প্রভু ও তার অধীনের সম্পর্কের রসায়ন ‘ক্ষমতার/আধিপত্যের’ (hegemony) নিয়মেই চলে। আদিকাল থেকেই এই আধিপত্যের অন্যতম স্তম্ভ ধর্ম। আর কতৃত্ব, সহযোগিতা ও প্রতিরোধের উপাদানগুলি মূলত ধর্মকে আশ্রয় করেই গ্রথিত হয়। পুরানের দেবতা-দানবের সম্পর্কের কেন্দ্রে ছিল অমৃত ভান্ডের উপর কতৃত্ব। আজকের প্রতিযোগিতা মানুষের জীবনধারনের উপযোগী সব পার্থিব সম্পদের মালিকানা নিয়ে। এবং এখানেই কতৃত্ব ও প্রতিরোধের গল্প, পুরাণ-বর্তমানে একাকার।
অসুর অধিপতি মহিষাসুর ‘মর্দনে’ দেবতাদের প্রতিনিধি দুর্গা হয়ে ওঠেন সর্বংস্বহা, ফেমিনিস্টদের বিচারে ‘আদ্যন্ত ফেমিনিস্ট’! মোহিনী রূপ ছাড়া তিনি যে উপায় মাত্র (tools only), একথা অনেকেই ভুলে যান। দশহাতে দশ অস্ত্রের দুর্গা পুরুষদের অস্ত্রেই বলীয়ান! তিনি দেবী, তাও পুরুষের বয়ানেই। মহালয়ার সকালে এই ভাষ্যই কি বেতারবাহিত হয়ে আমাদের কাছে আসেনা! দুর্গাকে সামনে রেখে এভাবেই এক প্রকল্প তৈরী হয়। পলাশীর যুদ্ধে বাঙালীর স্বাধীনতা সুর্য অস্তমিত হল বলে বিলাপ গাথায় ভাসলেও, ক্ষমতার অভিলাষীরা ইংরেজদের বিজয়কে মঙ্গলময়ই মনে করেছিলেন। বাঙালীর দুর্গোৎসবের জাঁক তখন থেকেই! ‘বনেদি বাড়ির পুজো’ নামকরন থেকেই এর প্রমান মেলে। সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রজার বিধর্মী শাসন থেকে মুক্তি কার্যত হিন্দু- ইংরেজ ক্ষমতার কেন্দ্র তৈরী করে। ক্ষমতা একসময় তার রূপ বদলায়, সহযোগিতা ‘প্রতিরোধ, প্রতিঘাতের’ পথ নেয়। প্রজার অপর অংশ ততদিনে সহযোগীর ভূমিকায়!
প্রজার অভ্যন্তরেও থাকে ক্ষমতার অনুশীলন। ধর্ম, জাতি, বর্ণ, বিচ্ছিন্নতা এর আধার। ক্ষমতার অনুশীলনের প্রতীক হিসেবে আসে দুর্গাসম কোন আধার, অপরদিকে প্রতিপক্ষ অসুর। এ এমন এক প্রকল্প যা চিরন্তন, শাশ্বত বলে মানিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়ায় স্থির থাকে। অশুভের বিরুদ্ধে শুভের জয় এখানে ক্ষমতাকে মান্যতা দেয়। তাই দিল্লীতে ছাত্র-যুবরা ধর্মীয় ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াইতে রাবণ কেই চাঁদমারি করে! এ এক লালিত ক্ষমতার বয়ান যা অজান্তে চাড়িয়ে যায় সাধারনের অন্দরে।
বাংলা ভাষায় যারা কথা বলেন তারাই বাঙালি! যারা এই বাংলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে থাকেন তারা ‘অপর’ (others). ক্ষমতা কেন্দ্রের বাইরে এদের অসংখ্য রক্তঝড়া আখ্যান থাকলেও তা সাধারণ্যে বেখাপ্যা এক আসুরিক বৃত্তান্ত মাত্র।ইতিহাস দেখার বিষয় ও এই নির্মিতিকেই মান্যতা দেয়। counter telling বা বিকল্প — স্বর তাই জানা বৃত্তের বাইরেই থাকে। ক্ষমতা এই কাজটাই করে।
সেই অজানা কথার পরতে পরতে থাকে এক বিকল্প সংস্কৃতি কথা। সেই কথায় আসে তাদের দেবতা হূদুড় দুর্গার বয়ান, অন্যায় যুদ্ধের কথা, উন্নত অসুর সংস্কৃতি, দাঁশাই নাচের বিয়োগ ব্যথা, এমত নানা বিষয়। বাঁকুড়া, পুরুলিয়া, পশ্চিম বর্ধমান, জঙ্গল মহলের বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে আদিবাসী জনজাতির মানুষ পুজোর দিনগুলো স্মরণ করেন তাদের সেই দমিত (suppresed) সংস্কৃতির কথা। রাবন বধের ঝাঁঝালো আলো ও শব্দ বাজির আবহে ঢাকা পড়ে যায় ‘অপর’ কথা।
এখানে বিকল্প কথন অবদমিত। আলোর বেনু’র রোশনাই তে তা চাপা পড়ে। মণ্ডপে মণ্ডপে আদিবাসী সংস্কৃতির জ্যান্ত চলচ্চিত্র আমাদের মোহিনী রূপে নিমজ্জিত করে, আমরা এক সংস্কৃতির আড়ালে ‘মর্দিনী’ অসুর বিনাশী হই।