওপরে ছিল আরও দুটি উচ্চস্তরের আদালত। শ্রেণীগুলিকে আদালতের মত কাজ করার কথা বলা হয়েছে এমন এক অধ্যায়ে, যে অধ্যায় মূলত সামগ্রিক আদালত পরিচালনার নিয়মাবলী নির্দিষ্ট করে — এখানে শ্রেণী সঙ্ঘের পরিচালিত আদালতের নিয়মকানুন বা প্রথার উল্লেখ, শ্রেণী আদালতকে অন্য মর্যাদা দিয়েছে বলেই আমরা মনে করছি। এবং সেই সূত্রে বলা যায় শ্রেণী সংঘের বিচারিক নির্দেশাবলী যে শুধুই তার সদস্যদের ওপরে বা তাদের কাজকর্মের বিষয়েও প্রযুক্ত হত না, বৃহত্তর জনসমাজের ওপরেও কার্যকর হত। বৃহস্পতি সংহিতায় এর পরের অধ্যায়ে গিল্ডের আদালতের কাজকর্মগুলি আলাদাভাবে লিপিবদ্ধ করা থেকে প্রমান হয় শ্রেণী সংগঠনগুলি সাধারণ আদালত হিসেবেও কাজকর্ম সমাধা করত। স্মৃতিকার ২৮ তম শ্লোকে বলছেন হিংসাত্মক দুষ্কর্মের বিচার বাদ দিয়ে সাধারণ অপরাধ আর দুষ্কর্মের বিচার করতে পারত শ্রেণী সংগঠনগুলি।
স্মৃতিকারের সিদ্ধান্তটি সমর্থিত হয়েছে সম্প্রতি আবিষ্কৃত দামোদরপুর তাম্রশিলালেখ সূত্রে। প্রথম কুমারগুপ্তের রাজত্বের দুটি শিলালেখর মধ্যে একটি ৪৩৩ অন্যটি ৪৩৮ খ্রিঃপূ —

অধ্যাপক রাধা গোবিন্দ বসাক স্তবকটি অনুবাদ করছেন এইভাবে — While Kumar’amatya Vetravarmma was administering the government of the locality in the company of nagara-sreshtshi Dhritipala, sarthavaha Bandhumitra, prathama-kulika Dhritimitra, prathama-kayastha Samvapala.
অনুবাদক, লেখটি অনুবাদ করার সময় শুধু কেন সাধারণ প্রশাসন পরিচালনার কথা বলছেন বুঝলাম না। আমি মনে করি তিনি লেখটির মূল সূর ধরতে পারেন নি। এই লেখতে স্পষ্টভাবে সঙ্ঘের বিচার প্রযুক্ত করার কথা বলা হচ্ছে। কারন এতে অধিকরণ, ব্যবহার অর্থাৎ আদালতের কাজকর্ম সম্বন্ধীয় বেশ কিছু নির্দিষ্ট লব্জ ব্যবহার করা হচ্ছে এবং একই সঙ্গে বিচার দেওয়ার কথাও বলা হচ্ছে। তাই আমার মতে লেখটির ভাষা কোনও একটা সাধারণ প্রশাসনের জন্যে প্রযুক্ত হওয়ার কথা নয়। আমি স্পষ্টভাবে মনে করি এই স্তবকে শহরের বিভিন্ন শ্রেষ্ঠীর শ্রেণী সংঘের মাথায় থাকা শ্রেষ্ঠী পরিচালিত প্রশাসনিক আদালত পরিচালনার কথা বলা হয়েছে।
নয়
এই সময়ের আরও কিছু লেখর আবিষ্কার শ্রেণী সংঘের ব্যবস্থাপনা বিষয়ে আমাদের দৃষ্টি আরও বৃহত্তরভাবে প্রসারিত করে। ৪৬৫খ্রিঃপূ স্কন্দগুপ্তের ইন্দোর তাম্রলিপিতে সূর্য মন্দিরে প্রদীপ জ্বালিয়ে রাখার জন্যে কিছু অর্থ দানের বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বলা হচ্ছে this gift of a Brahman’s endowment of (the temple of) the Sun (is) the perpetual property of the guild