দর্পণ-শব্দটিকে যদি আমি অহংকারের একটি পর্যায়-শব্দ বলি, তাহলে অনেকই বেশ চমকিত হয়ে উঠবেন জানি। তবু একই সঙ্গে আপনারা খানিক অবহিত হয়ে বসবেন নিশ্চয়, কেননা ‘শব্দ’ এমনি এক অলৌকিক স্ফুরণ, যার ক্রিয়ামূলের গভিরে দার্শনিক মনের বিরাট এক অভিসন্ধি লুকিয়ে থাকতে পারে। যে ক্রিয়াপদ থেকে ‘দর্প’ কথাটার উৎপত্তি সেই দর্প মানুষের কথার ফেরে পুণরায় ক্রিয়াপদ হয়ে গেল। পণ্ডিতরা সেই ক্রিয়াপদের অর্থ করলেন ‘সন্দীপয়তি’, অর্থাৎ যা চেতিয়ে দেয়, চেতিয়ে তোলে। আমরা এই চেতিয়ে তোলার ব্যাপারটাকেই অহংকার বলবো না তো? কারণ যা চেতিয়ে তোলে সেটাই নাকি দর্পণ। দর্পণ মানে আয়না। আয়নায় আমরা নিজেদের চেহারা দেখি — নিজেকে দেখার পর যে প্রতিক্রিয়া হয় আমাদের মনে সেটা কোনও-না-কোনওভাবে আমাদের চেতিয়ে দেয়– বেশিরভাগ সময়েই তা ইতিবাচকভাবে চেতিয়ে দেয়, কিন্তু গুটিকতক ক্ষেত্রে তা হীনমন্যতার প্রতিক্রিয়াও বহন করে যদিও সেটাও কিন্ত বিপ্রতীপভাবে চেতিয়ে তোলাই বটে।
বলতে বাধা নেই মহাত্মা গান্ধীর মতো আত্মদর্শী পুরুষ আর কে আছেন! আত্মদর্শী মানুষও কিন্তু দার্শনিক দৃষ্টিতে আপন আত্মার প্রতিভাসে নিজেকে যাচাই করে নিতে থাকেন। গান্ধী নিজের পুর্বজীবনের কথা বলতে গিয়ে জানিয়েছেন যে, তিনি যখন ইংল্যান্ডের সাউদাম্টনে পৌঁছোলেন, তখন থেকেই নিজের জামাকাপড় নিয়ে লজ্জিত হতে থাকলেন, এমনকী বম্বে-কাট্-এর শহুরে জামাও তার পছন্দ হল না। সেইকালের দিনে দশ পাউন্ড খরচা করে লন্ডনের বন্ড স্ট্রিট থেকে সুট কিনে পরার পরেও ব্যাপারটা ঠিক পুরোপুরি ইংরেজ সুলভ হয়নি বলে সামান্য ক্ষোভ তখনও ছিল তার। ঠিক এই কথাগুলি বলার সময় আয়নায় নিজেকে বার বার দেখে নেওয়াটা আমার একটা বিলাসিতার মধ্যে ছিল, বিশেষত বাড়ির বাঁধাধরা নাপিত যেদিন আমার দাড়ি কামিয়ে দিতে যেত। তাছাড়া দিনের প্রথমভাগে আমি অন্তত দশ মিনিট সময় ধরে এক বিরাট আয়নার সামনে দাড়াতাম। ফ্যাশন অনুযায়ী আমার চুলে সিঁথি কেটে চুলটাকে সঠিক জায়গায় সুস্থিত করাটাই একটা প্রাত্যহিক ‘স্ট্রাগল’ ছিল আমার পক্ষে। ততবারই অবিন্যস্ত অবাধ্য কেশরাশিকে বাগে আনাটা আমার অভ্যাসে দাড়িয়ে গিয়েছিল। তার মধ্যে আমি যতবারই ‘হ্যাট’ পরতাম বা খুলতাম, ততবারই অবিন্যস্ত অবাধ্য কেশরাশিকে বাগে আনাটা আমার অভ্যাসে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল।
