প্রত্যেক দিন আমাদের দেশে করোনা সংক্রমণ আর তাতে মৃত্যুর সংখ্যা নতুন নতুন রেকর্ড সৃষ্টি করছে। বেসরকারি হিসাবে যে সংখ্যাটা আরও বেশি সে কথা বললেও ভুল বলা হয় না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরিসংখ্যান বলছে, সারা বিশ্বে গত এক সপ্তাহে মোট করোনা সংক্রমণের প্রায় অর্ধেক ভারতের। এই সময় বিশ্বে যত করোনা সংক্রমিত রোগী মারা গিয়েছে তার ২৫ শতাংশ ভারতের। এর মধ্যে দেশের অধিকাংশ জায়গায় তৈরি হয়েছে অক্সিজেনের সঙ্কট। পরিস্থিতি এতটাই ভয়ংকর যে দেশের বিভিন্ন উচ্চ আদালত সরকারি ব্যবস্থার গাফিলতিকে ‘অক্সিজেনের অভাবে মৃত্যুর মতো পরিস্থিতি একটি অপরাধ’ এবং ‘গণহত্যার চেয়ে তা কম নয়’—এই ভাষায় তিরস্কার করেছে। দেশের সর্বোচ্চ আদালত সরকারের কাছে অক্সিজেনের এই সংকটের ব্যাখ্যা চেয়েছে।
প্রশ্ন; অক্সিজেনের এই চরম সংকট হল কীভাবে? অক্সিজেনের অভাবে যখন দেশের বিভিন্ন প্রান্তে একের পর মৃত্যু ঘটছে তখনও সরকারের তরফে জোর গলায় বলা হচ্ছিল যে দিল্লি বা দেশের কোথাও অক্সিজেনের কোনও অভাব নেই, কেবল পরিবহনে কিছু সমস্যা হচ্ছে। রাজধানীর যেখান থেকে এসব কথা বলা হচ্ছিল তার মাত্র কয়েক মাইল দূরের কয়েকটি ছোট হাসপাতাল জানাচ্ছিল যে তাদের অক্সিজেন শেষ হয়ে আসছে এবং অনেক রোগীর জীবন বাঁচানো মুশকিল। তবে অনেক বিশেষজ্ঞ বলছেন অক্সিজেন সঙ্কট সম্পূর্ণ একটা সমস্যার একটি মাত্র দিক, কিন্তু তা চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে; করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের জন্য দেশের কেন্দ্রীয় সরকার তার সঙ্গে রাজ্য সরকারগুলিও তৈরি ছিল না।
দেশে অক্সিজেন যে যথেষ্ট পরিমানে মজুদ নেই এবং হাসপাতালগুলিতে যে বেডের বিরাট অভাব রয়েছে তা কিন্তু অনেক আগে থেকেই সরকারের জানা ছিল। গত বছর নভেম্বর মাসে স্বাস্থ্য বিষয়ক সংসদীয় কমিটি বার বার এ বিষয়ে সরকারকে সতর্ক করেছিল। এমনকি ফেব্রুয়ারি মাসেও কয়েকজন বিশেষজ্ঞ করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের সম্ভাবনা নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন। মার্চের গোঁড়াতেও সরকারের তৈরি একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি সতর্ক করে জানিয়েছিল, করোনাভাইরাসের চেয়েও শক্তিশালী সংক্রামক একটি ভ্যারিয়্যান্ট সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ছে। কিন্তু কে শোনে কার কথা।
৮ মার্চ স্বয়ং কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঘোষণা করেন, ভারত এই প্যানডেমিক প্রায় জয় করে ফেলেছে। কেন তিনি এমন একটা দায়িত্বজ্ঞানহীন কাণ্ড করে বসলেন, তার পক্ষে বলা যায় যে, জানুয়ারি এবং ফেব্রুয়ারিতে প্রতিদিনের গড় সংক্রমণ ২০ হাজারের নীচে নেমে আসে, যেখানে সেপ্টেম্বরে মাসে ছিল প্রায় ৯০,০০০। কেবল তাই নয়, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীও ঘোষণা করেন, কোভিড পরাজিত। এরপরই সব রকম সভা সমাবেশের জন্য সমস্ত জায়গা খুলে দেওয়া হয়। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী স্বাস্থ্যমন্ত্রীর কথাবার্তা, কাজকর্ম দেখে সাধারন মানুষও করোনাকালের সাধারণ সাবধানতাগুলি অগ্রাহ্য করতে শুরু করে।
