নয়-এর দশক থেকেই মানুষ দেখতে শুরু করেছিল শহর ও শহরাঞ্চলের কিছু কমরেড জমির দালালি, ঠিকাদারি, প্রমোটারি, বাড়ি তৈরির অনুমতি দিয়ে প্রণামী আদায়, বিল্ডিং মেটেরিয়াল সাপ্লাই ও ভেড়ির ব্যবসা করছে পার্টির প্রভাব কাজে লাগিয়ে। সেই সময় থেকেই বন্ধ কারখানার জমিতে স্থানীয় পার্টি অফিসের আর্শীবাদে বহুতল ওঠার শুরু। এমনকি মানুষ এও দেখলেন যে কোনও একটি বহুতলে নীচু তলায় প্রমোটারের বদান্যতায় তৈরী হওয়া পার্টি অফিসের উদ্বোধন করছেন নেতারা। দলের মধ্যে এইসব কাজের অনেকেই প্রতিবাদ করেছিলেন কিন্তু তাতে কাজ হয়নি। কারণ ক্ষমতার শিকর যত ছড়িয়েছে, পার্টিতে তত উপদল গজিয়েছে। আর সেই উপদলের ডালে বসে থাকলেই সাতখুন মাপ হয়েছে। এই কারণেই পর পর দু-বার দমদম লোকসভা কেন্দ্রে পরাজয়ের পরে দমদম পুনরুদ্ধারে জ্যোতি বসুকে নিয়ে গিয়ে সল্টলেক স্টেডিয়ামে পার্টি যে সাধারণ সভা করান হয়েছিল সেখানে জ্যোতিবাবু বলেছিলেন, এখন শুনছি দলের মধ্যে অমুকদাদা, তমুকদাদা তৈরি হয়েছেন। এরকম কথা তো আগে কখনও শুনি নি। দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকলে কি কি রোগ ঘটতে পারে তা বিলক্ষণ জানা ছিল সিপিআইএম-এর। সেই ১৯৭৭-এ ক্ষমতায় আসার ৬ বছর পরেই ৮৩ সালেই ‘সিপিআইএম বলেছিল গৌরবজনক সাফল্য সত্ত্বেও পার্টির মধ্যে সংখ্যায় কম হলেও শ্রমিকশ্রেণী বিরোধী দেষত্রুটি দেখা দিয়েছে। ৬ বছর ধরে প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে কাজ করার ফলে দুর্নীতি ও অন্যান্য ত্রুটি বিচ্যুতির সুযোগ বেড়েছে।’
এবার আসি সিঙ্গুর নন্দীগ্রাম প্রসঙ্গে। বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য সম্পর্কে অনেকেই জেনে না জেনে অবান্তর কথা বলেন। ২০০৬ সালে আমি যে টেলিভিশন চ্যানেলে কাজ করতাম সেই চ্যানেলে ভোটের ফল বেড়োনর দিন সন্ধ্যে বেলায় সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন বুদ্ধবাবু। এক সহকর্মীর সঙ্গে আলিমুদ্দিন স্ট্রীটে আমি সেই সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম। দেখেছিলাম, শিল্পায়ন নিয়ে প্রশ্নের উত্তরে বুদ্ধবাবুর আবেগ ও ভাবনার মধ্যো কোনও খাদ ছিল না। আমার মনে হয় রাজ্যের শিল্পভাবনা নিয়ে তাঁর দিশায় কোনও ভুল ছিল না। ভুলটা হয়েছিল শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় জমি নীতির প্রয়োগে। তাই দীর্ঘদিন ধরে বামফ্রন্টের ভিঁতের নিচে যে উত্তাপ জমেছিল তার জ্বালামুখ খুলে দেওয়ার কাজটুকুই করেছিল সিঙ্গুর নন্দীগ্রাম কান্ড। জনগণভিত্তিক দলে আধিপত্যকামী ও আমলাতান্ত্রিক মানসিকতার নেতা কর্মী বেড়ে যাওয়ার কারণেই ৭৭ সালে যে বামফ্রন্ট সরকার ছিল নয়নের মনি আজ তা হয়ে দাঁড়িয়েছে চোখের বালি।
সংসদীয় ক্ষমতার রাজনীতির আঁকাবাঁকা পথে আড়াই দশক প্রায় একাই যিনি দলকে টেনে নিয়ে গিয়েছিলেন সেই জ্যোতি বসু আজ নেই। এই মুহূর্তে বিমান বসু ছাড়া আর কোনও সর্বজনমান্য নেতা দলে নেই। যাঁরা রয়েছেন তাদের প্রায় কারুরি মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্যতা নেই। ফলে সাধারণ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠতে পারছে না সিপিআইএম। এখনও মাটিতে পা রেখে চলেন, যে কয়েকজন নেতা দলে রয়েছেন তাঁরা মনে করেন ভোটে জেতার সুযোগ পরেও আসবে। তার আগে পার্টিটাকে গুছিয়ে তুলতে হবে। কিন্তু কোন পথে সেই লক্ষ্যে পৌঁছনো যাবে তা নিয়েই গোলমাল। সিপিআইএম এখনো বুঝে উঠতে পারছে না, নেতা বদল করলে সমস্যা মিটবে? না-কি অন্য কোনও রাস্তা খুঁজে বার করতে হবে?