দু-দিন আগে লখিমপুর খেরিতে দুই দলিত বোনের দেহ গাছে ঝুলন্ত অবস্থায় পাওয়া গিয়েছে৷ অভিযোগ দুই বোনকে অপহরণ করে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণ, তারপর খুন করে গাছে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ড ব্যুরোর রিপোর্ট অনুযায়ী, দেশে প্রতি ১৬ মিনিটে অন্তত একজন মেয়ে ধর্ষিতা হয়। উত্তরপ্রদেশে রোজ ১১ জন মেয়ে আর গোটা দেশে প্রতিদিন ৮ জন দলিত নারী ধর্ষিত হন। সংখ্যাটি বাস্তবে আরও বেশি হতে পারে কারণ, অনেক দলিত মেয়ের ধর্ষণের অভিযোগ দায়ের হয় না। এনসিআরবি-র তথ্য অনুযায়ী, দলিত নির্যাতনে সারা দেশের মধ্যে উত্তরপ্রদেশ শীর্ষে। সারা দেশে ২৫.৬% দলিত মানুষের ওপর নির্যাতন উত্তরপ্রদেশে ঘটেছে এবং এঁদের মধ্যে বেশির ভাগই দলিত নারীর প্রতি যৌন নির্যাতন।
কারা এই দলিত? এ দেশে সমাজের সব থেকে নীচু জাতি দলিত নামে চিহ্নিত। দলিতরা সংখ্যায় প্রায় ১৬ কোটি৷ মহাত্মা গান্ধী এঁদের হরিজন বা ঈশ্বরের সন্তান নাম দিয়েছিলেন কিন্তু তাতে ওঁদের অবস্থার তেমন কোনও পরিবর্তন হয়নি৷ সব থেকে বড় কথা আজও ওঁরা অচ্ছুত৷ ওঁরা আর পাঁচ জনের মতো মন্দিরে যেতে পারেনা, উচ্চবর্ণের স্কুলগুলিতে দলিত বাচ্চাদের লেখাপড়ার অধিকার নেই, উঁচু জাতের সঙ্গে এক কুঁয়ো থেকে জল তোলার অধিকার নেই৷ এমন কী একই শশ্মানে দাহ করারও অধিকার নেই৷ অথচ দলিত মেয়েদের ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা দিন দিন বেড়েই চলেছে। এনসিআরবি-র রিপোর্ট অনুযায়ী, গত ১০ বছরে দলিতদের উপর নির্যাতন বেড়েছে ২৫ শতাংশ, যার মধ্যে উত্তরপ্রদেশ সব থেকে উপরে।

বছর খানেক আগে গবেষক জয়শ্রী মঙ্গুবাইকে এক দলিত নারী বলেছিলেন, “আমরা সহিংসতার শিকার, কারণ আমরা গরিব, নিচু জাত এবং নারী; তাই সবার কাছেই অপদস্থ হই। কেউই আমাদের পক্ষে বলে না বা আমাদের সাহায্য করে না। আমরা সবচেয়ে বেশি যৌন নিপীড়নের শিকার হই, কারণ আমাদের কোনো ক্ষমতাই নেই”। ওই দলিত নারীর কথা সমর্থন করা ছাড়া উপায় থাকেনা কারণ, হাথরসের মতো ঘটনায় স্থানীয় থানা থেকে জেলা পুলিশ সুপারিনটেন্ডেন্ট, জেলা আধিকারিক, লুকিয়ে শব পোড়ানোর সময় দায়িত্বপ্রাপ্ত অফিসার, মৃতদেহ পাহারারত কনস্টেবল- সবাই সবাই একই সুরে কথা বলেন, ডিএম যখন ধর্ষিতার পরিবারকে বয়ান বদলানোর হুমকি দেন এবং পুলিশ জেলা সুপার বলেন, ‘ধর্ষণ হয়নি’। স্পষ্ট বোঝা যায়, উচ্চবর্ণের স্বার্থরক্ষার জন্য দলিত মেয়েদের নির্যাতনের ঘটনা চেপে দেওয়ার চেষ্টা চলে। নিচু জাত আর দরিদ্র দলিত মেয়ে ধর্ষণ হলেও পুলিশ নানা অজুহাতে অভিযোগ না নেওয়ার চেষ্টা চালায়, তদন্তে অবহেলা করে সর্বপরি তদন্ত ও বিচারে নিষ্ক্রিয়তা চরমে পৌঁছয়। হাথরসের মতো ঘটনাকে উত্তরপ্রদেশের শাসক দলের কর্মী-সমর্থকরা ‘ফেক’ বলে প্রচার করতে বলে, ‘নারীর ওপর অত্যাচারে রাজনীতি এনো না, জাতপাত এনো না, চলো সবাই মিলে সুবিচার চাই!’ তার মানে কি আমাদের সমাজে অপরাধের ক্ষেত্রে কোনও জাতপাতের বৈষম্য নেই, নাকি প্রকারান্তরে ব্রাহ্মণ্যবাদকেই প্রশ্রয় দেওয়া।
