মার্কসবাদী পার্টিতে সমালোচনা ও আত্মসমালোচনার গুরুত্ব আছে। কিন্তু ‘সংশোধনবাদ’ ও ‘সংকীর্ণতাবাদের’ বিরুদ্ধে ছায়াযুদ্ধ করা আমাদের দেশের সিপিআইএম নামক ‘সাচ্চা কমিউনিস্ট’ পার্টিকে কেউ কবে আত্মসমালোচনা করতে, নিজের ভুল স্বীকার করতে দেখেছে কি? যাকে-তাকে শ্রেণিশত্রু বলে দাগিয়ে দেওয়া, পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত ইংরেজিকে ব্রাত্য করে রাখা, জ্যোতি বসুকে প্রধানমন্ত্রী হতে না দেওয়া, সইফুদ্দিন চৌধুরী ও সোমনাথ লাহিড়ীর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ, ইউ পি এ সরকার থেকে সমর্থন তুলে নেওয়া, শিক্ষায় অনিলায়ন, চারদিকে আটঘাট না বেঁধে সিঙ্গুরে কৃষিজমি অধিগ্রহণ ও নন্দিগ্রামে কেমিকেল হাব গঠনের উদ্যোগ–এ সব ভুল কোনদিন স্বীকার করে নি তারা। বরং যে কোন ভুলকে নানা যুক্তি দিয়ে ব্যাখ্যা করে তারা আত্মপক্ষ সমর্থন করে। সেই সঙ্গে আছে একটা উপর-চালাকি এবং সবজান্তাভাব। এই ব্যাপারটা আবার উপরতলা থেকে সংক্রমিত হয়ে ছড়িয়ে যায় নিচের তলায়। যেন অন্যান্য দলের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে তাদের মৌলিক পার্থক্য আছে, তারা রাজনীতিতে ‘এলিট’ শ্রেণির। সংসদীয় গণতন্ত্রে ঢুকে পড়লেও আসলে তারা ‘বিপ্লবী’, বিপ্লবের গুরু দায়িত্ব বহন করে চলেছে তারা।
২০১১ সালে ক্ষমতাচ্যুতির পরে কেন তাদের পার্টি সংগঠন এমন তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ল, কেন পার্টি সদস্যরা কিছু তৃণমূলে ও পরে কিছু বিজেপিতে ভিড়ে গেল, তার যথাযথ ব্যাখ্যাও কি পার্টির তরফ থেকে দেওয়া হয়েছে? শুধু বলা হয়েছে তৃণমূলের ‘সন্ত্রাস’ থেকে আত্মরক্ষার জন্যই এ রকম করেছে তারা। তাহলেই তো প্রশ্ন আসে পার্টির ভেতর সুবিধাবাদের বীজ ছিল কি না! সেই যে রক্তক্ষরণ শুরু হল, সেই যে ভোটব্যাঙ্কে ধ্বস নামল, তা আর থামল না। ততদিনে পশ্চিমবঙ্গের রঙ্গমঞ্চে বিজেপির আবির্ভাব ঘটেছে। ২০১৪ তে কেন্দ্রতেও বিজেপি লাভ করল ক্ষমতা। সিপিআইএম তখন তৃণমূলের ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে তাকে অভিযুক্ত করল। এ কথা ঠিক যে তৃণমূল এন ডি এ মন্ত্রীসভায় ছিল। কিন্তু তার মানে এই নয় যে তৃণমূল ‘এসো গো এসো গো’ বলে বিজেপিকে ডেকে এনেছে। জ্যোতি বসুর আত্মজীবনী ‘যতদূর মনে পড়ে’ বইতে ‘স্বৈরাচারী’ কংগ্রেসের বিরুদ্ধে বিজেপির হাত ধরার উল্লেখ আছে ; সুভাষ চক্রবর্তীর প্রশ্রয়ে বিজেপির তপন শিকদার নির্বাচনে প্রথম জয়লাভ করেছিলেন। ত্রিপুরায় তো সিপিএমের শাসন ছিল, সেখানে বিজেপিকে ঢোকাল কে? এবার কেরলে বিজেপী প্রার্থী সুরেশ গোপী জয়লাভ করেছেন। এই প্রথম কেরলে ঢুকল বিজেপি। তাঁকেই বা আনল কে?
