বিদ্যাসাগর জীবনের শেষ কুড়ি বছর তৎকালীন সাঁওতাল পরগণার জামতাড়ার কার্মাটাঁড়ে কাটিয়েছিলেন আদিবাসী লোকজনের মধ্যে, তাদের খাদ্য ও ওষুধ দিয়ে সাহায্য করতেন, গড়পড়তা বাঙালির মনে এরকমই বদ্ধমূল ধারণা আছে। তিনি নাকি অকৃতজ্ঞ বাঙালির প্রতি নিদারুণ অভিমানে সেখানেই স্বেচ্ছানির্বাসন নিয়েছিলেন। সম্প্রতি কবি সুবোধ সরকারের একটি লেখায় এটা পড়ে চমকে উঠেছিলাম।
এমনকি সুমিত সরকারের মত ঐতিহাসিকও বিনা বাক্যব্যয়ে সেটি মেনে নিয়েছেন। এমন সিদ্ধান্তেও উপনীত হতে তাঁর আটকায়নি যে, ঘরে বাইরে এত আঘাত তিনি পেয়েছিলেন যে মানুষ সম্পর্কেই তিনি অনাস্থাবাদী হয়ে উঠেছিলেন। কেউ কেউ তো তাঁকে মানববিদ্বেষী বা মিস্যানথ্রোপিস্ট বলে চিহ্নিত করেছিলেন।
তবে আসল সত্যটি হল, বিদ্যাসাগর কোনদিনই স্থায়ীভাবে কলকাতা ছেড়ে যান নি, ছুটিছাটার সময়ে, বিশেষ করে পুজোর ছুটিতে বা টানা ছুটির সময় তিনি কার্মাটাঁড়ে চলে যেতেন বিশ্রাম নেওয়ার জন্যে। স্বাস্থ্যোদ্ধারের জন্যে জামতাড়া, মধুপুর, শিমুলতলা, দেওঘর যাওয়াটা সেকালের রেওয়াজ ছিল। ধনী লোকেরা সেখানে বাড়িভাড়া নিতেন বা গৃহ নির্মাণ করতেন অবসর যাপনের জন্যে। তার সঙ্গে সেবাধর্ম মিলে গেলে তো সোনায় সোহাগা। জীবনের শেষ কয়েকবছরও তিনি মেট্রোপলিটান কলেজের কাজকর্ম দেখেছেন ভগ্নস্বাস্থ্য নিয়ে। পালকি করে এসেছেন বাদুড়বাগানের বাড়ি থেকে শঙ্কর ঘোষ লেনের কলেজে। মাঝেমাঝে চন্দনগরেও গিয়ে কিছুদিন কাটিয়ে আসতেন। সবদিক খতিয়ে দেখে এই সিদ্ধান্তে আসা খুবই সহজ যে, কার্মাটাঁড়ে পাকাপাকিভাবে তিনি কখনও থাকেননি, মানববিদ্বেষী হয়ে ওঠা তো দূরের কথা।
আর একটি গোলমেলে ধারণা আছে যে, তিনি নাকি কার্মাটাঁড়েই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছিলেন, সেখানেই তাঁর দাহকার্য হয়েছিল। এই নিদারুণ বিশ্বাস বাঙালির মনে এতই বদ্ধমূল ছিল যে, নিমতলা মহাশ্মশানে তাঁর শেষকৃত্য হওয়ার কথাটি বেমালুম জনমানস থেকে মুছে যায়। অনেক অনুসন্ধানের পর এই তথ্য পেতে সুবলচন্দ্র মিত্রর ইংরেজিতে লেখা বিদ্যাসাগরের জীবনী ”Isvar Chandra Vidyasagar, a story of his life and work’ আর বিহারীলাল সরকারের বিদ্যাসাগরের জীবনী পড়তে হল। ব্রায়ান হ্যাচারের বই ‘Vidyasagar : The Life and After-life of an Eminent Indian’-ও পড়তে হয়েছে। সেখানে বাঙালি বিদ্যাসাগরবিদদের হাস্যকর ও অর্বাচীন ক্রিয়াকলাপ নিয়ে অনেক তির্যক মন্তব্য আছে। Subal Chandra Mitra তাঁর বইয়ে বিদ্যাসাগরের শেষযাত্রার বিবরণ দিয়ে লিখেছেন, — “The uncovered stretcher with its majestic burden was borne on the shoulders of the son, grandsons, brothers, other relatives, and friends. On its way, the sorrowful cortege once stopped a while before the Metropolitan Institution building. Here Narayan Chandra cried out in loud, pathetic terms, and invoked the blessing of his parent, saying–’Oh! my beloved father, here stands your dear Metropolitan. Bless me from heaven –give me power to preserve your noble work.’ The pathetic appeal so affected the processionists, that each of them moved to a flood of tears. The procession moved on with, sad, slow steps, and at 5 O’clock reached the Nimtala cremation Ghat…”
তাহলে নিমতলা ঘাটে তাঁর শেষকৃত্যের বিষয়ে আর কোনও সংশয়ই থাকছে না। সুমিত সরকারের মতো পণ্ডিত থেকে হালের পণ্ডিতপ্রবরদের একাংশ যে বিদ্যাসাগরের কার্মাটাঁড়েই দেহাবসানের কথা লিখে গেছেন, তা সর্বৈব ভুল। নিমতলা ঘাটে তাঁর শেষকৃত্যের পূর্ণাঙ্গ বিবরণ পাওয়া যায় প্রতক্ষ্যদর্শী এক কবির (মানকুমারী বসু) জবানবন্দী থেকেও। শ্মশানঘাটে প্রয়াত মহামানবের দু’টি ফটো তুলেছিলেন এস সেন নামক এক ফটোগ্রাফার। ছবিতে দেখা যায় বিদ্যাসাগরের মাথার কাছে মুহ্যমান অবস্থায় বসে আছেন ভাই ঈশানচন্দ্র, শম্ভুচন্দ্র, সূর্যকুমার অধিকারী ও পুত্র নারায়ণ চন্দ্র শর্মা। আর একজন অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তি তাঁর আরেক ভাই শিবচন্দ্র কিনা তা অনুমানসাপেক্ষ।
শেষ জীবনে যে বিদ্যাসাগর কলকাতা-কার্মাটাঁড়-চন্দননগর করতেন, তা লিখে গেছেন রমেশচন্দ্র দত্ত সুবল চন্দ্র মিত্রের লেখা বিদ্যাসাগরজীবনীর মুখবন্ধে। তিনি লিখেছেন, — “His health was already failing about this time; and he often retired from Calcutta to the more bracing climate of Karmatar where he had a country-seat ; where…”
বরাবরের জন্যে যে তিনি কার্মাটাঁড়ে যাননি, তা বোঝা যাবে Often শব্দটির ব্যবহারে। কিন্তু বাঙালি তাঁকে কার্মাটাঁড়ে নির্বাসিত করে নাকে সর্ষের তেল দিয়ে ঘুমোচ্ছিল।
এতই নিশ্চিন্ত ছিল সকলে তাঁর কার্মাটাঁড়-বাস সম্পর্কে যে নিমতলা মহাশ্মশানের দেওয়ালের ফলকে চার বছর আগেও দাহকৃত বিখ্যাত মনীষীদের নামের তালিকায় বিদ্যাসাগরের নাম ছিল না। বলা যায়, He was conspicuous by his absence। নাম ছিল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের। ফেসবুকে প্রথম দাবি তুলি আমি সেখানে বিদ্যাসাগরের স্মৃতিফলক লাগানোর জন্যে।যদিও জানতাম আমার একার দৌড় বেশিদূর নয়। অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে সেখানে ২০২০-তে একটি ফলক লাগিয়েছেন ভারতসভা বা Indian Association নামক সংস্থা। যদিও তার দু-বছর আগে থেকেই এর দাবি আমি তুলে আসছিলাম। উইকিপিডিয়ায় নিমতলা মহাশ্মশানে দাহকৃত মনীষীদের নামের তালিকায় সর্বাগ্রে বিদ্যাসাগরের নাম তুলতে হয় আমাকেই। এসব কাজ অবশ্য বিদ্যাসাগর-বিশেষজ্ঞদের কাছে কলকে পায় না। তাঁরা বিদ্যাসাগরের ঠিকে নিয়ে গজদন্তমিনারে বসে আছেন, সেখানে অখ্যাত কাউকে ঢুকতে দেবেন না।