যত দিন যাচ্ছে আমরা যেন ততই অসহায় হয়ে পড়ছি। উপায়হীন হয়ে পড়ছে আমাদের চারপাশ। কিছুতেই কোভিড-১৯-এর সঙ্গ ছেড়ে বেরতে পারছি না। সে কি অন্যান্য অনুজীবের মতো শরীরে পাকাপোক্ত বাসা বেঁধে ফেললো? সেগুলি তো এমন ভয়ঙ্কর প্রাণনাশী ছিল না। তাই তাদের জানতে পারা বা তাদের আচরণ বুঝতে পারা গিয়েছিল। কিন্তু কোভিড-১৯ মনে হচ্ছে একুশ শতকের চিকিৎসা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করে বসেছে।
আসলে কোভিড-১৯-এর চরিত্রই হচ্ছে মুহূর্তে মুহুর্তে নিজেকে বদলে ফেলা। ইতিমধ্যে অন্তত আট হাজারবার চরিত্র বদল করেছে এই অনুজীব। সে কারণেই একে বাগে আনা যাচ্ছে না কিছুতেই। ওর তালে তাল মিলিয়ে কি আমরা অতবার বদলে যেতে পারি, সেটা কি মানুষের পক্ষে সম্ভব? আমরা মাস্ক পরতে পারি, সাবান দিয়ে হাত ধুতে পারি, বারবার স্যানিটাইজার ব্যবহার করতে পারি, নিঃস্ব-সর্বশান্ত হয়েও লকডাউন পালন করতে পারি। কিন্তু কতদিন? কতদিন লকডাউন করে জীবন অচল করে বসে থাকবো? তিল তিল করে মৃত্যুর সামনে এগিয়ে যাব? যদি কোভিডের চরিত্র একইরকম থাকতো তাহলে বুঝে নিতাম জীবনযাপনে কোথায় কী রদবদল ঘটাতে হবে, যাতে অনুজীব শরীরে ঢুকতে পারবে না।
চিকিৎসা বিজ্ঞান কিন্তু এখনও নিশ্চিত হয়ে বলতে পারেনি, কোভিড-১৯ সংক্রমিত হওয়ার কারণ হচ্ছে এই। গবেষণা চলছে আর সেখান থেকে নানান ধারণা বিলি হয়ে যাচ্ছে আমাদের চারপাশে। একবার বলা হচ্ছে মুখ থেকে নিঃসৃত কণা বা ড্রপলেট থেকে কোভিড-১৯ ছড়ায়। আবার বলা হচ্ছে অনুজীবটি বায়ুতে উড়ে বেড়াচ্ছে। তাহলে আমরা কোথায় গিয়ে লুকাবো? বিজ্ঞান তার ধারণা জানিয়েছে, মুখ মাস্ক দিয়ে ঢেকে রাখতে হবে। তার মানে বিজ্ঞান আপাতত নাক-মুখ দিয়ে প্রবেশের পথ আটকে দিয়েই দায়মুক্ত। টিকা দিয়ে সেই অনুজীবকে ঘায়েল করার চেষ্টা চলছে। কিন্তু সেটা যে পরীক্ষা-নীরিক্ষার পর্যায় থেকে এককদম এগিয়েছে তা বলা যাবে না। প্রতিষেধক নিয়ে যে কেবল বাণিজ্য চলছে তা বলা যাবে না। দু-তিনটে গোলার্ধের রাজনীতিও চলছে সমান তালে। চরিত্র বদলে যাওয়া অনুজীবকে টিকা দিয়েই আটকে দেওয়া যাবে, এমন হিম্মত দেখাতে পারেনি একুশ শতকের চিকিৎসা বিজ্ঞান বা বিজ্ঞানী।
যেখানে চিকিৎসা বিজ্ঞান কোভিড-১৯ সংক্রমণ, তাকে প্রতিরোধ এবং তার চিকিৎসা সংক্রান্ত বিষয়ে নিশ্চিত করে কিছুই বলতে পারছে না, অন্তত গত দেড় বছর পেরিয়ে যাওয়ার পরেও পারেনি, সেখানে আমাদের দেশে কোভিড পাদুর্ভাবের গোড়া থেকেই শুরু হয়ে যায় নানা ধরণের বুজরুকি চিকিৎসা। গরু বা ওই জাতীয় প্রাণীর মল-মূত্র খেলে নাকি কোভিড ধার কাছ-ঘেষতে পারবে না, এরকম আরও নানা চিকিৎসা বা টোটকার কথা ছড়িয়ে যায় চারপাশে, আমাদের গর্বের সামাজিক মাধ্যমে যথাযোগ্য মর্যাদায় সেগুলি জায়গা করে নেয়। আমরা শিক্ষিত মানুষ, বিজ্ঞান ভাবাপন্ন মানুষ, আমাদের মধ্যে যারা কবি-সাহিত্যিক-শিল্পী-বিজ্ঞানী থেকে শুরু করে রাজনীতিকরা তারাও সেগুলি ছড়াতে থাকেন। সেই পর্বটি বেশ কিছুদিন আগে শেষ হয়েছে ঠিকই। কিন্তু তারপরেই শুরু হয়ে গিয়েছে আরেক পর্ব।
