১৫ অগস্ট আলিমুদ্দিনে উড়বে তেরঙ্গা। শেষ পর্যন্ত স্বাধীনতা দিবসে দেশের জাতীয় পতাকা তোলা হবে সিপিআইএম-এর হেড কোয়ার্টার থেকে শুরু করে জেলা এবং শাখা কমিটিগুলিতে প্রথমবার একে কি বলবো, সিপিআইএম-এর বোধোদয় নাকি নীতি বদল? তবে এই ভাবে স্বাধীনতা দিবস পালনের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন সিপিআইএম-এর শীর্ষ নেতারা। পশ্চিমবঙ্গ ছাড়াও অন্যান্য রাজ্য যেখানে সিপিআইএম-এর সংগঠন রয়েছে সেখানও এবার স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হবে। এমনকি দিল্লিতে সিপিআইএম-এর কেন্দ্রীয় অফিস এ.কে. গোপালন ভবনেও এবার তেরঙ্গা উত্তোলন করা হবে বলে জানিয়েছেন সিপিআইএম নেতারা।
গত রবিবার ছিল কেন্দ্রীয় কমিটির বৈঠক এবং সেই বৈঠকেই সিপিআইএম-এর কেন্দ্রীয় কমিটির নেতা সুজন চক্রবর্তী এই বছর স্বাধীনতার ৭৫তম বর্ষপূর্তি উপলক্ষে রাজ্য কমিটির কাছে সেটি পালন করার প্রস্তাব করেন। সেই প্রস্তাবে সিপিএমের কেন্দ্রীয় কমিটি সবুজ সংকেত দিয়েছে পশ্চিমবঙ্গ কমিটিকে।
গত ৭৪ বছর ধরে এ দেশে ১৫ আগস্ট দিনটি মহা গৌরবে স্বাধীনতা দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। কংগ্রেস, তৃণমূল, বিজেপি সবদলই ১৫ অগস্ট ঘটা করে স্বাধীনতা দিবস পালন করে। কিন্তু কোনওদিনই সিপিআইএম নেতারা স্বাধীনতা দিবস পালন করেছেন; এমনটা কেউ দেখেন নি। ভারতের কমিউনিস্ট আন্দোলনের সূত্রপাতের পর দেশে একাধিক কমিউনিস্ট পার্টি তৈরি হয়েছে। ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি ১৯৬৪ সালে ভেঙে গিয়ে তৈরি হয় সিপিআইএম। নিজেদের আন্তর্জাতিক বলে দাবি করা সিপিআইএম বা অন্য বাম দলগুলি কোনও দিনই ১৫ আগস্ট স্বাধীনতা দিবস পালনে আগ্রহ দেখায়নি। কিন্তু এবার কেন?
অনেকেই মনে করছেন ক্রমাগত পায়ের নীচের মাটি সরছে সিপিআইএম-এর। বলতে গেলে এখন সব কিছুই খুইয়ে তাঁরা নিঃস্ব। এই রাজ্যে একটানা ৩৪ বছর দাপটের সঙ্গে রাজত্ব করলেও আজ আর তাদের কোনো ক্ষমতা নেই। ২০১৯ সালের লোকসভা এবং ২০২১ সালের বিধানসভায় লজ্জাজনক হারের পর থেকে সিপিআইএম-এর সংগঠন বা শক্তি কমেছে সর্বত্র। আর সে কারণেই পথ বদল। এককালে নিজেদের আন্তর্জাতিকতাবাদী বলে দাবি করা সিপিআইএম তাই এবার নিজেদের দেশপ্রেমিক প্রমাণ করতেই এই পন্থা নিয়েছেন।
যদিও সিপিআইএম এই ধরনের আলাপ আলোচনাকে একেবারেই মানতে নারাজ। তাঁরা এসব কথাকে অপবাদ বলছেন। তাঁদের যুক্তি আগেও নাকি সিপিআইএম স্বাধীনতা দিবস পালন করেছে। কিন্তু যেহেতু এ বার দেশের স্বাধীনতা ৭৫তম বর্ষে পদাপর্ণ করছে, তাই দলগত ভাবে সব পার্টি অফিসেই জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হবে। সঙ্গে সারা বছর স্বাধীনতা বিষয়ে আলোচনাসভারও আয়োজন করা হবে। সিপিআইএম-এর এই কথার যে একেবারেই কোনও সত্যতা নেই তা সিপিআইএম নিজেও ভাল জানে। কারণ ‘ইয়ে আজাদি ঝুটা হ্যায়’ এই স্লোগান দেওয়া হয়েছিল দেশের কমিউনিস্ট পার্টির তরফে। তখন অবশ্য সিপিআইএম ছিল না। ছিল সিপিআই।
