এখনও স্পিন বোলডাক-চমন বর্ডার ক্রসিং থেকে চিত্র সাংবাদিক দানিশ সিদ্দিকির রক্তের দাগ শুকোয় নি। গত ১৬ জুলাই তালেবানরা তাঁকে এলাকা দখল করতে গিয়ে হত্যা করে। তিনি আফগান স্পেশাল ফোর্সের সঙ্গে এমবেডেড জার্নালিস্ট হিসেবে দক্ষিণ আফগানিস্তানের কান্দাহারে গিয়েছিলেন। সেখানে তিনি রয়টার্সের জন্য কাজ করছিলেন। সীমান্তের দখলদারি নিয়ে আফগান বিশেষ বাহিনী এবং তালেবানদের লড়াইয়ে প্রাণ হারান দানিশ।
দানিশ সিদ্দিকিকে হত্যা করে আফগানিস্তানে একটি কট্টোরপন্থী গোষ্ঠী। সেই খবরে আনন্দ প্রকাশ করে আমাদের দেশের আরেক কট্টরপন্থী গোষ্ঠী। সোশ্যাল মিডিয়ায় সেই আনন্দের প্রকাশ দেখেছেন অনেকেই। কারণ, দানিশ সিদ্দিকি নাম শুনলেই বোঝা যায় তিনি মুসলমান। দিল্লি সীমান্তে কৃষকরা যে আন্দোলন চালাচ্ছেন, দিল্লিতে যে ভয়াবহ দাঙ্গা হল, করোনায় দিল্লির যে বেহাল দশা হয়েছিল তা এক এক করে ফুটে উঠেছিল দানিশের ক্যামেরায়। তাই দানিশের হত্যায় আনন্দ প্রকাশ করেছিল আমাদের দেশের হিন্দু মৌলবাদীরা। দেশের প্রধানমন্ত্রী কি ওই চিত্র সাংবাদিকের মৃত্যুতে দুঃখ প্রকাশ করেছিলেন? তিনি কেন চুপ সেই প্রশ্ন তুলেছিলেন এক বিরোধী সাংসদ।
স্পিন বোলডাক-চমন বর্ডার ক্রসিং পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সীমান্ত এলাকা। এই সীমান্ত দখল মানে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের তালেবানদের যোগাযোগ, আসা-যাওয়ার পথ আরও সুগম হওয়া। প্রসঙ্গত; আফগান জনসংখ্যার প্রায় ৪২ শতাংশই পশতুন, এদের একটা বিরাট অংশ গিয়ে ভিড়েছে তালেবান গোষ্ঠীতে। আর তারাই সেখানে সবচেয়ে বড় জাতিগোষ্ঠী। সংখ্যায় প্রায় ১ কোটি ৫৩ লাখ। অন্যদিকে পাকিস্তানে তার চেয়ে অনেক বেশি পশতুন, প্রায় চার কোটি ৩৫ লাখ, যা পুরো আফগান জনসংখ্যার থেকেও বেশি।

সে যাই হোক, তালেবানদের উত্থানে সারা দুনিয়া যেমন উদ্বিগ্ন পাশাপাশি আমাদের দেশের কেন্দ্রীয় সরকার যারা হিন্দু মৌলবাদী বলেই সমধিক পরিচিত তারাও পড়েছে বিরাট চাপে। প্রথমত দক্ষিণ এশিয়ার প্রায় কোনও প্রতিবেশী দেশই আজ আর তার সঙ্গে নেই। বলা বাহুল্য আফগানিস্তানও আর ভারতের সঙ্গে থাকবে না। বিশেষ করে যখন সেখান থেকে ন্যাটো জোটের সব সেনা বিদায় নেবে। অবশ্য ইতিমধ্যে তালেবানরা দেশের সবটাই দখলে নিয়েছে, সরকারি বাহিনী মোটামুটি পর্যুদস্ত। দিল্লির কাবুল-নীতি যে একেবারেই ধোপে টিকল না তা বলাই যায়। বিজেপি সরকারের চাপ বাড়ছিল আগের বছর তালেবান-আমেরিকা-পাকিস্তান বৈঠক শুরু হওয়া থেকে।
উল্লেখ্য, ২০০১-এ আফগান যুদ্ধের পর পাকিস্তান কাবুল সরকারের কাছে হয়ে যায় আফগানিস্তানের শত্রু আর ভারত হয় বন্ধু রাষ্ট্র। কাবুল সরকারের সহায়তা পেয়ে ভারত সেখানে ব্যবসা-বাণিজ্য জমিয়ে তোলে। ফলে সেখানে একটা পাকিস্তানবিরোধী পরিবেশ তৈরি হয়। এই অবস্থাটা পরবর্তী এক যুগ পর্যন্ত ছিল। দুই প্রতিবেশী পাকিস্তান-আফগানিস্তান নানা ঝগড়া-বিবাদ, নরম-গরম সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে। কাবুল সরকার পাকিস্তান নির্ভরতা কাটিয়ে উঠতে ভারতের দিকে ঝুঁকে পড়ে। কিন্তু এই ঝুঁকে পড়লেও আফগানিস্তানের অর্থনৈতিক অবস্থা যেমন কিছুমাত্র পাল্টায় না আসে না রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা।
