এ বছর পুজোর ছুটির প্রথম গন্তব্য ছিল— কালিজ ভ্যালি, রংবুল।
একটুকরো সবুজের স্বর্গে ক্ষণিকের স্বস্তির নিঃশ্বাস। দার্জিলিং থেকে হাত বাড়ালেই কালিজ ভ্যালি। এখনও ভার্জিন। লোকের আনাগোনা খুবই কম। কালিজ ভ্যালি ছাড়াও টুরিস্টদের মুখে মুখে শোনা যায় রেনবো ভ্যালি। অনেকে তাই রেনবো ভ্যালিও বলে থাকে। এই কালিজ ভ্যালিকে ঘিরে রয়েছে তিন তিনটে নদী। উত্তরে কালিজ খোলা, পশ্চিমে হি খোলা, দক্ষিণে রঙ্গিত। মধ্যিখানে রয়েছে কাঞ্চনজঙ্ঘা। কালিজ কথাটির আক্ষরিক অর্থ সে ভাবে জানা যায় না। তবে স্থানীয়দের মাধ্যমে যে টুকু জানা গেল তা হলো কালিজ এক ধণের পাখির প্রজাতি। এখানে প্রচুর নাম না জানা রংবেরংয়ের পাখিও রয়েছে। পক্ষি প্রেমিকদের কাছে এই উপত্যকা খুবই লোভনীয়।

ফ্লাইট ধরে সোজা বাগডোগরা পৌঁছে বেশ নিশ্চিন্ত হলাম… আলো ঝলমলে আকাশ দেখে। নীলাকাশে শরতের আহ্বান! আমাদের যাত্রা শুরু… দার্জিলিং যাওয়ার পথ ধরে। ঘুম এর কাছে এসে রাস্তাটা বেঁকে গেলো, রঙ্গবুলে এসে। ড্রাইভার ভদ্রলোক বলে দিয়েছিলেন যে, সামনের ৩-৪ কিমি পথ বোল্ডার বিছানো, বেশ এবড়োখেবড়ো। কিন্তু বড় গাড়ি হওয়ায় পথের কষ্ট তেমন অনুভব হয় নি, চারপাশের পাহাড়ি শান্ত গ্রাম দেখে, রঙ বেরঙের ফুলের সমারোহে চোখ জুড়িয়ে গেল। পথের বাঁকের নিস্তব্ধতা উপভোগ করে আমরা দুপুরে পৌঁছে গেলাম আমাদের থাকার জায়গায়… রেন বো ভ্যালি রিসোর্টে। কালিজ ভ্যালি নামে চা বাগানের মাঝে সাজানো এই রিসোর্ট। চারপাশে অন্য কিছু নেই… করোনা কালে এমন নির্জনতায় সময়যাপন, সেটা বড় উপভোগ্য। যাই হোক, দুপুরে ঘরোয়া খাওয়াতে পেট ভরিয়ে আসেপাশে ঘুরে দেখলাম। তারপর সন্ধ্যা নামলো ঝুপ করে, কি নিস্তব্ধতা চারপাশে। মনে হলো… গভীর রাত হয়ে গেছে বুঝি! ব্যালকনিতে বসে দূরের পাহাড় দেখা, চা বাগানের বাতাস গায়ে মাখা আর নানারকম পোকামাকড়ের আওয়াজ… বেশ কাটলো রাতটা।