of oilmen, of which Jivanta is the head, residing at the town of Indrapura, as long as it continues in complete unity, (even) in moving away from this settlement। উল্লিখিত শ্রেণী সংঘের প্রতি নির্দেশ থেকে আমরা বেশ কিছু নতুন তথ্য আবিষ্কার করলাম। এখানে শ্রেণী সঙ্গঠনটির পরিচিতি তৈরি হচ্ছে শ্রেণী সংগঠনের নেতৃত্ব জীবন্তের নামে। তাম্রলেখতে সংগঠনের অভিজাততাও উল্লিখিত হয়েছে। বর্ণিত হয়েছে শ্রেণীর জোটবদ্ধতার তথ্যও। এবং একই সঙ্গে তার ভৌগোলিক এলাকার নামোল্লেখে আমাদের বোঝায় সঙ্ঘের সদস্যদের একজোট হয়ে থাকার বিষয়টা। এই লেখ থেকে প্রমান হয়, শ্রেণী সঙ্গঠন তখন চূড়ান্ত রূপে বিকশিত হয়েছিল। আরও একটা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হল শ্রেণী সঙ্ঘটি ভৌগোলিকভাবে এক শহর থেকে অন্য শহরে উঠে গেলেও তার সদস্যরা একজোট থাকে, ছড়িয়েছিটিয়ে যায় না এবং সঙ্ঘের ওপর জনগণের আস্থায় ঘাটতি পড়ে না।
তবে কুমারগুপ্ত এবং বন্ধুবর্মনের মন্দাসোর শিলালেখটি বিশেষভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করে আমাদের বুঝতে সাহায্য করে শ্রেণী সঙ্ঘ বিষয়ে আরও নানান খুঁটিনাটি তথ্য। লতা [কেন্দ্র-মধ্য গুজরাট] এলাকায় স্থাপিত রেশম বুনক কারিগরদের শ্রেণী সংঘটি রাজার বাসস্থানের শহর দাসপুরায় উঠে যায়। এখানে, নতুন এলাকায় উঠে আসার পর বেশ কিছু তাঁতি তাদের পূর্বজদের পেশা ছেড়ে ধনুর্বিদ্যা শিখে দক্ষ যোদ্ধা হয়ে ওঠে। কেউ কেউ ধার্মিক বিষয়ে পাঠ সাঙ্গ করে ধর্ম ব্যবসায়ে মন দেয়। এদের মধ্যে বুদ্ধিমানেরা জ্যোতর্বিদ্যা এবং জ্যোতিষবিদ্যা শিখে পার্থিব জীবন যাপনের বিলাসিতা ছেড়ে সন্ন্যাসীর মত জীবনধারণ করতে থাকে। অনেকে অন্যান্য পেশাতেও চলে যান। তবে অধিকাংশই তাদের মূল পেশা, তাঁত বোনায় থেকে যান (মন্তব্যে ফ্লিট লিখছেন, — It (the Inscription) narrates, in the first place, how a number of silk-weavers immigrated from the Lata Vishayn, or central and southern Gujarat, into the city of Dasapura and how some of the band took up other occupations while those who adhered to their original pursuit constituted themselves into a separate and flourishing guild” (C.I.I., Ill, p. 80). The verse 19 however makes it quite clear, that the guild included all the members described in verses 16-19. For, after referring to them in detail in the above verses, the author concludes adhikam = abhivibhati srenir-evam prakaraih” (verse 19), which