৮ থেকে ১০ হাজার বছর আগের কথা। গ্রিসে পাহাড়ের ওপর গুহার ভিতর থাকত কিছু মানুষ। রান্নাবান্না কিছুই জানত না। জঙ্গলে শিকার করে আর গাছ থেকে ফলমূল খেয়ে ক্ষুধা নিবৃত্ত করত। শিকার করা পশুর চামড়া দিয়েই লজ্জা নিবারণ করত। একদিন এক অদ্ভুত মানুষের সঙ্গে দেখা হলো তাদের। তার পরন, চলন-বলনের সঙ্গে তাদের চালচলন ও পোশাক-পরিচ্ছেদের কোনো মিল নেই। সিদ্ধান্ত নিল ব্যতিক্রমী এই মানুষটাকে মেরে ফেলবে তারা। কিন্তু সেই নতুন মানুষটা এতটাই সুন্দর যে তার প্রতি মায়ায় পড়ে তাকে নিয়ে গুহায় ফিরে এলো বউ-বাচ্চাদের দেখাবে বলে। নতুন মানুষটি তার আচার-আচরণ ও ব্যবহার দিয়ে জাদু করে ফেলল সেই গুহা মানবদের। সেই মানুষটির নাম ছিল সিক্রপ। সিক্রপ গুহা মানবদের বাড়ি বানাতে, তীর-ধনুক দিয়ে শিকার করতে, জাল পেতে পাখি ধরতে শেখাল। একসময় তারা একটি পরিচ্ছন্ন নগরী বানিয়ে ফেলল পাহাড়ি ঢালে। সবাই মিলে তারা রাজা বানাল সেই নতুন মানুষ সিক্রপকে। তখন পর্যন্ত শহরটির কোনো নাম দেওয়া হয়নি।
সেই শহরে একদিন হাজির হলেন বিশুদ্ধ জল ও সাগরের দেবতা নেপচুন আর জ্ঞান ও প্রজ্ঞার দেবি এথেনা। দুজনেরই দাবি— শহরটি তাঁর নামে নামকরণ করতে হবে। নেপচুন বললেন, বিনিময়ে তিনি টাকাপয়সা দেবেন শহরবাসীকে। জ্ঞান ও প্রজ্ঞার দেবি এথেনা শহরবাসীকে বললেন, জ্ঞান ও প্রজ্ঞা দেবেন তিনি। শহরবাসী দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে গেল। রাজা সিক্রপ এথেনা ও নেপচুনকে অনুরোধ করল কোনো একটি উপহার দিতে। যার উপহার বেশি ভালো হবে মানুষ তার নামে শহরের নাম রাখবে। নেপচুন উপহার দিলেন ঘোড়া। বললেন, আমার এ উপহার যুদ্ধ জয় করতে সাহায্য করবে। এথেনা দিলেন সবুজ পাতা, সাদা ফুলওয়ালা একটি অলিভ গাছ। বললেন, এ গাছ সূর্যের কিরণ থেকে বাঁচাবে, এর ফল খিদে মেটাবে, আর এর তেল বিশ্বজয়ী হবে। শহরের মানুষ যুদ্ধ কী জানত না, আর ঘোড়াও তারা আগে কখনো দেখেনি। তাদের কাছে অলিভ গাছ অনেক বেশি আকর্ষণীয় মনে হলো। তারা সেই শহরের নাম রাখল এথেনা। সেই দেবী এথেনার নাম অনুসারেই বর্তমানে গ্রিসের রাজধানীর নাম এথেন্স। তারা তারপর সেই নারীর মন্দির বানাল পাহাড়চূড়ায়। গ্রিক পুরাণে এভাবেই এসেছে অলিভ তেলের কথা। আল কোরআন ও হাদিসেও অলিভ ও অলিভ তেলের কথা বারবার বলা হয়েছে। নবীজি স্বয়ং এ তেল ব্যবহার করতেন ও শরীরে মাখতেন।

মানুষের দৈনন্দিন ব্যবহারে অলিভ তেলই ইতিহাসে প্রথম ব্যবহৃত হয়েছে। এ অলিভ থেকেই অলিভের তেল বানানোর প্রক্রিয়া শুরু হয় প্রায় ৮ হাজার বছর আগে বর্তমান প্যালেস্টাইনে। আস্তে আস্তে তা ছড়িয়ে পড়ে ভূমধ্যসাগরের চারপাশে। সেখানকার দেশগুলোয় যে অলিভ জন্মায় তা থেকে অলিভের তেল তৈরি হয়। অনেকের একটা ভুল ধারণা ভেঙে দিয়ে বলা যায়, জলপাই থেকে কিন্তু অলিভের তেল হয় না।
