জগন্মাতা কালী সকলেরই মা। সব সন্তানের ভক্তি ভালোবাসা আন্তরিকতার চিরকাঙ্গালিনী রাজ রাজেশ্বরী মাকালী। উচ্চ-নীচ ভেদ নেই। সাধক, ভক্ত, রাজা মহারাজার পুজোর মতো সমানভাবে পুজো গ্রহন করেন সমাজ ঘৃণিত নরহন্তা ডাকাত, বাটপাড়, চোর, ঠগিদের।
রঘু, বিশে, রামলাল, কালাচাঁদ, পুঁটে প্রভৃতি বাংলা জুড়ে বিখ্যাত সব ডাকাতদের আরাধ্যাদেবী কালী আজো ইতিহাসের জ্বলন্ত সাক্ষী। এইসব নিয়ে বহু কিংবদন্তি গল্প শোনা যায়। তাঁদের পূজিতা কালী “ডাকাত কালী” নামে পরিচিত। আজকের প্রতিবেদনে হুগলী জেলার বহু বছরের পুরোনো এমনই সাধককুলের পূজিতা দুই মন্দিরের কাহিনী বলবো।

কেলেগড়ের ডাকাত কালী : বিতর্কের অবকাশ থাকলেও, হুগলী জেলার জিরাটের অনেক কালী মন্দিরর মধ্যে কালিয়াগড়ের কালী সর্বাপেক্ষা প্রাচীন। জনশ্রুতি আছে, আজ থেকে প্রায় ১০০০ বছর আগে ভাগীরথীর পূর্বপাড়ে বাস করতেন এক দরিদ্র ব্রাহ্মণ। পারিবারিক অশান্তির কারণে তাঁর জীবন সম্পর্কে বিতৃষ্ণা জন্মায় ও আত্মাহুতি দেবার বাসনায় বর্ষার ভরা গঙ্গায় ঝাঁপ দেন। গঙ্গার উন্মত্ত স্রোতে তাঁর অচেতন দেহ ভাসতে ভাসতে পশ্চিম পাড়ের গহীন জঙ্গলে ঘেরা এক বটগাছের নিচে এসে পৌঁছায়।
মধ্যরাত্রে ক্লান্ত পরিশ্রান্ত অবস্থায় বট গাছের নীচে ঘুমিয়ে পরে। নিদ্রিত অবস্থায় তিনি স্বপ্নে দেখেন, ঘোর কৃষ্ণবর্ণা এক অপরূপ সুন্দরী মাতৃমূর্তি তাঁকে সেই স্থানে পুজো করা ও মন্দির নির্মাণ করার কথা বলেন।
ব্রাহ্মণ প্রথমে অভুক্ত দীর্ঘ পরিশ্রমের ক্লান্তিতে এ কথা স্বপ্ন মনে করেন। এরপর গহীন জঙ্গলে এক বেলগাছের তলায় এসে ঘুমিয়ে পরেন। পুনরায় সেই স্বপ্ন দেখেন। স্বপ্নানুসারে বেলতলার নীচে পরিষ্কার করে ভাগীরথী নদীতে স্নান করতে নামলেন। ভরা বর্ষায় ভাগীরথীর ভাবগম্ভীর সৌন্দর্য্যে তিনি মুগ্ধ ও অবিভূত হলেন।
কথিত আছে এইসব ভাবতে ভাবতে গঙ্গাস্নান করে পিছন ফিরতেই মায়ের পূজার উপকরণ দেখতে পান। পরম ভক্তিতে মায়ের পুজো দিয়ে প্রসাদ খেয়ে সুস্থ হলেন। ভাগীরথীর পাড়ে প্রাচীন বট ও বেলগাছের নিচে প্রতিষ্ঠিত হলো সিদ্ধেশ্বরী মায়ের মন্দির। ৩০০ বছর আগেও মন্দিরের পাশ দিয়ে ভাগীরথীর ধারা প্রবাহিত হতো, কালের নিয়মে আজ ভাগীরথী প্রায় ৪কিমি সরে গেছে, কিন্তু মন্দিরের গায়ের প্রাচীন বটগাছ ও বাঁধানো সিঁড়ি ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে রয়েছে।