certainly signifies that the guild flourished through all these men। অনুবাদে ফ্লিট আরও লিখছেন ” (And so) the guild shines gloriously all around, through those who are of this sort and through others who, etc…. এবং আগেই দেখেছি একটি শ্রেণী সংঘে নানান পেশার সদস্য থাকতে পারে। সংঘ যখন লতা অঞ্চলে ছিল তখন প্রত্যেকেই রেশম তাঁতি ছিল, কিন্তু মান্দাসোরে আসার পরে অনেক সদস্য তাঁদের বংশপরম্পরার বুনন পেশা ছেড়ে অন্যান্য পেশায় প্রবেশ করেছেন। বহু সদস্য পেশা ছেড়ে যাওয়া সত্ত্বেও এই সংঘকে তাঁতি সংঘ নামে অভিহিত করা হচ্ছে। আমরা আগেই বলেছি মান্দাসোরে সঙ্ঘ উঠে আসার পর সদস্যদের অনেকেই তাদের বংশ পরম্পরার পেশা ছেড়ে বেরিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু তারা শ্রেণী সংঘের সদস্যপদ ছেড়ে দিচ্ছে না। ইন্দোর তাম্রলিপিতে আমরা দেখলাম একটি শ্রেণী সংগঠনের ভৌগোলিক এলাকাও পরিবর্তিত হতে পারে, কিন্তু তার নাম, পরিচয়য়, চরিত্র বদল হচ্ছে না)। এইভাবে সবার অবদানে শ্রেণী সঙ্গঠনটি দাসপুরায় বিকশিত হল। ৪৩৬খ্রিঃতে নিজেদের সঞ্চিত সম্পদ বিনিয়োগ করে সঙ্ঘ একটি সূর্য মন্দির প্রতিষ্ঠা করে। আবার ৪৭২খ্রিঃতে একই শ্রেণী সংঘ মন্দিটি সারানোর জন্যে অর্থ ব্যয় করে।
আমাদের আলোচ্য অত্যন্ত আকর্ষণীয় শিলালেখটি প্রাচীন যুগের সংস্কৃত কাব্য শৈলীর অন্যতম উচ্চমার্গের নিদর্শন, যে শিলালেখ থেকে আমরা প্রাচীন ভারতের সমাজে শ্রেণী সংঘের চরিত্রগুলোর বিশদ এবং উজ্জ্বল বর্ণনা পাচ্ছি। শিলালেখর ভাষা থেকে একটা বিষয় পরিষ্কার, সাধারণভাবে শ্রেণী সংঘ হল প্রাচীন যুগের কারিগর, শ্রেষ্ঠী এবং অন্যান্য পেশাদারদের জোট, যে জোট কৃষ্টি এবং প্রগতির ওপর খুব একটা নির্ভরশীল ছিল না, যতটানা তারা পেশাদারদের স্বার্থ নির্ভর ছিল। রেশম তাঁতিদের শ্রেণী সংঘটি তাদের পেশা বিষয়ে গর্ব অনুভব করত। অথচ আমরা দেখব নিজেদের পেশার ভালমন্দ বিচার করার সঙ্গে সঙ্গে, সঙ্ঘ সমাজ প্রগতির নানান বিষয়েও চিন্তা ভাবনা করেছে। সংঘতে সামরিক দক্ষতার, যুদ্ধে অংশ নেওয়ার মানসিকতার মানুষও ছিল যারা, বলপ্রয়োগ করে শত্রু বিনাশ করার ক্ষমতা রাখত, এবং অন্যরা বিনয়, নম্র হয়ে ধার্মিক আলাপ আলোচনা করত, এবং দৈনন্দিন জীবনে পার্থিব বস্তুর প্রতি আসক্তি ঝেড়ে ফেতে পুণ্যাত্মা রূপে চিহ্নিত হইয়েছে (eyen to-day effect by force the destruction of their enemies ; While there were others, unassuming in their modesty and devoted to discourses of religion, men who overcame the attachment for worldly objects and were