ঠাকুরবাড়ির মহিলা সাহিত্যিক
পশ্চিম দিগন্তের একটুখানি আলো এসে পড়ল পুবের আকাশে। সেই নবজাগরণ। তার আকস্মিক সম্পাতে যখন অনেকে দিকভ্রান্ত, কেউ বা পথচ্যুত কিংবা বিদ্রোহী, তখন প্রথম উষার সবটুকু উষ্ণতা গ্রহণ করে জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ি যেন সারা দেশের ঘুম ভাঙাবার ভার নিয়েছিল। নবজাগরণের সেই পর্বে নারীজাগৃতির যে আয়োজন শুরু হয়েছিল, এই বাড়ির মহিলারা সেই কাজে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রধান ভূমিকা গ্রহণ করেছিলেন। সামাজিক বিধিনিষেধ আর ঘেরাটোপের রহস্য ছিন্ন করে তাঁরা ঘরের বাইরে বেরিয়ে এসেছিলেন। সাহিত্যক্ষেত্রেও তাঁরা নিজ স্বাক্ষর রাখতে পেরেছিলেন। স্মৃতি-বিস্মৃতির অন্তরালে লুকিয়ে থাকা ঠাকুরবাড়ির সেইসব অঙ্গনাদের গৌরবময় ভূমিকা হারিয়ে যাওয়ার নয়। ঠাকুর বাড়ির ভিতর বহু নক্ষত্রের মাঝে আজ আমরা আলোচনা করব চার ঠাকুরবাড়ির অঙ্গনাদের নিয়ে, যাঁরা সাহিত্য ক্ষেত্রে বিশেষ অবদান রেখে গেছেন।

স্বর্ণকুমারী দেবী
স্বর্ণকুমারী দেবী — ঠাকুরবাড়ির মহিলাদের মধ্যে উজ্জ্বলতম জ্যোতিষ্ক হলেন স্বর্ণকুমারী দেবী। তিনি ছিলেন মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথের কন্যা তথা রবীন্দ্রনাথের ভগিনী। তাঁর স্বামীর নাম জানকীনাথ ঘোষাল। তৎকালীন সময়ে মেয়েরা কেউ কেউ যখন সবে কিছু করার কথা ভাবছেন তখন স্বর্ণকুমারী বাংলা সাহিত্যে এসেছেন ঝোড়ো হাওয়ার মতো। লেখাপড়ার পাঠ ভালোভাবে শেষ হতে না হতেই তিনি লিখে ফেললেন আস্ত এক উপন্যাস। তার মাত্র ১০ বছব আগে প্রথম সার্থক বাংলা উপন্যাস লিখে বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর ঔপন্যাসিক জীবন শুরু করেছেন। ১৮৭৬ সালের ডিসেম্বর মাসে, শীতার্ত সন্ধ্যা উজ্জ্বল হয়ে উঠল এক অনামিকার আবির্ভাবে। বইয়ের নাম ‘দীপনির্বাণ’। লেখকের নামহীন বইটি নিয়ে জল্পনা চলতে থাকল। পরে জানা যায় বইটি লিখেছেন স্বর্ণকুমারী। বাংলা সাহিত্যের আসরে স্বর্ণকুমারী এসে আদায় করে নিলেন প্রার্থিত সম্মান। হাসি আর করুণার বদলে দেখা দিল শ্রদ্ধামেশানো বিস্ময়! সাহিত্য জগতে মেয়েদের চলার পথ আরও একটু সুগম হলো। উপন্যাস ছাড়াও স্বর্ণকুমারী লিখেছিলেন গল্প, নাটক, প্রহসন, কবিতা, গাথা, গান, রম্যরচনা, প্রবন্ধ, ভ্রমণকাহিনি, গীতিনাট্য, স্মৃতিকথা ও স্কুলপাঠ্য বই। তাঁর আদর্শ লেখক ছিলেন বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। তাঁর লেখা কয়েকটি ঐতিহাসিক উপন্যাস হলো — ‘দীপিনর্বাণ’, ‘মিবাররাজ’, ‘বিদ্রোহ’, ‘ফুলের মালা’, ‘হুগলীর ইমামবাড়া’ প্রভৃতি। তাঁর অপর একটি জনপ্রিয় উপন্যাস হলো ‘কাহাকে’।