উত্তর পূর্বাঞ্চল বা উত্তর পূর্ব ভারত বলে আমরা যে জায়গাটিকে আমরা চিনি সেটি প্রথমে ছিল উত্তর পূর্ব বাঙলা। মানে বাংলার উত্তর পূর্ব প্রান্ত। এই প্রান্ত দেশভাগের পর উত্তর পূর্ব ভারত হয়ে যায়। বস্তুত বাঙ্গলার পার্বত্য এলাকা, মালভূমি, উপত্যকা এলাকাগুলির মধ্যে বর্তমানের পার্বত্য চট্টগ্রামকে বাদ দিলে বাকি সবটাই উত্তর পূর্ব ভারত। ঐতিহাসিকভাবে এই অঞ্চলটিকে প্রথম উত্তর পূর্ব বলে চিহ্নিত করেছিলেন বাংলার এক গভর্নর জেনারেল গোত্রের ব্রিটিশ আধিকারিক আলেকজান্ডার মেকেঞ্জি। সেই ঘটনা ১৮৯৫ থেকে ১৮৯৮ এই সময়কালের। ভৌগোলিকভাবে হিমালয়ের দক্ষিন অংশটি যেভাবে ধীরে ধীরে সাগরে মানে বঙ্গোপসাগরে নেমে গেছে সেই মনোরম ছবি এই অঞ্চলে। হিমালয় শ্রেনীর পাহাড়গুলির সঙ্গে আবার মিশেছে আরাকান শ্রেনীর কিছু পাহাড়। এটি ঘটেছে মণিপুরে, নাগাল্যান্ডের বিস্তীর্ণ সীমানা জুড়ে। যে এলাকাটি ভুমিকম্পের ভরকেন্দ্র হয়ে আমাদের সামনে আসে বারবার। পাহাড়ে পাহাড়ে মিলনের বা পাহাড়ে সাগরের মিলনের সঙ্গে সঙ্গে এই এলাকাটিতে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মানুষের অনুপ্রবেশ ঘটেছিল। তাদের ভাষা আলাদা, আলাদা তাঁদের সংস্কৃতি, কৃষ্টির পরিচিতি। তবে একটি জায়গাতেই তাঁদের মিল পাওয়া যায় পদ্ধতিগত ভিন্নতা থাকলেও সেই মিল তাঁদের প্রকৃতিপূজায় বা টোটেম। সেই অর্থে উপজাতিরাই এই অঞ্চলের সংখ্যাগুরু মূলনিবাসী।
প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম হিসাবে অহোম রাজাদের হিন্দু হওয়ার পর হিন্দু ধর্মের প্রভাব, বিশেষত শাক্ত হিন্দুদের প্রভাব বাড়ে। আবার তার পাশাপাশি ত্রিপুরার প্রকৃতিপূজারি রাজাদের নিজেদের চন্দ্রবংশীয় বলে ঘোষনার মতন হাস্যকর অতীতও এই অঞ্চলে অনেক রয়েছে। কেবলমাত্র মূল ভুখন্ডের রাজপরিবারের রাজকণ্যা বিয়ে করার জন্য সে ছিল জাতে ওঠার এক চেষ্টা। ত্রিপুরার ফা রাজাদের মানিক্য হয়ে যাওয়ার ঘটনা অন্যন্য রাজ্যেও রয়েছে। মণিপুরের রাজ পরিবার সেই রকমের এক ঐতিহ্যের উত্তরাধিকারী হিসাবে উচ্চ বর্নের ধ্বজা তুলে রেখেছিল এতোকাল। সেই ধ্বজার সামনে ভারত সরকারের কোনও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বা প্রধানমন্ত্রীই গ্রাহ্য ছিলনা, যতো দিন না দেশের প্রধানমন্ত্রী হলেন মোদি শাহ। আজ এই পরিবারের প্রতিনিধি রাজ্যসভায় বিজেপির সাংসদ।

এই কথা ঠিক যে দেশে রাজ পরিবারের যে অবশিষ্টাংশ বাকি আছে তাঁরা বিজেপির প্রতি দুর্বল। হয়তো ইন্দিরা গান্ধী দেশে জমিদারি প্রথা লোপের আইন এনেছিলেন বলেই। ত্রিপুরায় ২০২৩ বিধানসভা নির্বাচনের মাস ছয় আগে এসেছিলেন মোহন ভাগবত। তিনি রাজবাড়িতে গিয়েছিলেন। প্রদ্যুত কিশোর মাণিক্য দেববর্মন তাঁকে আদর সোহাগে শেষ রাজা পিতামহ বীরবিক্রম কিশোর মাণিক্য বাহাদুরের সিংহাসনে বসিয়েছিলেন। রাজ পরিবারে যে সম্পর্ক হয় সেই সম্পর্কে সিন্ধিয়া পরিবারের এক কন্যা ছিল প্রদ্যুত কিশোরের সৎ মা। জ্যোতিরাদিত্য সিন্ধিয়ার সৎ পিসির ছেলে প্রদ্যুত যে সেই দিন থেকেই সলতে পাকাতে শুরু করেছিলেন সে বিষয় নিয়ে পরে আসছি। বলছি এই অঞ্চলের প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের, ধর্মাচরনের কথা। সেই দিক থেকে ইসলাম, খ্রিষ্টান, বৌদ্ধ, শিখ ধর্মের লোক রয়েছেন। কিন্তু এই অঞ্চলে কোনও দিনই ধর্মীয় সংঘাত ছিল না, যতো দিন না বিজেপি ইসলামোফোবিয়ার কথা তুলেছে।
