মন্দিরের ইতিহাস :
দাসপুর গ্রামের সুবর্ণবণিক আর তন্তুবায়রা অনেকগুলি মন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তার ভিতর সিংহদের এই গোপীনাথ মন্দিরটি ছিল সকলের সেরা। যেমন গরিমা ও গড়নে, তেমনই তার টেরাকোটা সজ্জায়। সুবর্ণবণিক সিংহরা দাসপুরে এসেছিলেন ওড়িশা থেকে, ইংরেজ আগমণের অর্ধশতাব্দী আগে। পত্তনীদার বঙ্গরাম চৌধুরীর বাড়ী থেকে অদূরেই বাস করত পরিবারটি। ১৭১৬ সালে কুলদেবতা গোপীনাথজীউর জন্য এক-রত্ন রীতির মন্দিরটি প্রতিষ্ঠা করেন তাঁরা। পরবর্তীকালে সিংহ পরিবারটি দাসপুর ছেড়ে কলকাতা চলে গিয়েছেন। তখন থেকে মন্দিরটি পরিত্যক্ত ও জীর্ণতার শিকার। পূর্বমুখী সৌধে ইমারতি থাম আর দরুণ খিলানে তিনটি দ্বারপথের অলিন্দ। দক্ষিণ এবং পশ্চিমে আরও দুটি অলিন্দ আছে, তবে সেগুলি আবৃত। গর্ভগৃহে একটিই দ্বারপথ। মাথায় বিষ্ণুপুরী ঘরানার চালা ছাউনি। ছাউনির মাথায় একটিই রত্ন, সেটি পশ্চিমের দেওয়াল ঘেঁষে স্থাপিত। এগুলিকে ‘আলগোছ টুঙ্গি’ মন্দির নামে অভিহিত করা হয়। দাসপুর এলাকায় এই রীতির আরও কয়েকটি মন্দির আছে।

অলঙকরন :
সামনের দেওয়াল আর চারটি স্তম্ভ টেরাকোটা ফলক দিয়ে মোড়া।
১. সামাজিক বিষয়ের ফলকের মধ্যে— পাদপীঠের লাগোয়া দেওয়াল আর স্তম্ভের গায়ে আছে ঝাম্পানে চড়া তামাকু সেবনরত জমিদারবাবু, বন্দুকধারী রক্ষী সহ নীলকর সাহেব, হরিণ শিকার, হার্মাদ রণতরী, নৌযুদ্ধের দৃশ্য ইত্যাদি।
২. তিনটি খিলানের মাথায় শিবলিঙ্গ-সহ প্রতিকৃতি দেউলের সারি।
৩. তিনটি বড় প্রস্থ, কার্ণিশের নীচের সারি এবং কোণাচের গায়ের ২টি করে সারিতে অনেক ফলক। সেগুলিতে রামায়ণ-কথা, পুরাণ, কৃষ্ণলীলা থেকে রাম-রাবণের যুদ্ধ, কালীয় দমন, দধিমন্থন, ননীচুরি, গোপিনীদের বস্ত্রহরণ, বৈষ্ণবদের সংকীর্তন দৃশ্য ইত্যাদি ফলক দেখা যায়।
তাছাড়াও, গর্ভগৃহে পিছনের দেওয়ালে পঙ্খের রঙ্গীন কাজ এবং দরজার কপাটে কাঠ-খোদাই কাজগুলিও চেয়ে দেখবার মত। মন্দিরটি দীর্ঘকাল বিগ্রহহীন ও পরিত্যক্ত।বন্যা কিংবা কোনও ভূমিকম্পের প্রকোপে মন্দিরটি পশ্চিম দিকে সামান্য হেলে গিয়েছে, দেখা যায়।

অনবদ্য টেরাকোট ফলকে সমৃদ্ধ এই মন্দির দীর্ঘদিন ধরে ক্রমশ শ্রীহীন হয়ে পড়ছিল। বিগ্রহহীন হয়ে এক রকম পরিত্যক্ত হয়ে পড়েছিল। কোন সরকারী সংস্থা এগিয়ে আসে নি একে সুসংসকৃত করে নবরুপ দিতে। ফল যা হওয়ার তাই হয়েছিল। আগাছা আর বটগাছের শিকড় জড়িয়ে ধরেছিল অস্টেপৃষটে । কিছুদিন আগে পরিবারের পক্ষে তা কাটা হয়। ক্ষতিগ্রস্ত হয় স্থাপত্য। কিন্তু বোঝা যায় নি এর পিছনে এইরকম অনুপম স্থাপত্য ঢেকে এক নতুন মন্দির তৈরীর পরিকল্পনা লুকিয়ে রয়েছে। সরকারী নথি ছাড়াও বেগলার থেকে ডেভিড ম্যাকাচ্চন , তারাপদ সাতড়া সহ বিভিন্ন ক্ষেত্র সমীক্ষকের লেখায় বারবার উঠে এসেছে এর অনুপম সৌন্দর্যের কথা। যে মন্দির দেখে প্রথমেই মনে আসে বাশবেড়িয়ার অনন্তবাসুদেব আর গুপ্তিপাড়ার রামচন্দ্র মন্দিরের টেরাকোটার কথা সেই অপরুপ শিল্প সুষমা আজ জড়াগ্রস্ত হয়ে হারিয়ে যেতে বসেছে।

জেলার এইরকম এক আইকনিক স্থাপত্য এভাবে নষ্ট হবে — সত্যই খুবই দুংখের বিষয়। দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে কংক্রিটের জঙ্গলে ঢেকে যাবে গোপীনাথ।আর বাকিটা ধংস হওয়া তো শুধু সময়ের অপেক্ষা।
সবার আগে এই শুরু হওয়া নির্মাণ কাজ বন্ধ হওয়া দরকার। কারন একবার তৈরী হয়ে গেলে আইনি জটিলতা , ক্ষতিপুরণ আরও নানা সমস্যার কারনে কিছু করা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়।
Property location:
Daspur 1 No Panchayat Samity, Daspur II Gram Panchayet , Owned by Late Haripada Singha family, Now managed by daughters family staying in Ghatal
আপনার তথ্য সমৃদ্ধ লেখাটি পড়ে উপকৃত হলাম। আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই। গর্ভে গৃহের দুটি দরজা ।উত্তর দিকে একটি লোহার দরজা আছে। অবাক করা ব্যাপার হল, দরজাতে এখনো মরচে ধরেনি। গর্ভ গৃহের সামনের দেওয়ালে রঙের কিছুটা তৎকালের মনে হয়েছে। এই সিংহ পরিবারের শেষ পুরুষ অপুত্রক হরি সিংহ। হরি সিংহের কন্যা প্রবাসী অর্চনা সিংহ দে বর্তমান এই মন্দিরের মালিক।
প্রসঙ্গত বলি, রাধাকান্তপুরে দাসেদের গোপীনাথ মন্দিরলিপি অনুসারে মন্দিটির প্রতিষ্ঠাকাল ১৬৯৬ খ্রিস্টাব্দের পূর্বে। কারণ ঐতিহাসিকগণের মতে শোভা সিংহ ১৬৯৬ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত জীবিত ছিলেন। আর শোভা সিংহের নির্দেশে শ্যামদাসের মুণ্ডচ্ছেদ হয়।