তালেবানদের সঙ্গে পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই’র যোগাযোগ কিন্তু বরাবরই ছিল। পাকিস্তানে তালেবানদের যাতায়াতও ছিল। ক্ষমতা হারিয়েও বছরের পর বছর মোল্লা ওমরের তালেবান সরকার দেশের একটা বিস্তৃত এলাকা দখলে রেখেছিল আর ২০ বছর ধরে চলছিল যুদ্ধ। তালেবানরা লড়াই করে আমেরিকার নেতৃত্বাধীন ন্যাটো বাহিনী এবং সরকারি বাহিনী—দুটির সঙ্গেই। শেষপর্যন্ত আমেরিকা কাতারের রাজধানী দোহায় তালেবানদের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর করে। যে হারে আমেরিকা তালেবানদের কাছে সৈন্য হারাচ্ছিল, তাতে আফগানিস্তান ত্যাগ করা ছাড়া তাদের উপায় ছিল না।
শান্তিচুক্তি স্থাপনে চীনেরও ভূমিকা রয়েছে। চীন কাবুল সরকার, তালেবান আর পাকিস্তানকে এক মঞ্চে আনতে কাজ করেছিল। পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে আফগানিস্তানের যুদ্ধ শেষ করতে সাহায্য করার জন্য ইসলামাবাদে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল চীন। সেখানে কীভাবে তালেবান এবং আফগান সরকার একটা সমঝোতায় পৌঁছতে পারে তার রূপরেখা নিয়ে তালেবানদের রাজনৈতিক শাখার প্রতিনিধি দলের সঙ্গে পাকিস্তান সরকারের বৈঠক হয়। আর চীন-পাকিস্তানের এই উপস্থিতি ভারতকে আরও চাপে ফেলে দেয়।

আফগানিস্তান এমন একটি দেশ, যাকে সবাই কব্জা করতে গিয়েছে কিন্তু শেষ পর্যন্ত পালিয়ে এসেছে। ১৮৪২ সালে ব্রিটিশ গিয়েছিল আফগানিস্তান দখল করতে, ১৯৮৯ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন গিয়েছিল এবং ২০০১ সালে আমেরিকা গিয়েছিল— সবাইকে ফিরে আসতে হয়েছে। তালেবানরা দুনিয়াকে বুঝিয়ে দিয়েছে যে আফগানিস্তানের উন্নয়ন এবং শান্তি প্রক্রিয়ায় তালেবানদের বাদ দিয়ে সম্ভব নয়। প্রতিবেশী ইরান, চীন, রাশিয়া, সেন্ট্রাল এশিয়া, পাকিস্তানও মনে হয় বুঝেছে যে জাতি গঠনে তালেবানদের ভবিষ্যৎকে এড়িয়ে যাওয়া যাবে না। সেখানে ভারতের কূটনীতি এবং ভূমিকা চূড়ান্তভাবে ব্যর্থ।
অতি সম্প্রতি একটি দৈনিক লেখে, ‘এক মাস আগে প্রকাশ্যে আসে যে তালেবানের সঙ্গে গোপনে ও নিঃশব্দে একটি আলোচনার দরজা খুলেছে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সরকার। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এই পদক্ষেপের সমর্থনে বলা হয়েছিল, পাকিস্তানকে আফগানিস্তান তথা দক্ষিণ-পশ্চিম এশিয়ার সন্ত্রাসমঞ্চ থেকে দূরে রাখতেই এ উদ্যোগ। কিন্তু এখন তালেবানের এই মাত্রাছাড়া সহিংসতার সামনে দাঁড়িয়ে কিছুটা কিংকর্তব্যবিমূঢ় দেখাচ্ছে নয়া দিল্লিকে। ভারতীয় ফটোসাংবাদিক দানিশ সিদ্দিকি কান্দাহারে সংঘর্ষে নিহত হওয়ায় এখন আরও চাপে সাউথ ব্লক।’
আসলে তালেবান নিয়ে ভারতের উদ্বেগ তো কাশ্মির নিয়ে। কাশ্মীরে চূড়ান্তভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘন, গণহত্যা, সন্ত্রাসবাদী নির্যাতন চালিয়েও ভারত ক্ষান্ত হয়নি; নরেন্দ্র মোদি কাশ্মীরের স্বায়ত্তশাসনও কেড়ে নিয়েছে। এমনকি কাশ্মীরকে রাজ্যের মর্যাদা থেকেও বঞ্চিত করেছে। কাশ্মীর বা কাশ্মীরী মানেই সন্ত্রাসবাদী- এই ছবিটাই উঠে এসেছে ভারতীয় মন-মানসিকতায়। কিন্তু এখন ভারত এখন ভয় পাচ্ছে যে কাশ্মীর নিয়ে পাকিস্তানি তালেবানদের সঙ্গে মিশে আফগান তালেবানরাও হয়ত আগের চেয়ে বেশি নাক গলাবে। তাতে সীমান্তে নিরাপত্তা আরও বিঘ্নিত হবে।
আমেরিকা কি আর ভারতের এই সমস্যা নিয়ে মাথা ঘামাতে রাজি হবে? রাশিয়া তো ভারতকে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, তালেবান তাদের আশ্বস্ত করেছে সন্ত্রাস তাদের দেশের বাইরে গড়াবে না। তাই এ নিয়ে অহেতুক মাথা ঘামাতে চায় না মস্কো। আফগান-পাকিস্তান নীতির ক্ষেত্রে ব্রিটেনের সমর্থন রয়েছে পুরোপুরি ইসলামাবাদের দিকেই, এটাও ভারতের পক্ষে খুবই চাপের।
Very nice and important writing.
খুব গোছানো লেখা। হ্যা, এভাবে পড়া যেতে পারেই, এবং বিশেষ ভুল নয় এই পর্যবেক্ষন।