characterised by piety and goodness,—very gods in an eartlily habitation)। সংঘের বহু সদস্য যেমন পূর্ণ উদ্যমে জ্যোতিষবিদ্যা চর্চা করেছে, তেমনি শিলালেখর ভাষা থেকে পরিষ্কার, কবিতার মত সূক্ষ্মকলাশৈলীও তাদের সদস্যদের কাছে অধরা থাকছে না। শ্রেণী সঙ্ঘকে শুধুই নির্দিষ্ট পেশাদার কারিগরদের সমূহ হিসেবেই এতদিন একতরফাভাবে একরৈখিক পরিচিতি প্রদান করা হয়েছে। পেশাদারদের নিরাপত্তা বিধান করা তাদের প্রাথমিক কাজ ছিল ঠিকই; কিন্তু এটাই তাদের কাজকর্মের সম্পূর্ণ রূপ ছিল না অর্থাৎ শ্রেণী সংঘ শুধু নিজেদের পেশা নিয়ে গর্বিত তাঁতি কারিগর পেশার মানুষদের সমূহই ছিল না, এই মঞ্চ নিজেদের সঙ্ঘকে পেশাদারিভাবে চালানোর পাশাপাশি, আরও নানান সামাজিক কাজকর্ম করেছে এবং একই সঙ্গে সাহিত্য বিকাশের ক্ষেত্র হিসেবেও নিজের অবদান পেশ করেছে। এই লেখতে যে সব অসামান্য কাব্য গাথা ব্যহার করা হয়েছে, সেখান থেকে আমরা শ্রেণী সংগঠনের এই প্রায় অনালোচ্য বিষয়টি বুঝতে পারি। ফলে আমরা যেন ভুলে না যাই প্রাচীন ভারতে শ্রেণী সংঘে উন্নতমানের কলা এবং শিল্প বিকাশেরই ক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত হত না, দেশ, সমাজ, রাষ্ট্র আইনবলে তাকে যে স্বশাসন আর স্বাধীনতার পরিবেশ উপহার দিয়েছিল, সেই কাঠামোকে কাজে লাগিয়ে সে শক্তির উৎসস্থল আর উদার কৃষ্টিরও ধারক বাহক হয়ে ওঠে; শ্রেণী সংগঠন সে সময় সমাজের সর্বশ্রেষ্ঠ অলঙ্কার হিসেবে গণ্য হয়েছে।
দশ
পরের দিকের সময়ে আরও নানান সূত্রে আমরা শ্রেণী সংঘের অস্তিত্বের বর্ণনা দেখতে পাই। গোয়ালিয়রের ভাইল্লাভট্টস্বামী মন্দিরের একটি শিলালিপি এক্ষেত্রে বিশেষ উল্লেখের দাবি পেশ করে। আমরা এর আগে দেখেছি সংঘের নেতৃত্ব দান করার সুবাদে শ্রেষ্ঠী এবং স্বার্থবাহরা গোয়ালিয়র শহর পরিচালনার দায়িত্ব পাচ্ছেন ৮৭৭ খ্রিঃতে। এই তথ্য থেকে আবারও প্রমান হয় যে অতীতে কত বড় রাজনৈতিক গুরুত্ব অর্জন করেছিল শ্রেণী সংগঠন এবং সেই রাজনৈতিক গুরুত্ব তারা তখনও ধরে রাখতে পারছে। শিলালিপিতে মালাকার [বাগান দেখাশোনা করা পেশাদার] এবং তেলিদের [তেল বিক্রি করা পেশাদার] শ্রেণী সংগঠনে যে দানের কথা বলা হয়েছে, সেই বক্তব্যটি বিশ্লেষণ করলে আমরা সে সময়ের শ্রেণী সংগঠনের সংবিধান সম্বন্ধে বেশ কিছু নতুন জ্ঞান অর্জন করতে পারব। শ্রীসর্বেশ্বপুরের চারজন তেলি সঙ্ঘ প্রধান এবং শ্রীবৎসস্বামীপুরের দুজন তেলি সঙ্ঘ প্রধান এবং দুটি অন্য এলাকার চারজন সংঘ প্রধানের কথা উল্লিখিত হয়েছে; আমরা শিলালিপি সূত্রে জানছি যে তেলিদের সংঘ সদস্যরা সামগ্রিকভাবে মিলেমিশে প্রতি তেল কারখানা থেকে প্রতি মাসে এক পালিকা তেল দান করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। একইভাবে বলা হয়েছে মালাকারদের যে সাতজন সংঘ প্রধানের নাম উল্লিখিত হয়েছে, তারা এবং অন্যান্য সদস্য প্রতিদিন ৫০টি মালা দান করবে।
