ত্রিপুরার রাজনৈতিক পরিস্থিতি যে পথে এগোচ্ছে তাতে কপালে ভাঁজ বিজেপি নেতাদেরও। শনিবার দিল্লি থেকে রাজ্যে ফিরলেন সুদীপ রায়বর্মন, আশিস সাহা। এই নিয়ে কংগ্রেসে দীপাবলির আয়োজন হল। যেন বনবাস কাটিয়ে অযোধ্যায় ফিরছেন রাম-লক্ষণ। ঘোষনা ছিল এই ঘর অয়াপসিতে দুই হাজার বাইকের মিছিল বিমানবন্দর থেকে মিছিল করে নেতাদের কংগ্রেস ভবনে নিয়ে আসবে। দুই দিন আগেই বিজেপির মন্ডলে মন্ডলে সভা বসে যায়, রুখতে হবে মিছিলকারীদের। এর পরও শুক্রবার রাতে পুলিশের কাছে রিপোর্ট আসে, মিছিলে লোকসংখ্যা চার হাজার ছাড়াতে পারে। সে দিনই দলীয় সভায় দলের নেতাদের পাশে রেখে মুখ্যমন্ত্রী প্রকাশ্য ভাবে স্বীকার করে নিলেন দলে ফাটল আছে। কি ভাবে তা মিটিয়ে ভোট বাড়াতে হবে আগামী নির্বাচনে তারও পরামর্শ দিলেন। এই যখন শাসক দলের অবস্থা,তার আমেজ নিচ্ছে প্রধান বিরোধী দল সিপিআইএম।
রাজ্যে এখন সিপিএমের সাংগঠনিক সম্মেলন চলছে। ফলে নেতাদের খোলামেলা প্রতিক্রিয়াও জানতে পারছেন সাধারণ মানুষ। আগামী নির্বাচনে কংগ্রেসের সঙ্গে সিপিএমের কি জোটের সম্ভবনা আছে? এমন প্রশ্নও চলে আসছে। সাংবাদিকের এইরকম এক প্রশ্নের জবাবে সিপিআইএম সম্পাদক জিতেন্দ্র চৌধুরী জানালেন, উনারা বিজেপি ছেড়ে কংগ্রেসের ফিরেছেন। আমরা এও শুনছি আরও অনেকেই নাকি আসছেন। তারা বলছেন বিজেপির আমলে গনতন্ত্র বিপন্ন। আর আমরা রাজ্যে গনতন্ত্র পুনরুদ্ধারে মাঠে কাজ করে আসছি। তারাও কাজটা করুন। শুধু মুখে বললে তো হবে না। মাঠে দেখা হবে। তখন না হয় সে সব ভাবা যাবে।
এ তো গেল সিপিআইএম নেতাদের মুখের কথা। অদূর ভবিষ্যতে তাঁদের কৌশল কি হবে বা হতে চলেছে? এই নিয়ে সিপিএমের ভেতরেও মতানৈক্য রয়েছে। তবে দলে ভারি যারা তারা মনে করেন না বিধানসভায় অনাস্থা দিয়ে সরকার ফেলে দেওয়া যাবে। বরং সিপিআইএম যদি মার্চের বাজেট অধিবেশনে অনাস্থা আনে তাতে হিতে বিপরীত হতে পারে। সিপিআইএম ইস্যুতে সব বিজেপি ফের ঐক্যবদ্ধ হতে পারে। এতে সিপিএমের ক্ষতিই বেশি, বরং রাজনৈতিক অবস্থান মতো সিপিআইএম বাজেটের বিভিন্ন ফিনান্সিয়াল বিলগুলির বিরোধিতাই করবে। রাজ্যের স্বার্থে ট্রেজারি বেঞ্চের কোন কোন সদস্য যদি গঠনমূলক সমালোচনায় এই বিরোধিতায় সায় দেন তাহলে বাজেট আটকে যেতে পারে। সাংবিধানিক সঙ্কট অবশ্যম্ভাবী হবে। তবে সরকার নাও পড়তে পারে। প্রথা অনুযায়ী সংখ্যার ঘাটতিতে বাজেট পাশ করানো না গেলে সরকার রাজ্যপালের শরণাপন্ন হন। রাজ্যপাল বিধানসভা অধ্যক্ষের রিপোর্ট তলব করে সিদ্ধান্ত জানান। সেই সিদ্ধান্ত হতে পারে শক্তি পরীক্ষার, কিংবা রাজ্যপাল বলে দিতে পারেন, সভায় উপস্থিতদের সংখ্যাগরিষ্ঠ বাজেটের পক্ষে ছিলেন তাই বাজেট পাশ হয়ে গেল।

দেশে কেন্দ্র রাজ্য যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো নিয়ে বিরোধী দলগুলির মনে এই সময়ে যে আশঙ্কা সেই আশঙ্কাতেই সিপিআইএম মনে করে এই আমলের রাজ্যপালেরা শক্তি পরীক্ষার কথা বলবে না বরং দ্বিতীয়টিই বলবে। হয়তো শেষ অবধি সরকার পড়তে দেওয়া হবে না। তাই সাংবিধানিক ফাঁকফোকরের চেয়ে সিপিআইএম এখন মনোযোগী সংগঠন নিয়ে। বিজেপি আইপিএফটি সরকার ক্ষমতায় আসার পর তাঁদের অধিকাংশ লোকাল অফিস অস্ত্বিত্বহীন। যেখানে যেখানে অফিসগুলি দাঁড়িয়ে আছে সে গুলিও খোলার উপায় নেই শাসক দলের প্রতিরোধের সামনে। কিন্তু পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে সিপিআইএম ছোট আকারে হলেও সাংগঠনিক কর্মসূচি শুরু করেছে নানান জায়গায়। চার বছরে প্রথম মিছিল দেখছেন কোন কোন বিধানসভার মানুষ।
এই সুবিধাজনক পরিস্থিতি হাত ছাড়া হয় তা চান না নেতারা। আবার এমন কোনও মন্তব্য করতে চাইছেন না, পা ফেলছেন মেপে। দক্ষিণ ত্রিপুরায় গিয়ে জিতেন্দ্র চৌধুরি বলে এসেছেন,—‘আমরা চাই না সরকার পড়ে যায়। সরকার পাঁচ বছর মেয়াদ থাকুক আর মানুষ এদের মুখ মুখোশ ভালো করে জানুন।’ আবার আগরতলার দলীয় অনুষ্ঠানে বলেছেন,— ‘বিজেপির আভ্যন্তরীণ রক্তপাত শুরু হয়েছে প্রথম দিন থেকেই, এখন রক্তশূণ্যতা বাড়বে।’ প্রথম বক্তব্যে বিপ্লব কুমার দেবের জন্য আশ্বাস যোগালেও দ্বিতীয় বক্তব্য বিপ্লব বিরোধীদের জন্য উৎসাহের হতে পারে। বস্তুত আগামী নির্বাচন অবধি কিংবা আশিস সাহা, সুদীপ রায় বর্মনের কথিত ‘টর্নেডো’ নেমে আসার আগে অবধি সিপিআইএম এইরকম ভারসাম্যের খেলা দিয়ে নিজের মাটি শক্ত করতে চাইবে। তবে সিপিএমের কাছেও খবর রয়েছে বা তারা আশাবাদী রয়েছেন, টর্নেডো না হলেও আম্ফানের ঝাপটা আসছেই। সেই ঝাপটায় অনেকটাই টালমাটাল হতে হচ্ছে বিপ্লব কুমার দেবের বিজেপি এবং সরকারকে।