আমরা বলতে চাই— এই যে আয়নার কাজটা, এখানে তো যথার্থই নিজেকে যাচিয়ে নেওয়া এবং একই সঙ্গে নিজেকে চেতিয়ে নেবার একটা সমীকরণ আছে। অর্থাৎ কিনা, প্রতিবিম্বিত “আমি”;-টুকু আমার কাছেই যদি উপভোগ-মধুর হয়ে ওঠে, তাহলে সমস্যা তো কিছুই নেই। সেখানে আপন চেহারার বহিরঙ্গে যদি কম-বেশি একটা পরিবর্তন আনা যায়, তাহলে চেহারাটাকে চেতিয়েও নেওয়া যায়। তাহলে আয়না মানেই এমন একটা “সেলফ্-ইনট্রোস্পেকশনে’র সুযোগ এবং সেই সুযোগটাকে এক একজন এক একভাবে কাজে লাগাচ্ছেন। এমনিতেই এটা একটা কথা বটে যে, প্রায় প্রত্যেকটা মানুষই নিজের চেহারা এবং গুণ নিয়ে অসন্তুষ্ট থাকেন না। আর সেই আত্মতুষ্টির প্রধান আধারশক্তি কিন্ত আয়না যেখান থেকে নিজের উপর আবেশ জন্মায়। সেই আদিম কালটার কথা ভাবাও যায় হয়তো, যখন মানুষ নিজের প্রতিকৃতি কীভাবে দেখতে হয় তা জানত না। তখন আয়নার কাজ করত আর একজন মানুষ– সেই ছিল তার সৌন্দর্যের আয়না। কিন্ত এমন আয়নার কোনও প্রত্যক্ষতা নেই বলে মানুষ কিন্তু প্রথম থেকেই চেষ্টা করেছে নিজেকে নিজে দেখার এবং এ-ব্যাপারে তাকে সবচেয়ে বেশি সাহায্য করেছে বিধাতার আদি সষ্টি জল।
আমি নার্সিসাস-এর কথা শুনে অবাক হই না। গ্রামগঞ্জের স্বচ্ছ নিথর পুকুরগুলিতে যখন গাছগাছালির ছায়া পড়ত, সেই মেদুর জলের মধ্যে নিজেকে দেখাটা যে কত মেদুরভাবে অর্থবহ হতে পারে, তা বুঝতাম-আমার কাকার মেয়েকে যখন দিঘির জলে নিঃশব্দে মুখ দেখতে দেখতাম। ছাব্বিশ বছরেই দিদি বিধবা হয়েছিলেন, সেই দিদি দিঘির আয়নায় নিজের মুখ দেখতেন মাঝে মাঝে। নিশ্চয় সেই দিঘির জলের প্রতিবিস্ব তাকে জন্মান্তরের দুঃখ মনে করিয়ে দিত, নিজের মুখখানি দেখে তিনি যেভাবে কাঁদতেন, তাতে বুঝতাম তার জীবনে যা হওয়ার নয়, তাই ঘটেছে। অনেক পরে বঙ্কিমচন্দ্র পড়ার সময় জলের আয়নাটুকু আমার কাছে আরও তাত্বিক বস্তু হয়ে উঠেছে।
বঙ্কিমের নায়িকা রোহণীও বিধবা। সে বারুণী পুকুরের ঘাটে জল আনতে এসেছিল। সেখানে ভরা পুকুরের জল রোহিণীকে অন্যত্তর এক মাত্রায় চিনিয়ে দিচ্ছে বলেই বঙ্কিম লিখেছেন –বারুণী পুষ্করিণী লইয়া আমি বড় গোলে পড়িলাম — আমি তাহা বর্ণনা করিয়া উঠিতে পারিতেছি না। পুষ্করিণীটা অতি বৃহৎ– নীল কাচের আয়না-মতো ঘাসের ফ্রেমের পরে আর একখানা ফ্রেম– বাগানের ফ্রেম — পুষ্করিণীর চারিপাশে বাবুদের বাগান –উদ্যান-বৃক্ষের এবং উদ্যানপ্রাচীরের বিরাম নাই। সেই ফ্রেমখানা বড় জাকাল — লাল, কালা, সবুজ, গোলাপী, সাদা, জরদ, নানাবর্ণ ফুলে মিনে করা — নানা ফলের পাতর বসান। মাঝে মাঝে সাদা বৈঠকখানা বাড়িগুলো এক এক খানা বড় বড় হীরার মতো অন্তগামী সুর্যের কিরণে জ্বলিতেছিল। আর মাথার উপর আকাশ-সেও সেই বাগান ফ্রেমে আঁটা, সেও একখানা নীল আয়না। আর সেই নীল আকাশ, আর সেই বাগানের ফ্রেম, আর সেই ঘাসের ফ্রেম, ফুল, ফল, গাছ, বাড়ি, সব সেই নীল জলের দর্পণে প্রতিবিম্বিত হইতেছিল। মাঝে মাঝে সেই কোকিলটা ডাকিতেছিল।এ সকল এক রকম বুঝানো যায়, কিন্তু সেই আকাশ, আর সেই পুকুর, আর সেই কোকিলের ডাকের সঙ্গে রোহিণীর মনের কি সম্বন্ধ, সেইটা বুঝাইতে পারিতেছি না। তাই বলিতেছিলাম যে, এই বারুণী পুকুর লইয়া আমি বড় গোলে পড়িলাম।
