বছর শেষে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী অযোধ্যায় সাড়ে চোদ্দশো কোটি টাকা ব্যায়ে নির্মিত নতুন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের উদ্বোধন করলেন। বিমানবন্দর উদ্বোধনের আগে প্রধানমন্ত্রী মোদী অযোধ্যা ধাম জংশন স্টেশন থেকে ছটি নতুন রুটের বন্দে ভারত ও দুটি অমৃত ভারত এক্সপ্রেসের পরিষেবাও চালু করেন। প্রসঙ্গত, রাম মন্দিরের কাজ শুরু হওয়ার পর অযোধ্যাকে ঢেলে সাজাতেই মোদী সরকার বিপুল টাকা বরাদ্দ করেছিল।বছরভর মোদি সরকার পঞ্চম অর্থনীতির দেশ হয়ে ওঠার সাফল্যের বড়াই করেছে কিন্তু বছর শেষে বাস্তব অবস্থা কি?
কার্যত কর্মসংস্থান থেকে শুরু করে শিক্ষা, স্বাস্থ্যের মতো মানবিক সূচক একদম তলানিতে এসে ঠেকেছে। আর্থিক বৈষম্য এতটুকু না কমে ক্রমশই বেড়েছে। জিডিপি-র নিরিখে দেশের অর্থনীতি সমৃদ্ধ হয়ে উঠেছে- এ কথা খুব বেশি করে প্রচার করা হচ্ছে কিন্তু সেই সমৃদ্ধি কাদের? অবশ্যই তা কেবলমাত্র মুষ্টিমেয় পুঁজিপতির। তার মানে এর সঙ্গে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ সাধারণ মানুষ অর্থাৎ কৃষক, শ্রমিক-কর্মচারীদের জীবনের কোনও সম্পর্ক নেই। আর সেই কারণেই ২০২২ সালের বিশ্ব ক্ষুধা সূচকের হিসাব অনুযায়ী ১২১টি দেশের মধ্যে ভারতের জায়গা ১০৭ নম্বরে। এই অবস্থান স্পষ্ট করেই বুঝিয়ে দেয় যে এ দেশেও একটা বিরাট অংশের মানুষ দিনের পর দিন অনাহারে কাটাচ্ছেন। এ দেশের সাধারণ মানুষের আয় বাড়া তো বহু দূরের কথা, দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের আয় ধাপে ধাপে কমে চলেছে।
সারা বছর ধরে মোদী সরকারের অর্থমন্ত্রী থেকে শুরু করে সরকারি অর্থনীতিবিদেরা সাধারণ মানুষের আয় বৃদ্ধির বহু প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন কিন্তু বছর বছর দিয়ে যাওয়া প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও তা বাড়ছে না কেন? কেবলমাত্র গত কয়েক বছর তো নয়, কেন্দ্রে নরেন্দ্র মোদী ক্ষমতায় আসার আগে থেকেই তিনি যে গালভরা আর্থিক প্রগতির প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, কৃষকদের আয় দ্বিগুণ করার বুলি হেঁকেছিলেন, তার একটিও কি তিনি পালন করতে পেরেছেন? এক কথায় স্পষ্ট উত্তর- না। সাধারণ মানুষের আর্থিক উন্নতি ঘটাতে গেলে যে সরকারকে যে আর্থিক নীতি বা পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হয়, তা মোদী বা তাঁর সরকার নেন নি। পরিবর্তে তারা যে নীতি ও পরিকল্পনা নিয়েছেন তা আসলে পুঁজিবাদী ব্যবস্থার সেবাদাস হয়ে কাজ করার নীতি।
মোদী সরকারের নীতি ও পরিকল্পনা থেকে কৃষক কিংবা শ্রমিক কারও অবস্থার কোনোরকম উন্নয়ন করা সম্ভব নয়। কারণ, মোদী ও তাঁর সরকারের নীতি ও পরিকল্পনা কেবলমাত্র মুষ্টিমেয় পুঁজিবাদীদের মুখ চেয়ে তাতে পুঁজিবাদী অর্থনীতির নিজস্ব প্রক্রিয়ায় সম্পদ ক্রমাগত মুষ্টিমেয় পুঁজিপতিদের কুক্ষিগত হয়েছে। দেশের ৭০ শতাংশ সম্পদের মালিক হয়েছে একমাত্র তারা। অন্যদিকে জনসংখ্যার সবচেয়ে নীচের দিকের ৫০ শতাংশ মানুষের হাতে এসেছে মাত্র ৩ শতাংশ সম্পদ। যে কারণে এ দেশে খিদের জ্বালায় মা তার সন্তানকে হাটে বিক্রি করতে বাধ্য হয়। যদিও সরকারি নথিতে খেতে না পেয়ে অনাহারে মৃত্যুর তথ্য পাওয়া যাবে না। কিন্তু এই বাস্তব ও নির্মম সত্যকে কোনোভাবেই ধামা চাপা দেওয়া যাবে না। সরকারি সংস্থা নীতি-আয়োগের রির্পোট (২৭ জুলাই) জানাচ্ছে, এ দেশের ৭৪.১ শতাংশ মানুষ সুষম খাবার কিনতে পারে না। প্রধানমন্ত্রী মোদী সারা বছর ধরে যতই বড় বড় ভাষণ দিন না কেন, তিনিও জানেন যে এই মর্মান্তিক সত্য কেবলমাত্র পরিসংখ্যানে আটকে নেই। দিন মাস বছর যতই এগচ্ছে পুঁজিপতিদের হাতে দেশ বিক্রি করে দেওয়ার তাঁর সরকারের নীতি-পরিকল্পনায় না খেতে পাওয়া মানুষের সংখ্যা বেড়েই চলেছে।
এই অবস্থার একটি কারণ খাদ্যসংকট। কিন্তু কেন এই খাদ্যসংকট? আমাদের মতো দেশে মোদী সরকার কর্পোরেট সংস্থার হাতে বেশি বেশি করে খাদ্য ব্যবসা তুলে দিয়েছে। এই একচেটিয়া মালিকরা কি খাদ্যসংকট দূর করবে? না, তারা খাদ্যপণ্যের ব্যবসা থেকে আরও মুনাফা তৈরির ছক কষবে। তাছাড়া বেঁচে থাকার জন্য কেবল খাদ্য পেলেই হয় না, সেই খাদ্যকে পুষ্টিকর এবং সুষম হতে হয়। রাষ্ট্রপুঞ্জের এক রিপোর্ট জানাচ্ছে, আমাদের দেশে পুষ্টিকর এবং সুষম খাবার থেকে বঞ্চিত প্রায় ৯৭ কোটি মানুষ। তার মানে মোট জনসংখ্যার ৭০ শতাংশেরও বেশি মানুষ পুষ্টিকর এবং সুষম খাবার পান না। কেবল তাই নয়, বিশ্বের যে আশি কোটি এগারো লক্ষ মানুষ প্রতিদিন রাতে না খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ে তার মধ্যে বিরাট অংশটি এই মহান ভারতের।