২০১৯-এ সিপিএমের ভোটব্যাঙ্কে বিপুল ধ্বস নামল। ২০১১ তে ছিল ৩০%, ২০১৪ তে ২৩%, ২০১৬ তে ২০% কিন্তু ২০১৯-এ তা নেমে হল ৬%। অথচ যে বিজেপির ভোট ২০১৬তে ১০% ছিল, তা ২০১৯-এ লাফিয়ে বেড়ে হল ৪০%। বিশেষজ্ঞরা বললেন, বামের ভোট রামে গেছে। শুনে বড্ড রাগ হল সিপিএমের। তারা একটা নতুন তত্ত্ব খাড়া করল : দিদি –মোদির তত্ত্ব বা বিজেমূল তত্ত্ব। ভাবল এই তত্ত্ব বাজারে ছাড়লে তাদের ভোট বাড়বে। কিন্তু ফল হল একেবারে বিপরীত। ২০২১-এর বিধানসভার নির্বাচনে কোন আসন পেল না, তাদের ভোট শতাংশ আরও কমে ৪% নামল। নির্বাচনে ভরাডুবির পর সিপিএমের উচ্চ নেতৃত্ব এই তত্ত্বকে খারিজ করে দেয়। রাজ্য সম্পাদক সূর্যকান্ত মিশ্র সামাজিক মাধ্যমে দলের সর্বস্তরের কর্মীদের সে বার্তা দেন। মুজফফর আহমদের জন্মদিনে (৫ আগস্ট, ২০২১) এক পাঠচক্রের নোটেও সূর্যকান্ত মিশ্র সে কথা জানেন। পার্টি কংগ্রেসও ‘বিজেমূল তত্ত্ব’-কে খারিজ করে দেয়।
কিন্তু রাজ্যের নেতাদের কমলি তো ছাড়বে না। ২০২২ সালের আগস্ট মাস। রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম অন্যভাবে ‘বিজেমূল’ তত্ত্বকে আবার প্রতিষ্ঠা করলেন। তিনি ফেসবুকে অনুব্রত মণ্ডলের ভাইপো সুমিত মণ্ডল, বিজেপির অমিতাভ চক্রবর্তী, অনুব্রত কন্যা সুকন্যা মণ্ডলের ছবির কোলাজ করে বুঝিয়ে দিতে চাইলেন আসলে দিদি-মোদির সেটিং আছে। আবার শুরু হয়ে গেল সেটিং তত্ত্ব। মহম্মদ সেলিম, সুজন চক্রবর্তীরা বলে যেতে লাগলেন। মুখপত্র ‘গণশক্তি’র পাতা ওল্টালেই তার প্রমাণ পাওয়া যাবে।
এবার আসি জোটের কথায়। কংগ্রেসের সঙ্গে জোট। এই জোটের জন্য কংগ্রেসের অধীর চৌধুরী তাঁদের হাইকমাণ্ডের নির্দেশ অগ্রাহ্য করতেও দ্বিধা করেন নি। খবরের কাগজের পাতায় অধীর-সেলিমের যুগলবন্দির ছবি বহুবার প্রকাশিত হয়েছে। ইণ্ডিয়া জোটের বৈঠকে যখন সীতারাম ইয়েচুরি আর মমতা ব্যানার্জী এক মঞ্চে আলোচনা করছেন, তখন ধূপগুড়ির উপর্নিবাচনে এক মঞ্চে সেলিম-অধীর ‘দিদি-মোদি’র সেটিং নিয়ে মুখর। কংগ্রেস আর সিপিএমের তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা যাই হোক, সাধারণ মানুষ তাদের মোটা বুদ্ধিতে ব্যাপারটা বুঝতে পারে না। বাংলায় কংগ্রেস জোটসঙ্গী, কিন্তু কেরলে প্রতিপক্ষ। এ কেমন কথা! কেরলের ওয়ানাড়ে রাহুল গান্ধী দাঁড়াতে চাইলে ক্রুদ্ধ হয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী বিজয়ন। আই এস এফের সঙ্গেও জোট হয়েছিল ২০২১ সালের নির্বাচনে। সে নির্বাচনে সিপিআইএম ও কংগ্রেস কোন আসন পায় নি, কিন্তু আইএসএফ ফাঁক তালে জিতে নিয়েছিল একটি আসন। আই এস এফের সঙ্গে জোট নিয়ে সমালোচনাও হয়েছিল। কিন্তু দেখা গেল ২০২৪-এর নির্বাচনের আগে আবার আই এস এফের সঙ্গে জোটের কথা চালাচালি শুরু হল। জোটটা ভেস্তে যেতে বলা হল আই এস এফের সঙ্গে তৃণমূলের সেটিং হয়ে গেছে। সেটিং তত্ত্ব আসলে সি পিএমের ‘কণ্ঠ আঁকড়ি ধরিল পাকড়ি’।
