তাঁকে দুই মলাটের মধ্যে প্রথম বন্দি করেছিলেন বিপ্লবী নলিনীকান্ত সরকার। এই নলিনীকান্ত ‘দাদা ঠাকুরকে’ খুব কাছ থেকে দেখেছিলেন। কাছের মানুষ, মনের মানুষ। দাদা ঠাকুর ওরফে শরৎচন্দ্র পন্ডিত। তাঁর মস্তিষ্ক প্রসূত ‘জঙ্গীপুর সংবাদ’ নামের সাপ্তাহিক পত্রিকায় সবরকম অন্যায়কে আঘাত করতেন তিনি। তাঁর সম্পাদিত আর–একটি পত্রিকা ছিল ‘বিদূষক’—রঙ্গব্যঙ্গের ভাষায় সেখানেও সত্যকে প্রতিষ্ঠা করাই তাঁর লক্ষ্য ছিল। বোতলের আকারে এক–একটি সঙ্কলন মাঝে মাঝে প্রকাশ করতেন— নাম ছিল ‘বোতলপুরাণ’। নাম শরৎচন্দ্র পণ্ডিত, জন্ম ১৮৮১ খ্রিস্টাব্দে। বীরভূমের একটি গ্রামে। প্রয়াণ ১৯৬৮–তে। কোনও কোনও মানুষ থাকেন যাঁরা জীবৎকালেই কিছুটা কিংবদন্তি হয়ে ওঠেন। তাঁদের জীবনকে ঘিরে ছড়িয়ে পড়ে কিছু গল্পকথা। অনেকটাই সত্য; কিছু হয়তো একটু অতিরঞ্জিত। কিন্তু তার মধ্যেই থেকে যায় সত্যের নির্যাস।

শরৎচন্দ্র পণ্ডিত প্রতিষ্ঠিত পণ্ডিত প্রেস জঙ্গিপুর
পিতা হরিলাল পণ্ডিতের আদিবাস ছিল বীরভূমের ধরমপুর গ্রামে। পরে চলে আসেন মুর্শিদাবাদের দহরপুরে। শৈশবে অনাথ শরৎচন্দ্র জঙ্গিপুরে নুন আনতে পান্তা ফোরায় অবস্থা কাকা রসিকলালের কাছে মানুষ হয়েছিলেন। বহেমিয়ান জীবনে যা যা ঘটার তার অনেকটাই তার জীবনে ঘটেছে। তাঁর বিদগ্ধ শব্দ–খেলা এবং সরসোক্তি অর্থাৎ ইংরেজিতে যাকে বলে ‘পান’ (Pun) এবং ‘উইট’ (Wit)— এই দুইয়ের সমন্বয়ে তাঁর স্মরণীয় বাক্–কলা উঠে এসেছে তাঁর লেখনীতে। প্রমথনাথ বিশী তাঁকে বলেছিলেন এ যুগের শ্রেষ্ঠ হিউমারিস্ট।
তাঁর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়বার একটি কারণ অবশ্য ছিল কলকাতা বেতার–কেন্দ্রের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘকালের সম্পর্ক। একবার রেডিওতে ফ্যাশন নিয়ে কথা বলতে গিয়ে আধুনিকা মায়েদের সম্পর্কে ঈষৎ কটাক্ষ করেছিলেন দাদাঠাকুর। প্রচুর সমালোচনা হল। অধিকর্তা স্টেপলটন সাহেব ডেকে পাঠালেন। ধুতি–চাদর পরিহিত দাদাঠাকুরকে দেখে প্রথমে বললেন, ‘দিস ইজ ইওর ফ্যাশন?’
তারপর দাদাঠাকুরকে বললেন ‘ফ্যাশন’ শব্দের সংজ্ঞা দিতে। দাদাঠাকুর লিখে দিলেন— ‘ফ্যাশন ইজ দ্য থিং দ্যাট অ্যারাউজেজ প্যাশন অফ দি আদার সেক্স।’ সেকালের সাহেবরা অনেকেই গুণের কদর করতেন। এই উত্তর শুনে সাহেব তাঁর পারিশ্রমিক দশ টাকা বাড়িয়ে দিলেন এবং নির্দেশ দিলেন প্রতি মাসে যেন অন্তত চারটি অনুষ্ঠান তাঁকে দেওয়া হয়। অনেকে তাঁর খালি পা-এ রেডিও স্টেশনে আসা নিয়ে তির্যক কথাও বলেছেন। তিনি হেসে বলেছেন, আমি খলিফা (খালি পা)। কিন্তু এই হাসির আড়ালে ছিল এক করুণ কাহিনী। শৈশবে পাঠশালয় যেতে হত নদীর তীরের উত্তপ্ত বালির ওপর দিয়ে। বালক শরৎচন্দ্রের পায়ে প্রায়ইফস্কা পড়ে যেত। অধৈর্য হয়ে একদিন বালক শরৎচন্দ্র কাকার কাছে এক জোড়া জুতোর বায়না ধরলেন। দরিদ্র কাকা তাঁকে প্রতিবেশী কাঠের পাওয়ালা প্রতিবন্ধী হরি স্যাকরাকে দেখিয়ে বলেছিলেন ‘ওর তো একটা পা নেই তবু চলে যাচ্ছে, আর তোর জুতো না হলে চলবে না?’ সেই থেকেই আমৃত্যু শরৎচন্দ্র জুতো পরেননি। এমনি ছিল তাঁর চরিত্রের দৃঢ়তা। বরং তাঁর এই খালি পা সম্বন্ধে পরবর্তীকালে মানুষের কৌতূহলী প্রশ্নের সরস উত্তর দিতেন এই বলে যে, বাগদাদের রাজারা হলেন ‘খালিফা’ আর তিনি ‘খালিপা’!