শুধু অলিভ অয়েল বলে কথা নয়। পৃথিবীর ইতিহাসে প্রাচীনকাল থেকেই পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ভিন্ন ভিন্ন তেল ব্যবহার হয়ে আসছে। যেমন চীন ও জাপানে খ্রিস্টের জন্মের ২ হাজার বছর আগে অর্থাৎ এখন থেকে ৪ হাজার বছর আগে তারা রান্নাবান্না থেকে গৃহস্থালির নানা কাজকর্মে সয়াবিন তেল ব্যবহার করত। ইতিহাসে চীন, জাপানের লোকই বোধকরি সয়াবিন তেলের স্বাদ প্রথম আস্বাদন করেছিল। উত্তর আমেরিকার মেক্সিকোর আদিবাসীরা পিনাট ও সূর্যমুখী ফুলের বিচি থেকে একরকম তেল উৎপন্ন করত।
তবে ভারতবর্ষে রান্নাবান্না থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধর্মীয় আচার, অনুষ্ঠান, যজ্ঞ ও পূজাপার্বণে তেলের ছিল বহুমাত্রিক ব্যবহার। সেই প্রাচীনকাল থেকে মধ্যযুগ কিংবা আধুনিক যুগের আগ পর্যন্ত উচ্চবর্গের আহার-বিহারে ব্যবহৃত হতো ঘি, বাটার, ননী প্রভৃতি উচ্চমূল্যের ভোজ্যপণ্য সামগ্রী। হিন্দুশাস্ত্র যেমন ঋগ্বেদ, রামায়ণ, মহাভারত প্রভৃতি গ্রন্থ পাঠ করলেই অনুধাবন করা যায় ঋষিমুনিদের যে কোনো প্রকারের রসনাবিলাসে ঘি, মাখন, ননী ছাড়া কল্পনাই করা যেত না। আর আমার ধারণা, সমাজের নীচুজাত অর্থাৎ অন্ত্যজ শ্রেণি তিল থেকে তেল উৎপন্ন করে রান্নাবান্নায় ব্যবহার করত। তেল নামটাও যে তিল থেকে এসেছে তা বুঝতে নিশ্চই রকেট সায়েন্টিস্ট হতে হয় না।

তিল ঠিক কবে থেকে রসুইঘরে প্রবেশ করেছিল তা ইতিহাসেরও হিসাবের বাইরে। অন্যান্য শস্যের সঙ্গে, হরপ্পায় একতাল পোড়া-তিলও পাওয়া গেছে। ঋগ্বেদে যদিও তিলের তেলের উল্লেখ নেই, কিন্তু তিল দিয়ে তৈরি খাবারের উল্লেখ রয়েছে।
আলেকজান্ডারের সঙ্গে এ দেশে আসা গ্রিক পণ্ডিত আরিস্তবোলাস লিখেছেন, তিনি ব্রাহ্মণদের মধু আর তিল মিশিয়ে এক রকম লাড্ডু খেতে দেখেছেন। তিল শুধু এ দেশে নয়, সারা বিশ্বেই ভীষণ পরিচিত সেই প্রাচীনকাল থেকে। মেসোপটেমিয়ায় তিলের চাষ হচ্ছে ৪ হাজার বছর ধরে; তুতানখামেনের মমির পাশে পাওয়া তিল প্রমাণ করে সে জমানায়ও তা মানুষের কতটা প্রিয় ছিল! শুধু মুখরোচক বলে নয়, তার পুষ্টিগুণও তিলকে সাধারণ মানুষের কাছাকাছি এনে দিয়েছিল। রোমান যোদ্ধারা শরীরের শক্তি আর উদ্দীপনা ধরে রাখতে তিল খেত।
চীন দেশের সঙ্গে তিলের পরিচয় সেই ৪ হাজার বছর আগে। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, খাবার হিসেবে নয়, সে জমানায় চীনে তিল ব্যবহার হতো কালি তৈরি করতে আর জ্বালানির তেল হিসেবে। খাবার হিসেবে তিল সে দেশে প্রথম ব্যবহৃত হয় হান সাম্রাজ্যের সময়।
তবে দক্ষিণ ভারতের তামিল সাংগাম সাহিত্য থেকে জানা যায় ২ হাজার বছর আগে গৃহস্থালির রান্নাবান্নার কাজে ব্যবহৃত হতো বাটার, ঘি, তিলের তেল ও নারকেল তেল। দক্ষিণ ভারতে যেহেতু নারকেল গাছের ছড়াছড়ি সেহেতু তাদের রসনাবিলাসে নারকেল তেল থাকবে সেটাই বরং স্বাভাবিক।