পরের দিন সকালে ব্রেকফাস্ট করেই স্থানীয় একজনকে গাইড হিসেবে নিয়ে রওনা দিলাম রেনবো ফলস্ দেখতে, বেশ অনেকটা হাইকিং করে যেতে হবে। পথে যেতে যেতে ঐ ভদ্রলোকের কাছে শুনলাম… এই পথ এখনো টুরিস্টদের কাছে অজানা অচেনা। সেই অনেককাল আগে ঝর্ণায় পৌঁছানোর দীর্ঘ ২ কিমি মত পথ রেলিং দিয়ে সাজানো হয়েছিল। তারপর অযত্নে অবহেলায় দেখভাল হয়নি। তাই পথ জুড়ে যে সিঁড়ি, তা শ্যাওলা ধরা, কিছু জায়গায় রেলিং ভাঙা, বসার জায়গার ছাউনিগুলো সব ভগ্নপ্রায়। যাওয়ার পথে অনেকটা নীচে নেমে যেতে হয়, একসময় মনে হল যে… আর কতদূর, পথ যে আর শেষ হয় না! পথের বাঁকে সিঁড়িগুলো সব মরা গাছের ডালপালাতে ভর্তি। একসময় বুঝতে না পেরে পা পিছলে আমার সিঁড়িতে পড়ে কোমরে চোটও লাগে। কিন্তু নতুনকে দেখার হাতছানি অগ্রাহ্য করা যায় না… তাই কিছু পরেই যখন গন্তব্যে পৌঁছালাম, তখন মনে হলো সব কষ্ট একবারে কমে গেল। আমাদের বিশ্বাস হয় নি আগে রিসোর্টের লোকেদের কথা… কিন্তু সত্যি তেমনই। এই দৃশ্য ছবি তুলে বা লিখে বোঝানো যায় না!

এক প্রাকৃতিক অঝোর ধারা ঝরে পড়ছে, সে ঝর্ণার জলের মাঝে রামধনু তার সাতরঙা বাহার নিয়ে আমাদের মুগ্ধ করছে। সোজাসুজি সূর্যের আলো ঝর্ণার জলে প্রতিফলিত হয়ে জলকণার মধ্যে এমন রামধনুর সৃষ্টি করছে। চারপাশে প্রকৃতি নিজেকে সাজিয়ে রেখেছে দুহাত ভরে, আর তারমাঝে এমন করে রঙের খেলা। বেশ কিছু ক্ষণ কাটালাম ওখানে। আমরা ছাড়া আর ৩-৪ জনের একটি দল ছিল, ফলে এত ফাঁকায় এমন ঈশ্বরের রূপ দর্শন, তাও তো একরকম পুজোর মতই!
যাই হোক এবার ফেরার পালা… আমার ৮ বছরের মেয়ে গাইড দাদার সাথে দিব্যি ঐ খাড়াই পথ উঠে যেতে লাগলো। কিন্তু বাধ সাধলো আমার শরীর। একে তো পড়ে গিয়ে কোমরে ব্যথা, তার উপরে এতটা সিঁড়ি উপরে ওঠা। প্রতি ১০ টা ধাপ উঠেই বসে পড়া, একসময় শুয়েও পড়েছি, সাথে বুকে হাঁফ ধরা। এমন করে কোন মতে, উপরে ওঠা গেল। কিন্তু যা দেখলাম— তা চিরকাল মনের কোণে থেকে যাবে। তবে বর্ষার পর পর এলে এই পথে প্রচুর জোঁকের আক্রমণ থাকে শুনলাম, সাথে তাই লবণ নিয়ে যেতে হয়। আমরাও রেখেছিলাম, আর রিসোর্টের মালিক বলেছিলেন জুতোতে স্যানিটাইজার স্প্রে করতে, তাতেও জোঁকের হাত থেকে কিছুটা রেহাই মেলে। হাঁটতে হাঁটতে অবশেষে রিসোর্টে এসে, সুইমিং পুলের সামনে বসে পা ডুবিয়ে আরাম হলো অনেকটা। দিনের বেলা ঠান্ডা তো দুরস্ত, রীতিমতো গরম অনুভূতি।

দুপুরে খাওয়ার পরে রিসোর্টের ভিতর দিয়েই চা বাগান ঘুরে দেখলাম। শুধু ঘুরে দেখাই নয়, সেখানে একজন কর্মীর সাথে হাতে হাত মিলিয়ে চা পাতা তোলা, চা বাগানের ছায়াতে শুয়ে পড়া, চা পাতা শুকাতে দেওয়া… সব করা হলো!!
দুটো দিন বেশ নিরিবিলিতে মনোরম পরিবেশে কাটলো বেশ। কালিজ ভ্যালিতে এই একটি রিসোর্ট… Rainbow valley resort। ২০০০-৩০০০ টাকার মধ্যে রুম আছে, সবরকম আধুনিক ব্যবস্থাপনা। প্যাকেজ হিসেবে দৈনিক তিনবেলা খাওয়া খরচ… জনপ্রতি ৬০০ টাকা।
ছবি : লেখক