বৈষ্ণব পদাবলী সাহিত্যে নারীকে আল্লাদিনী শক্তির আধার বলা হয়েছে। তবু সভ্যতার ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় বিশ্বের অধিকাংশ দেশে, সব যুগেই নারী দাসত্বের শৃঙ্খলে আবদ্ধ হয়েছে। যুগে যুগে দেশে দেশে নারী হয়েছে উপেক্ষিত ও অবহেলিত। নারীর ব্যক্তিত্ব বিকাশের পথ রুদ্ধ হয়েছে বারবার। “ছেলের মুতে কড়ি/মেয়ের গলায় দড়ি” — এ প্রবাদ গ্রাম বাংলা থেকে উঠে এলেও তার প্রভাব নগর সভ্যতায় আরও প্রকট। পুত্র-সন্তান এমন একটি সম্পদ যা প্রস্রাব করলেও, এস-ই বর্জ্য পদার্থের ভিতরও আর্থিক সম্পদ থাকে, কন্যাসন্তান এতই অবাঞ্ছিত যে তার গলায় গড়ি হলে অর্থাৎ তার মৃত্যু হলেও পরিবারের সামগ্রিক রূপ-রেখার কিছু বদল ঘটে না। নারীশিক্ষা প্রচলনে যে কতটা বাধা ছিল তা প্রমাণ করে ঈশ্বর গুপ্তের ব্যঙ্গ কিবতায় — “যত ছুঁড়িগুলো তুড়ি মেরে কেতাব হাতে নিচ্ছে যবে/ এরা এ বি শিখে বিবি সেজে বিলাতি বোল কবেই কবে।” সেই যুগে যাঁরা চাইছিলেন না মেয়েদের শিক্ষা, তাঁদের মনে হয়েছিল লেখাপড়া শিখলেই মেয়েরা বাইরে বেরতে শিখবে, স্বাধীন হবে এবং সংসার বিকল হবে। এই চিন্তা প্রবাদে ছাপ ফেলেছে — “মা পায় না কাঁথা সেলাই-এর সুতো!/ ছেলের পায়ে চোদ্দ সিকের জুতো!” তবে একথাও ঠিক যে যত আঘাত এসেছে, তার পরেও নারীরা কিন্তু “মরিতে মরিতেও মরে নাই”। শেষ হয়েও হইল না শেষের মতো, তাঁদের ব্যক্তিত্ব নিয়ে, প্রতিবাদ নিয়ে, প্রাণ দিয়ে এবং মহৎ উদ্দেশ্যে প্রাণ নিয়ে ঘুরে দাঁড়িয়েছে বারবার। রবীন্দ্র উপন্যাসে গোড়ার মা ‘আনন্দময়ী’ বা শরৎচন্দ্রের পল্লীসমাজের ‘জ্যাঠাইমা’ আমাদের দেখিয়ে দিয়েছেন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত হয়েও যাঁরা এমন এক একটি প্রতিষ্ঠান, যাঁরা প্রমাণ করেন সংসার-সমাজ-সাহিত্যে সুশাসনের ইতিবৃত্ত তাঁদের জন্যই রক্ষিত হয়। মনে প্রশ্ন জাগে রবিকবি বা শরৎবাবু শুধু কি কল্পনার মাধ্যমে সাহিত্যে এমন চরিত্র গড়ে তুলেছিলেন? ভুল, ভুল একেবারেই ভুল। তৎকালীন সময়ের দিকে তাকালে আমরা সন্ধান পাব এমন অনেক মণি-মাণিক্যের যাঁরা তাঁদের ব্যক্তিত্ব দিয়ে সমাজে আলোড়ন সৃষ্টি করতে চেয়েছেন। কেউ পেরেছেন, কাউকে বা আমরা বিস্মৃত হয়েছি — কিন্তু তাঁদের কর্ম থেকে গেছে আগামীর উদ্দেশ্যে। সাহিত্য জগতেও এমন অনেক নারী সাহিত্যিক এসেছেন, যাঁদের মাধ্যমে বাংলা সাহিত্য আস্তে আস্তে পরিপুষ্ট হতে পেরেছে। কিন্তু আমরা কি মনে রেখেছি তাঁদের সবাই কে? এই লেখার মধ্যে আমরা তুলে ধরতে চাইছি এমন কিছু নারী-সাহিত্যিককে যাঁদের আমরা ভুলেছি, বা ভুলতে বসেছি বা এখনও মনে রেখেছি।