পূর্বে এই জায়গার নাম ছিলো ‘মহাম্মদপুর’। দেবী সিদ্ধেশ্বরী কালী মাতার মন্দির প্রতিষ্টা হলে মায়ের নাম অনুসারে এখানকার নাম হয় কালীগড় বা কেলেগড়ঃ।পরে ব্রিটিশ রাজত্বে সরকারী কাগজপত্রে নাম লেখা হলো কালিয়াগড়। সেই ব্রাহ্মণ ব্যক্তির পদবী ছিলো মুখোপাধ্যায়। মায়ের পুজোর অধিকার পান বলে তাঁর বংশধরেরা অধিকারী পদবী ধারণ করেছিলেন। এই বংশের শেষ পুরুষ চন্দ্রনাথ অধিকারী ১২২৭ সনে স্বর্গলাভ করেন এবং তাঁর ভাগিনা কালীপ্রসন্ন চট্টোপাধ্যায় পুজোর ভার গ্রহন করেন।
মন্দিরটি একটি বলয়পীঠ। দক্ষযজ্ঞের পর মহাদেব সতীর দেহ কাঁধে নিয়ে বিশ্বব্যাপী প্রলয় নৃত্য শুরু করেন। মহাদেবের এই প্রলয় থামাতে বিষ্ণু তাঁর সুদর্শন চক্র দিয়ে সতীর দেহ খন্ড খন্ড করে দেন। সতীর দেহাংশ যেখানে যেখানে পড়েছিল সেগুলি হলো পবিত্র শক্তিপীঠ এবং সতীমায়ের পরিধেয় গহনা যেখানে যেখানে পড়েছিল সেগুলি হলো উপপীঠ। কথিত আছে,এই স্থানে সতীর বালা পড়েছিল। তাই একে বলা হয় বলয়পীঠ।
অন্য একটি ইতিহাস সূত্রে জানা যায়, বাঁশবেড়িয়ার কাছে বেনেপুকুর গ্রামে বাস করতো প্রভাবশালী জমিদার কালাচাঁদ। দিনের বেলায় তিনি ছিলেন অত্যন্ত এক সজ্জন ও পরম ধার্মিক ব্যক্তি। রাতের অন্ধকারে এই জমিদার হয়ে উঠতো কুখ্যাত ডাকাত সর্দার কালীচাঁদ। স্থল ও জলপথে ঠগীদের কায়দায় ডাকাতি করতো। জমিদার ছিলেন কালীর সাধক। তাঁর বাড়িতেই ছিলো কালীর মন্দির। নিত্যদিন নিজের হাতে কালী পুজো করে দলবল নিয়ে বেরোত ডাকাতি করতে। বর্তমানে এটি প্রচারিত কেলেগড় নামে। এখানকার কালী সিদ্ধেশ্বরী।
মায়ের সামনে ডাকাতরা নরবলি, পশুবলি দিতো। মহাকাল ভৈরবও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ডাকাতদের হাতে। দিনের বেলায় লোক দেখিয়ে গরিবদের দান করতো। রাতে ডাকাতি করতে গিয়ে অসহায় মানুষদের ধরে এনে গোপন কুঠুরিতে আটকে রাখতো। নিজের হাতে মায়ের সামনে বলি দিতো।সারা বছর ও কালীপুজোর দিন মহা ধুমধামের সাথে এখানে আজো মাতৃ আরাধনা হয়। আগে প্রচুর বলি হতো, কিন্তু মানুষের সচেতনতায় বলি কমতে কমতে এখন প্রায় শেষের পথে। তবে জিরাট ও তার আশপাশের এলাকার মানুষজনের ভক্তিতে এতটুকু ভাটা পড়েনি।

সিঙ্গুরের প্রসিদ্ধ ডাকাত কালী:
বৈদ্যবাটী-তারকেশ্বর রোডের পাশে সিঙ্গুরের পুরুষোত্তমপুরে প্রসিদ্ধ কালী মন্দিরটি প্রায় ৫০০ থেকে ৫৫০ বছরের পুরোনো। এই মন্দিরকে ঘিরে রয়েছে নানান ইতিহাস। পুজোর সময়কাল নিয়ে বিতর্ক থাকলেও এই কালী যথেষ্ট প্রাচীণ। টেরাকোটার কাজে সাজানো মন্দিরের গায়ে মনুষ্য লতিকা, পশু লতিকা নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। মন্দিরের