ওপরের আলোচনা থেকে পরিষ্কার যে প্রাচীন কালের মত, পরের সময়েও শ্রেণী সঙ্গঠনের সামাজিক গুরুত্ব এবং মর্যাদা বজায় ছিল; অতীতের উদাহরণ অনুসরণ করে তারা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বিপুল পরিমান সম্পদ ইত্যাদি দান করছে। তাছাড়া বৃহস্পতিস্মৃতিতে শ্রেণী সংগঠনের যে সংবিধানের কথা বলা হয়েছে, সে সব নির্দেশ তারা মান্য করত অর্থাৎ যে সংবিধানে প্রতিটি শ্রেণী সংগঠনের মাথায় দুই, তিন বা পাঁচজন প্রধান আধিকারিকের কথা বলা হয়েছে, সেই সংখ্যাটি আমরা শিলালেখতেও উল্লেখ পাচ্ছি — তেলিদের সংঘে দুই বা চার এবং মালাকারদের সংগঠনে এই ধরণের সাতজন নেতৃত্বের উল্লেখ পাচ্ছি। এই নেতাদের আলাদা করে নাম নেওয়ায় সামগ্রিকভাবে স্থানীয় রাজনীতিতে তাদের গুরুত্ব এবং সম্মানের জায়গাটা আমাদের বুঝতে সাহায্য করে। এবং একই সঙ্গে নেতৃত্বের ক্ষমতার ব্যপ্তির উল্লেখ আমরা বৃহস্পতি স্মৃতিতে পাচ্ছি।
প্রায় একই সময়ের আরেকটি শিলালেখ থেকে ঘোড়া ব্যবসায়ীদের শ্রেণী সংঘের কথা পাচ্ছি। এই সংগঠন রাজা এবং অন্যান্য সাম্রাজ্য আধিকারিকসহ অন্যান্য ক্রেতাদের ঘোড়া, ঘোটকি এবং অন্যান্য পশু বিক্রির ওপরে এক দশমাংশ কর চাপাত। এই শ্রেণি সংগঠনের সদস্য নানান দেশের মানুষ ছিলেন। তাদের বিক্রয়লব্ধ এক দশমাংশ কর পেহোয়া এবং কনৌজ এবং এই অঞ্চলের নানান মন্দিরের রক্ষণাবেক্ষণে ব্যয় হয়েছে। এখানে শ্রেণী সংগঠনের প্রধানদের নাম উল্লেখের পাশাপাশি আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাচ্ছি, তাদের জন্মস্থানেরও বর্ণনাও দেওয়া হয়েছে। উত্তর দেশের ঘোড়া ব্যবসায়ীদের শ্রেণী সংঘের উল্লেখ রয়েছে ৯৭৩-৭৪-এর হর্ষবর্ধনের শিলালেখতে। দশম শতকের শেষের সময়ের সিয়াদনি শিলালেখতে পান বিক্রেতা, তেল উৎপাদক এবং পাথর খোদাই কারিগরদের শ্রেণী সংগঠনের কথা বলা হচ্ছে। একটি মদ্য প্রস্তুতকারক সংগঠনে ১৩৫০ দাম্মা বিনিয়োগের কথাও উল্লিখিত হয়েছে। দশম শতের মাঝামাঝি সময়ে রাজত্ব করা চেদি লক্ষ্মণরাজের কারিতালাই শিলালেখতে ভাগুলিকদয়ের (ব্যাধ?) শ্রেণী সংগঠনের কথা রয়েছে। এছাড়াও বিজয়সেনের ডেকোপাড়া শিলালেখতে যে শিল্পীগোষ্ঠীর কথা উল্লিখিত হয়েছে সেটি হয়ত উত্তরবঙ্গের বারেন্দ্র অঞ্চলের পাথর কাটিয়েদের কথা বলেছে। অর্থাৎ হিন্দু আমলের শেষতম সময়েও শ্রেণী সংঘ টিকে আছে। (চলবে)