আজ বরং এক জলপরীর গল্প বলি। জলপরীর কথা শুনলেই তো মনে হয় শতাব্দী প্রাচীন এক কাল্পনিক নারী চরিত্রের কথা, যাকে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের লোকজ সংস্কৃতির বিভিন্ন গল্প, আখ্যানে খুঁজে পাওয়া যায়। কিন্তু আজকের এই জলপরী পাহাড়ের রাই জনজাতির মনের মানুষ। ভয়ঙ্করী পাহাড়ি তিস্তা নদীতে দুর্ঘটনা ঘটলেই খোঁজ পড়ে এই সাহসিনীর কারণ তিনি যে দূর্গতদের দুর্গতিনাশিনী।
কালিম্পং এ তিস্তা নদীর লাগোয়া তারখোলা এলাকার মানগচুরে বসবাসকারী এই জলপরীর আসল নাম শান্তি রাই। পেশায় জিটিএর প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত টুরিস্ট গাইড। বয়স ৪০ এর কোঠায়।
কাজ কালিঝোড়া থেকে সিকিমের রংপো পর্যন্ত ১০ নম্বর জাতীয় সড়কের দুর্ঘটনার জেরে তিস্তা নদীর প্রবল জলস্রোতের সাথে পাঞ্জা কষে বা খাদে পড়ে যাওয়া গাড়ি থেকে দুর্ঘটনায় জখম মানুষদের উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠানো।
অবিবাহিত, ডাকাবুকো,পাহাড় চড়তে ওস্তাদ — তার চেয়ে ওস্তাদ সাঁতারে শান্তির রিভার রাফটিং এর হাতেখড়ি হয়েছিল দাদা প্রবীণ রাই এবং সন্তবির লামার কাছে। হোয়াইট ওয়াটার রাফটিং প্রতিযোগিতা, হিমালয়ান মাউন্টেনিয়ারিং প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে পাহাড়ে চড়ার স্বীকৃতি, যুব কল্যাণ ও ক্রীড়া দপ্তর এবং পুলিশ বিভাগের হিমালায়ান তরাই ডুয়ার্স স্পোর্টস ফেস্টিভ্যালে ফুটবলে জয়ী হওয়ার মতো বহু খেতাব আছে শান্তির সাফল্যের ঝুলিতে।

দার্জিলিং কালিম্পং সিকিম ডুয়ার্স পেরিয়ে জলপরীর নাম ছড়িয়ে পড়েছে ভুটানেও। পাহাড়ি নদীতে গাড়ি পড়ে গেলেই খোঁজ শুরু হয় জলপরীর। পাহাড়ের খাদে গড়িয়ে পড়া, চিরতরে হারিয়ে যাওয়া মানুষ ও যানবাহন দুর্ঘটনার কবলে পড়া দেখতে হতো সেই কোন ছোট বয়স থেকেই শান্তিকে। একটি গাড়ি খাদ থেকে তুলতে হাজার হাজার টাকা খরচা করতে হয়। এমনকি গাড়ী তুলতে দেরি হলে মৃতের সংখ্যা ক্রমশ বাড়তে থাকে। ধনীরা এ খরচ বহন করতে পারলেও গরিবদের দুর্দশার শেষ থাকে না। সেখান থেকেই পরিত্রাণ দিতে শান্তি রাইয়ের সংগঠনের জন্ম। ২০১৯ সাল থেকে এলাকার ৩-৪ জন যুবককে নিয়ে তৈরি হয়েছিলো তিস্তা রঙ্গীত রেস্কিউ সেন্টার (Teesta Rangeet Rescue Centre)। আজকে যার সদস্যের সংখ্যা ৫০ এরও বেশি। টাকার জন্য নয়, গরিব মানুষদের সাহায্য করার উদ্দেশ্যেই তৈরি হয়েছে এই রেসকিউ সেন্টার।
এই ধরনের উদ্যোগকে কুর্নিশ জানিয়েছেন পরিবেশ প্রেমী সংস্থা হিমালয়ান নেচার অ্যান্ড অ্যাডভেঞ্চার (Himalayan Nature & Adventure Foundation) থেকে শুরু করে রাজ্যের মন্ত্রীও। হিমালয়ান মাউন্টেনিয়ারিং ইনস্টিটিউট থেকে তাকে সংবর্ধণা দিয়ে নাম দেওয়া হয়েছে ‘দ্য আইরন লেডি অফ দার্জিলিং।’ আসলে সাহসই হলো ভারতীর নারীর সাফল্যের দিশারী।