গর্ভগৃহে অধিষ্ঠাত্রী মৃন্ময়ী মূর্তির উচ্চতা প্রায় নয় ফুট। বঙ্গে এমন উচ্চতার সিদ্ধেশ্বরী মূর্তি খুবই কম দেখা যায়। তবে দ্বিমত রয়েছে এখানে কালী প্রতিষ্ঠা করা নিয়ে। কেউ বলে ডাকাত সর্দার রঘু এই কালী প্রতিষ্ঠা করেন আবার কারো মতে গগন ডাকাত বা ডাকাত সর্দার বিশু এ কালীর প্রতিষ্ঠাতা।
কথিত আছে ঠাকুর রামকৃষ্ণ অসুস্থ হয়ে পড়লে মা সারদা কামারপুকুর থেকে দক্ষিণেশ্বর যাচ্ছিলেন ঠাকুরের কাছে। ডাকাতি করার উদ্দেশ্যে রঘু ডাকাত ও গগন ডাকাত মায়ের পথ আটকায়। কিন্তু রক্তচক্ষু মা কালীর মুখের প্রতিচ্ছবি দেখতে পায় তাঁরা সারদা মায়ের মুখের মধ্যে। নিজেদের ভুল বুঝতে পারে। রাত হয়ে যাওয়ায় ডাকাতদের ডেরায় মা থেকে যান। রাত্রে সারদা মা কে খেতে দেওয়া হয় চাল ও কড়াই ভাজা। তাই আজো প্রসাদের অন্যান্য উপকরণের সংগে দেওয়া হয় চাল ও কড়াই ভাজা।
ইতিহাসের পাতায় উঁকি দিলে দেখা যায় ইংরেজ শাসকদের অত্যাচারে নীল বিদ্রোহের প্রেক্ষাপটে জন্ম হয় বিশু ডাকাতদের। বহু নীলকর সাহেবদের খুন করে জ্বালিয়ে দিয়েছিলো এই বিশু ডাকাত। শোনা যায়, চলকেবাটির মোড়ল দেবীর স্বপ্নাদেশ পেয়ে এ মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। ডাকাতি করতে যাবার আগে ও ফেরার পথে মায়ের পুজো দিতো ডাকাতরা। এখনও প্রচুর মানুষ আসেন নিত্যদিন মায়ের পুজো দিতে। মন্দিরের উন্নয়ন স্বার্থে রয়েছে “ডাকাতকালী মন্দির উন্নয়ণ কমিটি”। শিবের মাথায় জল ঢালতে হেঁটে যাঁরা শেওড়াফুলি থেকে তারকেশ্বর যান তাঁরা প্রথমে এই মন্দিরে এসেই বিশ্রাম নেন। পুরুষোত্তমপুরের ডাকাত কালীর কথা আজ প্রায় সকলেরই জানা।।
তথ্যঋণ: রোহিনীকান্ত মুখোপাধ্যায় প্রণীত কুলসার সংগ্রহ গ্রন্থ, সুধীর কুমার মিত্র — হুগলী জেলার ইতিহাস ও বঙ্গসমাজ।।
ভালো লেখা
থ্যাংক ইউ ????
খুব ভালো লাগলো, একবার ঘুরে আসার ইচ্ছে করছে, দেখি মা ডাকেন কিনা, ভালো থাকবেন
সুযোগ হলে নিশ্চয়ই দর্শন করে আসুন।
ধন্যবাদ জানাই ????❤️
Aapnar lekhar bhitar natunatyya thake o porteo bhalo lage…onek kichhu jante pari…
ধন্যবাদ জানাই আপনাকে।
আসন্ন কালী পূজোর প্রাক মুহূর্তে *হুগলী জেলার ডাকাত কালী* উপাখ্যান ভক্তজনের ভক্তি বৃদ্ধি করবে।পেজ ফোরের অসাধারণ প্রতিবেদন মুগ্ধ করলো।
রিঙ্কি ম্যাডাম মানেই ইতিহাসের খোলা দরজায় দৃষ্টি স্থাপন।জয় মা কালী????
আপনার মতামত পেয়ে আমি আপ্লুত ও অনুপ্রাণিত হলাম শ্রদ্ধেয় ????❤️