আগে যখন আমাদের দেশের মেয়েদের মধ্যে প্রথাগত শিক্ষার অভাব ছিল তখন অনেকেই কিন্তু ঘর-সংসারের ফাঁকে ফাঁকেই সাহিত্য সাধনা চালাতেন। বাস্তব নিয়ে সেই সব মহিলা সাহিত্যিকদের আবেগঘন সৃষ্টি পাঠক সমাজকে একসময় অভিভূতও করে তুলেছিল। কিন্তু আজ তাঁরা বিস্তৃতপ্রায়। তাঁদেরই মধ্যে কয়েকজনের কথা বলি —

নিরূপমা দেবী
— ইনি হৃদয়গ্রাহী সিনেমা অন্নপূর্ণার মন্দির, বিধিলিপি, শ্যামলীর লেখিকা। মুর্শিদাবাদ জেলার বহরমপুরে ১৮৫৩ সালে ৭ জানুয়ারি তিনি জন্মান। মাত্র ১০ বছর বয়সে নিরূপমা দেবীর বিয়ে হয় নদিয়া জেলার সাহাবাড়ির নবগোপাল ভট্টর সঙ্গে। সালটা ছিল ১৮৯৩। বিয়ের চার বছরের মাথায় যক্ষ্মা রোগে নবগোপাল মারা যান। মাত্র ১৪ বছর বয়সে বাল্যবিধবা হয়ে ফিরে আসেন ভাগলপুরে তাঁর বাবার বাড়িতে। এইসময় তাঁকে ঘিরে ধরেছিল বিষন্নতা। ছোটো বেলার দুরন্ত-হাসিখুশি মেয়েটি বদলে গিয়েছিল একেবারে। আস্তে আস্তে হয়ে উঠছিলেন জীবন-বিমুখ। এই সময় তাঁকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার জন্য ছোটোবেলার বন্ধু সাহিত্যিক অনুরূপা দেবী তাঁকে দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের একটি কবিতা চিঠির মধ্যে লিখে পাঠান। এই কবিতাই নিরূপমা দেবীকে পুনরায় জীবনের রূপ-রস-গন্ধ আশ্বাদ করতে অনুপ্রেরণা দেয়। বৈধব্যের পর তিনি তাঁর বড়ো ভাই বিভূতিভূষণ ভট্ট ও সাহিত্যিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের অনুপ্রেরণায় সাহিত্য সাধনায় ব্রতী হন। বিভূতিভূষণ ও শরৎচন্দ্রের হাতে লেখা পত্রিকায় তাঁর সাহিত্য রচনার হাতেখড়ি হয়েছিল। তাঁর লেখা প্রথম উপন্যাস ‘উচ্ছৃঙ্খল’। স্বদেশি যুগে তাঁর রচিত বহু গান ও কবিতা খ্যাতিলাভ করেছিল। প্রেম ও দাম্পত্য জীবনের অন্তর্দ্বন্দ্ব তাঁর উপন্যাসের প্রধান উপজীব্য। ১৩১৯-২০ বঙ্গাব্দে প্রকাশিত ‘দিদি’ তাঁর শ্রেষ্ঠ উপন্যাস বলে স্বীকৃত। ১৯৩৮ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে ‘ভূবনমোহিনী স্বর্ণ পদক’ এবং ১৯৪৩ সালে ‘জগত্তারিনী’ স্বর্ণপদক প্রদান করে। ১৯৪৩ সালে বর্ধমান সাহিত্য পরিষদ কর্তৃক সম্মানিত হন। ১৯৫১ সালে ৭ জানুয়ারি অর্থাৎ জন্মদিনের দিনেই তাঁর প্রয়াণ ঘটে।

অনুরূপা দেবী
অনুরূপা দেবী — ১৮৮২ সালের ৯ সেপ্টেম্বর জন্মান অনুরূপা দেবী। স্ত্রী শিক্ষা প্রসারে যথেষ্ট অবদান থাকলেও তিনি ছিলেন মূলত মহিলা সাহিত্যিক। তাঁর চলচ্চিত্রায়িত উপন্যাসগুলির বিষয়বস্তু ছিল বিশেষত মহিলাদের অবসরের আবেগঘন আলোচনা। তাঁর সৃষ্ট উপন্যাসগুলির মধ্যে রয়েছে ‘মহাশক্তি’, ‘মা’, ‘মহানিশা’, ‘পোষ্যপুত্র’, ‘বাগদত্তা’, ‘পথের সাথী’ প্রভৃতি। তাঁর রচিত মোট উপন্যাসের সংখ্যা ৬৩টি। এছাড়াও তিনি কিছু নাটক রচনা করেছিলেন। ‘জীবনের শ্রুতিলেখা’ নামে আত্মজীবনীমূলক একটি লেখা ‘মাতৃভূমি’ পত্রিকায় তিনি লিখতে শুরু করেছিলেন। কিন্তু তা সমাপ্ত করেননি। শৈশব থেকেই সাহিত্যচর্চার পিরবেশের মধ্যে তাঁর বড়ো হয়ে ওঠা। অনুরূপা দেবী ‘রাণী দেবী’ ছদ্মনামে প্রথম গল্প লিখে ‘কুন্তলীন’ পুরস্কার পান।