উল্লেখ্য, ভাসকো দা গামার ভারত জয়ের আগ পর্যন্ত আমাদের হেঁসেলে সরষের তেল প্রবেশ করেনি। বঙ্গদেশ তথা সমগ্র ভারতবর্ষে সরষের তেল মোটামুটিভাবে বলা যায় জনপ্রিয় করে তুলেছিল ইংরেজ ও পর্তুগিজরা।
ভারতে প্রায় ৫ হাজার বছর আগে সেই সিন্ধু সভ্যতার আমল থেকেই সরষে চাষ শুরু হয়। বৈদিক শাস্ত্রে আলাদা করে সাদা সরষেকে রাই বা রাজিকা, আর সাধারণ কালো সরষেকে সিদ্ধার্থ নামে বর্ণনা করা হয়েছে। দুষ্ট আত্মা তাড়াতে সরষে ব্যবহারেরও উল্লেখ আছে। বৌদ্ধশাস্ত্রে অবশ্য সরষে শুধুই রান্নার মশলা। কিন্তু তারপর বহুদিন সরষের কোনো খোঁজখবর পাওয়া যায় না। সরষে এ দেশে আবার ফেরত এলো পর্তুগিজ বণিকদের জাহাজে চেপে।

বাইবেলেও সরষের উল্লেখ আছে। সেকালে ইহুদিরা রান্নায় সরষে ব্যবহার করতেন। ফেরেশতারা দেখা করতে এলে ইবরাহিম (আ.) পরিবেশন করেছিলেন সরষে দিয়ে রান্না করা গোরুর জিভ। যা আজও অনেক দেশেই ‘ডেলিকেসি’। গ্রিকরা রান্না ছাড়াও ডাক্তারিবিদ্যায়ও সরষে ব্যবহার করতেন। গণিতজ্ঞ ও বিজ্ঞানী পাইথাগোরাস সরষেকে কাঁকড়াবিছা কামড়ের অব্যর্থ ওষুধ বলে ঘোষণা করেছিলেন। হিপোক্রেতিস ওষুধ তৈরি আর মচকে যাওয়া হাড়ে পট্টি দিতে সরষে ব্যবহার করতেন। ভেঙে গেলে বা মচকে গেলে কিছুকাল আগেও সরষের এ প্লাস্টার করা হতো। তাই যুদ্ধ ক্ষেত্রেও সরষের বস্তা যেত। আলেকজান্ডার বিশ্বজয়ে বেরিয়ে ৩৩১ খ্রিস্টপূর্বে যখন পারস্যে পৌঁছান, সে দেশের রাজা দারিউস একটা চমৎকার কাজ করেন। নিজের সেনাসংখ্যা কী বিপুল তা বোঝাতে আর আলেকজান্ডারকে সাবধান করতে এক বস্তা তিল উপহার পাঠান। আলেকজান্ডার জবাবটা দেন দুর্দান্ত। তিনি রাজা দারিউসকে এক বস্তা সরষে উপহার দিয়ে বুঝিয়ে দেন তাঁর সেনা অগুনতি তো বটেই, তাদের মেজাজও ঝাঁজালো। ৪২ খ্রিস্টাব্দে লেখা প্লিনির রেসিপি-বইয়ে খাবারে সরষেবাটা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। তবে তখন গ্রিক-রোমানরা রোজের খাবারে সরষে দিত না তার ঝাঁজের জন্য। সে কারণেই সরষে ছিল পালপার্বণের খাবার। গোলমরিচ যেমন এখনো ‘পেপার ক্রাশার’ দিয়ে গুঁড়িয়ে ফরাসি খানার ওপর ছড়িয়ে দেওয়া হয়, সে জমানায় সরষে গুঁড়া করে মদ বা জলের সঙ্গে মিশিয়ে খাওয়াও ছিল এক রেওয়াজ।
তবে বিদেশিদের হাত ধরে সরষের তেল এ দেশে এলেও খুব দ্রুতই তা ভারতবর্ষে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। যার নজির আমরা দেখি ‘মনসামঙ্গল’ কাব্যে। মনসামঙ্গল কাব্যের কাহিনিতে আমরা বাংলার প্রায় ৫০০ বছরের বৃহত্তর জীবনচিত্র পেয়ে থাকি। এ জীবন বৃহত্তর মানবের জীবন। মনসামঙ্গল কাব্যকে তাই ‘জনসাহিত্য’ বলা চলে। এ সাহিত্যে সাধারণ মানুষের জীবনবৃত্তায়ন অতিসুন্দরভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।