রোহিণী কি ভাবিতেছিল, বলিতে পারি না কিন্তু বোধ হয় ভাবিতেছিল যে, কি অপরাধে এ বালবৈধব্য আমার অদৃষ্টে ঘটিল? আমি অন্যের অপেক্ষা এমন কি গুরুতর অপরাধ করিয়াছি যে, আমি এ পৃথিবীর কোন সুখভোগ করিতে পাইলাম না কোন দোষে আমাকে এ রূপ যৌবন থাকিতে কেবল শুষ্ক কাষ্ঠের মতো ইহজীবন কাটাইতে হইল? যাহারা এ জীবনের সকল সুখে সুখী — মনে কর, ওই গোবিন্দলালবাবুর স্ত্রী–তাহারা আমার অপেক্ষা কোন গুণে গুণবতী — কোন পূণ্যফলে তাহাদের কপালে এ সুখ — আমার কপালে শুন্য? দূর হৌক — পরের সুখ দেখিয়া আমি কাতর নই- কিন্ত আমার সকল পথ বন্ধ কেন? আমার এ অসুখের জীবন রাখিয়া কি করি?

যে রোহিণী হরলালের সম্মুখে মুখরার ন্যায় কথোপকথন করিয়াছিল– গোবিন্দলালের সম্মুখে সে রোহিণী একটা কথাও কহিতে পারিল না। কিছু বলিল না — গঠিত-পুত্তলির মতো সেই সরোবর-সোপানের শোভা বর্ধিত করিতে লাগিল।গোবিন্দলাল স্বচ্ছ সরোবর- জলে সেই ভাস্করকীর্তিকল্প মুর্তির ছায়া দেখিলেন, পূর্ণচন্দ্রের ছায়া দেখিলেন এবং কুসুমিত কাঞ্চনাদি বৃক্ষের ছায়া দেখিলেন। সব সুন্দর– কেবল নির্দয়তা অসুন্দর। সৃষ্টি করুণাময়ী — মনুষ্য অকরুণ। গোবিন্দলাল প্রকৃতির স্পষ্টাক্ষর পড়িলেন।
বঙ্কিমের এত বড় একটা উদ্ধৃতি দিয়ে আমরা কিন্তু রোহিণার মন বিচার করতে বসিনি। আমরা শুধু ‘নীল কাচের আয়নার মতো’ বারুণী পুষ্করিণীর জল নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছি। জলই সেই আদি প্রকৃতি যেখানে মানুষ প্রথম নিজের ‘রিট্রোস্পেকশন’ শুরু করেছিল এবং এই প্রতিবিম্ব-পাত থেকেই নার্সিসাস একটা দার্শনিক তত্ত্ব হয়ে উঠেছে — দর্পণ সেখানে ভালবাসার দেবতার প্রতিশব্দ হয়ে উঠেছে, দর্পণ দর্পক হয়ে উঠেছে, যেমনটা গুপ্তযুগের অমর সিংহ বলেছিলেন কন্দর্পো দর্পকো’নঙ্গঃ। দর্পণে আপন প্রতিবিম্বপাত মানুষকে অহংকারও দেয় একটা। নার্সিসাস তো বনে বনে ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন, কিন্ত চলার পথে এক সময় তিনি বুঝতে পারেন যে, কেউ যেন তাকে অনুসরণ করছে।
