নেশা যদি মানুষের বশ হয় তাহলে কোনও ক্ষতি নেই, ক্ষতি সেখানে যেখানে নেশার বশ হয় মানুষ। গাঁজা হল সে ধরনেরই নেশা। যখন এর দ্বারা কেউ আক্রান্ত হয়, এই নেশা আক্রান্ত ব্যক্তিকে নিয়ন্ত্রিত করে জীবনের অন্তিম পর্যায়ে পৌঁছে দেয়। বিশেষ করে আজকের অবক্ষয়িত মূল্যবোধহীন যুব সমাজ বিশেষ চক্রের ফাঁদে পড়ে যেভাবে এই সমস্ত নেশায় মত্ত হচ্ছে, তা রীতিমতো বিস্ময়কর। বলাবাহুল্য তা আতঙ্কেরও। এ নিয়ে চিন্তিত গোটা বিশ্বজুড়ে বিজ্ঞানী ও গবেষকরা। বিশিষ্ট মাইক্রোবায়োলজিস্ট অধ্যাপক ড. তন্ময় ঘোষের মতে যেভাবে আজকের প্রজন্মের যুব সমাজ গাঁজায় আসক্ত হচ্ছে, তাতে কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়েছে অনেকেরই। ভালো মেধাসম্পদ সমাজ থেকে ধ্বংস হচ্ছে। যা আগামী দিনে দেশের পক্ষে চরম ক্ষতিকর। তিনি বলেন, বিভিন্ন দেশে গাঁজা ভিন্ন ভিন্ন নামে পরিচিত। গাঁজা গাছের শীর্ষ, পাতা, ডাল ও ফুল — যা এই উপমহাদেশে গাঁজা নামে পরিচিত। একই জিনিস পশ্চিমের দেশগুলিতে মারিযুয়ানা বা মারিহুয়ানা নামে পরিচিত। গাছের পাতা বা ডালের আঠালো কষ কিংবা নির্যাস দিয়ে তৈরি এ অঞ্চলের চরস নামের জিনিসটিই পশ্চিম দেশের হাশিস। মনে রাখতে হবে ভারতবর্ষের প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় চিকিৎসাশাস্ত্রে উল্লেখিত গাঁজা শরীরের ব্যথা-বেদনা কমাতে ব্যবহার করা হতো। তবে অন্যান্য ভেষজ গুণ থাকলেও বতর্মান সময়ে দাঁড়িয়ে আজকের প্রজন্ম যেভাবে গাঁজার নেশার কবলে পড়ছে তা চিন্তার বিষয়।
তন্ময়বাবু আরও বলেন, গাঁজাতে ক্যালাবিনয়েড সহ টেট্রাহাইড্রোক্যানাবিবলের মতো একশোটির বেশি বিভিন্ন রাসায়নিক যৌগের উপস্থিতি রয়েছে। গাঁজা মানবদেহের উপর নানান মনস্তাত্ত্বিক ও শারীরবৃত্তীয় প্রভাব ফেলে। এছাড়াও গাঁজার বিভিন্ন প্রজাতিতেই টি.এইচ.সি এবং অন্যান্য ক্যানাবিনয়েড ফার্মাকোলজিকাল প্রভাব থাকে। ক্ষতিকর দিকটা যুবসমাজের উপরেই পড়ছে।

উল্লেখ্য, বিজ্ঞানীরা গবেষণায় জানতে পেরেছেন গাঁজা সেবনের পরপরই টি.এইচ.সি ফুসফুসের মধ্য দিয়ে শোধিত হয়ে রক্ত প্রবাহের সঙ্গে মিশে শরীরের বিভিন্ন অংশে তথা মস্তিষ্কেও প্রবাহিত হয়। এরফলে নেশাগ্রস্ত ব্যক্তির আনন্দানুভূতি, স্মৃতি-চিন্তা, মনোযোগ, সংবেদন এবং চলাচলের সমন্বয়ের ক্ষেত্রে সরাসরি পরিবর্তন আনে। যা এক থেকে তিন ঘণ্টা স্থায়ী হয়। আর যদি গাঁজাকে খাদ্যের সঙ্গে বা পানীয়তে মিশিয়ে খাওয়া হয় তাহলেই শারীরিক প্রভাব লক্ষ্য করা যাবে। চোখ লাল, মুখের শুষ্কতা, ত্বকের গরম ও ঠাণ্ডা সংবেদন, হৃৎস্পন্দন বৃদ্ধি ও পেশি শিথিলতা ইত্যাদি লক্ষণ ধরা পড়বে।

মাইক্রোবায়োলজিস্ট ডা. তন্ময় ঘোষ।
নীলরতন মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের অধ্যক্ষ ডা. পীতবরণ চক্রবর্তীর মতে, যেভাবে গাঁজার প্রভাব যুব সমাজের উপর পড়ছে তাতে চিন্তার বিষয়। যুবরা ক্ষতিগ্রস্ত হলে সমাজটাই পিছিয়ে পড়বে। গাঁজা এমন জিনিস যা সিগারেটের চেয়েও ফুসফুসে অন্তত তিন থেকে চারগুণ বেশি কার্বন মনোক্সাইড ও অন্যান্য ক্ষতিকারক পদার্থ জমা হয়। ফলে গাঁজা সেবনকারীদের ফুসফুসে ও শ্বাসনালীতে ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। তাছাড়াও গাঁজা সেবনে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাবার ফলে সেবনকারীর সংক্রামক রোগ বেশি হয় এবং ব্যাকটেরিয়া ও ভাইরাসজনিত রোগে আক্রান্ত হবার সম্ভাবনাও বেড়ে যায়। এছাড়া গবেষণায় দেখা গেছে কোনও গাঁজা সেবনকারীর সেবনের প্রথম এক ঘণ্টায় হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি সাধারণ অবস্থার চেয়ে চারগুণ বেড়ে যায়। কারণ সেবনের ফলে রক্তচাপ ও হৃৎস্পন্দন বেড়ে যায়।
প্রসঙ্গত, যেহারে ভারত জুড়ে গাঁজা, চরস ও ভাঙ বিক্রি হচ্ছে তা খুবই উদ্বেগের। যার সিংহভাগই যুবসম্প্রদায়ই জড়িত। নারকোটিক্স ড্রাগস অ্যান্ড সাইকোট্রপিক সাবটেন্স বা এন.ডি.পি.এস আইন অনুসারে গাঁজা ও চরস বিক্রি বেআইনি। গত ২০২১ সালে ভারতে আইননুসারে প্রায় এক লক্ষ অভিযুক্ত ধরা পড়েছে। এরপরেও গাঁজা বিক্রি বন্ধ হচ্ছে না। বিশেষজ্ঞদের মতে যুবসমাজকে সুস্থ রাখতে হলে গাঁজা বিক্রির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।