দাদাঠাকুর ছিলেন বলিষ্ঠ সাংবাদিক। রঘুনাথগঞ্জ থেকেই তাঁর সম্পাদনা ও প্রকাশনায় বের হত সাপ্তাহিক পত্রিকা ‘জঙ্গিপুর সংবাদ’ ও ব্যাঙ্গ পত্রিকা ‘বিদূষক’। এখনও জঙ্গিপুরে রয়েছে দাদা ঠাকুরের পন্ডিত প্রেস। তাঁর নাতি সমীরবাবু এখনও সযত্নে রেখে দিয়েছেন দাদা ঠাকুরের ব্যবহৃত সমস্ত কিছু। কলকাতা প্রেস ক্লাব থেকে ‘বাংলা সংবাদপত্রের ২০০ বছর’ নামে একটি সংকলন বেরিয়েছিল। তাতে দাদুর সম্পর্কে লিখেছিলেন সমীরবাবু। সেই সময়ে জঙ্গিপুরের এসডিও ছিলেন চারুচন্দ্র গুপ্ত। তিনি ট্রেনের থার্ড ক্লাসের টিকিট কেটে ফার্স্টক্লাসে চড়তেন। অজুহাত দিতেন ফার্স্টক্লাসের টিকিট শেষ হয়ে যাওয়ায় তিনি বাধ্য হয়ে এই কাজ করেছেন। দাদাঠাকুর এসডিও-র মিথ্যাচার সামনে আনেন। প্রমাণ-সহ। তিনি এসডিও টিকিট কাটার পরে ফার্স্টক্লাসের টিকিট কাটেন। এবং একই সঙ্গে ট্রেনে কলকাতায় যান। তার পর খবরটি প্রকাশিত হয় ‘জঙ্গিপুর সংবাদ’এ। এসডিও-কে বাংলাদেশের রংপুরে বদলি করা হয়েছিল। পরে জঙ্গিপুরেই একবার দেখা হয়েছিল সেই এসডিও-র সঙ্গে। তিনি দাদাঠাকুরকে জিজ্ঞাসা করেন, তাঁকে কেন শিকার করা হয়েছে? দাদাঠাকুরের জবাব, ‘বাঘ সবাইকে কামড়ায় না, কিন্তু বাঘকে পেলে কেউ ছাড়ে না, সবাই মারে’।
‘বোতল পুরাণ’ ছিল তাঁর আরেকটি দুর্দান্ত সৃষ্টি। বোতলের আকারে পত্রিকা, যা তিনি নিজেই ফিরি করতেন কলকাতার পথে পথে স্বরচিত গান গেয়ে গেয়ে—‘হিউমার স্যাটায়ার উইট / আর ইন মাই পাবলিকেশন / জেন্টেলম্যান টেক দি বট্ল / ফর ইওর রিলাক্সেশন। তাঁর গানে মুগ্ধ হয়ে একবার এক গোরা সার্জেন্ট সবক’টি ‘বোতলপুরাণ’ কিনে নিয়ে এই ‘হকার-কবি’ কে শ্রদ্ধা জানিয়েছিলেন।

নলিনীকান্ত সরকার ও দাদাঠাকুর
দাদাঠাকুরের জীবনের আর একটি বড় কীর্তি তেলেভাজা ও চানাচুরের দোকানের মালিক কার্তিকচন্দ্র সাহাকে জঙ্গিপুর মিউনিসিপ্যালিটির কমিশনার করা। কার্তিকচন্দ্র ছিলেন সদানন্দ, সাহসী, স্পষ্টবাদী এক মানুষ। দাদাঠাকুর কার্তিকচন্দ্রকে খুব ভালবাসতেন। ডাকতেন ‘কাত্তিকে’ বলে। সে বার কার্তিকচন্দ্রের ত্রৈমাসিক ট্যাক্স মিউনিসিপ্যালিটি এক ধাক্কায় তিন আনা থেকে বাড়িয়ে করে দিল ছ’আনা। এই বর্ধিত ট্যাক্সে স্বল্পআয়ী কার্তিকচন্দ্র স্বাভাবিক ভাবেই ক্ষুণ্ণ হলেন। শরণাপন্ন হলেন দাদাঠাকুরের। দাদাঠাকুর পরামর্শ দিলেন, মিউনিসিপ্যালিটির চেয়ারম্যানের কাছে আবেদন করতে। দরখাস্তও লিখে দিলেন। এক বার নয়, তিন তিন বার। কিন্তু কোনও কাজ হল না। দাদাঠাকুর তাঁর কাত্তিকে’কে বললেন—‘যাঁরা তোর দরখাস্তকে এ ভাবে অগ্রাহ্য করল সেখানেই বসাব তোকে। এই বর্ধিত ট্যাক্স দিয়েই বাজিমাত করব। তোকে মিউনিসিপ্যালিটির কমিশনার করব।’
