ঘোরলাগা শৈশবের অলস দুপুরে প্রায়ই শোনা যেত, ‘মিঠাই লাগবে, হাওয়াই মিঠাই!’ হয়তো কোনও মাঝ বয়সী বা বৃদ্ধ ফেরিওয়ালা টিনের বাক্সে (চারপাশে স্বচ্ছ কাচের দেয়াল দেওয়া) গোল গোল গোলাপি-সাদা রঙয়ের হাওয়াই মিঠাই নিয়ে হাজির হতো। এযেন এক টুকরো স্বপ্নের মতো বিষয় ছিল। এক পয়সা দিলেই পাওয়া যেত এক টুকরো হাওয়াই মিঠাই। মুখে পুরে দিতেই এক অপূর্ব মিষ্টি স্বাদের স্বপ্নিল ছোঁয়া দিয়ে নিমিষেই মিলিয়ে যেত। এজন্যই এর নাম হাওয়াই মিঠাই। এখন এক একটা হাওয়া মিঠাই পাঁচ টাকা।
দাম বাড়লেও হাল ফেরেনি হাওয়া মিঠাই বিক্রেতাদের। এক পয়সা দরের হাওয়া মিঠাই বর্তমানে পাঁচ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। তা সত্ত্বেও সংসারের একই হাল রয়েছে বলে জানান, জলপাইগুড়ির দীর্ঘদিনের হাওয়াই মিঠাই বিক্রেতা রাম বাহাদুর সাইনি। তিনি বলেন, “একসময় এক পয়সা দরে হাওয়া মিঠাই বিক্রি করেছি। এখন পাঁচ টাকা দিয়ে এক একটি হাওয়া মিঠাই বিক্রি হচ্ছে। কিন্তু আগে যেমন সংসার চলত এখনও সেভাবেই চলছে।” জলপাইগুড়ি শহরের মাসকালাইবাড়ি এলাকার বাসিন্দা রাম বাহাদুর সাইনি। শহরে গ্রামে বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে ঘুরে দীর্ঘদিন ধরেই হাওয়াই মিঠাই বিক্রি করছেন ।

তিনি বলেন, “এক পয়সার দরে হাওয়া মিঠাই বিক্রি করে আগে সারাদিনে এক টাকা রোজগার হত। এখন পাঁচ টাকা দরে হাওয়া মিঠাই বিক্রি করে প্রতিদিন প্রায় ৬০০ টাকা রোজগার হয়। কিন্তু সংসার চলছে সেই একইভাবেই।”

চিনির সাথে রঙ মিশিয়ে তৈরী হয় হাওয়া মিঠাই। এই মিঠাই তৈরী হয় মেশিনে। তারপরে এই মিঠাই বিক্রি করেন হাওয়া মিঠাই-এর ফেরিওয়ালারা। রাম বাহাদুর সাহানীর কথায় আগে এই হাওয়া মিঠাই বিক্রি করে দিনে দেড় হাজার টাকা লাভ হত।ওই টাকা দিয়েই তো বাড়ি করেছি, মেয়েদের বিয়ে দিয়েছি ছেলেকে পড়াশোনা করিয়েছি নিজের এবং স্ত্রীর চিকিৎসা করিয়েছি, নিজের পছন্দসই খাবার খেতে পেরেছি, ঘুরে বেড়িয়েছি সপরিবারে, আর এখন কিছুই হয় না, ছেলেমেয়েরা না করে এইভাবে ফেরি করতে বয়স হয়েছে, কিন্তু নেশা হয়ে গেছে তাই যতদিন শরীর সুস্থ থাকবে বের হবই। ছেলে মোবাইল কিনে দিয়েছে যাতে অসুবিধা না হয়,তবুও করছি। আগের মতন আর বাইরে থাকি না, দশটা থেকে তিনটে পযর্ন্ত করে চলে যাই বাড়ি। এখন দিনে তিনশো টাকা বিক্রি করি। আমার হাতখরচ উঠে আসে। আমি যতদিন সুস্থ থাকবো ফেরি করতে বের হব। গর্বের সাথে জানালেন তিনি।

ইতিহাস বলছে, ১৮৯৭ সালে মার্কিন উইলিয়াম মরিসন ও জন সি. ওয়ারটন প্রথমবার হাওয়া মিঠাই তৈরির যন্ত্র উদ্ভাবন করেন। আধুনিক পদ্ধতিতে এ খাবার তৈরি শুরু হওয়ার পরও খুব একটা জনপ্রিয়তা পায়নি। তবে যখনই এ খাবার ১৯০৪ সালে সেন্ট লুইস বিশ্ব মেলায় গেল, তখনই জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে হুড়মুড় করে। বিশ্ব মেলার পরই মূলত খাবারটি বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয়তা পায় খাবারটি। চাহিদা ও জনপ্রিয়তার জন্য একাধিক কোম্পানি এগিয়ে এল এই মজাদার খাবার তৈরিতে। দামি চকলেট, আইসক্রিম কিংবা ক্যান্ডির লড়াইয়ে বাজারেও হাওয়াই মিঠাইয়ের কদর বাড়তে থাকে। এরপর বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মতো ভারতেও ছড়িয়ে পড়ে এ খাবার। ইংরেজিতে রয়েছে এর কিছু মজাদার নাম; যেমন কটন ক্যান্ডি, ফেয়ারি ফ্লস, ক্যান্ডি ফ্লস কিংবা স্পুন সুগার। দেখতে অনেকটা তুলার মতো বলে ১৯২০ সালে মার্কিনরা এই মিঠায়ের নাম দিয়েছে ‘কটন ক্যান্ডি।’ তারা এই হাওয়া মিঠায়ের এতই ভক্ত যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ৭ ডিসেম্বর দিনটি ‘জাতীয় কটন ক্যান্ডি ডে’ হিসাবে পালন করা হয়।