১৫০০ সালের শেষ দিককার বরিশালে জন্ম নেওয়া বাঙালি কবি বিজয় গুপ্ত লিখেছেন, ‘তেতইলের কাষ্ঠে অগ্নি করে ধুক ধুক/নারিকেল খাড় দুগ্ধে রান্ধে মুগ সুগ/শাক শুকুতা রান্ধে কলইর ভাঙ্গে বড়া/কটু তৈল দিয়া ভাজে তাল বাইগণ পোড়া।’ এ ‘কটু তৈল’ই সরষের তেল।

এখানে একটি বিষয় জানিয়ে রাখা ভালো, সেই প্রাচীনকাল থেকেই রান্নার কাজে ব্যবহৃত এই যে অলিভ অয়েল, তিলের তেল, সরিষার তেল, ঘি প্রভৃতির পাশাপাশি ভাজিভুজি ও ব্যঞ্জন রান্নায় একটি বড় অংশে ব্যবহৃত হতো অ্যানিমল ফ্যাট অর্থাৎ পশুচর্বি। সে চর্বি সংগ্রহ করা হতো গরু, ছাগল, ভেড়া কিংবা শূকরের মাংস থেকে। ১৯৮২-৮৩ সালের দিককার কথা। যদিও আমরা ঢাকায় থাকতাম কিন্তু প্রতি কোরবানি ঈদে দলবেঁধে গ্রামে যাওয়া হতো। সে সময় আমি নিজ চোখে দেখেছি গ্রামের মা-চাচিরা কীভাবে কোরবানির মাংস থেকে হলুদ রঙের একরকম চর্বি সংগ্রহ করে কাচের বৈয়ামে তুলে রাখতেন। হরিদ্রাভ সে চর্বি দিয়ে সকালে গরম গরম পরোটা ভাজা হতো। অপূর্ব সুস্বাদু ছিল গবাদি পশুর চর্বিতে ভাজা গরম গরম সে পরোটা। সেসব চর্বি যে শুধু রান্নার কাজেই ব্যবহৃত হতো তা নয়, পশ্চিমা বিশেষ ১৯০০ সালের শুরুতে ভেজিট্যাবল অয়েল আবিষ্কারের আগ পর্যন্ত সাবান-সহ বহুবিধ প্রসাধনসামগ্রীতে ব্যবহৃত হতো এসব পশুর চর্বি। বিশেষ করে ইউরোপ ও আমেরিকায় শূকরের চর্বি বেশি ব্যবহৃত হতো। ১৯০০ সালের শুরুর দিকে প্রক্টর ও ক্যাম্বেল নামক দুজন ব্যবসায়ী প্রথম বাণিজ্যিকভাবে ভেজিট্যাবল অয়েল উৎপাদন শুরু করেন। প্রথম দিকে অবশ্য এই ভেজিট্যাবল অয়েল যে দৈনন্দিন রান্নাবান্নার কাজে ব্যবহৃত হতে পারে তা তাদের মাথায়ই বোধকরি আসেনি। গবাদি পশুর চর্বি যেহেতু ব্যয়বহুল সেহেতু সাবান ও প্রসাধনসামগ্রীগুলোয় ব্যবহারের জন্য সে সময় অনেকেই তেল চর্বির বিকল্প সস্তাজাতীয় দ্রব্য আবিষ্কারের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। অবশেষে সফল হলেন প্রক্টর ও ক্যাম্বেল। ১৯৪০ সালের দিকে তাঁদের মাথায় এলো এ জিনিস তো রান্নায়ও ব্যবহার সম্ভব। তখন থেকে ‘প্রক্টর অ্যান্ড ক্যাম্বেল’ ও ‘ক্রিসকো’ নামক দুটো প্রতিষ্ঠান বাণিজ্যিকভাবে সয়াবিন তেল উৎপাদন শুরু করে। কিন্তু আধুনিক সমাজেও দেখা যায় নতুন একটি ভোজ্য কিংবা দ্রব্য এলে তরুণ-তরুণীরা সেগুলো সহজে গ্রহণ করলেও বয়স্ক মানুষ সহজে গ্রহণ করতে চান না। উপরন্তু ভোজ্যপণ্য মানুষের কাছে আরও অধিকতর স্পর্শকাতর। এ প্রসঙ্গে আমার বাষ্প ইঞ্জিন আবিষ্কারক জেমস ওয়াটের কথা মনে পড়ে গেল। ১৭৭৬ সালে তাঁর এ ইঞ্জিন তিনি ব্যবসার জন্য বাজারে নিয়ে আসেন। কিন্তু কেউ তাঁর ইঞ্জিন কেনে না। ব্যবসায় লালবাতি। সমস্ত পুঁজিপাট্টা শেষ। একদিন তিনি ম্যথু