অবশেষে উত্তরকাশীর সিল্কইয়ারা টানেলে আটকে পড়া ৪১ জন শ্রমিক আলোর মুখ দেখলেন। টানেল থেকে ১৭ দিন পর তাদের উদ্ধার করার পর উত্তরাখণ্ডের মুখ্যমন্ত্রী পুস্কর সিং ধামি তাঁদের মালা পরিয়ে বরণ করে বুকে জড়িয়ে ধরেন। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী তো আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়েন। প্রসঙ্গত, এই সিল্কইয়ারা টানেল কেন্দ্রীয় সরকারের চার ধাম প্রকল্পের যা নাকি তৈরি হচ্ছে উত্তরাখণ্ডের বদ্রিনাথ-কেদারনাথ-গঙ্গোত্রি এবং যমুনোত্রিতে যাতায়াতের পথ আরও সুগম করার জন্য। এই টানেল প্রায় ২০ কিমি পথ সাড়ে ৪ কিমি নিয়ে আসবে। মোদি সরকার এই প্রকল্প নিয়ে যতই পর্যটকদের স্বার্থের কথা বলুক, অতীতের অভিজ্ঞতা কিন্তু প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের আশঙ্কাকেই সামনে আনছে।
পরিবেশ বিজ্ঞানী এবং বিশেষজ্ঞরাও গোড়া থেকে বলছেন, এখানে রাস্তা তৈরি হলে ও যান চলাচল করলে পরিবেশ মারাত্মক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কারণ, পাহাড় কেটে রাস্তা তৈরি হলে তাতে প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হয়। যা ভবিষ্যতে বড়সড় বিপর্যয় ডেকে আনে। গত জানুয়ারিতে যেমনটা ঘটেছিল উত্তরাখণ্ডের যোশিমঠে। ওই ছোট্ট জনপদে পাহাড় হুড়মুড়িয়ে ভেঙে নেমে এসেছিল রাস্তার উপর। মাটির নীচে চাপা পড়েছিল অসংখ্য বাড়ি, মন্দির। এই পাহাড়ি রাজ্যের আর এক আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্র বদ্রীনাথও ভূমিধসের কবলে পড়েছে বারবার। কেবল তাই নয়, কখনও সিকিমে, কখনও দার্জিলিং এবং অন্যত্র বিপর্যয় ঘটেই চলেছে। অথচ মোদি সরকার অতীত থেকে শিক্ষা না নিয়ে যুক্তি খাড়া করে বলছে, প্রাকৃতিক ভারসাম্যের দিকে নজর রেখেই কাজ হচ্ছে। আসলে হিন্দুত্বের ধ্বজাধারীদের লক্ষ্য পর্যটন নয়, ভক্তসমাগম বৃদ্ধি করে ভক্তিকে পুঁজি করা।
ভূমিধসের কবলে পড়া যে জোশিমঠ অঞ্চলকে সরকার ‘নো কনস্ট্রাকশন জোন’ চিহ্নিত করেছে সেই রাজ্যেরই উত্তরকাশীতে কিভাবে সড়ক–সুড়ঙ্গ নির্মাণ যজ্ঞ চলে? আসলে কেন্দ্রের সরকার দেশের উন্নয়নের সঙ্গে পরিবেশের সম্পর্ককে গুরুত্ব না দিয়ে ধর্মীয় রাজনীতির সম্পর্ককে প্রাসঙ্গিক করে তোলে। তাই দেশের দূষণ নিয়ন্ত্রণ ভাবনাকে ‘দূর হটো’ করে অযোধ্যায় সরযূ নদীর পারে কিংবা কলকাতায় হুগলী নদীর ধারে দীপ দীপাবলি উদযাপিত হয়। মানুষের অন্ন বস্ত্রের থেকেও জরুরি হয়ে ওঠে অযোধ্যায় রামমন্দির কিংবা দিঘার সমুদ্রতটে জগন্নাথের মন্দির। একই ভাবে দেশের সড়ক যোগাযোগের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার পায় তীর্থযাত্রার পথ। হিন্দুত্ববাদী গেরুয়া শাসক ভোট জয়ের রাস্তা প্রশস্ত করতে হিমালয়কে কেটে-ভেঙে, জঙ্গল ছেঁটে কখনও ‘চার ধাম যাত্রার’ সড়ক, কখনও অমরনাথ যাত্রার জন্য চার লেনের তীর্থ পথ গড়তে মরীয়া। অন্যদিকে পাহাড়ময় লাগামহীন নির্মাণ আর নগরায়নের ফলে কখনও হিমবাহ ফেটে, কখনও হড়পা বানে কিংবা ভূমিধসে মরছে হাজার হাজার মানুষ।