প্রায় রোজই দেখা যাচ্ছে অনেকেই ছড়িয়েই চলেছেন, কোভিড নিয়ে অযথা ভয় পাবেন না, মাস্ক পড়ুন, বাড়িতে থাকুন। খুব ভাল পরামর্শ। কিন্তু তারপর দেখা যাচ্ছে বাড়িতে কি কি ওষুধ রাখবেন তার নাম ও ছবি। কেউ পরামর্শ দিচ্ছেন আক্রান্ত মনে করলে অ্যান্টিবায়োটিক খেতে, কেউ বাড়িতে প্যারাসিটামল রাখার পরামর্শ দিচ্ছেন, যাতে জ্বর মনে হলেই সেটি খায়। কখনও কখনও একাধিক চিকিৎসককেও বলতে শোনা যাচ্ছে, কোভিড আক্রান্ত হওয়ার আগেই অ্যান্টিবায়োটিক খেতে। চিকিৎসক এবং সামাজিক মাধ্যমের গুণী মানুষদের এই পরামর্শের প্রভাব সাধারণ মানুষের মধ্যে পড়তে বাধ্য। তারা শরীরে করোনার কোনও উপসর্গ অনুভব করলেই নিজেরাই দোকান থেকে কিনে নিচ্ছেন এবং খাচ্ছেন।
যারা সামাজিক মাধ্যমে কোভিড নিয়ে নানা ধরণের পরামর্শ দিচ্ছেন; তারা একবার অন্তত ভেবে দেখবেন; এখনও চিকিৎসা বিজ্ঞান বা কোনও বিজ্ঞানী কোভিড নিয়ে নিশ্চিত করে একটিও কথা বলেন নি। প্যারাসিটামল, অ্যান্টিবায়োটিকের পরামর্শ দিয়ে তার ছবি সামাজিক মাধ্যমে ছেড়ে দেওয়ার আগে অন্তত একবার ভেবে দেখবেন, কোনও সভ্য দেশের কোনও চিকিৎসক বা চিকিৎসা বিজ্ঞানী এ ধরনের ওষুধের পরামর্শ দিচ্ছেন কিনা। হ্যাঁ আমাদের দেশের চিকিৎসকরা চিকিৎসায় যতটা আগ্রহী তার থেকে বেশি আগ্রহী টেলিভিশনে অসুখ নিয়ে বলতে। চিকিৎসক এবং বিজ্ঞানীরা যখন কোভিড নিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন তখন কতিপয় চিকিৎসক টেলিভিশন, ফেসবুকে কত অনায়াসে কোভিড নিয়ে কত কথা বলছেন, চিকিৎসা বাতলে দিচ্ছেন। এদিকে কোভিড ভ্যাকসিন বলে যেটি আমরা শরীরে নিচ্ছি সেটিও অমিল, হাসপাতালে শয্যা থেকে অক্সিজেন সবই অমিল। সে ব্যাপারে অবশ্য সামাজিক মাধ্যম সোচ্চার; সেকথা অস্বীকার করা যাবে না। যেমন বাংলায় যে একমাস ধরে ভোট চলছে, ভোটের প্রচারে হাজার হাজার মানুষের সমাগম, সেসব নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে ঝড় বয়ে যাচ্ছে আবার কোভিড নিয়ে নানা পরামর্শ যেভাবে এগচ্ছে সেটাও যদি ঝড়ে পরিণত হয় তাহলে বিপদ।
লকডাউনে মিনিটে মিনিটে কবি-সাহিত্যিক-শিল্পী-বাগ্মীর জন্ম হচ্ছিল, এখন চিকিৎসা বিজ্ঞানীরাও জন্ম নিচ্ছেন ফেসবুকে।
দেখতে পারছি তারা নিজেদের বিশেষঙ্গের বিশেষঙ্গ ভেবে করোনা নিয়ে নানা উপদেশ দিচ্ছেন, এর পরিণতি কি হতে পারে
তা কি ভেবে দেখেছে।
এ ধরণের ডাক্তারি পরামর্শ যে কোভিডের থেকেও ভয়ঙ্কর তা কি ফেসবুক বন্ধুরা বোঝেন না, নাকি অল্পবিদ্যা…
কোভিড যত ভয়ঙ্কর হচ্ছে ফেসবুকে আঁকা লেখা চিকিৎসার পরামর্শ তত বাড়ছে কেন? সংক্রমণে তারা কি পাগল বা ছাগল
হয়ে যাচ্ছেন?
আমরা অনেকেই অনেক কিছু যে জানিনা সেটা মেনে নিতে পারি কিন্তু যখনই অসুখ বিসুখের কথা ওঠে তখন সবাই এই
করো, ওই করো, না না ওটা কোরো না-এমন কথা বলতেই থাকি। সেই অভ্যাস থেকেই মনে হয় চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা যে
বিষয়ে দিশা দেখাতে পারছেন না সে বিষয়ে আমাদের পরামর্শ কিন্তু চলছেই।