বলটন নামক বার্মিংহামের এক ব্যবসায়ীর সঙ্গে দেখা করে তাঁর সাহায্য প্রার্থনা করলেন। ম্যথু তাঁকে বললেন, এ ব্যবসায় যদি তাঁকে পার্টনার করা হয় তবেই তিনি তাঁকে সাহায্য করবেন। জেমস ওয়াট তো অবাক! জেনেশুনে এমন লস প্রজেক্টে কেউ অংশীদার হতে চায়? বলটন মৃদু হেসে উত্তর দিলেন, ব্যবসার মারপ্যাঁচ তাঁর নাকি ভালোই জানা আছে। অবশেষে অংশীদার করা হলো বলটনকে। বলটন বললেন, যেহেতু বেশির ভাগ মানুষই ইঞ্জিনের চেয়ে ঘোড়াটানা গাড়ির ওপর নির্ভরশীলতা দেখাচ্ছে। তাহলে আমরাও এ ইঞ্জিন বাজারজাত করার সময় ইঞ্জিনের ওপর লিখে দেব ‘দশ হর্স পাওয়ার’ কিংবা ‘বিশ হর্স পাওয়ার’। তাতে মানুষের আন্দাজ হবে এ ইঞ্জিনের ক্ষমতা আসলে কতটুকু। ব্যবসায়িক বুদ্ধি বলে কথা। হুহু করে বিক্রি হতে লাগল তাঁদের বাজারজাত করা সব ইঞ্জিন। এখন পর্যন্তও বাজারে যে কোনো মোটর কিংবা ইঞ্জিন হর্স পাওয়ার হিসেবেই বিক্রি হয়।
সে যাই হোক, ১৯৪০ সালের দিকে সয়াবিন তেল বাজারে এলেও আমেরিকানরা তা গ্রহণ করছিল না। কিন্তু হঠাৎ করেই একটি বড় ধরনের হার্ট অ্যাটাক হলো তৎকালীন আমেরিকার রাষ্ট্রপতি আইজেন হাওয়ারের। অভিজ্ঞ ডাক্তাররা মত দিলেন অতিরিক্ত পরিমাণ বাটার ঘি খাওয়ার জন্যই এ হার্ট অ্যাটাক। আর যায় কোথায়! প্রক্টর অ্যান্ড ক্যাম্বেল ও ক্রিসকো এঁরা সব একযোগে বলতে শুরু করলেন, ‘আমাদের তৈরি ভেজিট্যাবল অয়েলে হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি নেই যা বাটার ও ঘিতে বিদ্যমান।’ তাঁদের সঙ্গে সুর মেলালেন আমেরিকার বড় বড় সব চিকিৎসক। আর অমনি তরতর করে বিক্রি হতে লাগল ভেজিট্যাবল অয়েল।

বাংলাদেশে সয়াবিন চাষ শুরু হয় ১৯৭৪ সালের দিকে প্রধানত নোয়াখালী ও ফেনী জেলায়। কিন্তু এ তেল জনপ্রিয় হতে আরও এক দশক লেগে যায়। ১৯৮৪ কিংবা ’৮৫ সালের দিকে আমার বয়স তখন সাত কি আট বছর। আমার স্পষ্ট মনে আছে, সে সময়ও আমাদের রসুইঘরে ভোজ্য তেল হিসেবে ব্যবহার হতো সরিষার তেল। বাবা নিজে টঙ্গী বাজারে গিয়ে সরষে ভাঙানোর মিল থেকে নিজ হাতে মাসকাবারির খাঁটি সরষের তেল কিনে আনতেন। ’৯০ সালের দিকে ধীরে ধীরে সয়াবিন তেল জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। এই যে তেলের দাম এবার এত বৃদ্ধি পেল এর পেছনে কারণ কী? স্বয়ং সিপিডি সংবাদ সম্মেলন করে বলেছে, আন্তর্জাতিক বাজারের চেয়ে বাংলাদেশে তেলের দাম বেশি। পত্রপত্রিকাগুলোও ফলাও করে প্রচার করছে তেলের উচ্চমূল্যের পেছনে আছে একটি সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট। আমার অভিমতও তাই। এ সিন্ডিকেটই প্রতি বছর কোনো না কোনো পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেয়। সে হোক পিঁয়াজ, রসুন কিংবা তেল।
লেখক : প্রাবন্ধিক বাংলাদেশ সুপ্রীমকোর্টের ব্যারিস্টার