যদিও তখনও মানুষকে মাস্ক পরতে এবং সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়। কিন্তু দিল্লি থেকে ঘন ঘন পাঁচটি রাজ্যে গিয়ে প্রায় রোজই বড় বড় নির্বাচনী জনসভার যে ধুম পড়ে যায়, সেখানে অধিকাংশ মানুষের মুখে কোনও মাস্ক তো ছিলই না, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখারও কোনও প্রশ্ন ছিলনা। এরপর কুম্ভ মেলারও অনুমতি দেয় সরকার। যেখানে হাজির হয়ে যায় লাখ লাখ হিন্দু পূণ্যার্থী। মোট কথা সরকারের অজ্ঞতা বা অবহেলায় কখন যে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ আছড়ে পড়ল তা সরকার দেখতেই পেলনা। বরং হাসপাতালের বাইরে চিকিৎসার অভাবে মানুষ মারা যাচ্ছে-এমন করুণ দৃশ্য দেশের স্বাস্থ্য অবকাঠামোর বেহাল দশাকে আরও নগ্ন করে দিল।
মানুষকে হাজার হাজার টাকা খরচ করে কালোবাজার থেকে অক্সিজেন জোগাড় করতে হচ্ছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে তা রি-ফিল করতে হচ্ছে। অথচ কোভিডের দ্বিতীয় ঢেউয়ের জন্য তৈরি হতে গত বছর বেশ কয়েকটি উচ্চ-ক্ষমতাসম্পন্ন কমিটি করা হয়। কিন্তু তারপরও অক্সিজেনের অভাব, হাসপাতাল বেড নেই, ওষুধ নেই-এটাই হয়ে গেল স্বাভাবিক দৃশ্য।
প্রথম দফায় সংক্রমণ যখন কমছিল, তখনই দ্বিতীয় ঢেউয়ের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া দরকার ছিল। অক্সিজেন বা রেমডিসিভিরের মতো ওষুধ মজুত রাখা প্রয়োজন ছিল। আরও উৎপাদন বাড়ানো দরকার ছিল। অক্সিজেনের অভাবে অনেক মানুষ যখন মারা গেল তখন সরকারের টনক নড়ল। সরকার এক রাজ্য থেকে আরেক রাজ্যে অক্সিজেন নেওয়ার জন্য বিশেষ ট্রেন চালু করল। শিল্পে অক্সিজেনের ব্যবহার বন্ধ করল। এখন যদি উৎপাদন বেড়েও থাকে চাহিদা তার চেয়ে বহুগুণ বেড়ে গিয়েছে।
যখন কোভিডের সঙ্গে যুদ্ধে মানুষকে টিকা দেওয়ার ব্যবস্থা শুরু হল তখন হিসেব বলছে দেশে জুলাই মাসের মধ্যে ৩০ কোটি মানুষকে ভ্যাকসিন দেওয়ার যেখানে লক্ষ্য সেখানে এখন পর্যন্ত দেশের ১৪০ কোটি মানুষের মধ্যে মাত্র দু’কোটি ৬০ লাখ মানুষ দু-ডোজ টিকা নিয়েছেন। ১২ কোটি ৪০ লাখ লোক প্রথম ডোজ পেয়েছেন। ৪৫ বছরের বেশি বয়স্ক মানুষকে ভ্যাকসিন দিতে সরকারের হাতে ৬১ কোটি ৫০ লাখ ডোজ ভ্যাকসিন দরকার। কিন্তু তার জোগান আসবে কোথা থেকে। দুর্ভাগ্য ভারত বিশ্বের ওষুধ প্রস্তুতকারী হিসাবে অন্যতম কিন্তু এখন সে নিজেই ভ্যাকসিনের সংকটে ভুগছে।
প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা করছেন, কোভিড পরাজিত, কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঘোষণা করছেন, ভারত এই প্যানডেমিক প্রায় জয় করে
ফেলেছে- এদের প্রাণদণ্ড হবে না কেন?
Covid পরাজিত না Covid-er কাছে দেশ পরাজিত অপদার্থটার দৌলতে !!!
আদালতের হুমকি, রাজ্যে রাজ্যে ধ্বস তবু ওরা বেপরোয়া কেন, মানুষের জীবন নিয়ে ছেলেখেলার সাহস কোথা থেকে
পাচ্ছে?
অক্সিজেনের অভাবে যখন একাধিক মৃত্যু ঘটছে তখনও সরকার জোর গলায় বলছে, কোনও অভাব নেই- চরম মিথ্যবাদিও
অনেক সময় সত্যি বলে। তাহলে অক্সিজেন নিয়ে হাহাকার কেন?