এখানে স্বর্ণকুমারী একটি মেয়ের ভালবাসার কথা শুনিয়েছিলেন। অনুবাদের বিষয়ে স্বর্ণকুমারী দেবী বেশ উৎসাহী ছিলেন। তাঁর দু’টি উপন্যাস, চোদ্দটি গল্প ও একটি নাটক অনুদিত হয়। তাঁর লেখা উল্লেখযোগ্য দু’টি প্রহসন হলো — ‘পাকচক্র’ ও ‘কনেবদল’। তাঁর ‘গল্পস্বল্পে’ (১৮৮৯) ছোটোদের মনের কথা সুন্দর ভাবে ধরা পড়েছে।

জ্ঞানদানন্দিনী দেবী
জ্ঞানদানন্দিনী দেবী — রবীন্দ্রনাথের মেজদাদা সত্যেন্দ্রনাথের স্ত্রী ছিলেন জ্ঞানদানন্দিনী দেবী। ঠাকুর বাড়িতে ‘মেজ বৌঠান’ নামে তিনি অধিক পরিচিত। জ্ঞানদানন্দিনীর বাবা গৌরীদান করেছিলেন সাত বছরের মেয়েকে। তখন তার অক্ষর পরিচয় সবে শুরু হয়েছে গ্রামের পাঠশালাতে। শুধু প্রথম ভারতীয় সিভিলিয়ান অফিসার নন, বাংলার স্ত্রী-স্বাধীনতার পথিকৃৎ সত্যেন্দ্রনাথ তাঁর স্ত্রীকে সব বিষয়ে ভারতীয় নারীর আদর্শ করে তুলতে চেয়েছিলেন। তিনি তাঁর স্ত্রীকে বোম্বাই নিয়ে গিয়েছিলেন। বিলেতের শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে তিনি ফিরে এসেছিলেন আধুনিক রূচিসম্মত বোধ নিয়ে। বাড়ির ছোটোদের বিষয়ে তাঁর আগ্রহ ছিল প্রশংসারযোগ্য। ঠাকুর বাড়ির ছোট ছেলে-মেয়েদের জড়ো করে তিনি ‘বালক’ নামে একটি পত্রিকা বের করেছিলেন। এই পত্রিকার সম্পাদিকা ছিলেন তিনি। নাতি সুবীরের জন্য দুটি রূপকথার নাট্যরূপ দিয়েছিলেন তিনি। জ্ঞানদানন্দিনীর অন্যান্য প্রবন্ধেও দেখা যায় শিশু চিন্তার প্রাধান্য। তাঁর লেখা কয়েকটি প্রবন্ধ ‘ভারতী’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। সেগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো — ‘কিন্ডার গার্টেন’, ‘ইংরাজনিন্দা ও স্বদেশানুরাগ’ ও ‘স্ত্রীশিক্ষা’। এছাড়া তাঁর লেখা মারাঠি রচনার বঙ্গানুবাদ ‘ভাউ সাহেবের বখর’ — তৃতীয় পানিপথের যুদ্ধের পটভূমিতে লেখা কাহিনি।

প্রজ্ঞাসুন্দরী