যিনি অনুসরণ করছিলেন, তিনি অন্সরা প্রতিধ্বনি, ইংরেজিতে ‘ইকো’। ইকো নার্সিসাসকে দেখেই তাকে ভালবেসে ফেলেছিলেন, তাই সম্ভম্রে দূর থেকে অনুসর করছিলেন নার্সিসাসকে। কিছুক্ষণের মধ্যেই নার্সিসাস বুঝতে পারলেন যে, কেউ তাকে অনুসরণ করছে। তিনি চেচিয়ে উঠলেন পিছন ফিরে– কে ওখানে? কে? উত্তরে বর্ণময় প্রতিধ্বনি শোনা গেল — কে ওখানে? কে? এই উত্তর কিন্তু ইকো দিয়েছিলেন। নারসিসাসের দিক থেকে তাতে কোনও প্রতিক্রিয়া হল না এবং ইকো নিরুপায় হয়ে যার আপন স্বরূপ প্রকাশ করে জড়িয়ে ধরতে গেলেন তাকে। নার্সিসাস সঙ্গে সঙ্গে পিছনে সরে গিয়ে বললেন — আমাকে ছেড়ে দাও, আমি একা থাকতে চাই। তার কথা শুনে মন ভেঙে গেল অপ্সরা প্রতিধ্বনির। তিনি চলে গেলেন এবং দিন কাটাতে লাগলেন পর্বতের সবুজ উপত্যকা ভূমিতে, যেখানে তিনি কথা বললে তারই কথা শুধু প্রতিধ্বনি হয়ে ফিরে আসে কানে।
বেশ কিছুদিন পর অপ্সরা প্রতিধ্বনির এই হতাশার কথা জানতে পারলেন নিয়তির দেবী নেমেসিস। তিনি নার্সিসাসকে উপযুক্ত শাস্তি দেবার বাসনায় তাঁকে বনপথের ভ্রান্তি দিয়ে টেনে আনলেন এক থির-নিবিড় জলস্থানের সামনে। নার্সিসাস সেই গভীর পুষ্করিণীর ধারে বসে আপন মুখচ্ছায়া দেখতে পেল জলের মধ্যে। নার্সিসাস এমনিতেই এক অসামান্য সুন্দর পুরুষ। জলের মধ্যে নিজের সৌন্দর্য দেখে নিজের প্রতিই তাঁর এমন মুগ্ধতা তৈরি হল যে, তিনি যেন আটকে রইলেন সেই জলের আধারে।
নার্সিসাসের জীবন শেষ পর্যন্ত আত্মপ্রেমের কোন স্বর্গে উপস্থিত হল তার ব্যাখ্যা দেওয়া কঠিন। কেননা সেটা আত্মহত্যার জায়গা। কিন্তু এই কাহিনির মধ্যে দু’টি শিক্ষণীয় দার্শনিক কথা আছে, যেটা বঙ্কিমের রোহিণীও বোঝে, আর বোঝেন আমাদের ভারতবর্ষের রসশাস্ত্রকারেরা। একটা অদ্ভুত তো দেখলেন এই কাহিনিতে যে, যিনি নার্সিসাসের প্রেমে পড়ছেন তিনি সেই অপ্সরা প্রতিধ্বনিও কিন্তু নিজেকেই শুধু ধ্বনিত করছে বলে সেখানেও এক আপন বহুমানন আছে, অর্থাৎ সে নিজেই নিজেকে শুনছে। নিজেকেই নিজে ‘অ্যাড্রেস’ করা ছাড়া তার আর কোনও জগৎ নেই বলে সেখানে একদিকে যেমন এক আত্মগরিমা কাজ করে, তেমনই আছে এক অলৌকিক বিষণ্ণতা, যা সে নিজে বোঝে না, কিন্তু আমরা বুঝি, কেননা একেলা গায়কের নহে তো গান গাহিতে হয় দুই জনে।
একইভাবে নার্সিসিস নিথর জলে আপন মুখের সৌন্দর্য দেখে যেভাবে আপনাকে আপনিই পাগল হয়ে বসল, এখানে সেই সৌন্দর্য অনুভবের মধ্যে একপ্রকার দর্প আছে; ইংরেজিতে ওরা বলেছেন – Narcissism is the pursuit of gratification from variety or egoistic Admiration of one’s own attributes. এইবার তাহলে বলুন, সম্পূর্ণ গর্বভাবাত্মক ‘দর্পি’ ধাতু থেকে যে দর্পণ কথাটা এসেছে, সংস্কৃতের এই শব্দখানি এসেছে, সেটা কত গভীরভাবে সদর্থক। আমরা বারবার বলছি – নার্সিসাস বা নার্সিসিজমে’র তত্ত্বগত দিকটা মনুষ্য-প্রকৃতির একটা দিক বটে, কিন্তু আমাদে দর্পণের