সাম্প্রতিক কালে বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিতে এবং কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে বেশ কিছু ধর্ষণের ঘটনায় লক্ষ্য করা গিয়েছে, নির্দিষ্টভাবে দলিত এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নারীরাই টার্গেট। জম্মুর ছোট্ট মেয়ে আসিফা থেকে উত্তরপ্রদেশের উন্নাও-হাথরস, সর্বত্র একই ছবি। আর প্রতিটি ক্ষেত্রেই ধর্ষক উচ্চবর্ণের। উত্তরপ্রদেশে এই প্রবণতা খুব নতুন নয়। দলিত মেয়েদের ধর্ষণের পর মেরে ফেলার ঘটনা প্রায়শই ঘটে। সে রাজ্যে বাল্মীকি সম্প্রদায়ের মেয়েটি ও লখিমপুর খেরি জেলার দলিত মেয়েটির ক্ষেত্রেও মিল চোখে পড়ার মতো। দুষ্কৃতীরা দু’জনেরই জিভ কেটে দিয়েছে। কেন, শুধুই কি মুখ বন্ধের চেষ্টা? না ওরা দলিত, তার ওপর মেয়ে, তাহলে তার আবার কথা বলার কী দরকার! হাথরসের ঘটনায় এলাকার মিডিয়া যতক্ষণ পর্যন্ত না চেঁচামেচি শুরু করেছিল, ততক্ষণ পর্যন্ত পুলিশ অভিযোগে ধর্ষণের ধারা লেখেনি, এমনকি মেয়েটির মৃত্যুর পরও পুলিশ বলেছে- ধর্ষণ হয়নি, শিরদাঁড়ায় আঘাত লাগেনি, জিব অক্ষত আছে ইত্যাদি।

তবুও আমরা মানতে চাই না যে দলিতদের উপর এখনও এই ধরনের অত্যাচার ঘটেই চলেছে। বিশাল দেশের বিপুল জনসংখ্যা, তাই হাতে গোনা কয়েকটি ঘটনাই প্রচারের আলো পেলে তবেই জানতে পারি। কিন্তু সেই সব ঘটনাও জাতি, ধর্ম, বর্ণের শ্রেণিবিন্যাসে কার্যত আর পাঁচটি সাধারণ ঘটনায় পরিণত হয়। আর আমরা অতীব ভদ্র ও শিক্ষিতরা বলি, “এসব তো ওদের মধ্যে আগেও ঘটত, এখনও আকছাড় ঘটে”। ওরা মানে নিচু জাতের মানুষ। আসলে জাতিভেদ প্রথার আড়ালে আমরাই দলিত নারীর দেহ ভোগ ও খুনের অবাধ ফরমান দিয়ে রেখেছি। এ কথা মানি বা না মানি, বাস্তব হল সামাজিক অনুষ্ঠানে দলিত নারীরা ঠিক যতখানি অস্পৃশ্যতার শিকার, তার থেকেও বেশি উঁচু জাতের পুরুষের লালসার শিকার। যদিও আমরা ধর্ষনের ঘটনার প্রতিবাদে মোমবাতি মিছিল করি। যে প্রতিবাদ মোমবাতির মতোই নরম, ঠান্ডা এবং কম্পমান।
প্রসঙ্গত, মনুবাদের সময় থেকে দলিত নারীরা সামাজিক বিধান অনুযায়ী ধর্ষণের শিকার। দক্ষিণ ভারতের মন্দিরগুলোতে দেবদাসী, নাবালিকারা পুরোহিতের সেবায়, পাঞ্জাব সহ কিছু রাজ্যে আবার যোগিনী করে রাখার প্রচলন আছে। চিত্রকূটে বেআইনি খাদানে কাজ করা নাবালিকারা পাওনা টাকা পাওয়ার জন্য কন্ট্রাক্টরের কাছে দেহ বিক্রি করতে বাধ্য হয়। অর্থাৎ, প্রাচীন কাল থেকে আধুনিক যুগেও সেই ভয়ানক সামাজিক রীতি রয়েই গিয়েছে। কিন্তু আমাদের কি এসব ঘটনা বিচলিত করেনা, যতটা উচ্চবিত্ত বা মধ্যবিত্ত পরিবারের নারীর ওপর অত্যাচারের ঘটনা করে। তাই তুতিকোরিনের কালিভিলা গ্রামে আট বছরের দলিত মেয়ে উঁচু জাতের বাড়ি টিভি দেখতে গিয়ে ধর্ষিত হয়। শানবাগের দলিত সেবিকা, উন্নাও-এর দলিতের স্ত্রী, কিংবা মালদহের চোপড়ায় মাম্পি সরেন…। আমাদের দেশের কয়েকটি পর্ন সাইটে ‘দলিত মেইড’ পর্নের ট্রেন্ডও চলে। আসলে দলিত অস্পৃশ্য হলেও নারীমাংসের জাত হয় না।
সময়োপযোগী লেখা, আমাদের অনেক লজ্জার মাঝে এটাই হয়তো সব থেকে বেশি লজ্জার