বলে রাখি, সাংসদ পদ খোয়ানোর আগে অবধি কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীর নাকি পরিকল্পনা ছিল ২০২৪ এর আগে দ্বিতীয় পদযাত্রা হবে গুজরাটের সোমনাথ থেকে অরুণাচলের পরশুরাম। অর্থাৎ অরুণাচলে পরশুরামের একটি স্মৃতি বা স্মারক আছে যে জায়গাটিতে মন্দির বানাতে চায় বিজেপি। যদিও ওই অঞ্চলটিতে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী উপজাতি অংশের মানুষের বসতি। অরুনাচল যেহেতু এই সময়ে চিন ভারত সম্পর্কের আপাত শীতলতায় বারবার শিরোনামে আসে তাই স্থানীয় লোকেদের আপত্তিতে মন্দির নির্মানের পরিকল্পনা থেকে সরে এসেছে। যদিও পরশুরাম চরিত্রটি আরএসএসের মনুবাদী, নারীবিদ্বেষ অবস্থান থেকে চরিত্র হিসাবে খুব ম্যাচো। বলা যায় আসাম আর ত্রিপুরাকে বাদ দিলে উত্তর পূর্বের বাকি ছয়টি রাজ্যই উপজাতি মানুষের রাজ্য।
বৈচিত্রের মধ্যে ঐক্য বলে আমরা যা শুনতাম ভারত দেশের স্বরূপ, তাঁর একটা ছোট সংস্করন উত্তর পূর্বাঞ্চল। ঐতিহাসিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক কারনে এই অঞ্চলে মানুষের ভাষা, সংস্কৃতি, আচারের এতো ভিন্নতা দেশের আর কোনও প্রান্তে নেই। এই ভিন্নতা থেকে সংঘাত, আর সংঘর্ষ অবধারিতভাবে এসেছে নানান সময়ে। এই জমিতে মানুষের যে বাস তাঁরা যেন ট্রেনের তৃতীয় শ্রেনীর কোনও কামরার যাত্রী। এখানে প্রত্যেকেই প্রত্যেককে বলছে অনুপ্রবেশকারী। আসামে বাঙ্গালীকে অনুপ্রবেশকারী বলে অসমীয়া ভাষী মানুষ। আবার অসমীয়াদের অনুপ্রবেশকারী বলে থাকে বোডো জনগোষ্ঠির লোক। একই চরিত্র সব রাজ্যে নানান চেহারায়। এই আসামে, এই উত্তর পূর্বাঞ্চলে সংঘাত বা কনফ্লিক্ট আজন্ম। প্রথম থেকে বলা হলে ভারত সরকারের সঙ্গে নাগা কনফ্লিক্ট, ভারত সরকারের সঙ্গে মিজো কনফ্লিক্ট যেমন চলছিল আবার নাগা কুকি সংঘাত ছিল মনিপুরে, আসামে কখনো আসমিয়া বাঙালি, কখনো বোডো অসমিয়া, কখনো বোড়ো বাঙালি, মেঘালয়ে ভূমিপুত্র খাসিয়াদের সঙ্গে অউপজাতি অসমিয়া, বাঙালি। মিজোরামে মিজো বনাম চাকমা কিংবা মিজো বনাম রিয়াং ত্রিপুরায় পাহাড়ি বাঙালি এইগুলি লেগেই রয়েছে।

হিসাব করে দেখা যায় উত্তর পূর্বাঞ্চলে ছোটবড় মিলিয়ে প্রায় চারশোটির মতো জাতি গোষ্ঠী বা এথনিক গ্রুপ রয়েছে। ভাষা রয়েছে ২০ থেকে ২২ খানা। এদের অনেকেরই লিপি নেই। আর এই ভাষাগুলি উর্দু, সংস্কৃত পরিবারের নয়। ত্রিপুরায় উপজাতিদের সিংহভাগ যে ভাষায় কথা বলেন, ককবরক ভাষা — সেটি সিনো টিবেটিয়ান পরিবারের গারো-বোরো একটি উপশাখা। বাঙ্গালিরা এতোবছর পাশাপাশি থেকেও এই ভাষা বুঝে না। যারা বুঝতে পারেন তাঁরা প্রয়োজনে বুঝেন। আমার অনেক দাদা, বন্ধু আছেন স্বাভাবিকভাবেই। আমি তাঁরা যখন কথা বলেন, কিংবা বিধানসভায়, ময়দানে ভাষন দেন তখন তাঁদের কথাগুলি বুঝতে পারি ৮০ ভাগ। একশোভাগ নয়। কিন্তু বলতে পারিনা। যদিও আমার মতো অনেকেই আত্মগ্লানিতে ভুগি, কেন সহনাগরিকের ভাষাটা শেখা হল না। আমার পক্ষে গুজরাতি কিংবা কন্নড় ভাষা শেখা যত সহজ তত সহজ হয়না ককবরক শেখা। এর আরও একটা কারন হল এই ভাষাগুলির ফোনেটিকস নির্ভরতা। একটা শব্দে চারটি পাচটি অর্থ হয় উচ্চারন ভেদে। এদের ভাষার স্বীকৃতি, লিপি বিতর্ক এই সবই রাজনীতিক দলগুলির জন্য ভোট আদায়ের দারুন উপাদান ছাড়া আর কিছুই নয়। (চলবে)
এই প্রবন্ধটি ২১ এপ্রিল ২০২৩ থিওজফিক্যাল সোসাইটি হলে উপনিবেশ বিরোধী ও কর্পোরেট বিরোধী চর্চা, তৃতীয় মধুমঙ্গল স্মৃতি বক্তৃতায় পঠিত।
লেখক : সাংবাদিক সিতাংশুরঞ্জন দে। আগরতলা, ত্রিপুরা। email : srdehere@gmail.com