১৯৯৭ সালে শুদ্ধকরণ দলিল তৈরীর কারণ হিসেবে বলা হয়েছিল, বিশেষত কেরলে ও পশ্চিমবাংলায় দীর্ঘদিন ধরে শাসন ক্ষমতায় থাকার ফলে পার্টিতে বুর্জুয়া দলগুলির মতো ত্রুটি বিচ্যুতি দেখা দিয়েছে। শুদ্ধকরণ দলিলে রোগ চিহ্নিত করে দাওয়াই হিসেবে বলা হয়েছিল, ‘ছেলে-মেয়ের বিয়েতে দান ও উপহার নেওয়া যাবে না। অসাধু ব্যবসায়ী, ঠিকাদার ও প্রমোটারদের সঙ্গে ওঠাবসা করা যাবে না। সরকারী ক্ষমতার অপব্যবহার করে ব্যক্তিগত প্রতিপত্তি বাড়ানো যাবে না।’ দুর্নীতি রুখতে এছাড়াও আরো অনেক বিধিনিষেধের কথা বলা হয়েছিল। এত কিছুর পরেও ২০১১-তে বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণ করে হারের যে কারণগুলো দেখানো হয়েছে, তা থেকে পরিষ্কার রোগ চিহ্নিত করে শুদ্ধকরণের ফলে যে নেতাদের দল থেকে ঝেঁটিয়ে দূর করা উচিতছিল তা করা হয় নি। এই কারণেই শুদ্ধকরণ অভিযান কখনই অভিযান হয়ে উঠতে পারে নি।
বর্ধমানে এক দলীয় সভায় রাজ্যের কমিউনিস্ট আন্দোলনের এক মহীরুহ বিনয় চৌধুরী বলেছিলেন পার্টিটাকে ‘গাছ (মানে টিম্বার মাফিয়া) মাছ (ভেঁড়ির মালিক) আর ঠিকাদারে খেলো’। এই সত্যি কথা বলে বিনয় চৌধুরীর মতো নেতাকেও একঘরে হতে হয়েছিল। এরফলেই সৎ, বিনয়ী ও বিপুল সাংগঠনিক দক্ষতা থাকা নেতাদের শূন্যস্থান ক্রমশ ভড়াট করেছে উদ্ধত, সবজানতা ও প্রচার সর্বস্ব নেতা কর্মীরা। অথচ ১৯৭৭-এ ক্ষমতায় আসার পরবর্তী দু-দশকে সিপিআইএম দেখিয়েছিল জনস্বার্থমুখী কাজের মধ্যে দিয়ে কিভাবে জনদরদী নেতা কর্মী তৈরি হয়। কেন্দ্রের আধিপত্যবাদ ও রাজ্য বিরোধী পদক্ষেপের বিরুদ্ধে সেই সময়ে সিপিআইএম নেতৃত্ব দক্ষ সেনাপতির ভূমিকা পালন করেছিলেন। শিখ দাঙ্গা ও বাবরি মসজিদ ধ্বংসের সময় পশ্চিমবঙ্গে জ্যোতি বসুর নেতৃত্বে বামফ্রন্ট শান্তি বজায় রেখে মানুষের আস্থা বাড়িয়েছিল।
১৯৭৮ সালে রাজ্যে ভয়াবহ বন্যায় সিপিআইএম যেভাবে বন্যা দুর্গতদের পাশে দাঁড়িয়েছিল তার নজির অন্য রাজনৈতিক দলের নেই। দুর্গত এলাকায় ত্রাণ পৌঁছে দিতে গিয়ে অনেক পার্টি কর্মীর মৃত্যুও হয়েছিল। দারিদ্র দুরীকরণ, গ্রামীণ সম্পদ সৃষ্টি করে কর্মসংস্থান বারানো, ভূমিসংস্কার ও গরিব মানুষের ক্ষমতা বাড়িয়ে সিপিআইএম-এর পঞ্চায়েত যে কাজ করেছিল তার ফলে বিশাল সংখ্যক মানুষ পার্টির পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন। অথচ আড়াই দশক পরে পঞ্চায়েতের মাধ্যমে বিভিন্ন সরকারী প্রকল্প—ইন্দিরা আবাস যোজনা ও বার্ধক্য ভাতা পেতে পার্টি অফিসে কড়া নারাটা বাধ্যতা মূলক হয়ে দাঁড়িয়েছিল। বেকার যুবক-যুবতীদের সরকার নয় পার্টি অফিসের মুখাপেক্ষী করে তোলা হয়। এর ফলে নির্বাচিত সরকারের সংস্থা আর পার্টির মধ্যে আড়াল ঘুঁচে যায়। এমনকি পুলিশের কাজও পার্টি অফিস থেকেই নিয়ন্ত্রিত হতে থাকে। শুধু তাই নয়, জমির গোলমাল, পারিবারিক বিরোধ, ক্লাব অথবা পাড়ার বিরোধ, ভাড়াটে বাড়ি ওয়ালার বিরোধের মীমাংসাতেও ঢুকে পড়ে পার্টি। জনগণের পার্টি ধীরে ধীরে সামাজিক শক্তি হয়ে সামাজিক পরিষদ পার্টি গ্রাস করে নেয়।
দু-দশক আগে আমাকে এক সিপিআইএম নেতা বলেছিলেন, গর্ভস্থ সন্তান পুত্র না কন্যা হবে তা স্থির করে দেওয়া ছাড়া এমন কোনও কাজ নেই যা আমরা করি না। নয়-এর দশকের শেষ দিকে পঞ্চায়েতের ত্রিস্তরেই অডিট করাটা প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। সরকারি পরিসংখ্যান বলছে ১৯৯৬ সালে ৩,৩১৪টি গ্রাম পঞ্চায়েতের মধ্যে ২,১৫৭টি-তে অডিট হয়নি। ৩৪১টি পঞ্চায়েত সমিতির কোনওটিতে অডিট হয়নি। ১৭টি জেলাপরিষদের একটিতেও অডিট হয়নি। ১৯৭৮-এ রাজ্যে প্রথম পঞ্চায়েত নির্বাচনের মুখে প্রমোদ দাশগুপ্ত বলেছিলেন, পঞ্চায়েত এমন এক ধারালো অস্ত্র যা ঠিকমত ব্যবহার করলে শত্রুদের কাটতে কাটতে এগনো যাবে আর সঠিক ব্যবহার না হলে নিজেরাই কাটা পড়বে।
(আগামীকাল শেষ কিস্তি)