গত কয়েক বছরের মধ্যে উত্তরাখণ্ডে তীর্থযাত্রী এবং পর্যটকদের সংখ্যা ছুঁয়েছে ১০ কোটি। পাহাড়ে এই ভাবে বাড়তে থাকা জনবিস্ফোরণের প্রেক্ষিতে দেশের সর্বোচ্চ আদালত পাহাড়ে কোনো নির্মাণ অনুমোদনের আগে যেন সেখানকার ধারণ ক্ষমতা নির্ধারণ করা হয় বলে সরকারকে নির্দেশ দিয়েছে। কিন্তু সরকার সে নির্দেশকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়েছে। পাহাড়ে নির্মাণের সঙ্গে ওতোপ্রতো ভাবে জড়িয়ে থাকে পাহাড়ের ঢালের স্থায়িত্ব। সেই ঢালের স্থায়িত্ব আবার নির্ভর করে পাহাড়ের পাথর-মাটির শক্তি এবং তার ভারবহন ক্ষমতার ওপর। সেই ভারবহন ক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত পাহাড়ে গাছপালার সংখ্যা কত। মোদীর সাধের ধাম যাত্রা প্রকল্পে কাটা পড়েছে ৫৬ হাজার গাছ, নষ্ট হয়েছে ৬৯০ হেক্টর বনাঞ্চল। পাহাড়ে ভূমিধস আটকায় গাছের শেকড়; আলগা মাটিকে বেঁধে রেখে। যখনই সড়ক-সেতু–হোটেল–বাড়ি নির্মাণের জন্য সবুজ সাফ হয় তখন আলগা মাটি–নরম পাথরের পাহাড়ে ঘর-বাড়ি-হোটেলের স্থায়িত্ব এবং অস্তিত্ব অনিশ্চিত হয়ে পড়ে এবং বিপর্যয় নেমে আসতে পারে যে কোনো সময়ে। তাছাড়া পাহাড়ে প্রচুর পরিমাণে ঘর-বাড়ি-হোটেল তৈরির একটা প্রভাব পড়ে মাটির নিচে জলপ্রবাহের গতিপথের ওপরও। বাড়তি চাপে জলপ্রবাহের পথ রুদ্ধ হতে হতে জলের বাড়তি চাপে এবং অতি বৃষ্টিতে মাটির ভারবহন ক্ষমতা কমে ভূমিধস ঘটে।
টানেল মাটির নীচে কিংবা পাহাড়ের ওপর যেখানেই হোক, সেখানকার পাথর–মাটির ভূতাত্ত্বিক এবং ভূ-প্রাযুক্তিক আদ্যোপান্ত জানা-বোঝা দরকার। নির্মাণকারী সংস্থা কিংবা প্রকল্প রিপোর্ট সে বিষয়ে কতটা গুরুত্ব দিয়েছিল জানা নেই। তবে পরিবেশবিদ ও বিশেষঙ্গরা আগেই বিপদ দেখেছিলেন। জানা যাচ্ছে, এই টানেল তৈরি করতে টানেল বোরিং মেশিনের পরিবর্তে পাহাড় ফাটাতে বিস্ফোরক ব্যবহৃত হয়েছে। এতে আলগা-ভঙ্গুর পাহাড় কাটার ফলে আশপাশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে পাথর-মাটির অবস্থান বিঘ্নিত হয়। এতে পাথর-মাটির ভারসাম্য নষ্ট হয়ে পাহাড়ের ধস নামতে পারে। ১২ নভেম্বরের আগেও ২০১৯ সালে এই টানেল তৈরির সময় ধস নেমেছিল। যদিও তখন কোনো শ্রমিকদের মৃত্যুফাঁদে আটকে পড়তে হয়নি। এ যাত্রায় ৪১ শ্রমিক প্রাণে বেঁচে গেলেও ধসের ঝুঁকি কাঁধে নিয়েই কিন্তু বিপজ্জনক চার ধাম প্রকল্প চলছে। তাছাড়া নির্মাণ শেষ হয়ে গেল বা টানেল চালু হল মানেই ধসের ঝুঁকি আর নেই তা কিন্তু একেবারেই নয়, বরং টানেলের রাস্তা দিয়ে যখন ভারী এবং অনেক সংখ্যক যান চলাচল করবে তখন ঝুঁকি আরও বাড়বে।