এ যেন অতিকায় এক দৈত্যের বড় থেকে ছোট হওয়ার গল্প। আকার পাল্টে যেখানে ভ্যাকসিন তার নাগাল পায়নি সে জায়গায় টিঁকে থাকার কাহিনি। যদিও তখনও তার মারণ ক্ষমতা অনেকটাই রয়েছে। এই হছে অতিমারীর একটি স্থানীয় অসুখের পরিণত হওয়ার ইতিবৃত্ত যা শুনিয়েছেন চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা। তারা বলছেন, পৃথিবী বহুদিন ধরেই সংক্রামক রোগের সঙ্গে লড়াই করেছে। বিশ্বজোড়া নানা ভাইরাসের আক্রমণের মুখোমুখি তাকে হতে হয়েছে বহুবার। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ইতিহাস বলছে, অতিমারী দূর হলেও তার ভাইরাসকে পুরোপুরি পরাস্ত করা কঠিন। বিশ্বের কোন না কোন দেশে সে টিঁকে থাকে। কোভিড-১৯ এর ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটবে।
আমাদের চিকিৎসা বিজ্ঞান এখনও পর্যন্ত মাত্র একটি অতিমারীর ভাইরাসকে পরাস্ত করতে সক্ষম হয়েছে তা হল, গুটি বসন্ত বা স্মল পক্স। আর সবই পরিণত হয়েছে কোন বিশেষ দেশ বা ভূখণ্ডের স্থানীয় অসুখে। প্যানডেমিক দানোর ভয়ংকর শক্তি খর্ব করতে করতে একটা ছোট জায়গায় সীমাবদ্ধ করা গিয়েছে। কিন্তু তার বেশি আর এগোনো যায়নি। এটা একটা বাস্তবতা।
চিকিৎসা বিজ্ঞান বা রোগ নিরাময় ব্যবস্থার এই সীমাবদ্ধতা শ্বীকার করে নিয়েছেন ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশনের এমার্জেন্সি প্রোগ্রামের একজিকিউটিভ ডিরেক্টর মার্ক রায়ান। তার মতে, এই ভাইরাসগুলি আর পাঁচটা রোগের মতই মানব সম্প্রদায়ের মধ্যে টিঁকে থাকবে, একে নির্মূল করা যাবেনা। এই না যাওয়ার কারণটি লুকিয়ে রয়েছে বিভিন্ন দেশের মধ্যে স্বাস্থ্য পরিকাঠামো, স্বাস্থ্য পরিষেবা এবং টিকাকরণের বৈষম্যের মধ্যে। এর ফলে একটি দেশ কোভিড-১৯ এর উন্নতমানের ভ্যাকসিন ও প্রায় প্রতিটি মানুষের টিকাকরণের মাধ্যমে তাকে দেশ থেকে উৎখাত করতে সক্ষম হলেও অন্য একটি অনুন্নত দেশে তা টিঁকে থাকতে সক্ষম হচ্ছে। কারণ সে দেশের ভ্যাকসিনের মান ততটা উন্নত নয়। পরিকাঠামো ব্যবস্থার দুর্বলতা থাকায় সব মানুষের শক্তিশালী টিকাকরণ সম্ভব হয়নি। এটা সত্যিই একটা জটিল সমস্যা।

একটা অনুন্নত দেশে আত্মগোপন করা বা কোনমতে টিঁকে থাকা অতিমারী ভাইরাস থেকে সে দেশে যাওয়া মানুষের মধ্যে কোভিড-১৯ বা অন্য কোন অতিমারী ভাইরাস ছড়াতে পারে। রোগ নিরাময়ের চাবিকাঠি মানুষের হাতে এলেও তার সুফল পাওয়া যাচ্ছেনা স্বাস্থ্য পরিষেবার বৈষম্যগত কারণেই। চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা বলছেন, ভাইরাসের প্যানডেমিক থেকে এনডেমিক হয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়াটি খুব একটা সরল নয়। এটা হয় খুব ধীরে এবং অগোছালোভাবে। ধরুন কোন জায়গায় পরিকাঠামো একটু দুর্বল বা রোগ নিরাময় সম্পর্কে মানুষের সচেতনতা একটু কম, কোভিড-১৯ এর মত ভাইরাস সেখানে থিতু হয়ে বসে রোগ ছড়াতে শুরু করতে পারে। হয়তো সেটা আগের মত শক্তিশালী নয় কিংবা মারণ ক্ষমতা কম। এটা অনেকটা নির্ভর করে সে দেশের মানুষের হার্ড ইমিউনিটির ওপর।
ইমিউনোলজি বা নিরাময় বিজ্ঞানের গবেষকরা বলছেন, ভ্যাকসিন কোভিড-১৯ কে শেষ করেছে মানে এই নয় যে তা পুনঃসংক্রমণ বা রোগ নির্মূল করার লক্ষ্যেও সফল হবে। আমরা এখনও জানিনা কোভিড-১৯ প্রতিরোধের ভ্যাকসিন পুনঃসংক্রমণ রোধে কার্যকর হবে কিনা। গোটা পৃথিবীর স্বাস্থ্য পরিকাঠামোর চলতি অবস্থাতে তা সম্ভবও নয়। এই কারণে ইনফ্লুয়েঞ্জা, ওল্ড করোনা ভাইরাস, রাইনোভাইরাস ও শ্বাসযন্ত্রে নানা সংক্রমণের ভাইরাস পৃথিবীতে রয়ে গেছে। সীমিত জায়গায় সংক্রমণ ছড়াতে সক্ষমও হচ্ছে।
ভারতের পরিসংখ্যান বলছে, কোভিড-১৯ আক্রান্ত মাত্র ২১.৩ শতাংশ মানুষ আক্রান্ত হওয়ার পর শরীরে অ্যান্টিবডি বা রোগ প্রতিরোধ শক্তি তৈরি করতে পেরেছে। দিল্লিতে ৫৭ শতাংশ মানুষ সংক্রমিত হয়েছিলেন। অ্যান্টিবডি তৈরি হয়েছে অপেক্ষাকৃত কম মানুষদের মধ্যে। তাই পুনঃসংক্রমণ ঘটার সম্ভাবনা থেকেই যাচ্ছে। পৃথিবীর সব মানুষের সমানভাবে শক্তিশালী ভ্যাকসিন পাওয়া এবং তাদের শরীরে রোগ প্রতিরোধক ক্ষমতা উপযুক্তভাবে না বাড়লে এই সমস্যার সমাধান হবেনা।