তত্ত্ব আরও অনেক গভীর। কেননা দর্পণের প্রতিবিম্ব- বোধ ভারতবর্ষের গবেষণায় অন্যতর এক মাত্রা সূচিত করে। ভারতবর্ষ একদিকে জানে যে, দর্পণে যে ছায়া পড়ে, তার কোনও সত্তা নেই, নিত্যতাও নেই, সেটা মিথ্যা। এই দার্শনিকতার চূড়ান্ত পর্যায়ে আমাদের জীব-জগৎও কিন্তু এক বৃহত প্রতিবিম্ব, যেটাকে বৈদান্তিক ভাষায় মায়া বলেছি আমরা। কিন্তু দর্পণের দার্শনিক রূপক বোঝানোর ছলে আমরা দর্পণে প্রতিবিম্ববৎ মায়ার তত্ত্বও বোঝাতে চাই না। কেননা তাতে দর্পণের ইতিবাচকতা বোঝা যায় না। আমরা, সত্যি কথা! দর্পণটাকেই বোঝাতে চাইছি এবং একই সঙ্গে বোঝাতে চাইছি দর্পণের প্রতিভাসে যে সত্য তৈরি হয়, সেই সত্য অলৌকিক এক কাব্যের সত্য। সেই প্রাতিভাসিক সত্যের জোর এতটাই যে, দর্পণ এক সময় একটা গোটা সমাজের শুভ চিহ্ন হয়ে ওঠে, এমনকী সেই দর্পণে প্রতিফলিত মৌল বাস্তব দার্শনিক তত্ত্বান্তরের জন্ম দেয়।আমাদের জীবনে জাতকর্মের সংস্কারের মধ্যে অন্নপ্রাশণ, উপনয়ন, বিবাহ সর্বত্রই তামা, পিতল বা কাসার তৈরি একটা দর্পণ রাখ হয় মাঙ্গলিক চিহ্ন হিসেবে।এর সবচেয়ে বড় কারণ তো এটাই যে, স্থির জল ছাড়াও মানুষ যেদিন প্রথম তামার পাত ঘষে ঘষে চকচকে উপরিতলের উপর নিজের স্থির প্রতিচ্ছবি দেখতে পেল, সেদিন থেকেই এই প্রথম আয়নাটা স্মরণে রেখে দিল মানুষ, মাঙ্গলিক হিসেবে এখনও তা অন্বপ্রাশণ, বিবাহ কিংবা বহু উপচারের পুজোয় বরণডালা বা কুলোর মধ্যে দর্পণের স্থান হয়ে গিয়েছে।
শুধু ভারতবর্ষের আস্তিক ধর্ম নয় নাস্তবাদী বৌদ্ধদের মধ্যেও অষ্টমঙ্গলের রূপ আছে এবং তার মধ্যে একটা কিন্তু দর্পণ। তিব্বতী বৌদ্ধরা বলেন– বুদ্ধ ছয় বছর ধরে কঠোর পরিশ্রমে তপস্যা করার পর তাঁর শরীর রমণী তাকে দই খেতে দেন। সেই দই খাবার পরেই তার শীর্ণ দেহ মেদ-মাংসে ভরাট হয়ে ওঠে এবং তখন তার শরীরের মধ্যে লুপ্তপ্রায় দেহচিহ্নগুলি ফুটে উঠতে থাকে। ঠিক এই সময় যিনি জীবের দেহ এবং আকার সৃষ্টি করেন, সেই আকৃতি-দেবী বুদ্ধের হাতে একখানি দর্পণ দেন তার সৃষ্টি করেন, সেই আকৃতি দেবী বুদ্ধের হাতে একখানি দর্পণ দেন তার আপন প্রতিকৃতি দেখার জন্য। সেই থেকে দর্পণ বৌদ্ধদের কাছেও এক মাঙ্গলিক।
আমরা দর্পণকে মাঙ্গলিক হিসেবে গ্রহণ করেছি বহুকাল। কুষাণ কিংবা শুঙ্গ যুগের শিল্পকৃতিতে আমরা দর্পণের খোঁজ পাচ্ছি, মেয়েরা সামনে আয়না ধরে আপন সৌন্দর্য পরীক্ষা করছে — এই খবর আমাদের কাছে খুব বাস্তবোচিতভাবেই স্বাভাবিক। কিন্তু আয়নায় যে রূপ ফুট উঠছে তার দার্শনিক তাৎপর্য এমনই যে, সেখানে আমরা মৃণ্ময় জাগতিক সত্তাকে চিন্ময়ী হয়ে উঠতে দেখি। আমরা যখন দর্পণে নিজের মুখ দেখি, তখন সেই প্রতিবিম্বকেই আমরা ‘আমি’ বলে ভাবি। সেই ‘আমি’ দেখার পর বেশির ভাগ সময়েই “মাছের মধ্যে রুই/আর মানুষের মধ্যে মুই” গোছের দর্পণ-দর্প তৈরি হয় মনে। কখনও বা যদি এমন হয় যে, নিজের স্বরূপকে নিজের মনে তেমন করে ধরছে না, তাহলে সেই প্রাতিভাসিক প্রতিবিম্ব থেকে শিক্ষা নিয়ে আজন্মলব্ধ মুখ-শরীরে যথাসম্ভবদ পরিবর্তন এনে নিজেকে যথেষ্ট পরিমাণ গ্রহণীয় করে তোলার চেষ্টা করি। স্বভাবিত এবং স্বচেষ্টায় পরিকল্পিত সেই পরিবর্তিত রূপ আয়নায় দেখে তখন হয়তো ভালও লাগে। মনে হয় আসল আমি তাহলে এইটাই। কিন্ত মনে মনে মানুষ জানে যে, আয়নায় দেখা মুখ- চোখ-শরীর আমি নই। ‘আমি’-র প্রতিভাস।
দর্পণে দেখা এই প্রাতিভাসিক সত্যটাকে আমরা যখন দার্শনিকতার মধ্যে প্রতিষ্ঠা করি, তখন কিন্তু জড় বন্তুটাকে এক সজীব রূপকের মতো দেখতে পাই। প্রথমেই তখন মনে হয়, দর্পণ নিজেই এক সজীব সত্তার অনুকার। দার্শনিক দৃষ্টিতে মানুষের চোখই কিন্তু আদিম দর্পণ যেখানে ছায়া পড়ে অনন্ত মানুষের, পরিবার-পরিজনের, বন্ধু-বান্ধবের, অন্যান্যের। আমার চোখে যখন অন্যজনকে দেখি, তখন সে কিন্তু আমার চক্ষু-দর্পণে নিজেকে দেখছে এবং একই সঙ্গে তার চোখের আয়নায় কিন্তু আমি আমাকেও দেখছি। এই চক্ষু-দর্পণের মাধ্যমেই আমাদের পরস্পরের সম্পর্ক তৈরি হয় এবং সেই পরস্পরের চাক্ষুষ পরিচয়ের পর্যবসান ঘটে চিত্ত-দর্পণের ছায়ায়।
মহাকবিকে তখন লিখতে হয়—
আপনাকে এই জানা আমার ফুরাবে না
সেই জানারই সঙ্গে সঙ্গে তোমায় চেনা।
দুর্গাপূজার দশমীতে যখন সেই আদিম জল-দর্পণে মহাদেবীর প্রতিমাচ্ছবি ভেসে ওঠে, পুরোহিত মন্ত্র পড়তে থাকেন “গচ্ছ গচ্ছ পরং স্থানং স্বস্থানং পরমেশ্বরি”– পরমা দেবী আমার! তুমি নিজের জায়গায় যাও এখন। বছর গেলে তুমি আবার এসো এখানে আমার ঘরে— পুনরাগমনায় চ। এই যে দেবী নিজের জায়গায় যাবেন, সেই নিজের স্থানটুকু নির্দেশ করা হয় দর্পণে– যেখানে দেবীর মুগ্ময়ী সত্তা চিন্ময়ীতে মিলিয়ে যাবে। দর্পণ এখানে সূর্যমন্ডলের প্রতিরুপ। দর্পণের মন্ত্রের মধ্যেই তার এই সূর্যস্বরূপতা ফুটে ওঠে। ঋগবেদের ভাবনায় দর্পণ হল সেই পুরাতন আদিম জ্যোতিস্বরূপ যেখানে প্রতিটি দিনের কর্মাকর্ম যেন দেখতে পাওয়া যায়–যেন পশ্যন্তি বাসরম্। এই দর্পণে যখন দুর্গামূর্তির প্রতিভাস ভেসে ওঠে, তখনই বুঝতে পারি জ্যোতিঃস্বরূপিণী যে দুর্গা-মাকে আমরা এই চারদিন ধরে চক্ষু-দর্পণে মৃণ্ময়ী রূপে প্রত্যক্ষ করেছি, তিনি এবার চিত্ত দর্পণে আশ্রয় নিলেন, তিনি মিলিয়ে গেলেন সূর্যমণ্ডলের মধ্যে। এই সূর্যমণ্ডল আসলে আমাদেরই হৃদয় আকাশে অবস্থিত হৃদয়-দর্পণে।