কোভিড টিকাকরণের ৬ মাস পার হয়েছে গতকাল। সরকারি নথি বলছে, জরুরি ভিত্তিতে যাদের টিকা পাওয়ার কথা তাদের প্রায় এক তৃতীয়াংশকে একটি ডোজ দেওয়া গেছে। কিন্তু প্রায় ৭৫ মিলিয়ন মানুষ, যারা জনসংখ্যার প্রায় ৭.৭৫ শতাংশ, তাদের এখনও দুটি ডোজ দিয়ে ওঠা যায়নি। মানে জনসংখ্যার অধিকাংশেরই টিকাকরণ সম্পূর্ণ হয়নি। কোভিডের তৃতীয় ঢেউ প্রায় আছড়ে পড়ার মুখে এই অবস্থা অনেককেই ভাবাচ্ছে। সরকারি পরিসংখ্যানই বলছে জরুরি ভিত্তিতে যাদের টিকা দেওয়ার প্রয়োজন সেই প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের সংখ্যা ৯.৭৫ মিলিয়নেরও বেশি। এদের প্রায় ৩১-৬৭ শতাংশ মানুষকেই এখনও টিকা দিয়ে ওঠা যায়নি। সত্যি কথা বলতে কি এরা এখনও একটি ডোজও পায়নি।

দেশের উত্তরপূর্বের রাজ্যগুলির অবস্থা অবশ্য তুলনামূলকভাবে একটু ভাল। কারণ তাদের জনসংখ্যা কম, আক্রান্তের সংখ্যাও কম। বড় রাজ্যগুলির যেখানে আরও অনেক বেশি মানুষকে দিতে হবে কোভিড টিকা, সেখানে টিকাকরণে আশানুরূপ অগ্রগতি হয়নি। গুজরাট, কর্ণাটক, তেলেঙ্গানা, রাজস্থানের মত রাজ্যগুলির বেশিরভাগ মানুষ পেয়েছেন একটি ডোজ – তেলেঙ্গানায় এই হিসেব ৪৬.৭৩ শতাংশ; গুজরাট ৪৪.৭৫ শতাংশ; কর্ণাটক ৪৩.৬ শতাংশ এবং রাজস্থান ৪২.১৩ শতাংশ। সরকারি প্রচেষ্টার সীমাবদ্ধতার পাশাপাশি মানুষের টিকাকরণের সচেতনতার অভাবও যে এর একটা বড় কারণ একথা মানতেই হবে।
পশ্চিমবঙ্গ জনসংখ্যার বিচারে দেশের তৃতীয় বৃহত্তম রাজ্য। কিন্তু দিনকয়েক আগে পাওয়া হিসেব অনুযায়ী টিকাকরণ হয়েছে মাত্র ২৪.৭ শতাংশ মানুষের। এক্ষেত্রে কিন্তু সচেতনতার অভাব বা রাজ্যের উদ্যোগহীনতাকে দায়ী করা যাবেনা। আরও বেশি ভ্যাকসিন পাঠানোর জন্য বারবার কেন্দ্রের কাছে দাবি করেছে রাজ্য সরকার। তারা নিজেরাও বিকল্প ব্যবস্থার উদ্যোগ নিতে চেয়েছেন, কিন্তু কেন্দ্রের সম্মতি মেলেনি। অথচ এ রাজ্যে যাকে বলা যায় ভ্যাকসিন হেজিটেন্সি বা ভ্যাকসিন দ্বিধা, তা নেই। টিকাকরণে সবচেয়ে বেশি এগিয়ে আছে উত্তরপ্রদেশ, তারপরে মহারাষ্ট্র। দেশের তৃতীয় বৃহত্তম রাজ্য পশ্চিমবঙ্গ এব্যাপারে কেন্দ্রের মনোযোগ থেকে বঞ্চিত বলেই মনে হয়।

পশ্চিমবঙ্গের কোভিড সমস্যার ব্যাপারে কেন্দ্র বরাবরই উদাসীন। কারণ বারবার আপত্তি করা সত্বেও এখানে ভোট প্রক্রিয়া দীর্ঘ করেছেন তারা। মানা করা সত্বেও চিত্রতারকাদের প্রচারে এনে নির্বাচনী সভা ও মিছিলে ব্যাপক জনসমাগম ঘটিয়েছেন। এতে রাজ্যে কোভিড বেড়েছে। অথচ ভ্যাকসিন সরবরাহের ব্যাপারে তাদের এই তৎপরতা দেখা যায়নি। রাজ্যে কোভিড মোকাবিলার কাজ গতিশীল করার ব্যাপারে তারা বরাবরই নিষ্ক্রিয়। নাহলে ইতিমধ্যে রাজ্যে টিকাকরণ আরও অনেক বেশি গতি পেত।
সবকিছু নিয়ে যে রাজনীতি করা যায়না, সেই সাধারণ বোধটুকুই কেন্দ্রের নেই। সরকারি পরিসংখ্যানেই প্রমাণিত হচ্ছে টিকাকরণের এই সীমাবদ্ধতা। প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চল, বিশেষ করে নিম্নবিত্ত মানুষ ও আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকায় টিকাকরণের সমস্যা সঠিকভাবে সামনে আসেনা, এলে এব্যাপারে সরকারি ব্যর্থতার চেহারা আরও স্পষ্ট হত।