কয়েক বছর আগেও শীতের সঙ্গে শহরে তাবু ফেলত সার্কাস। ট্রাপিজের খেলা থেকে জীব-জন্তুর আকর্ষণ তো থাকতই, তবে জোকারের কাণ্ডকারখানায় হেসে লুটোপুটি খেত আট থেকে আশি। জীবজন্তুর খেলা নিষিদ্ধ হতেই সার্কাস তার আভিজাত্য অনেকটাই হারাল। তারপরও জাগলিং, ব্যালান্সের খেলার পাশাপাশি মনোরঞ্জনের শেষ ভরসা ছিল জোকারদের রঙ্গরস।
কিন্তু করোনাকালে গোটা দুনিয়াটা ওলটপালট হতেই জীবন থেকে অনেক কিছুই যেন ধীরে ধীরে মিলিয়ে যেতে শুরু করেছে। নিয়ম মেনে হেমন্ত ফুরলেই শীত আসবে। কিন্তু এ বছরও মনে হয় না শহরের কোনও সার্কাস ময়দানে তাবু ফেলবে কোনো সার্কাস পার্টি। সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার নানা বিধি নিষেধে কত মানুষের জীবন জীবিকা যে সংকটে তার হিসাব দেওয়া কঠিন।
করোনা নিয়মিত কেড়ে নিচ্ছে রুটি রুজি। বিভিন্ন পেশার মানুষ প্রতিদিন কাজ হারাচ্ছেন। এদের মধ্যে বিশেষভাবে বলতে হয় সার্কাসের জোকারদের কথা। তাদের আজ দেড় বছর ধরে কোন রোজগার নেই, অর্থাভাব তাদের এমন জায়গাতে নিয়ে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে যে ওরা আজ নিজেদের এই জীবিকাকেই ভুলতে বসেছেন।

শিলিগুড়ির বেশ কয়েকজন জোকার যারা একসময় এই পেশাতে বেশ সারা ফেলেছিলেন তারা এই পেশা ছেড়ে দিয়ে অন্য পেশাতে চলে গেছেন। শিলিগুড়ির এক জোকার যিনি প্রচুর সার্কাসে দর্শকদের মনোরঞ্জন করেছেন নাম অসিত মন্ডল,আজ সবকিছু হারিয়ে নিজের পরিবার নিয়ে প্রায় পথে বসেছেন।তিনি জানালেন গত দুবছর ধরে তাঁর হাতে কোনও কাজ নেই। কিভাবে পেট চালাবেন বুঝেই উঠতে পারছেন না। আর কিছুদিন এইভাবে চললে পরিবার সহ সবকিছু বিক্রি করে বাইরে চলে যেতে হবে। কারন শিলিগুড়িতে থাকতে গেলে প্রচুর টাকার প্রয়োজন। আগে যখন কাজ ছিল তখনই কোনমতে চলত। আর এখন তাদের না আছে কাজ, না আছে রোজগারের বিকল্প রাস্তা।

শিলিগুড়ি সহ গোটা উত্তরবঙ্গ জুড়ে সার্কাসে যারা এই পেশায় ছিলেন তাদের গত আঠেরো মাস ধরে কোন কাজ নেই। রোজগারের অভাবে নিজের ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা পযর্ন্ত বন্ধ হয়েছে। নিরুপায় হয়ে সাহায্যের জন্য আবেদন করেছেন বহুবার রাজ্য এবং কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে। রাজ্য সরকার কিছু সাহায্য করলেও কেন্দ্রীয় সরকারের কাছ থেকে কোনও উত্তর পাওয়া যায় নি। হতাশাগ্রস্ত সার্কাসের জোকারেরা আজ সম্পূর্ণভাবে হতাশ। বেঙ্গল সার্কাস আসোসিয়েসনের পক্ষ থেকে জানা গিয়েছে, যদি সরকার কোন সবুজ সংকেত দেয় তবেই কিছু করা সম্ভব, তা না হলে বাঁচার আর কোনও পথ নেই। কিন্তু অপেক্ষারও তো একটা শেষ আছে। ততদিন কি হবে এইসব জোকারদের। কিভাবে পেটের ভাত যোগাবেন তারা?

প্রতিদিন নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম বাড়ছে। বাড়তে বাড়তে সাধারণ মানুষের নাগালের প্রায় বাইরে চলে গিয়েছে। যখন ওদের কাজ ছিল তখনও মাস ফুরলে সামান্য বেতনই পেত। তখনই সংসার চালাতে নাভিশ্বাস উঠয় আর এখন মাসের পর মাস রোজগারবিহীন। কিভাবে চালাবেন সংসার, এই প্রশ্ন চিহ্নটাই তীব্র বেগে ধেয়ে আসছে ওদের দিকে। যদি অন্তত কয়েক মাসের মধ্যে অবস্থা আগের মতন হয়ে যায় তবেই আবার চলবে সার্কাস। কোনক্রমে বেঁচে যাবেন যোগেশ রায় রঞ্জিত সুত্রধররা। কিন্তু সেই দিন কবে আসবে? কবে আবার সার্কাসের তাবু পড়বে শহরের ময়দানে, ফের ছোটরা বড়রা করোনা ভুলে সার্কাস দেখার উৎসাহ পাবে, এরকম বহু প্রশ্নের সহজ উত্তর দেওয়া আজ সব থেকে কঠিন কাজ।