প্রভাবতী দেবী (সরস্বতী)
প্রভাবতী দেবী (সরস্বতী) — প্রভাবতী দেবী অবিভক্ত ২৪ পরগনা জেলায় খাটুয়ায় ১৯০৫ সালে ৫ মার্চ জন্মান। তাঁর বাবার নাম গোপালচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় ও স্বামীর নাম বিধুভূষণ চৌধুরী। মাত্র নয় বছরে তাঁর বিবাহ হয়। বাড়িতে বাবার অনুপ্রেরণা ও সাহায্যেই তিনি শেলি, কিটস, বায়রন প্রভৃতি বিদেশি কবিদের কাব্যের সঙ্গে পরিচিত হন। কোনো প্রথাগত শিক্ষা তাঁর ছিল না। কিন্তু পরবর্তীকালে ‘টিচার্স ট্রেনিং’ করে তিনি শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেন। তাঁর লেখা প্রথম উপন্যাস ‘বিজিতা’। ১৩৩০ বঙ্গাব্দে ‘বিজিতা’ বাংলায় ‘ভাঙাগড়া’, হিন্দিতে ‘ভার্বী’ ও মালায়লামে ‘কুলদেবতা’ নামে চিত্রায়িত হয়। তাঁর ‘পথের শেষে’ উপন্যাসটি ‘বাংলার মেয়ে’ নামে নাটকে রূপায়িত হয়ে অনেকদিন সাফল্যের সঙ্গে অভিনিত হয়। ছোটোদের জন্য তিনি ‘কৃষ্ণা রোমাঞ্চ সিরিজ’ প্রকাশ করেন। মহিলা গোয়েন্দা হিসেবে কৃষ্ণার বাংলা সাহিত্যে আবির্ভাব। এছাড়াও তিনি ‘ইন্টারন্যাশনাল সার্কাস’ লিখেছিলেন। প্রায় তিনশো উপন্যাস রচনা করেছিলেন তিনি। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে ‘লীলা’ পুরস্কারে সম্মানিত করেন ও নবদ্বীপের পণ্ডিত সমাজ তাঁকে সরস্বতী উপাধি প্রদান করে। ১৯৫২ সালের প্রভাবতী দেবী ‘মহিলা আত্মরক্ষা সমিতি’র সভাপতি হয়েছিলেন।
রাজিয়া খাতুন চৌধুরি — রাজিয়া খাতুন চৌধুরি শুধুমাত্র বাড়িতে পড়াশোনা করেই সৃষ্টি করেছিলেন সাহিত্য। হয়ে উঠেছিলেন কবি, গল্পকার, প্রবন্ধকার। অনুবাদকর্মেও তিনি ছিলেন পারদর্শী। ‘সওগাত’, ‘মোহাম্মদী’, ‘নওরোজ’ প্রভৃতি বহু পত্র-পত্রিকায় নিয়মিত তাঁর রচনা প্রকাশিত হতো। তাঁর উল্লেখযোগ্য রচনা হলো ‘পথের কাহিনি’। তিনি ১৯০৭ সালে জন্মান ও ১৯৩৪ সালে মাত্র সাতাশ বছর বয়সে মারা যান।
ফুলকুমারী গুপ্ত — ফুলকুমারী গুপ্তের ‘সৃষ্টি রহস্য’ গ্রন্থটি বাঙালি মহিলার প্রথম রহস্য রচনা বলে অভিহিত হয়। তৎকালীন সমসাময়িক বহু পত্রিকায় তাঁর বহু প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে ও সেগুলি জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। শাস্ত্র ও দর্শন নিয়ে তিনি পড়াশোনা করেছিলেন। পণ্ডিত ও সাধক বিনায়ক শাস্ত্রীর ছাত্রী ছিলেন ফুলকুমারী দেবী। ১৮৬৯ সালের জানুয়ারি মাসে হুগলি জেলার গুপ্তিপাড়ায় তিনি জন্মগ্রহণ করেন। পিতার নাম শ্যামচরণ সেন ও স্বামীর নাম শ্রীশচন্দ্র গুপ্ত। ১৯৩১ সালের ২ মার্চ তাঁর মৃত্যু হয়। (চলবে)