২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে সিপিআইএম ‘সংগ্রামের ময়দানে’ একটু অন্যভাবে অবর্তীর্ণ হল। নামানো হল তরুণ ব্রিগেডকে। প্রার্থীও করা হল তাঁদের কয়েকজনকে। মিছিলে মিটিংএ একটা জোয়ারও এল। সেসবে ভিড়ও হতে লাগল। আর ভিড় দেখে নেতারা উৎসাহিত হলেন। সুজন চক্রবর্তী বলে দিলেন ১০টা আসন তাঁরা ছিনিয়ে নেবেন। অধীর চক্রবর্তী বলে দিলেন বন্ধু সেলিম জিতবেনই। সভা সমাবেশে ভিড় দেখে বছর কয়েক আগের একটা কথা মনে পড়ে গেল। ব্রিগেডে সভা। বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য অসুস্থ। তবু তিনি এসেছেন। মঞ্চের তলায় গাড়িতে বসে আছেন। উঠতে পারবেন না মঞ্চে। অসুস্থ বলে। একজন কমরেড উৎসাহিত হয়ে বললেন, দেখছেন কত মানুষ ! বুদ্ধদেববাবু বললেন, যাঁরা এসেছেন তাঁরা সবাই আমাদের ভোট দেবেন তো ! এটাই আসল কথা। সভার ভিড় দেখে নির্বাচনে জেতার হিসেব করা যায় না। মানুষের নাড়ির স্পন্দন বুঝতে হয়। মানুষের প্রতি দিনের আন্দোলনের সঙ্গী হবার বদলে সিপিআইএম ফেসবুক, টুইটার, এবং আদালতের উপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়াছিল। এবারের লোকসভা নির্বাচনের কয়েকটি ফলাফলের দিকে চোখ রাখা যাক। যাদবপুরে তারা তিন নম্বরে –প্রাপ্ত ভোট ২,৫৮,৭১২; শ্রীরামপুরে তিন নম্বরে — প্রাপ্ত ভোট ২,৩৯.১৪৬; তমলুকে তিন নম্বরে, প্রাপ্ত ভোট ৮৫,৩৮৯। এই তিনটি কেন্দ্রে তরুণ প্রার্থী ছিল, এবং তাদের জয়লাভের আশা করা হয়েছিল। বসিরহাট, ঝাড়গ্রাম, হুগলি, আরামবাগ, দমদমে সিপিআইএম তিন নম্বরে আছে ; শুধু মুর্শিদাবাদে আছে দুই নম্বরে। অধীর চৌধুরীর সঙ্গে জোট করায় অধীর যেমন ডুবলেন, তেমনি সিপিআইএমকেও ডুবিয়ে ছাড়লেন।
এবার শত্রু নির্বাচনের প্রশ্নটা বিচার করা যাক। সিপিআইএম ‘রণনীতি ও রণকৌশল’ নির্ণয় করে। সেই রণনীতিতে প্রধান শত্রুর বিচার করা হয়। ভারতের প্রধান শত্রুটা কে? এর উত্তরে বঙ্গ সিপিআইএম দুজন শত্রুর কথা বলবেন — বিজেপি ও তৃণমূল। এভাবে রামকে এনে তৃণমূলকে হটিয়ে বামের প্রতিষ্ঠা? কিন্তু বিজেপিকে যদি ফ্যাসিস্ট শক্তি বলি, তাহলে তাকে প্রতিষ্ঠার সুযোগ দিলে সে কি কমিউনিস্টদের ছেড়ে কথা বলবে? রণনীতিগত এই বিভ্রান্তি বঙ্গ সিপিআইএম শোধরাতে পারে নি। বিহারের সিপিআইএমএল নেতা দীপংকর ভট্টাচার্য কিন্তু এই বিভ্রান্তির শিকার হন নি। তিনি প্রথমাবধি বলে আসছেন প্রথম ও প্রধান কাজ ফ্যাসিস্ট শক্তির প্রতীক বিজেপিকে হটানো।
আন্দোলনের ক্ষেত্রে অবজেকটিভ ও সাবজেকটিভ কনডিশনের কথা বলা হয়। অবজেকটিভ কনডিশন তো ছিলই। শাসকের প্রশাসনিক ত্রুটি, নানাক্ষেত্রে দুর্নীতি ইত্যাদি। কিন্তু সেই অবজেকটিভ কনডিশনকে সিপিআইএম কাজে লাগাতে পারে নি। ভেবেছে সমাজ-মাধ্যমে হইচই আর আদালতের রায় সে কাজ করে দেবে। শ্রেণিবিভক্ত সমাজে আদালত বা গণমাধ্যম শেষ পর্যন্ত নিরপেক্ষ হতে পারে না।
যথোপযুক্ত বিশ্লেষণ। তবে এদের প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়েছে, জনমনে এদের এখন আর তেমন কোনো জায়গা নেই।