প্রজ্ঞাসুন্দরী — ঠাকুরবাড়িতে সবরকম শিল্পচর্চার সুযোগ ছিল। এই বাড়ির অন্য মহিলারা যখন নাচ, গান, কবিতা, আঁকা নিয়ে ব্যস্ত প্রজ্ঞাসুন্দরীর মন টেনেছিল রান্নাঘর। হেমেন্দ্রনাথের কন্যা প্রজ্ঞাসুন্দরী।অসমিয়া সাহিত্যের জনক লক্ষ্মীনাথ বেজরুয়া তাঁর স্বামী। রান্নাঘর নিয়ে প্রজ্ঞা দেবী ভাবতে শুরু করেন ‘পূণ্য’ পত্রিকা সম্পাদনার সময় থেকে। প্রথম থেকেই এই পত্রিকার পাতায় পাতায় হরেক রকম আমিষ ও নিরামিষ ব্যঞ্জনের প্রস্তুত প্রণালী ছাপা হতে থাকে প্রজ্ঞা দেবীর চেষ্টায়। সুগৃহীনীর মতো তৎকালীন বাজার দরটিও তিনি এই পত্রিকার মাধ্যমে পাঠককে জানিয়ে দিতেন। তাঁর রচিত বই ‘আমিষ ও নিরামিষ আহার’ ভোজনরসিকদের কাছে জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল। এই বইটির তিনটি খণ্ড প্রকাশিত হয়েছিল। তিনি আরও একটি নতুন জিনিস বাংলার ভোজসভায় এনেছিলেন। সেটা হলো বাংলা মেনু কার্ড বা তাঁর নিজের ভাষায় ‘ক্রমণী’।

ইন্দিরা দেবী চৌধুরাণী
ইন্দিরা দেবী চৌধুরাণী— সত্যেন্দ্রনাথ ও জ্ঞানদানন্দিনীর একমাত্র মেয়ে ইন্দিরা। সম্পর্কে তিনি রবীন্দ্রনাথের ভাইঝি। কৈশোরেই তিনি রবীন্দ্রনাথের বিখ্যাত ‘ছিন্নপত্রাবলী’র প্রাপক। রবীন্দ্রনাথকে দিয়ে যিনি এই অসাধারণ চিঠিগুলি লিখিয়ে নিতে পেরেছিলেন তাঁর অসামান্যতা আছে বইকি! ইন্দিরার জন্ম ১৮৭৩ সালে। প্রমথ চৌধুরী তাঁর স্বামী। ঠাকুরবাড়ির মেয়েদের মধ্যে ইন্দিরা দেবীই প্রথম বি.এ পাশ করেন। অনুবাদ সাহিত্যে ইন্দিরা দেবীর প্রতিভা সবথেকে বেশি বিকশিত হয়। রবীন্দ্র-রচনার অনুবাদ ছাড়াও ইন্দিরা অনুবাদ করেন প্রমথ চৌধুরীর ‘চার ইয়ারী কথা’র। ‘টেলস্ অব ফোর ফ্রেন্ডস’ তাঁর উল্লেখযোগ্য অনুবাদ রচনা। এ ছাড়াও সত্যেন্দ্রনাথের সঙ্গে যুগ্ম ভাবে অনুবাদ করেন মহর্ষির আত্মজীবনী ‘দি অটোবায়োগ্রাফি অব মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ টেগোর’। তিনি ফরাসি থেকে বাংলায় অনুবাদের ক্ষেত্রেও অসাধারণ কৃতিত্ব দেখিয়েছেন। তাঁর যে চারটি অনুবাদের কথা উল্লেখ করা দরকার সেগুলি হলো — রেনে গ্রুসে-র ‘ভারতবর্ষ’, পিয়ের লোতির ‘কমল কুমারিকাশ্রম’, মাদার লেভির ‘ভারত ভ্রমণ কাহিনী’ (কলম্বো থেকে শান্তিনিকেতন) এবং আঁদ্রে জিদের লেখা ‘ফরাসি গীতাঞ্জলীর ভূমিকা’। আবার ইন্দিরা যখন স্মৃতিকথা লিখতেন তখন তাতে মিশত গল্পের রসষ প্রখর স্মৃতিশক্তির সাহায্যে তিনি রবীন্দ্রনাথের প্রথম জীবনের বহু গান উদ্ধার করেছেন। নাহলে অনেক গানেরই সুর হারিয়ে যেত। কত গানের স্বরলিপি যে তিনি করেছেন তার ইয়ত্তা নেই। তিনি রবীন্দ্রসংগীতের তথ্য ও তত্ত্ব দুটোকেই সমৃদ্ধ করেছেন। (চলবে)