অনেক আগে থেকেই আমাদের দেশে নারীরা রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, শিক্ষা, সাংস্কৃতিক ইত্যাদি নানান ক্ষেত্রেই সাহসের সঙ্গে নিজেদের উচ্চস্থানে থাকার প্রমাণ দিয়ে চলে আসছেন। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে মধ্যে থেকেও নিজেদের সাহসে ভর করে মহিলাদের অগ্রগতি প্রতিনিধিত্ব করেছেন সেই সকল ‘প্রথমা’দের আজকে স্মরণ করার দিন।
কোন এক কালে, ডাক্তার মানেই ছিলো কেবল পুরুষ। নারীরাও যে পারেন ডাক্তার হতে তার পথ দেখিয়েছিলেন কাদম্বিনী গঙ্গোপাধ্যায়। তিনি ছিলেন ব্রিটিশ ভারতের প্রথম দুইজন নারী স্নাতকের একজন এবং ইউরোপীয় চিকিৎসাশাস্ত্রে শিক্ষিত দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম নারী চিকিৎসক।
বর্তমানে অনেক মহিলাই রাজ্যসভার সদস্য হচ্ছেন। পথটা এতটা মসৃণ ছিলো না সেই আমলে। রাজ্য সভার প্রথম মহিলা সদস্য হিসাবে নিজের স্থান দখল করে নেন রুক্মিণী দেবী আরুনদেল। তিনি আবার ভরতনাট্যম নৃত্যশৈলীকেও জনসম্মুখে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন।ভারতের প্রথম মহিলা রাষ্ট্রপতি — শ্রীমতি প্রতিভা প্যাটেল, ভারতের প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী — শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী ভারতীয় নারী শক্তির স্মরণীয় প্রতীক।

ভারতীয় বংশোদ্ভূত প্রথম মহিলা মহাকাশচারী ছিলেন কল্পনা চাওলা। ভারতীয় মহিলা টেস্ট ক্রিকেট টিমের প্রথম অধিনায়ক শান্তা রঙ্গস্বামী, সেরা মহিলা আথ্যালিট পিটি ঊষা ভারতীয় নারী শক্তির স্মরণীয় প্রতীক। প্রথম ভারতীয় মহিলা বাচেন্দ্রি পাল কেবল আত্মবিশ্বাসে ভর দিয়ে অপার সাহসিকতায় এভারেস্ট জয় করেছিলেন। ভারতের প্রথম মহিলা বৈজ্ঞানিক যিনি ডক্টরেট উপাধি পান, তিনি হলেন পশ্চিমবঙ্গের অসীমা চট্টোপাধ্যায় — যার সাফল্য বহু নারীকে বিজ্ঞানের প্রতি আগ্রহী করতে সাহায্য করেছিল। আরতি সাহা ভারতীয় প্রথম মহিলা যিনি ইংলিশ চ্যানেল পার করেছিলেন। রিতা ফরিয়া ষাটের দশকে প্রথম ভারতীয় বিশ্বসুন্দরীর খেতাব জিতে দুনিয়াকে চমকে দিয়েছিলেন। ক্যাপ্টেন প্রেম মাথুর পরিচিত ভারতের প্রথম মহিলা কমার্শিয়াল বিমান চালিকা হিসেবে। একজন মহিলাকে বাণিজ্যিকভাবে বিমান চালানোর অনুমতি দেওয়ার ধারণাটি সেই সময়ে বিতর্কিত ছিল, কিন্তু যখন ডেকান এয়ারলাইন্স তাকে ৩৮ বছর বয়সে সহ-পাইলট হিসাবে নিয়োগ করেছিল, তখন তিনিই প্রথম ভারতীয় মহিলা ছিলেন।
ভারতীয় চলচ্চিত্রের প্রথম মহিলা পরিচালক, চিত্রনাট্যকার ছিলেন ফাতেমা বেগম। যে সময় মহিলা পরিচালকের কথা ভাবাই যেত না। ১৯২৬ সালে তার প্রথম সিনেমা ছিল বুলবুল এ পরিস্থান। চালু করেন তার নিজস্ব প্রোডাকশন হাউস।

সিডনি অলিম্পিকে প্রথম মহিলা খেলোয়াড় হিসেবে ওয়েট লিফটার হিসেবে যোগদান করেছিলেন কর্ণম মালেশ্বারী। মহিলাদের ৬৯ কেজি বিভাগে ২৪০ কেজি ওজন তুলে সিডনি অলিম্পিকে দেশের একমাত্র পদকটা মালেশ্বরীই জিতেছিলেন।
এরকম ভুরি ভুরি উদাহরণ রয়েছে বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীদের অবস্থান নিয়ে। জীবন যুদ্ধের প্রতিটি ক্ষেত্রেই তাঁরা সাহসিকতার ও নিজেদের উচ্চস্থানে থাকার প্রমাণ অনেক আগে থেকেই দিয়ে আসছেন।
সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে ও সার্বিক উন্নয়নে নারীদের অবদানকে সম্মান জানানো এবং অতি অবশ্যই নারীর ক্ষমতায়নের অঙ্গীকার-কে স্মরণ করার দিনটিই হল “নারী দিবস।” এবছর নারী দিবসের প্রতিপাদ্য : ‘ডিজিটাল প্রযুক্তি ও উদ্ভাবন, জেন্ডার বৈষম্য করবে নিরসন’। তথ্যপ্রযুক্তির উপযুক্ত ব্যবহার নারীর কর্মসংস্থানের প্রত্যয়কে আরও সুদৃঢ় করে তুলতে সাহায্য করবে। সমাজে পুরুষদের মতোই নারীরাও এগিয়ে চলেছেন নিজ গুণে।
আজ এই নির্দিষ্ট দিনে কুর্নিশ জানাই সকল নারীদের যাঁদের দৃঢ় সংকল্প ও আত্মবিশ্বাস মহিলাদের অগ্রগতির প্রতিনিধিত্ব করছেন যাতে বর্তমানের নারীরাও তাঁদের থেকে আরো বেশি অনুপ্রাণিত হতে পারেন।
অত্যন্ত মূল্যবান লেখা। খুব ভাল লাগল।
ধন্যবাদ জানাই আপনাকে ????