নিজেদের আন্তর্জাতিকতাবাদী বলে দাবি করা সিপিআইএম নিজেদের দেশপ্রেমিক প্রমাণ করার চেষ্টা না করলেও এখন মানুষের কাছাকাছি আসার চেষ্টা করছে। ১৫ আগস্ট যখন প্রায় সমগ্র দেশবাসী স্বাধীনতা দিবসে মাতবে— পতাকা উত্তোলন, কুজকাওয়াজ ইত্যাদির মাধ্যমে, তখন সিপিআইএম নিজেদের পার্টি অফিসগুলিতে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করে মানুষকে বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করবে যে তাঁরাও স্বাধীনতা দিবস পালন করছে। সিপিআইএম-এর কেন্দ্রীয় কমিটির নেতা সুজন চক্রবর্তী যতই বলুন আগেও সিপিআইএম স্বাধীনতা দিবস পালন করেছে, সেটা সম্পূর্ণভাবেই অসত্য। তবে এটা ঘটনা অনেক দেরিতে হলেও সিপিআইএম পথ বদল করল বা তাদের বোধদয় হল। তবু এ প্রশ্ন থাকছেই রাজ্যের মানুষ আজ সিপিআইএম-এর এই পথ বদল বা বোধদয়কে সহজভাবে নেবেন কিনা?
অন্যদিকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা ৭৫তম বর্ষপূর্তি উপলক্ষে স্বাধীনতা দিবসের আগে সিপিআইএম-এর এই সিদ্ধান্তকে তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করছেন। দেশজুড়ে বিজেপি বিরোধী যে হাওয়া বইতে শুরু করেছে তাতে সিপিআইএম-এর এই পথ বদল বা বোধদয় প্রভাব ফেলতেও পারে। কিন্তু তা এমনও নয় যে সিপিআইএম পার্টি অফিসগুলিতে জাতীয় পতাকা উড়ল আর বিজেপির দেশপ্রেম যেন এক ধরণের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ল। তবে সিপিআইএম-এর কেন্দ্রীয় কমিটির তরফে স্বাধীনতার ৭৫ বছর উপলক্ষে কেবল তেরঙ্গা উত্তোলনের কথাই বলেনি। একবছর ধরে তাঁরা নানা কর্মসূচির কথাও জানিয়েছেন। একবছর ধরে ধর্মনিরপেক্ষ, গণতন্ত্র, সাম্প্রদায়িকতার বিপদ, দেশের স্বাধীনতায় কমিউনিস্টদের ভূমিকা-এই সমস্ত কিছু নিয়েই চলবে প্রচার।
বিভিন্ন মহলে সিপিআইএম-এর এই পথ বদল বোধদয় নিয়ে চর্চা শুরু হয়েছে। অন্যদিকে জাতীয় পতাকা উত্তোলনের ব্যাখ্যা হিসেবে সিপিআইএম-এর ব্যাখ্যা, জাতীয়তাবাদ বা দেশাত্মবোধকে পুঁজি করে বিজেপি যেভাবে প্রভাব বিস্তার করছে, তাকেই চ্যালেঞ্জ জানাতে চায় বামেরা। এতকাল কংগ্রেস, বিজেপি, তৃণমূল প্রায় সব রাজনৈতিক দলই স্বাধীনতা দিবসে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেছে। এবার সেই তালিকায় যুক্ত হচ্ছে সিপিআইএম। ১৯৬৪ সালে সিপিআইএম প্রতিষ্ঠার পর বিশেষ করে ১৯৭৭ সালে এই রাজ্যে ক্ষমতায় এসে সিপিআইএম-এর দাপট ছিল তা গত ১০ বছরে শূন্যে এসে ঠেকেছে। অনেক দেরিতে হলেও এই বোধদয়ের পর মানুষ সিপিআইএমকে দেশপ্রেমিক বলে মানবে কিনা সেটাই দেখার বিষয়।
আমার মনে একটাই চিন্তা আসছে, কেন নিতে হলো, আর এর effect কি আশা করছে দল এবং ফল কি হবে বলে মনে হয়