সুযোগ মিলে গেল অচিরেই। মিউনিসিপ্যালিটির চেয়ারম্যান পরলোকগমন করলেন। তিনি ৫ নম্বর ওয়ার্ড থেকে নির্বাচিত। এই ওয়ার্ডে উপনির্বাচন শুরু হল। সে সময় নিয়ম ছিল, যে বছরে দেড় টাকা ট্যাক্স দেয়, সে-ই মিঊনিসিপ্যালিটির নির্বাচনে কমিশনারের পদপ্রার্থী হতে পারে। কার্তিকচন্দ্রের ত্রৈমাসিক ট্যাক্স ছ’আনা হওয়ায় বাৎসরিক সেটা দেড় টাকায় দাঁড়িয়েছে। সুতরাং কার্তিকচন্দ্রের প্রার্থী হতে বাধা রইল না। তেলেভাজা-চানাচুরের দোকানের মালিক ভোটে প্রার্থী হয়েছে শুনে সারা শহরে সাড়া পড়ে গেল। বিপক্ষে দাঁড়িয়েছেন স্থানীয় এক সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি। তাঁর বিরুদ্ধে কার্তিকচন্দ্র কার পরামর্শে দাঁড়িয়েছেন, তা জানতে শহরের কারও বাকি থাকল না।
দাদাঠাকুর অবশ্য প্রকাশ্যেই তাঁর ‘জঙ্গিপুর সংবাদ’ থেকে কার্তিকচন্দ্রের হয়ে প্রচার শুরু করলেন। লিখলেন ভোটের গান, ছড়া। এই গান-ছড়ার মধ্যে একটি তো ‘দাদাঠাকুর’ চলচ্চিত্রের সুবাদে বিখ্যাত। ‘ভোট দিয়ে যা-/ আয় ভোটার আয়/ মাছ কুটলে মুড়ো দিব/ গাই বিয়োলে দুধ দিব…।’ বিরোধী প্রার্থীর হয়ে, তাঁর বিরুদ্ধেই যায় এমন ছড়া ভোটের ইতিহাসে নতুন ও অভিনব। মহা সমারোহে শুরু হয়ে গেল নির্বাচন। ফল বেরোলে দেখা গেল বেশ ভাল ভোটের ব্যবধানে প্রতিপক্ষকে পরাজিত করে বিজয়ী হয়েছেন কার্তিকচন্দ্র।
‘জঙ্গিপুর সংবাদ’ এ সম্পাদকীয়তে দাদাঠাকুর লিখলেন— ‘জঙ্গিপুর মিউনিসিপ্যালিটির ৫ নম্বর ওয়ার্ডের অন্যতম কমিশনার বাবু ইন্দ্রচন্দ্র মুখোপাধ্যায় মহাশয়ের মৃত্যু হওয়ায় তাঁহার স্থানে জনৈক কমিশনার নির্ব্বাচনের দিন ছিল ২৮ শে জুলাই। প্রার্থী ছিলেন দুইজন।… শ্রীযুক্ত কার্ত্তিকচন্দ্র সাহা অধিক সংখ্যক ভোটপ্রাপ্ত হইয়া কমিশনার নির্ব্বাচিত হইয়াছেন। এই নির্ব্বাচনে একটু আন্দোলন উত্থিত হইয়াছে, যেহেতু নির্ব্বাচিত ব্যক্তি শিক্ষিত বা ধনাঢ্য নহে।… করদাতাগণ যাহাকে যোগ্য মনে করেন তিনিই যোগ্য। শুধু কমিশনার হইলে হয় না, দেশের কাজ করিবার প্রবৃত্তি থাকা চাই। সব বন তুলসী ভাবে সব সে শিলা শালগ্রাম,সব পানি গঙ্গা ভাবে যব ঘটমে বিরাজে রাম। দেখা যাক সাহাজীর দ্বারা কি হয়’ (বানান অপরিবর্তিত)।
মিউনিসাপ্যালিটির ভোট আর লোকসভার ভোট নিশ্চয় এক নয়। কিন্তু ভোটের তরজায় সুস্থ রুচি, রসবোধ যে দরকার তা সব ভোটের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। দাদাঠাকুর সেটাই দেখিয়েছেন তাঁর রচনায়, কর্মে।
সূত্র : ইন্টারনেট